Home নিয়মিত অলিম্পিকের কথকতা

অলিম্পিকের কথকতা

মিজানুর রহমান মিজান..

সাধে কি আর অলিম্পিককে বলে ‘গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ’! এ ধরাধামের আর কোনো প্রতিযোগিতার নেই এমন সর্বগ্রাসী ব্যাপার স্যাপার। ধরণীর এই মহা ক্রীড়াযজ্ঞের ৩০তম আসর বসছে ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনে। আসর শুরুর পূর্বক্ষণে অলিম্পিকের আদ্যোপান্ত খানিকটা জেনে নিতেই আজকের আয়োজন। অলিম্পিক গেমসের ইতিহাস যেমন প্রাচীন তেমনি ঐতিহ্যমণ্ডিত। বর্তমান আছে এমন প্রতিযোগিতার আর কোনটিরই শেকড় এতটা গভীরে প্রোথিত নয়। অলিম্পিকের ইতিহাসকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। প্রাচীন অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতক থেকে চতুর্থ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। আর আধুনিক অলিম্পিকের পথচলা ব্যারন পিয়েরে কুবার্তের হাত ধরে ১৮৯৪ সাল থেকে। সেই প্রাচীনকাল থেকে আজকের আধুনিক অলিম্পিক মাঝে পেরিয়ে গেছে অনেকটা সময়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রেক্ষিতে অলিম্পিকে এসেছে নানা পরিবর্তন। অনেক পথ পার করে অলিম্পিক আজ বর্তমান অবস্থায় এসেছে। সেসব কথা জানার পথে প্রথমেই আমরা কয়েক হাজার বছর আগের পুরনো গ্রিসের অলিম্পিকে ফিরে যাচ্ছি অলিম্পিকের অতীত জানতে।
অলিম্পিকের পুরনো অধ্যায়
অলিম্পিকের পুরনো ইতিহাসটা এতটাই প্রাচীন যে পৃথিবীর আর কোনো ক্রীড়া আসর এর ধারে কাছেও নেই। প্রাচীন অলিম্পিকের উৎপত্তি নিয়ে যে জনশ্রুতিগুলো রয়েছে তা খানিকটা ধোঁয়াশাপূর্ণ। বেশকিছু মিথও প্রচলিত আছে এ নিয়ে। এগুলোর মাঝে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত মিথ অনুসারে গ্রিক রাজা হেরাক্লেস এবং তার বাবা জিউস এই গেমসের আদি পুরুষ। প্রাচীন গ্রিসে অলিম্পাস পাহাড়কে পবিত্র মনে করা হতো। ভাবা হতো এ পাাহাড়ে দেবতারা বাস করেন। তাই দেবতাদের সম্মানে পাহাড়ের পাদদেশে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। হেরাক্লেসই প্রথম এ গেমসকে অলিম্পিক নামকরণ করেন এবং তিনি জিউসের সম্মানে অলিম্পিক স্টেডিয়ামও নির্মাণ করেছিলেন। খানিকটা মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও প্রাচীন অলিম্পিকের শুরুর সময়কাল নিয়ে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য মত হলো ৭৭৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। ওই সময়ের গ্রিসের নগর রাষ্ট্র এবং রাজ্যগুলো এ প্রতিযোগিতায় অংশ নিত। প্রতিযোগিতা চলাকালে অংশগ্রহণকারী রাজ্যগুলো পরস্পর যুদ্ধ-বিগ্রহ থেকে বিরত থাকত। মূলত দৌড়, মুষ্টিযুদ্ধ, কুস্তি এ ধরনের খেলাগুলো সে সময়ের অলিম্পিকে প্রাধান্য পেয়েছে। অলিম্পিকের প্রথম চ্যাম্পিয়ন হিসেবে তৎকালীন এলিস শহরের কোরোবাস নামের একজনকে পাওয়া যায় যিনি পেশায় একজন পাচক ছিলেন। অলিম্পিক তার পুরনো সময় থেকেই চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

