Home স্মরণ মহাকবি শেখ সাদী

মহাকবি শেখ সাদী

ড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম..
মহাকবি শেখ সাদীর নাম তোমরা সকলেই শুনেছ। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে তিনি আপনজনের মতোই পরিচিত। তাঁর বিরচিত অমর অমূল্য উপদেশপূর্ণ কবিতা বাংলাদেশের ঘরে ঘরে প্রায় মুসলিমের কণ্ঠে ভক্তিভরে আবৃত্তি হয়ে থাকে। শেখ সাদীর রচিত বিখ্যাত আরবি নাতÑ
বালাগাল উলা বিকামালিহি
কাশাফাদ দুযা বিজামালিহি
হাসুনাত জামিউ খিসালিহি
সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি
অর্থাৎ
অতি উচ্চতা মহিমা মহান পূর্ণগুণজ্ঞানে হে নবী
তব মাধুরীত অমর আঁধার বিদূরিত আজিরে সবি
অতীব সুন্দর অতীব সুন্দর তোমার সকল আচার ব্যবহারই
সহস্র সালাম উপরে তোমার হে নবী রাসূলে আরবি।
এ অমর নাতটি প্রত্যহ যে কতবার মুসলিম জাহানের ঘরে ঘরে উচ্চারিত হয় তা নির্ণয় দুরূহ। এ ধরনের অনেক সুন্দর সুন্দর নাত, হামদ, উপদেশাবলি, নীতিবাক্য ও অসংখ্য গল্প রচনা করে শেখ সাদী বিশ্ববাসীর কাছে অমর হয়ে রয়েছেন।
কবির পুরো নাম শেখ আবু আবদুল্লাহ মুশাররফ উদ্দীন ইবনে মুসলেহ সাদী। তাঁর কবি নাম সাদী। সমগ্র বিশ্বের মানুষের নিকট তিনি শেখ সাদী নামে সমধিক পরিচিত।
দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে ১১৭৫ খ্রিষ্টাব্দে পাঁচশত পঁচাত্তর হিজরিতে পারস্যের অন্তর্গত প্রসিদ্ধ সিরাজ নগরের তাউস নামক স্থানে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে শেখ সাদী জন্মগ্রহণ করেন।
এ সিরাজ নগর ছিল তদানীন্তন পারস্যের রাজধানী। শেখ সাদীর পিতার নাম সৈয়দ আবদুল্লাহ আর মাতার নাম মাইমুরা খাতুন। তাঁর পিতা একজন দ্বীনদার ব্যক্তি ছিলেন। পিতার কাছেই তাঁর লেখাপড়ার হাতে খড়ি হয়। শৈশবেই তিনি পিতৃহারা হন। মায়ের ভাবনা ছিলো ছেলেকে কিভাবে মানুষ করবেন। কারণ সাদী ছিলেন বড়ই মেধাবী। শেখ সাদীর প্রাথমিক শিক্ষা সিরাজ নগরেই লাভ ঘটে। এরপর তিনি উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য এলেন তদানীন্তন মুসলিম বিশ্বের সেরা জ্ঞানকেন্দ্র বাগদাদে। বাগদাদে এক পর্যায়ে তিনি বিখ্যাত নিযামিয়া মাদরাসায় শিক্ষা লাভ করেন। অল্প দিনের মধ্যেই তিনি এই মাদরাসায় শিক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি মেধাবী ছাত্র হিসেবে মশহুর হয়ে পড়েন এবং শিক্ষাবৃত্তি লাভ করেন। মাদরাসায় কুরআন, হাদিস তাফসিরশাস্ত্র, ফিকাহ, উসুল, ফারায়েজ, হিকমা, দর্শন, ভাষাবিজ্ঞান, ধ্বনিবিজ্ঞান, অলঙ্কারশাস্ত্র ইত্যাদি বিষয়ে তিনি গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। বাগদাদে অবস্থানকালে শেখ সাদী গাউসুল আযম হয়রত আবদুল কাদির জিলানীর সান্নিধ্যে গিয়ে দ্বীনের বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই কবিতা লেখার দিকে তাঁর ঝোঁক ছিল। আবুল ফাতাহ ইবনে জুময়ী নামে এক নামকরা কবি ছিলেন বাগদাদে। নিযামিয়া মাদরাসার শিক্ষক ছিলেন তিনি। মাদরাসায় একটি কবিতা একদিন তাঁর হাতে পড়ল। তিনি তা পড়ে এতই মুগ্ধ হলেন যে সেদিন থেকেই তিনি সাদীর দেখাশোনার ভার নেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় শেখ সাদী বিভিন্ন ভাষা শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি আরবি, ফার্সি, হিব্রু, গ্রিক, তুর্কি, ল্যাটিন, উর্দু, হিন্দি, সংস্কৃত, আফগানি ইত্যাদি চব্বিশটি ভাষা শিখে ফেলেন। ত্রিশ বছর বয়সে সাদী নিযামিয়া মাদরাসায় শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং সাহিত্য, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব ও নীতিশাস্ত্রে অসামান্য সাফল্য অর্জন করে মাওলানা উপাধি পান।
