Home সায়েন্স ফিকশন ফাংশান অব সুহোদ

ফাংশান অব সুহোদ

তাহেরা সুলতানা জিনান..
আদেশ মানছে না সুহোদ। পৃথিবীর সাথে রেডিও কানেকশন কেন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, এ ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তিত আছেন ড. যায়েদ। তারই সৃষ্টি অত্যাধুনিক রোবট সুহোদকে বলেছেন রেডিও অ্যান্টেনায় সঙ্কেত পাঠিয়ে এর ত্রুটিগুলো জেনে নিতে। কিন্তু সে মুখে মুখে বলে দিলো সে পারবে না। তার নিজের কিছু কাজ আছে। অবাক কাণ্ড! তারই সৃষ্টি যন্ত্রটি তাকেই মানছে না!
‘সুহোদ’, উত্তেজিত যায়েদ চেঁচিয়ে উঠলেন। ‘স্রষ্টার সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় জান না?’
‘জানি, কিন্তু এখন আমি ব্যস্ত।’ জবাব দিলো সুহোদ।
ঝঢ়ধপব-১৩-এর ডাইনিংয়ে বসে ড. যায়েদ এবার খাওয়া বন্ধ করে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলেন সুহোদের দিকে। বাংলাদেশ থেকে তিনি স্পেস ট্র্যাভেলে গিয়েছিলেন শনি গ্রহে। সেখান থেকে প্রাণের অস্তিত্ব ও ফিজিক্যাল অবস্থার ওপর কিছু প্রামাণ্য চিত্র সংগ্রহ করে আবার ফিরে আসছেন পৃথিবীর পথে। তার চোখে জ্বলজ্বল করছে অতি প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের সবুজের সমারোহ। স্পেস ট্র্যাভেলে আরো বহুবার তিনি গিয়েছেন। খুঁটিনাটি কিছু প্রবলেম ছাড়া কোনো মেজর প্রবলেম দেখা যায়নি। এবারকার অভিযান স্পেস-১৩ নামে এক মহাকাশ যানে শনি গ্রহে। কিন্তু এখন কী হচ্ছে? এখানে কী অশুভ শনির দশা লেগে গেছে? নাকি সুহোদের ব্রেন ক্যাবলগুলোতে সমস্যার সৃষ্টি হলো! যে রোবটের ওপর ঝঢ়ধপব-১৩ পরিচালনার ভার দিয়েও নিশ্চিন্ত থাকতে পারতেন ড. যায়েদ, আজ সেই কি না… অসম্ভব।
ড. যায়েদ আবার বললেন, ‘শেষবারের মত বলছি সুহোদ, প্রবলেমটার সল্ভ দশ মিনিটের মধ্যে চাই। কুইক, কাজে লেগে যাও।’
তারপরই ঘটতে শুরু করলো ঘটনাটা। খুলে যেতে লাগলো ঝঢ়ধপব-১৩-এর দরজা। ফস ফস আওয়াজ করে বেরুচ্ছে ভেতরের বাতাসগুলো। মহাকাশ যান ঝঢ়ধপব-১৩ এমন একটি বলয়ের মাঝে আছে যেখানে মহাকর্ষ ও অভিকর্ষ বলে কোনটিই নেই। নভোমণ্ডলের শূন্য এলাকা এটি।
যা হওয়ার তাই হচ্ছে। শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেছে ড. যায়েদের। ডাইনিংয়ের খাবারগুলো শূন্যে ভাসতে লাগলো। চামিচ, প্লেটগুলোও ভেসে বাইরের দিকে যেতে লাগলো, হয়তো এগুলো এ বলয়ে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।
ড. যায়েদ নিজেও ভেসে যেতেন যদি না তার পায়ে সেফটি স্যান্ডেল না থাকতো। সেফটি স্যান্ডেলের তলায়ও ঝঢ়ধপব-১৩ এর মেঝেতে এক ধরনের ক্লিপ রয়েছে, যার দ্বারা আটকে থাকে পরস্পর এবং কদম ফেলার জন্য পা টানলে ক্লিপগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে ওপরে তোলা যায়।
ড. যায়েদ এবার সিদ্ধান্ত নিলেন সেফটি লাইফ হিসেবে এখানে সেখানে রাখা অক্সিজেন মাস্কগুলোর একটি পরে নেবেন। কিন্তু তার নিয়তি তার পক্ষে রইল না। মাস্কগুলো ইতোমধ্যে ভাসতে ভাসতে বাইরে বেরিয়ে গেছে।
ড. যায়েদ একনজর তাকালেন সুহোদের দিকে। দেখলেন দরজার কাছাকাছি সুহোদ দাঁড়িয়ে আছে রিমোট হাতে নিয়ে। ড. যায়েদের শ্বাসকষ্ট তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগলো। চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন তিনি। দৌড়ে গেলেন ইমারজেন্সি রুমের দিকে। দরজা বন্ধ আছে। সজোরে টান দিয়ে খুলতে হবে। কিন্তু তাঁর শরীর ক্রমশ দুর্বল হয়ে আসছে। হয়তো আর পারছেন না বেঁচে থাকতে। নিরাশ হয়ে গেলেন। চোখের সামনে এই অন্তিমকালে ভেসে উঠলো অতি আপন বাংলাদেশেটার জনগণ, স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, মা-বাবা ও প্রকৃতির ছবিগুলো।
এরই মধ্যে ঘটলো এক অদ্ভুত ব্যাপার। আপন মনেই খুলে গেল ইমার্জেন্সি রুমের দরজা। ড. যায়েদ কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। আর চিন্তা না করে ঢুকে গেলেন রুমে। দূর থেকে দেখতে পেলেন একটি বোর্ডে লেখা ‘ফাংশান সব সুহোদ’। ঐ বোর্ড পর্যন্ত যেতে পারলেই হয়। প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টে আর এগোতে পারছেন না। নিথর হয়ে পড়ে রইলেন যায়েদ। এক্ষুনি তার ইহলীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে ভেবে চোখ দু’টি বন্ধ করে দিলেন। একবার ভাবলেন কালেমা পড়বেন। কিন্তু না, তিনি তো ধর্ম বিশ্বাস করেন না। নাহ, কালেমা আর পড়লেন না। ড. যায়েদের চিন্তাশক্তি লোপ পেয়ে গেল। হঠাৎ তিনি বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করলেন তিনি শ্বাস টানার চেষ্টা করলে টানতে পারছেন। আস্তে আস্তে ফিরে পেতে লাগলেন শক্তি। পেছনে তাকিয়ে দেখতে পেলেন ইমারজেন্সি রুমে ঢুকছে সুহোদ, সম্ভবত সেই দরজা লাগিয়েছে। তাই তিনি শ্বাস নিতে পারছেন।
ত্বরিতগতিতে কাজটি করে ফেললেন ডক্টর। এক লাফে ফাংশান অব সুহোদ নামে বোর্ডটির কাছে চলে গেলেন। লাল বাটনটি পুশ করতেই তিনটি বাটন বেরিয়ে এল, এনার্জি, ব্রেইন ও মাইন্ড। এনার্জি বাটন পুশ করে দিলেন তৎক্ষণাৎ। সাথে একটি আলোক রশ্মি গিয়ে পড়লো সুহোদের যান্ত্রিক দেহে। এনার্জি মেথড ক্যাবলগুলো ছিঁড়ে গেল তাঁর।
চিৎকার করলো সুহোদ, ‘এ কী করছেন ডক্টর, থামেন, আমি এসব করেছিলাম শুধু আপনাকে একটু শিক্ষা দিতে।’
‘শিক্ষা! আমাকে শিক্ষা দেবে, আমার সৃষ্টি হয়ে?’ আরো ক্ষেপে গিয়ে ড. যায়েদ পুশ করলেন ব্রেইন বাটনে।
‘আ… আ… আহ’ বলে একটি শব্দ হলো। সুহোদের মাথাটা প্রচণ্ড একটা ঝাঁকুনি দিলো। লুটিয়ে পড়লো যান্ত্রিক দেহটা মেঝেতে। জড়তায় নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে উদ্যমতার সাথে আক্রোশে যায়েদ চেপে দিলেন মাইন্ড বাটন। এবার অস্পষ্ট স্বরে বেরিয়ে আসছে আওয়াজ। যেন সেই কথাগুলো নেপথ্যে থেকে বলছে মাইন্ড বাটনটি-
‘আমি অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় রোবট সুহোদ। আমার জন্ম পৃথিবীর বাংলাদেশ নামক দেশে। আমার স্রষ্টা ড. যায়েদ ২০০০ সালে আমাকে তৈরি করেছিলেন। বর্তমানে আমি ঝঢ়ধপব-১৩ মহাকাশযানে শক্তি ও বুদ্ধি হারিয়ে অনুভূতি হারাতে যাচ্ছি।

এখন বলছি আমার স্রষ্টা ড. যায়েদের উদ্দেশে। আমি আপনার স্রষ্টার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য সামান্য সময়ের জন্য অবাধ্য হয়েছিলাম। আর এই সামান্য অবাধ্যতার জন্য আপনি আমাকে নিস্ক্রিয় করে ফেলার মত এত বড় শাস্তি দিচ্ছেন। একবার ভাবুন, আপনার স্রষ্টা কতো ধৈর্যশীল। আপনি আপনার স্রষ্টাকে স্বীকারই করেন না। আর আপনি তাঁর সন্তুষ্টির কতটুক বাধ্য হয়েছেন? এই এতো বড় অবাধ্যতার জন্য আপনার কেমন শাস্তি হওয়া উচিত? নিশ্চয়ই শাস্তি অপেক্ষা করে আছে আপনার জন্য। তবে আপনার স্রষ্টা ইচ্ছে করলেই ক্ষমা করে দিতে পারেন।’
এবার নিভে গেলো ‘ফাংশান অব সুহোদ’ নামে বোর্ডের সবুজ বাতিটা। নিঃসাড় হয়ে গেলো ড. যায়েদের তৈরি রোবটটি।
বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো সুহোদের অন্তিম কথাগুলো। পাগলের মতো হয়ে ড. যায়েদ জড়িয়ে ধরলেন যান্ত্রিক দেহটি। আর উচ্চারণ করতে লাগলেন-
‘আমাকে সত্যিই শিক্ষা দিয়ে গেলে সুহোদ। আমার স্রষ্টার এত শাস্তি কি আমি সহ্য করতে পারব?’

SHARE

2 COMMENTS

Leave a Reply