নতুন সূর্যোদয়
অলিম্পিকের আসর আবার বসার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে একেবারে ১৯ শতকের শেষ পর্যন্ত। তবে এ শুরুটাও এমন নয় যে হঠাৎ করেই অলিম্পিক পুনরুজ্জীবন লাভ করেছে। আধুনিক অলিম্পিকের প্রথম তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ চোখে পড়ে ‘লা অলিম্পিয়াড ডে লা রিপাবলিক’ নামের জাতীয় উৎসবে। বিপ্লবোত্তর ফ্রান্সে ১৭৯৬ সাল থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয় যেখানে প্রাচীন গ্রিক অলিম্পিকের অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৮৫০ ড. উইলিয়াম পেনি ব্রুকস ইংল্যান্ডে ওয়েনলক অলিম্পিয়ান গেমসের সূচনা করেন, সেটিও অবদান রেখেছে অলিম্পিক গেমস ফিরে পেতে। ১৮৬৫ সালে এসে হুলি, ড. ব্রুকস, ও র‌্যাভেনস্টাইন লিভারপুলে জাতীয় অলিম্পিয়ান এসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে এর আর্টিকেলগুলোই আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি) এর ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করেছে। তবে যেই গ্রিকরা অলিম্পিকের পূর্বপুরুষ তাদের প্রথম আগ্রহ লক্ষ্য করা যায় ১৮২১ সালে যখন তারা অটোম্যান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তাদের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে। গ্রিক কবি ও পত্রিকার সম্পাদক প্যানাজিওতিস সুতসোস তার ‘ডায়ালগ অভ দ্যা ডেড’ কবিতায় এর প্রস্তাব দেন যেটা প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৩৩ সালে। ১৮৫৬ সালে এভানজেলিস জাপাস নামের এক সম্পদশালী গ্রিক-রোমান সে সময়ের গ্রিসের রাজা অটোকে অলিম্পিক গেমসের পুনরায় শুরুর জন্য তহবিল দিতে চেয়ে চিঠি লেখেন। তিনি ১৮৫৯ সালে এথেন্স সিটি স্কয়ারে প্রথম অলিম্পিক গেমসের (আইওসির আন্তর্জাতিক অলিম্পিক নয়) পৃষ্ঠপোষকও ছিলেন। ১৮৯০ সালে ওয়েনলক অলিম্পিক সোসাইটির অলিম্পিয়ান গেমসে যোগদানের পর ফরাসি নাগরিক ব্যারন পিয়েরে কুবার্তে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি) গঠনে অনুপ্রাণিত হন। তিনি আন্তর্জাতিকভাবে অলিম্পিক গেমস প্রবর্তনের জন্য কাজ করতে থাকেন। ১৮৯৪ সালে তিনি আইওসি গঠন করেন। নবগঠিত আইওসির প্রথম অলিম্পিক কংগ্রেসে তিনি তার আইডিয়াগুলো তুলে ধরেন। ঐতিহাসিক সেই কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৯৪ সালের ১৬ জুন থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত প্যারিসের সরোবন ইউনিভার্সিটিতে। সভার শেষ দিনে এসে সিদ্ধান্ত হয় আইওসির অধীনে প্রথম অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হবে ১৮৯৬ সালে, আর এর স্বাগতিক হবে প্রাচীন অলিম্পিকের ঐতিহ্য বহনকারী গ্রিসের এথেন্স নগরী।

মাইলফলক ১৮৯৬
আধুনিক অলিম্পিকের ইতিহাসের প্রথম আসর। যে গ্রিসে অলিম্পিকের যবনিকা ঘটেছিল সেই গ্রিসেই অলিম্পিকের পুনর্জাগরণ। আইওসির অধীনে প্রথম অলিম্পিকের আয়োজক হবার গর্ব নিজের করে নিল গ্রিসের এথেন্স নগরী। প্রথম আসরে অংশ নেয় ১৪টি দেশের মোট ২৪১ জন অ্যাথলেট। প্রতিযোগিতায় মোট ইভেন্টের সংখ্যা ছিল ৪৩টি। গ্রিক জনগণের এ আসরের প্রতি অসাধারণ স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া ছিল। এমনকি এটা এতটাই যে কিছু অ্যাথলেট দাবিও জানালেন যে এথেন্সই যেন অলিম্পিকের স্থায়ী আয়োজক হয়। যদিও কমিটি এ দাবি গ্রহণ করেনি বরং তারা আধুনিক অলিম্পিক বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত হবার ব্যাপারে মত দেন। যার ফলশ্রুতি হিসেবে এর দ্বিতীয় আসর অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত হয় ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। আর তৃতীয় আসরের জন্য নির্ধারণ করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট লুইস শহরকে। তবে ১৮৯৬ সালের ব্যাপক সাড়া জাগানো শুরুর পর প্যারিস ও সেন্ট লুইস অলিম্পিক ছিল অনেকটাই নি®প্রভ। প্যারিস অলিম্পিকে কোন স্টেডিয়াম ছিল না। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এ আসরেই প্রথম নারী ক্রীড়াবিদরা অংশ নেয়। আর ১৯০৪ সালের সেন্ট লুইস অলিম্পিকে যে ৬৫০ জন অ্যাথলেট অংশ নেয় তার ৫৮০ জনই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। যেটা অলিম্পিকের চেতনার সাথে একেবারেই সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। অলিম্পিক তার ছন্দে ফেরে ১৯০৬ সালের মধ্যবর্তী এক বিশেষ আসরে যেটা এমনকি আইওসি কর্তৃক অফিসিয়ালি স্বীকৃতও নয়। এটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেই এথেন্স নগরীতে। যথারীতি আবারও এথেন্স, আবারও দর্শক-প্রতিযোগীদের অসাধারণ সাড়া। মূলত এ আয়োজনটাই ভবিষ্যৎ অলিম্পিকের জনপ্রিয়তা ও বৃহদাকার হবার শুরু ছিল। এরপর আর অলিম্পিককে পেছন ফিরতে হয়নি।