শিক্ষা সমাপ্তির পর হজ পালনের জন্য তিনি পবিত্র মক্কা-মদিনা শরীফ গমন করেন। হজ সম্পাদনের পর তিনি দেশ ভ্রমণে বের হন। তিনি দামেস্ক, জেরুসালেম, ত্রিপলি, আলেপ্পো, কায়রো, ইস্পাহান, ভারত, সমরকন্দ, চীন, স্পেন, ইতালি, আফ্রিকা সফর করেন। শেখ সাদী এত  দেশ ভ্রমণ করেন যে, একমাত্র ইবনে বতুতা ছাড়া প্রাচ্যজগতে তার মতো পরিব্রাজক আর কেউ ছিল না। তা এই দেশ ভ্রমণের সময় অনেকবার তিনি যাযাবরদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন। কিন্তু দেশ ভ্রমণের মোহ ত্যাগ করতে পারেননি। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ বোস্তানে তিনি বলেছেনÑ
নানান দেশে ঘুরে ঘুরে জীবন হল গত যে
নানান রকম লোকের সাথে দিন কেটেছে কত যে।
যেথায় গেছি কিছু কিছু নিয়েছি মোর থলিতে
নিয়েছি ভাল যা পেয়েছি পথের ধারে চলিতে।
শেখ সাদী একজন মুজাহিদও ছিলেন। একবার তিনি জেরুসালেমে সফর করছিলেন।
এ সময় বায়তুল মুকাদ্দাসে মুসলিমদের সাথে খ্রিষ্টানদের যুদ্ধ চলছিল। শেখ সাদী মুসলিম সৈন্যদলের সাথে যুদ্ধে যোগ দিয়ে যেমন অসাধারণ বীরত্ব দেখান, তেমনি উত্তেজনাপূর্ণ ধর্মীয় কবিতা পাঠ করে মুসলিম মুজাহিদদের উদ্দীপ্ত করে তোলেন।
যুদ্ধে মুসলমানরা বিজয়ী হয় এবং তিনি গাজী উপাধি পান।
শেখ সাদী যেখানেই থাকতেন সেখানেই তিনি লিখে যেতেন আর দ্বীনের দাওয়াত মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতেন। জীবনের প্রায় ত্রিশটি বছর বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে অবশেষে বৃদ্ধ বয়সে জন্মভূমি সিরাজ নগরে এসে বসবান শুরু করেন। তিনি সারাদিন হামদ, নাত, গজল, কবিতা ও বিভিন্ন উপদেশমূলক রচনা লিখতেন, আর রাতের বেলায় কুরআন অধ্যয়ন ও ইবাদত বন্দেগি করতেন।
তৎকালে তাঁর মতো জ্ঞানী লোক আর কেউ ছিল না। সিরাজ নগরে বসেই তিনি তার সুপ্রসিদ্ধ গুলিস্তা ও বোস্তা গ্রন্থ দু’টি রচনা করেন। এ ছাড়াও তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ সাহারিয়া, কারিমা, কাসায়েদ ফারসি, কাসায়েদ আরবিয়া, গজলিয়াত, পান্দে নামাহ ইত্যাদি। সাদীর রচিত মোট ২২ খানা গ্রন্থের নাম শোনা যায়। শেখ সাদীর শ্রেষ্ঠগ্রন্থ গুলিস্তা বিশ্বসাহিত্যের এক অতুলনীয় সম্পদ। ইংরেজি, ফরাসি, ডাচ, জার্মান, আরবি, উর্দু, তুর্কি, স্প্যানিশ ইত্যাদি বহু ভাষায় এ জনপ্রিয় গ্রন্থের অনুবাদ হয়েছে। আজও তাঁর কবিতা বিশ্বের কাব্যাঙ্গনে উচ্চারিত হচ্ছে সমগ্র আবেদন নিয়ে। শেখ সাদীর ভাষা ছিল অত্যন্ত অলঙ্কারময়। আর প্রকাশভঙ্গির জাদুকরী প্রভাব পাঠকচিত্তকে মোহিত করে রাখতো।
শেখ সাদীর হৃদয় ছিল উদার ও মহৎ। তাঁর দৃষ্টিতে সকল মুসলমান ছিলেন সমান।
দীর্ঘজীবন একনিষ্ঠ সাধনা চালিয়ে ১২৯২ খ্রিষ্টাব্দে সিরাজ নগরে মহাকবি শেখ সাদী ইন্তেকাল করেন। সিরাজের ‘দিলকুশা’ নামক একটি পার্বত্যভূমিতে তাঁকে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে শেখ সাদীর বয়স হয়েছিল একশত ষোল বছর।

SHARE

5 COMMENTS

  1. তাঁর দৃষ্টিতে সকল মুসলমান ছিলেন সমান। এই লাইনটিতে; ”তাঁর দৃষ্টিতে সকল মুসলমান” এর পরিবর্তে ”তাঁর দৃষ্টিতে সকল মানুষ ছিলেন সমান” হলে সম্ভবত তার(মহাকবি শেখ সাদী) মর্যাদা সঠিক ভাবে প্রকাশ পেত।

  2. পড়ে অনেক কিছু জানলাম মহান কবি সম্পর্কে। এ ধরণের মহান ব্যক্তিদের নিয়ে নিয়মিতভাবে লেখা প্রকাশ করবেন আশা করি।
    কিশোরকণ্ঠ একটু আলাদা। ভালোমানের লেখা থাকে আর অনেক কিছু জানা যায়। আমি পড়ি এ পত্রিকাটি। খুব ভালো লাগে আমার।
    সেই সাথে রূপকথা ভেৌতিক গল্পও ভালো লাগে। এছাড়া বিদেশি গল্পের অনুবাদও আমার খুব ভালো লাগে। আশা করি এগুলো আরো ছাপাবেন। ধন্যবাদ।

Leave a Reply