Home গল্প টিপ টিপ বৃষ্টিতে

টিপ টিপ বৃষ্টিতে

হেলাল আরিফীন..

আকাশজুড়ে মেঘ করেছে। এখনই হয়ত ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি নেমে পড়বে। রহিম সাহেব স্কুল থেকে ফিরছিলেন। তিনি আজ ছাতা আনেননি। ছাতা আনবেন কি, সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় কী ঝকঝকে রোদটাই না ছিল!
বিকেলেই আবার সারা আকাশজুড়ে কালো মেঘ। আসলে আষাঢ় মাসের আকাশের কোনো ঠিক নেই। কখন রোদ্দুর, কখন বৃষ্টি বোঝা মুশকিল ।
আইল রাস্তা পেরিয়ে বাজারে যাওয়ার পাকা সড়কটিতে উঠতেই বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা পড়তে শুরু করল। এখন শুরুতে ফাঁকা ফাঁকা হয়ে বেড় বড় ফোঁটা পড়লো। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়ত আকাশ টুকরো টুকরো হয়ে বৃষ্টি নামবে। তখন বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।
মাইলখানেকের মধ্যে একটা দোকানপাটও নেই যে কিছু সময়ের জন্য আশ্রয় নেয়া যাবে। সঙ্গে ছাতা থাকলে কি এত চিন্তা করতে হতো? আসার সময় ছাতাটি সাথে আনার কথা কেন যে মনে হলো না? নিজের মনের ওপরই এখন রাগ হচ্ছে তার।
নিজের দৈনন্দিন ব্যবহার্য প্রিয় ছাতাটির কথা ভাবতে ভাবতে নিচের দিকে তাকিয়ে হাঁটছিলেন রহিম সাহেব। চোখের সামনে রাস্তায় একটা ছাতা পড়ে থাকতে দেখে তিনি একটু অবাক হলেন। ছাতাটি খুব পুরনো হয়নি। বরং নতুনই বলা চলে। কাপড়টাও কুচকুচে কালো। রঙটা কোথাও একটু ফিকে হয়ে যায়নি। স্টিলের ডাঁটাও ঝকঝকে রয়েছে। প্রায় জনশূন্য এই রাস্তায় ছাতাটি কোত্থেকে এল? আকাশ থেকে পড়ল নাকি? মেঘের ওই বড় বড় ফোঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে আকাশ থেকে যদি ছাতা পড়ত? এখানে একটা ছাতা, ওখানে একটা ছাতা, ওপাশে একটা ছাতা, এপাশে একটা ছাতাÑ উ, কী দারুণ দৃশ্য!
নিজের কল্পিত গল্পের দৃশ্যে নিজেই হেসে ফেললেন। উবু হয়ে ছাতাটি তুলতে গিয়েই থেমে গিয়ে ভাবলেনÑ ছাতাটি তুলে নেয়া কি ঠিক হচ্ছে? পড়ে থাকা কোন জিনিস কি তুলে নেয়া উচিত? নাকি জিনিসটাকে এভাবে পড়ে থাকতে দেয়াই উচিত?
কিছুক্ষণ সাত-পাঁচ ভেবে নেয়ার পর ছাতাটি হাতে তুলে নিলেন রহিম সাহেব। বড় বড় ফোঁটার পরিবর্তে তখন টিপ টিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। তিনি ছাতাটা মাথার ওপর ফোটাতে গিয়েও ফোটালেন না। কারো জিনিস কুড়িয়ে পেলেই কি ব্যবহার করা যায়? যায় না। ছাতার মালিককে খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু ছাতাটা যে এখানে ফেলে রেখে গেছে তাকে তিনি কিভাবে খুঁজে বের করবেন?
তিনি কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে একে-ওকে জিজ্ঞেস করলেন। ছাতা হারানোর কথা কেউ স্বীকার করলো না। বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর রাস্তার পাশের এক মুদিদোকানদারকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনার দোকানে কি কেউ এসে ছাতা হারানোর কথা বলেছিল? দোকানদার বললেন, না, ছাতা হারানোর কথা তো কেউ বলেনি? ক্যান মাস্টার সাব?