ছন্দপতন
এরপর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত চার বছর পরপর অলিম্পিক তার সূচি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে। তবে চলার পথে ছন্দ পতনের ঘটনা ঘটেছে দুইবার। এ পৃথিবী আধুনিক কালে এসে যে দুটি মহাবিপর্যয় পাড়ি দিয়েছে তা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি অলিম্পিক গেমসও। দু’টি বিশ্বযুদ্ধের তাণ্ডবলীলায় সভ্যতা যখন থমকে দাঁড়িয়ে পথ খুঁজে ফিরেছে অলিম্পিক গেমসও থমকে গিয়েছিল তখন। ১৯১৬ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে অনুষ্ঠিত হতে পারেনি এর ষষ্ঠ আসর। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞে দাঁড়িয়ে ১৯৪০ ও ১৯৪৪ এ যথাক্রমে ১২ ও ১৩তম আসরের আয়োজন সম্ভব হয়নি। ধ্বংসযজ্ঞ পেরিয়ে পৃথিবী যখন গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছে তখন গেমসও খুঁজে পেয়েছে নিজস্ব ছন্দ। সময়ের সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে এর পরিসর। প্রথম আসরের ১৪টি দেশ আর ২৪১ জন অ্যাথলেটের সংখ্যা ২০০৮ সালে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ২৯তম অলিম্পিক এ এসে দাঁড়িয়েছে ২০৪টি দেশের ১০৫০০ জন অ্যাথলেটে। তবে শীতকালীন অলিম্পিকের পরিসর অবশ্য এতটা বড় নয়।
অলিম্পিকের রকমফের
অলিম্পিক বললে সাধারণভাবে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিককেই বোঝায়। প্রচার প্রচারণার আলোটাও বেশি থাকে এ অলিম্পিককে ঘিরেই। শুরুতে কেবল গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকই প্রচলিত ছিল। কিন্তু সময়ের প্রেক্ষিতে আরও কিছু অলিম্পিক এর প্রচলন ঘটানো হয়েছে। ১৯২৪ সালে এসে প্রথম শীতকালীন অলিম্পিক এর আয়োজন করা হয়। এর কারণ ছিল অলিম্পিক কর্তৃপক্ষ চাচ্ছিল তুষার বা বরফের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু ইভেন্টকে অলিম্পিকে সংযোজন করতে। যা গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে সম্ভব ছিল না। এ কারণে ১৯২১ সালে লুজানে কমিটির কংগ্রেসে অলিম্পিকের শীতকালীন ভার্সন চালুর সিদ্ধান্ত হয়। শীতকালীন অলিম্পিকও প্রতি চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয়। তবে এটি গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের তৃতীয় বছরে হয়ে থাকে। অলিম্পিকের আরেকটি ধরন হলো প্যারা অলিম্পিক। এর প্রথম প্রয়াস লক্ষ্য করা যায় ১৯৪৮ সালে স্যার লুডউইগ গাটম্যান এর মাধ্যমে। তিনি ওই বছরে লন্ডনে অলিম্পিক চলাকালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আহত সৈনিকদের নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল খেলাকে আরোগ্যের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা। সে সময় থেকে এটি প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হতে থাকে। ১৯৬০ সালে রোম অলিম্পিকে গাটম্যান ৪০০ জন অ্যাথলেট নিয়ে আসেন ‘প্যারালাল অলিম্পিক’-এ প্রতিযোগিতার জন্য। যেটি প্রথম প্যারা অলিম্পিক হিসেবে পরিচিত হয়ে আছে। এরপর থেকে প্রতি অলিম্পিক (গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন উভয়)এর সাথে প্যারা অলিম্পিকও অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। প্যারা অলিম্পিকে শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী অ্যাথলেটরা অংশ নেন। ১৯৬০ সালেই মার্কিন নাগরিক ইউনাইস কেনেডি শ্রাইভার এর প্রচেষ্টায় স্পেশাল অলিম্পিকের যাত্রা শুরু হয়। স্পেশাল অলিম্পিকে অংশ নিয়ে থাকে বুদ্ধি প্রতিবন্ধীরা। অলিম্পিকে সর্বশেষ সংযোজন হল যুব অলিম্পিক। ২০০১ সালে আইওসির ১১৯তম কংগ্রেসে যুব অলিম্পিক আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়। ২০১০ সালে সিঙ্গাপুরে প্রথম গ্রীষ্মকালীন যুব অলিম্পিক এর আয়োজন করা হয়। এর শীতকালীন ভার্সনও আছে। সময়ের দিক থেকে এটি সিনিয়র গেমসের তুলনায় স্বল্পদৈর্ঘ্যের। যুব অলিম্পিকে অংশগ্রহণকারীদের বয়স ১৪ বছর থেকে ১৮ বছরের মধ্যে।

আইওসি
অলিম্পিক গেমসের অভিভাবক সংস্থা হল আইওসি। এর সদর দপ্তর অবস্থিত সুইজারল্যান্ডের লুজান শহরে। অভিভাবক সংস্থা হিসেবে এটি স্বাগতিক নির্বাচন, গেমসের সার্বিক পরিকল্পনার নজরদারি, স্পন্সর, সম্প্রচার নীতিমালা ইত্যাদি বিষয়সমূহের দেখভাল করে থাকে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা, মিডিয়া পার্টনার, প্রতিষ্ঠান, অফিসিয়াল ইত্যাদি এর অন্তর্গত। অলিম্পিক মুভমেন্ট এর প্রধান তিনটি উপাদান আছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা (আইএফ) সমূহ যারা কোন বিশেষ ক্রীড়ার আন্তর্জাতিক সংস্থা। যেমন ফুটবলের আন্তর্জাতিক সংস্থা ফিফা। বর্তমানে ৩৫টি আইএফ অলিম্পিক মুভমেন্টের সাথে সংশ্লিষ্ট।
জাতীয় অলিম্পিক কমিটি (এনওসি) যারা কোন দেশের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করে। বর্তমানে ২০৫টি এনওসি অলিম্পিক কমিটি দ্বারা স্বীকৃত।
অর্গানাইজিং কমিটি (ওসিওজি)। এ কমিটিগুলো কোন গেমস আয়োজনকে সামনে রেখে গঠিত হয় এবং গেমস শেষে আইওসিকে গেমসের রিপোর্ট প্রদানের মাধ্যমে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
অলিম্পিক মুভমেন্টের অফিসিয়াল ভাষা দুটি; ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজি। এর বাইরে আয়োজক দেশের ভাষা তৃতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। আইওসির প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন গ্রিস নাগরিক দিমিত্রিস ভিকোলাস। পিয়েরে কুবার্তে এর দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট।

প্রতীক
অলিম্পিক প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয় ভিন্ন ভিন্ন রঙের পরস্পর সংযুক্ত পাঁচটি বৃত্ত। সাদা জমিনের ওপর নীল, হলুদ, কালো, সবুজ ও লাল রঙের বৃত্ত দিয়ে তৈরি হয়েছে অলিম্পিক পতাকা। পতাকার পরিকল্পনাকারীও ছিলেন ব্যারন পিয়েরে কুবার্তে। হলুদ, নীল, কালো, সবুজ ও লাল বৃত্তগুলো যথাক্রমে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, ওশেনিয়া ও আমেরিকা মহাদেশকে বোঝায়। রঙগুলো বেছে নেয়ার কারণ হল প্রতিটি জাতির পতাকাতেই এ রঙগুলোর অন্তত একটির উপস্থিতি আছে। অলিম্পিক পতাকা ১৯১৪ সালে গৃহীত হলেও গেমসে প্রথম উত্তোলন করা হয় ১৯২০ সালে এন্টওয়ার্প (বেলজিয়াম) অলিম্পিকে। অলিম্পিকের আরেকটি অনুষঙ্গ হল মশাল। গেমসের কয়েক মাস পূর্বে মশাল প্রজ্বলন প্রাচীন গ্রিক রীতিকে মনে করিয়ে দেয়। বিভিন্ন শহর ঘোরা শেষে উদ্বোধনী দিনে এটির মাধ্যমে স্টেডিয়ামের বৃহৎ মশাল জ্বালানো হয়। ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকে প্রথম এর প্রচলন করা হয় যদিও ১৯২৮ সাল থেকেই মশালকে অলিম্পিকের প্রতীক হিসেবে ধরা হত। ১৯৬৮ সালে এসে অলিম্পিকে প্রথম মাসকট এর দেখা মেলে। মাসকট সাধারণত স্বাগতিক দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।

উদ্বোধন আর সমাপনী
অলিম্পিক গেমস আনুষ্ঠানিকতায় পরিপূর্ণ। আনুষ্ঠানিকতার বেশিরভাগ রীতিগুলো ১৯২০ সালের এ্যান্টওয়ার্প অলিম্পিক থেকে শুরু হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শুরুটা হয় স্বাগতিক দেশের পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে। এর পর স্বাগতিক দেশ তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরতে বিভিন্ন পারফরম্যান্স প্রদর্শন করে। এই প্রদর্শনীর বিষয়টি দিনকে দিন আরও বৃহৎ ও জটিলাকার ধারণ করছে। কারণটা হল প্রতিটি স্বাগতিকই তার পূর্বের অলিম্পিক আয়োজকের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান করতে চায়। সর্বশেষ বেইজিং অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের খরচ ছিল ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সাংস্কৃতিক আয়োজন শেষে অ্যাথলেটরা দেশ অনুসারে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করে। অলিম্পিক গেমসের জনক গ্রিস ঐতিহ্যগতভাবে প্রথম দেশ হিসেবে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করে। বাকি দলগুলো স্বাগতিক দেশের পছন্দ করা ভাষার বর্ণক্রমানুসারে প্যারেডে অংশ নেয়। সবশেষে আসে স্বাগতিক দেশের অ্যাথলেটরা। স্টেডিয়ামের অলিম্পিক মশাল জ্বালানোর মাধ্যমে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে। সমাপনী অনুষ্ঠান গেমসের সকল ইভেন্টগুলো শেষ হবার পর করা হয়। সকল দেশের পতাকা নিয়ে অ্যাথলেটরা মাঠ প্রদক্ষিণ করে। সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনটি দেশের পতাকা ওড়ানো হয়। অলিম্পিকের সূতিকাগার হিসেবে সম্মান জানাতে গ্রিসের পতাকা, বর্তমান স্বাগতিক দেশের পতাকা এবং পরবর্তী গেমস আয়োজক দেশের পতাকা। আইওসি প্রেসিডেন্টের সমাপনী বক্তব্যের মাধ্যমে অফিসিয়ালি গেমসের সমাপ্তি ঘটে এবং মশাল নেভানো হয়। স্বাগতিক নগরীর মেয়র কমিটির প্রেসিডেন্টের কাছে স্পেশাল অলিম্পিক পতাকা তুলে দেন, সেটি আবার পরবর্তী আয়োজক নগরীর মেয়রকে হস্তান্তর করা হয়। সবশেষে পরবর্তী আয়োজক দেশ সংক্ষিপ্ত ডিসপ্লেতে তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরে সবাইকে পরবর্তী অলিম্পিক অনুষ্ঠানের আহ্বান জানায়।

খেলাধুলা
এবার তবে খেলার কথা হোক! বর্তমান আছে অলিম্পিক গেমসে এমন খেলার সংখ্যা ৩৫। এ খেলাগুলোই ৩০টি বিভাগে প্রায় ৪০০টির মত ইভেন্টে বিভক্ত। গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে খেলার সংখ্যা ২৬টি; শীতকালীন অলিম্পিকে যার সংখ্যা ১৫। অ্যাথলেটিকস, সাঁতার, ফেন্সিং এবং জিমন্যাস্টিক এই চারটি খেলা গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের কোন আসর থেকে বাদ পড়েনি। অপরদিকে স্কিইং, স্কেটিং, আইস হকি, নর্ডিক কম্বাইন্ড, স্কি জাম্পিং এবং স্পিড স্কেটিং এ খেলাগুলো শীতকালীন অলিম্পিক প্রতিটি আসরেই ছিল। কোন একটি খেলা অলিম্পিকের অন্তর্ভুক্ত হতে হলে এর জন্য আইওসির স্বীকৃতি প্রয়োজন হয়। তারপর কোন গেমসের জন্য আইওসির প্রথম সেশনের রিভিশন প্রোগ্রামে খেলাটিকে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে নির্বাচিত হতে হবে। তবেই তা গেমসের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। ২০০৪ সালে আইওসি অলিম্পিক প্রোগ্রাম কমিশন গঠন করেছে যাদের কাজ হল বিভিন্ন খেলার পর্যালোচনা করা। এই কমিশন কোন খেলার গ্রহণযোগ্যতার বিচারে সাতটি মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। এগুলো হল খেলাটির ইতিহাস-ঐতিহ্য, সার্বজনীনতা, জনপ্রিয়তা, ইমেজ, অ্যাথলেটদের স্বাস্থ্যগত অবস্থা, খেলার ব্যয় এবং খেলাটির আন্তর্জাতিক ফেডারেশনের অবস্থা। এ কমিশন ২০১২ সালের জন্য গলফ, কারাতে, রাগবি, রোলার স্পোর্টস এবং স্কোয়াশ এই পাঁচটি খেলা পর্যালোচনা করে। এর থেকে কেবল কারাতে এবং স্কোয়াশকে ২০১২ অলিম্পিকের জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হয়েছে। বাকি খেলাগুলো দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তবে গলফকে ২০১৬ এবং রাগবিকে ২০২০ সালের গেমসের জন্য অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এ আসর দু’টিতে সর্বাধিক ২৮টি করে খেলা অনুষ্ঠিত হবে।

আহ! পদক!
প্রাপ্তির আনন্দ আর না পাবার বেদনা সবই যখন এই পদককে ঘিরে, তখন পদক তো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতেই থাকবে। প্রতিটি ইভেন্টের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারী অ্যাথলেট বা দল যথাক্রমে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ পদক লাভ করে। ১৯১২ সাল পর্যন্ত স্বর্ণপদক ছিল নিরেট স্বর্ণের। এরপর সেটা গিল্ডেড সিলভার এবং বর্তমানে সোনা দিয়ে মোড়ানো সিলভার পদকে রূপ নিয়েছে। তবে প্রতিটি স্বর্ণপদকে অবশ্যই কমপক্ষে ৬ গ্রাম পরিমাণ বিশুদ্ধ স্বর্ণ থাকতে হয়। প্রথম তিনজনকে পদক দেয়ার এ পদ্ধতি অবশ্য প্রথম দুই আসরে ছিল না। তখন প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান লাভকারীকে রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ পদক দেয়া হত। তিনটি পদক দেয়ার এ ফরম্যাট চালু হয় ১৯০৪ সাল থেকে। ১৯৪৮ সাল থেকে চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ স্থানধারীদের সনদ দেয়ার ব্যবস্থা চালু হয় যেটা ভিক্টরি ডিপ্লোমা হিসেবে পরিচিত। ১৯৮৪ সালে এসে সপ্তম ও অষ্টম স্থানও ভিক্টরি ডিপ্লোমার অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০০৪ সালে অলিম্পিক যেবার তার আঁতুড় ঘর এথেন্সে ফিরে যায় সেবার পদকের সাথে গ্রিসের জাতীয় প্রতীক জলপাই পাতার মালাও দেয়া হয়। পদক দেয়ার আনুষ্ঠানিকতা হয় প্রতিটি ইভেন্ট শেষ হয়ে যাবার পরই। বিজয়ী তিন অ্যাথলেট বা দল তিনস্তর বিশিষ্ট বেদীতে দাঁড়ায়। একজন আইওসি সদস্য তাদের পদক পরিয়ে দেবার পর বিজয়ীদের নিজ নিজ দেশের পতাকা তিনটি উত্তোলন করা হয়। একই সঙ্গে স্বর্ণপদক প্রাপ্ত দেশের জাতীয় সঙ্গীতও বাজানো হয়।

গর্বের স্বাগতিক
অলিম্পিকের আয়োজক নগরী সাধারণত আসরের সাত বছর পূর্বে নির্ধারণ করা হয়। নির্বাচন প্রক্রিয়া দু’টি অংশে দুই বছর ধরে চলে। আগ্রহী নগরী সে দেশের এনওসির মাধ্যমে আইওসির নিকট আবেদন পাঠায়। আবেদনের শেষ সময়সীমা সমাপ্ত হবার পর থেকেই নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রথম অংশের কাজ শুরু হয়। এনওসির বিশেষ দল যাচাই বাছাই শেষে আবেদনকারী হিসেবে যোগ্য নগরীর একটি তালিকা তৈরি করে। এ পর্যায় থেকে দ্বিতীয় অংশের কাজ শুরু হয়। তালিকায় টিকে যাওয়া প্রত্যেক আবেদনকারী নগরী তার প্রজেক্টের বিস্তারিত বিবরণ কমিটির কাছে উপস্থাপন করে। আইওসির পর্যালোচনা দল এগুলো বিশ্লেষণ, ইন্টারভিউ করা, সরেজমিনে প্রদর্শন প্রভৃতি শেষে এ তালিকাকে আরও সংক্ষিপ্ত করে নিয়ে আসে এবং সাধারণ অধিবেশনে তা উপস্থাপন করে। অধিবেশনে সদস্যদের ভোটে চূড়ান্তভাবে স্বাগতিক নির্বাচিত হয় এবং আইওসি স্বাগতিক নগরীর বিড কমিটি ও সংশ্লিষ্ট এনওসির সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করে। ২০১৬ সাল পর্যন্ত ২৩টি দেশের মোট ৪৪টি নগরীতে গেমস অনুষ্ঠিত হয়েছে বা হবার জন্য স্বাগতিক নির্বাচিত হয়েছে। কিন্তু ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাইরে এর সংখ্যা মাত্র ৮। ২০১৬ সালে রিও ডি জেনিরো অলিম্পিকের মাধ্যমে প্রথম দক্ষিণ আমেরিকার কোন দেশে অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এশিয়াতে অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হয়েছে মোট তিনবার; ১৯৬৪ সালে টোকিও, ১৯৮৮ সালে সিউল এবং ২০০৮ সালে বেইজিংয়ে। এককভাবে চারবার গ্রীষ্মকালীন ও চারবার শীতকালীন অলিম্পিকের আয়োজন করা আমেরিকা আয়োজকের তালিকায় রয়েছে শীর্ষে। ২০১২ সালের অলিম্পিকের মাধ্যমে ইংল্যান্ড তিনবার গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক আয়োজনের গর্ব লাভ করতে যাচ্ছে। আর লন্ডন নগরী একাই তিনবার আয়োজক হয়ে পেছনে ফেলতে যাচ্ছে অন্যসব নগরীকে। জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স এবং গ্রিস আয়োজক হয়েছে দুইবার করে। দুইবার আয়োজক নগরী হবার গর্ব আছে লস এঞ্জেলস, প্যারিস এবং এথেন্সের। শীতকালীন অলিম্পিকে ফ্রান্স তিনবার আর সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, নরওয়ে, জাপান এবং ইতালি আয়োজক হয়েছে দুইবার করে। ২০১৪ সালে সোচি অলিম্পিক হবে রাশিয়ার প্রথম শীতকালীন অলিম্পিক আয়োজন।
বাজেটপাতি
অলিম্পিকের বাজেট কেমন হবে? দৈত্যাকার আয়োজন আর বিশাল প্রতিষ্ঠানের বাজেট যেমন হবার কথা। ব্যাপারটাও তাই। তবে বিশ শতকের প্রথমার্ধে আইওসি ছোট বাজেট নিয়েই চলেছে। এমনকি ১৯৭২ সালের পূর্বপর্যন্ত এই বাজেটকে ছোটখাটো বলেই চালান যায়। এর কারণ হল ১৯৫২ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত আইওসির প্রেসিডেন্ট এভরি ব্রান্ডেজ অলিম্পিকের বাণিজ্যিকীকরণের ঘোর বিরোধী ছিলেন। ১৯৭২ সালে যখন তিনি অবসরে যান আইওসির সম্পদের পরিমাণ ছিল ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তার অবসরের পর মাত্র ৮ বছরের ব্যবধানে এটি চলে যায় ৪৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। অলিম্পিক সে সময় নীতি পরিবর্তন করে কর্পোরেট স্পন্সরশিপের দিকে ঝুঁকতে থাকে। ১৯৮৪ সালে লস এঞ্জেলস অলিম্পিক থেকে উদ্বৃত্ত হয় ২২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার যা ওই সময়ের জন্য এক অপ্রত্যাশিত অঙ্ক ছিল। এ উদ্বৃত্তের মূলে ছিল স্পন্সরশিপ স্বত্ব বিক্রি। এই সময়ে অলিম্পিক নিজেই একটি ব্র্যান্ডে পরিণত হয়। তবে অলিম্পিকের অতি বাণিজ্যিকীকরণ বর্তমানে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। গেমস টিভিতে সম্প্রচারের প্রথম ঘটনা ছিল ১৯৩৬ সালে বার্লিন অলিম্পিকে যদিও তা কেবলমাত্র স্থানীয় ভিত্তিতে ছিল। অলিম্পিকের আন্তর্জাতিক সম্প্রচার শুরু হয় ১৯৫৬ সালের শীতকালীন অলিম্পিক থেকে। সেই অবধি এ শতাব্দীর গোড়া পর্যন্ত দর্শকের সংখ্যা বেড়েই চলেছিল। ১৯৬৮ সালে রঙিন টেলিভিশনের প্রচলন দর্শক সংখ্যাকে আনুমানিক ৬০০ মিলিয়নে নিয়ে যায়। লস এঞ্জেলস অলিম্পিকে (১৯৮৪) দর্শক সংখ্যা বেড়ে দাড়ায় ৯০০ মিলিয়নে। আর মাত্র ৮ বছর পর বার্সেলোনা অলিম্পিকে গিয়ে এ সংখ্যা পৌঁছে ৩.৫ বিলিয়নে। দর্শক সংখ্যার এই ক্রমাগত বৃদ্ধি বিজ্ঞাপন দাতাদের আকৃষ্ট করেছে, আর বেড়েছে টেলিভিশন স্বত্বের দাম। ১৯৫৬ সালের অলিম্পিকের স্বত্ব কিনতে সিবিএসকে যেখানে মাত্র ৪০ মিলিয়ন ডলারের মত খরচা করতে হয়েছে সেখানে ১৯৯৮ সালে একে খরচা করতে হয়েছে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার। আর ২০০০ থেকে ২০১২ পর্যন্ত সকল অলিম্পিক গেমসের স্বত্ব সিবিএস কিনে নিয়েছে ৩.৫ বিলিয়ন ডলারে। ২০০০ সালের দিকে এসে টিভি দর্শকের কমতি ঘটে ইন্টারনেটে সরাসরি ফলাফল ও ভিডিও দেখার সুযোগ, কেবল চ্যানেলের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং চ্যানেলগুলোর ধারণ করা খেলা সম্প্রচারের জন্য। ২০০৬ সালে টিভি চ্যানেলগুলো সরাসরি সম্প্রচারের দিকে গেলে দর্শকদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ২০০৬ এর শীতকালীন অলিম্পিকে দর্শকসংখ্যা কমলেও ২০০৮ সালের বেইজিংয়ের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে যায়।

চাঁদের কলঙ্ক
সন্ত্রাস, বর্ণবৈষম্য, ড্রাগ কেলেঙ্কারি বা রাজনীতিকীকরণ প্রভৃতি বিষয় অলিম্পিককে বিভিন্ন সময় নেতিবাচক খবরের শিরোনাম করেছে। দুটি বিশ্বযুদ্ধের ঘটনায় অলিম্পিক হোঁচট খেয়েছে, আয়োজনে ব্যর্থ হয়েছে মোট তিনটি আসর। ১৯৯৬ সালে আটলান্টা অলিম্পিকে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় দু’জন মারা যায় এবং আহত হয় অনেকে। ১৯৭২ সালে মিউনিখ অলিম্পিকে কিডন্যাপ এবং হত্যার ঘটনা ঘটেছিল। ১৯৬৮-তে মেক্সিকো অলিম্পিকে বর্ণবৈষম্যের ঘটনা ছিল ব্যাপক সমালোচিত। অলিম্পিকে পারফরম্যান্স বৃদ্ধির জন্য বিশ শতকের গোড়া থেকে অনেক অ্যাথলেট ড্রাগ ব্যবহার শুরু করেন। এমনকি ১৯৬০ সালে রোম অলিম্পিকে ড্রাগের ফলশ্রুতিতে এক অ্যাথলেটের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। ৬০ এর দশকের মাঝামাঝিতে এসে আইওসি ড্রাগ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ১৯৬৮ সালের অলিম্পিকে প্রথম একজন সুইডিশ অ্যাথলেট ড্রাগ টেস্টে পজিটিভ হওয়ায় তার ব্রোঞ্জ পদক কেড়ে নেয়া হয়েছিল। ডোপিং সংক্রান্ত ঘটনা সবচেয়ে বেশি আলোচনার সৃষ্টি করে ১৯৮৮ সালে সিউলে কানাডিয়ান ¯িপ্রন্টার বেন জনসন যখন ড্রাগ টেস্টে পজিটিভ হয়ে তার স্বর্ণপদক খোয়ান। ১৯৯৯ সালে আইওসি ওয়ার্ল্ড অ্যান্টি ডোপিং এজেন্সি (ওয়াডা) গঠন করে ডোপিংকে নিয়ন্ত্রণের জন্য। অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড এবং ব্রিটেন কেবল এই তিনটি দেশ সকল অলিম্পিকে অংশ নিয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেশগুলো যোগ্য অ্যাথলেট না থাকায় অলিম্পিক মিস করলেও অলিম্পিক বয়কটের ঘটনাও আছে বেশকিছু। ১৯৩৬ সালে আয়ারল্যান্ড বার্লিন অলিম্পিক বয়কট করে। ১৯৫৬ সালে মেলবোর্ন অলিম্পিকে তিনটি বয়কটের ঘটনা ছিল। নেদারল্যান্ড, স্পেন ও সুইজারল্যান্ড অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় হাঙ্গেরির বিক্ষোভের ঘটনায় সোভিয়েত ইউনিয়নের শক্তি প্রয়োগের প্রতিবাদে (যদিও পরে অশ্বারোহী দল পাঠায়)। সুয়েজ সঙ্কটকে কেন্দ্র করে কম্বোডিয়া, মিসর, ইরাক ও লেবানন গেমস বয়কট করে। আর চীনের বয়কট ছিল তাইওয়ানের অংশ নেয়ার বিষয়ে। ১৯৭২ ও ১৯৭৬ সালে বৃহৎসংখ্যক আফ্রিকান দেশ গেমস বয়কট করে দক্ষিণ আফ্রিকার পৃথকীকরণ নীতির প্রতিবাদে। ১৯৮০ ও ১৯৮৪ সালে স্নায়ুযুদ্ধের দুই পক্ষ একে অপরের গেমস বয়কট করে। মস্কো অলিম্পিকে (১৯৮০) আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসনের প্রতিবাদে ৬৫টি রাষ্ট্র গেমস বয়কট করে। লস এঞ্জেলস অলিম্পিকে (১৯৮৪) সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার বলয়ের ১৪টি রাষ্ট্র গেমসে অংশ নেয়নি। সম্প্রতি জর্জিয়া আসন্ন ২০১৪ সালের সোচি শীতকালীন অলিম্পিক বয়কটের ঘোষণা দিয়েছে রাশিয়ার ওসেটিয়া যুদ্ধে অংশ নেয়ার প্রতিবাদে।