রহিম সাহেব হাতের ছাতাটি দেখিয়ে বললেন, এই দেখুন না, এই ছাতাটি আমি রাস্তায় পেয়েছি। এখন এর মালিককে যে কিভাবে খুঁজে পাই!
দোকানদার বললেন, যে বেচারা ছাতাটা খুইয়েছে সে এখন কোথায় আছে কে জানে! ছাতাটা সাইকেলের ক্যারিয়ারে নিয়েছিল বোধ হয়। ক্যারিয়ার থেকে রাস্তায় কখন পড়ে গেছে টের পায়নি। রাস্তায় হাঁটার সময় হাত থেকে তো কারো ছাতা পড়ে যাওয়ার কথা নয়। তবে যেভাবেই পড়ে থাক না কেন, লোকটির এখন হুঁশ হয়েছে, চারদিকে যা বৃষ্টি শুরু হয়েছে!
বাইশ তেইশ বছরের শীর্ণকায় এক যুবক  এসে রহিম সাহেবের সামনে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো টকটকে লাল, মাথার চুলগুলো উস্কোখুস্কো। চেহারায় উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপনের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ফুটে রয়েছে। এখানে আসার পর থেকেই রহিম সাহেবের পেছনে পেছনে ঘুর ঘুর করছিল ছেলেটি। রহিম সাহেব ছেলেটির দিকে সন্দেহের চোখে তাকাতেই ছেলেটি বলল, আঙ্কেল, এইটা আমার ছাতা। আমারে দিয়ে দ্যান।
রহিম সাহেব মৃদু হেসে বললেন, তুমি বলছ, এটা তোমার ছাতা। হয়ত এটা তোমারই ছাতা। কিন্তু ছাতাটা আমার হাতে এল কী করে?
রহিম সাহেরেব প্রশ্ন করার ধরন দেখে ছেলেটি ইতস্তের গলায় বলল, আঙ্কেল, আমি ছাতাটা ওই গাছের সাথে ঠেস দিয়ে রাইখা পেশাব করতে বসেছিলাম, আর আপনিÑ
রহিম সাহেব ছেলেটিকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, আর গাছতলা থেকে আমি ছাতাটি কুড়িয়ে এনেছি, তাই তো?
ছেলেটি এবার জোর গলায় বলল, এই ছাতাটা তো আমার ছাতা, আঙ্কেল। আপনে বিষয়টা বুঝতে পারছেন না।
রহিম সাহেব সহজে কারো সাথে তুই তুকারি করে কথা বলেন না। তিনি রেগে তুই তুকারিতে নেমে গিয়ে ছাতাটির ডাঁট উঁচিয়ে বললেন, আমার হাতে ছাতাটা দেখে ধান্ধাবাজির কথা ভেবেছিলি, সেটা এখন ভুলে গিয়ে এখান থেকে দূর হ। তা না হলে এই ছাতার ডাঁট দিয়েই তোকে আমি পেটাব।
ছেলেটি দ্রুত পায়ে সরে যেতে যেতে বলল, ওরে বাপরে, যার ছাতা আপনে তারেই ফেরত দিয়েন, আঙ্কেল। ছাতা লইয়া আমার কোনো ধান্ধা করার দরকার নেই।
ছেলেটি চলে যাওয়ার পর রহিম সাহেব দোকানদার লোকটির দিকে পাশ ফিরে বললেন, দেখেছেন, যুবক ছেলে অথচ কেমন উচ্ছন্নে গেছে!