লন্ডন ২০১২
দুয়ারে কড়া নাড়ছে অলিম্পিকের ৩০তম আসর। লন্ডনে ২৭ জুলাই রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের উদ্বোধনের মধ্যে দিয়ে পর্দা উঠবে এ আয়োজনের। চলবে ১২ আগস্ট পর্যন্ত। লন্ডন এক বিশ্ব মিলনমেলায় পরিণত হতে চলেছে। ৮৮ লাখ দর্শকের সাথে ২১ হাজার সংবাদকর্মীর ভিড়। আর কয়েক হাজার অ্যাথলেট তো থাকছেই। বাংলাদেশও অংশ নিচ্ছে বিশ্ব ক্রীড়ার এই মহা সম্মেলনে। ১৯৮৪ সালে লস এঞ্জেলস অলিম্পিকে প্রথম অংশগ্রহণের পর থেকে নিয়মিতই অলিম্পিকে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ কিন্তু এ অলিম্পিকে একটু অন্যভাবেও থাকছে। সেটি হল এ অলিম্পিকের প্রধান পোশাক সরবারহকারী দেশ বাংলাদেশ। অলিম্পিকের এ আসরের জন্য পোশাক সরবারহ বিশ্ববিখ্যাত প্রতিষ্ঠান এডিডাস, নাইকি ও পুমা। এসব প্রতিষ্ঠান যেসব দেশ থেকে পোশাক তৈরি করে নিচ্ছে বাংলাদেশ সে তালিকায় সবার শীর্ষে। যাহোক ইতিহাসের অংশ হতে লন্ডন এখন প্রস্তুত। পৃথিবীবাসী, অলিম্পিক আর লন্ডন নগরী সবাই সবাইকে বরণ করে নেবার অপেক্ষায়; অপেক্ষায় আমরাও।

 

SHARE

Leave a Reply