দোকানদার অবজ্ঞার গলায় বললেন, আরে, ওই পোলার কথা কী কন, ও তো একটা বড় নেশাখোর। বাপ মায়ের বখে যাওয়া সন্তান।
রহিম সাহেব দোকানদারের দিকে ছাতাটা বাড়িয়ে দিয়ে অনুরোধের গলায় বললেন, আচ্ছা, ছাতাটা আপনার দোকানের একটা জায়গায় রাখুন। যদি কেউ এসে ছাতাটির খোঁজ খবর নেয়Ñ
দোকানদার লোকটি বিরক্তির গলায় বললেন, না, না, আমি ওসব ছাতা ফাতা রাখবার পারমু না। ওই নেশাখোর ছেলেটি আপনার কিছুই বলতে পারে নাই, কিন্তু আমার সাথে ঠিকই ঝামেলা করবে। ও ছাতা আপনেই নিয়ে যান।
দোকানের ছাউনির নিচ থেকে রাস্তায় নেমে এলেন রহিম সাহেব। ছাতাটি হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে চললেন তিনি। তখনও টিপ টিপ বৃষ্টি হচ্ছে। তাঁর পরনের জামা-কাপড় ভিজে যাচ্ছে। ছাতাটি ফুটিয়ে মাথার ওপর ধরলেই কাপড় চোপড় রক্ষা পায় তাঁর। কিন্তু তিনি তা করছেন না। রাস্তায় অনেকেই তাঁর দিকে ভুরু কুঁচকে তাকাচ্ছেন। একজন তো মুখ ফসকে বলেই ফেললÑ পাগল নাকি, হাতে ছাতা থাকতে ভিজে যাচ্ছে?
রহিম সাহেব দ্রুত পায়ে সামনের দিকে হাঁটতে থাকেন। রাস্তার পশ্চিম পাশে আইল পথ ধরে টিপ টিপ পায়ে হেঁটে আসছে এক কিশোর। ওর মাথার ওপর মানকচুর একটা বড় পাতা। ওকে বৃষ্টিতে মানকচুর পাতা মাথায় নিয়ে আসতে দেখে নিজের স্কুলজীবনের কথা মনে পড়ে গেল রহিম সাহেবের। বৃষ্টির দিনে ছোটবেলায় তিনিও বড় কচুপাতা মাথায় নিয়ে স্কুলে যেতেন। ওকে পাকা রাস্তাটিতে উঠতে দেখে তিনি খুশি গলায় বললেন, কী সবুর, আজ স্কুলে যাওনি কেন?
সবুর বলল, স্যার, আমার মায়ের অসুখ।
কী হয়েছে তোমার মায়ের?
স্যার, মায়ের জ্বর আইছে।
এখন কোথায় যাচ্ছ?
মায়ের জন্য ওষুধ আনতে দোকানে যাইতেছি।
অ।
স্যার, হাতে ছাতা থাকতে আপনে বৃষ্টিতে ভিজছেন ক্যান?
রহিম সাহেব মৃদু হেসে বললেন, এ ছাতা আমার নয়। আমি ওটা রাস্তায় পেয়েছি। তোমার ছাতা আছে?
নাই। মায়ে কইছে এ বছর তো বৃষ্টি বাদলার দিন গেলই, সামনের বছরে কিনা দিমু।
তোমার তো বাবা নাই, না?
জি, স্যার। বাবায় আমার জন্মের আগেই কালাজ্বরে মইরা গেছে।
রহিম সাহেব সবুরকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, সবুর, এই ছাতাটি তুমি নাও।
সবুর ইতস্তের গলায় বলল, স্যার, এই ছাতা তো আমার না।
রহিম সাহেব বললেন, না হলো তোমার, আমি তোমাকে দিলাম।
রহিম সাহেরেব হাত থেকে ছাতাটি নিয়ে খুব খুশি হলো সবুর। কচুপাতা ফেলে দিয়ে ছাতা মাথায় আনন্দে হেঁটে যাচ্ছে ও। রহিম সাহেব ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন। ছাতা মাথায় দিয়ে সবুরের হেঁটে যাওয়া দেখছেন। তিনি ভিজে জবজবে হয়ে যাচ্ছেন। সেদিকে তাঁর কোনো খেয়াল নেই। তিনি সবুরকে দেখছেন। বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থেকে এভাবে ভেজার আনন্দই আলাদা।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply