Home প্রচ্ছদ রচনা ভূমি কাঁপে ভূমিকম্পে

ভূমি কাঁপে ভূমিকম্পে

মাসুম কবীর..

হঠাৎ করেই ভূমিকম্পের বিষয়টি ঠিক যেন আমাদের চোখের সামনে চলে এসেছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই বেশ ঘনঘনই এখন ভূমিকম্প হচ্ছে। এই ভূমিকম্প নিয়ে বড় বড় মানুষের ভারী ভারী কথা নিশ্চয়ই তোমাদের অনেকের মনেই ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে। কী কী করতে হবে সে সময়, কোন্ ধরনের ভূমিকম্পে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারেÑ এসব বিষয় জানতে নিশ্চয়ই তোমাদের ইচ্ছে করছে। হ্যাঁ বন্ধুরা, এই লেখাটি পড়লে ভূমিকম্প সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা তোমাদের হবে।

ভূমিকম্প কী
প্রথমেই শুরু করি, ভূমিকম্প আসলে জিনিসটা কী, সেটা দিয়ে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ভূ অর্থ পৃথিবী আর কম্পন মানে কাঁপা। তার মানে হলো, পৃথিবী যখন কাঁপে, তখন তাকে ভূমিকম্প বলা হয়। প্রকৃতির নিয়মে ভূ-অভ্যন্তরে (মানে মাটির নিচে) সৃষ্ট আলোড়নের কারণে ভূ-পৃষ্ঠের কোনো কোনো অংশ হঠাৎ কেঁপে ওঠে। আর এই কেঁপে ওঠাকেই আমরা বলি ভূমিকম্প। এই ধরনের কম্পন প্রচণ্ড, মাঝারি কিংবা মৃদুÑ এই তিন ধরনের হতে পারে।
অনুমান করা হয়, প্রতি বছর প্রায় ৫ লাখ বার ভূমিকম্প হয়। আর এগুলোর মাত্র ১ লাখ ভূমিকম্পই মানুষ বুঝতে পারে। আবার অনেক সময়ই সমুদ্রের তলদেশে ভূমিকম্প হয়, যেগুলো স্থল পর্যন্ত আসার আগেই শেষ হয়ে যায়। তাই আমরা সেভাবে ভূমিকম্পের প্রভাব টের পাই না। তবে সাগর তলে বড় সড় ভূমিকম্প হলে সুনামি হতে পারে। এতে করে প্রচণ্ড জলোচ্ছ্বাস হয়। এর ফলে উপকূলীয় লোকজন, সমুদ্রে মাছ ধরতে থাকা জেলে বা জাহাজের মানুষজন আর নৌকাগুলো পড়ে ভয়াবহ বিপদে।
বাংলাদেশ পৃথিবীর ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত বলে এদেশে ইদানীং খুব ঘনঘন ভূমিকম্প অনুভূত হচ্ছে। আর বড় সড় ভূমিকম্প হওয়ার আগে মৃদু ভূমিকম্প বেশ ঘনঘনই হয়ে থাকে। ১১৪ বছর আগে ১৮৯৭ সালে এদেশে এক ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়। যা ‘দ্য গ্রেট বেঙ্গল আর্থকোয়াক’ নামে পরিচিত। এমন ভয়াবহ আরেকটি ভূমিকম্পের আশঙ্কাও কিন্তু একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যায় না।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই ভূমিকম্প হয়। কিন্তু দেশে দেশে মাটির গঠনে ভিন্নতা, টেকটোনিক প্লেট, বিল্ডিং কোড, বিল্ডিং স্ট্রাকচার ও বাড়ি বানানোর উপকরণে পার্থক্য থাকায় ভূমিকম্পের প্রভাবও তাই দেশ ভেদে ভিন্ন হয়।

ভূমিকম্প কেন হয়
পৃথিবীর কেন্দ্রভাগ থেকে শক্তি ভূ-ত্বকের বাইরে বিমুক্ত হওয়ার সময়ই ভূমিকম্প হয়। ব্যাপারটা আরেকটু বুঝিয়ে বলি। বাইরে থেকে তাকালে পৃথিবীকে নিরেট বলের মতো মনে হলেও এর ভেতরের অংশে রয়েছে প্রধানত চারটি স্তর। সবচেয়ে উপরের শক্ত স্তরকে বলে ভূত্বক। এই ভূত্বককে বিজ্ঞানীরা ২০টি অংশে ভাগ করেছেন। এগুলোকে প্লেট বলে। এই প্লেট মানে কিন্তু আবার থালা নয়। আর ভূত্বকের নিচে রয়েছে গরম গলিত লাভার স্তর। অর্থাৎ গরম লাভার স্তরের ওপর ভেসে আছে প্লেটগুলো। কেন্দ্রভাগের ভীষণ গরম তরল লাভা, গ্যাস থেকে প্রচুর শক্তি উৎপন্ন হয়। এই শক্তি পৃথিবীর বাইরের দিকে সবসময় চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। কখনও কখনও এই চাপ এতটাই জোরালো হয় যে, মাটি ফুলে ওঠে। তখন আমাদের চারপাশ ভীষণ কাঁপতে থাকে। একেই বলে ভূমিকম্প।
প্লেটগুলো যখন একটা আরেকটার গায়ে ধাক্কা খায়, তখন প্রথমে কিছুক্ষণ লেগে থাকে। ফলে কোনো প্লেটই নড়ে না, কিন্তু একটা আরেকটাকে বিপুল শক্তিতে ঠেলতে থাকে। সেই ঠেলায় প্রথমে হয়তো প্লেটগুলো একটু-আধটু নড়ে, কিন্তু তাতে তেমন কিছু হয় না। আর একটু পরেই সেই প্রচণ্ড ঠেলা সামলাতে না পেরে দুই প্লেটের শেষপ্রান্তের পাথরগুলো ভেঙে যায়। ঠিক তখনই ভূমিকম্প হয়। পাথরগুলো ভাঙতে শুরু করলে প্লেট দুটোও নড়তে শুরু করে। ওই প্লেট দুটো যতক্ষণ পর্যন্ত আবার স্থির হয়ে নড়াচড়া বন্ধ না করছে, ততক্ষণ ভূমিকম্পও চলতে থাকে।
পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় যে কোনো সময় ভূমিকম্প হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ও আলাস্কা, গুয়াতেমালা, চিলি, পেরু, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক, নিউজিল্যান্ড, গ্রিস, ইতালি এবং জাপানে ঘনঘন ভূমিকম্প হয়।

ভূমিকম্পের শ্রেণীবিভাগ
মাটির গভীরে শিলাস্তরের বিচ্যুতির মাধ্যমে যে বিন্দুতে শক্তি নিঃসরণের ফলে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয় তাকে ভূমিকম্পের কেন্দ্র (ঋড়পঁং) বলে। কেন্দ্র থেকে উলম্বভাবে ভূ-পৃষ্ঠের উপরস্থ বিন্দুকে ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র (ঊঢ়রপবহঃবৎ) বলে। ভূমিকম্পের উপকেন্দ্রে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সবচেয়ে বেশি হয়। উপকেন্দ্র থেকে দূরত্ব বৃদ্ধির সাথে সাথে ভূমিকম্পজনিত ক্ষতির মাত্রা হ্রাস পেতে থাকে।
কেন্দ্রের গভীরতার ভিত্তিতে ভূমিকম্পকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। যথাÑ
১.    অগভীর কেন্দ্রবিশিষ্ট ভূমিকম্প (ঝযধষষড়-িভড়পঁং বধৎঃযয়ঁধশব) : এ ধরনের ভূমিকম্প সাধারণ ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ৭০ কিলোমিটারের মধ্যে সৃষ্টি হয়। অনুভূত বেশির ভাগ ভূমিকম্পই এই শ্রেণীর। সাধারণত প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পগুলো স্বল্প গভীরতায় সৃষ্টি হয়ে থাকে।
২.    মাঝারি গভীর কেন্দ্রবিশিষ্ট ভূমিকম্প (ওহঃবৎসবফরধঃব-ভড়পঁং বধৎঃযয়ঁধশব) : ৭০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার গভীরতার মধ্যে সংঘটিত ভূমিকম্পগুলো এই দলে পড়ে।
৩.    গভীর কেন্দ্রবিশিষ্ট ভূমিকম্প (উববঢ়-ভড়পঁং বধৎঃযয়ঁধশব) : ৩০০ থেকে ৭০০ কিলোমিটার গভীরতায় এগুলোর উৎপত্তি।

ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল নির্ণয়
এটি সঠিকভাবে জানার জন্য কমপক্ষে তিনটি রেকর্ডিং স্টেশন প্রয়োজন। ধরা যাক ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে তিনটি ভূমিকম্প পরিমাপক স্টেশন আছে। ঢাকা স্টেশনের সিসমোগ্রাফ পরীক্ষা করে দেখা গেল ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ঢাকাস্থ রেকর্ডিং স্টেশন থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত অর্থাৎ ঢাকাকে কেন্দ্র করে ১০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধ নিয়ে একটি বৃত্ত অঙ্কন করলে ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল সে বৃত্তের পরিধির ওপর পড়বে। একইভাবে চট্টগ্রামের সিসমোগ্রাফ পরীক্ষা করে দেখা গেল ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল চট্টগ্রামে অবস্থিত রেকর্ডিং স্টেশন থেকে ১৫৫ কিলোমিটার দূরে। একইভাবে আমরা বলতে পারি চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে ১৫৫ কিলোমিটার ব্যাসার্ধ বিশিষ্ট একটি বৃত্ত অঙ্কন করলে ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল সে বৃত্তের পরিধি বরাবর পড়বে। এখন আমরা যদি ঢাকা ও চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে আঁকা বৃত্ত দুটো মনোযোগ দিয়ে দেখি তাহলে দেখবো বৃত্ত দুটো পরস্পরকে দুটো ভিন্ন ভিন্ন বিন্দুতে ছেদ করেছে। তাহলে আমরা সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল বৃত্ত দুটোর ছেদবিন্দুদ্বয়ের যে কোনো একটিতে। এবার সিলেট স্টেশনের সিসমোগ্রাফ থেকে প্রাপ্ত দূরত্ব ব্যবহার করে একটি বৃত্ত অঙ্কন করলে আমরা দেখবো বৃত্তটির পরিধি ঢাকা ও চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে ইতঃপূর্বে অঙ্কিত দুটোর ছেদবিন্দুদ্বয়ের যে কোনো একটির ওপর পড়ে। ওই ছেদ বিন্দুটিই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল।

ভূমিকম্পের পরিমাপ
মোটামুটি ১৫০ বছর আগ পর্যন্ত মানুষ শুধু ভূমিকম্প হয়ে গেলো, এমনটাই দেখতে পেত। কিন্তু কতো মাত্রার বা ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প হলো, তা জানতে পারতো না। ঘনঘন ভূমিকম্প হয় এমন এলাকায় বিজ্ঞানীরা সবসময় নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। এরপর নানারকম হিসাব-নিকাশ করে অনেকক্ষেত্রেই তারা ভূমিকম্পের আগাম খবর বলে দিতে পারেন। এর ফলে অনেক জানমাল রক্ষা পায়। ভূমিকম্প মাপার জন্য বিজ্ঞানীদের আবিষ্কৃত যন্ত্রের নাম সিসমোগ্রাফ বা সিসমোমিটার। এই সিসমোগ্রাফ আরো একটি নামেও পরিচিতÑ একসিলারোগ্রাফ। এই যন্ত্রে ¯িপ্রংয়ের নিচে একটি ওজনদার জিনিস ঝোলানো থাকে। একটি কাঁটা ওজনদার জিনিসটির সঙ্গে যুক্ত থাকে। যন্ত্রে অপর দিকে ঘুরতে থাকে একটি ছোট আকারের ড্রাম। পৃথিবী যে গতিতে কাঁপে, ওজনদার জিনিসের সঙ্গের কাঁটাটি সেই গতিতে কাঁপতে থাকে। কাঁপুনির দাগ পড়ে ড্রামের গায়ে। এই দাগ দেখে বলা যায় ভূমিকম্পের মাত্রা কত। রিখটার স্কেলে এই মাত্রা পরিমাপ করা হয়। এই পরিমাপে যেকোনো সংখ্যার ভূমিকম্প পূর্ববর্তী সংখ্যার চাইতে ১০ গুণ শক্তিশালী। যেমন ৩ মাত্রার ভূমিকম্পের চেয়ে ৪ মাত্রার ভূমিকম্প ১০ গুণ বেশি শক্তিশালী। ভূমিকম্পের মাত্রা দুইভাবে পরিমাপ করা হয়। তীব্রতা (গধমহরঃঁফব) ও প্রচণ্ডতা বা ব্যাপকতা (ওহঃবহংরঃু)।

প্রথম ভূমিকম্প মাপার যন্ত্র
চীন ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। সেখানে যতসব বড় বড় ভূমিকম্প হয়। প্রায় ২ হাজার বছর আগে হ্যান রাজবংশের শাসনামলে চীনা জ্যোতির্বিদ, গণিতবিদ ঝাঙ হেঙ প্রথম সিসমোগ্রাফ যন্ত্র আবিষ্কার করেন। ঝাঙ হেঙয়ের সিসমোগ্রাফ যন্ত্রটি ছিল ব্রোঞ্জের তৈরি একটি ঘড়া। এর ওপরের দিকের চারপাশে আটটি ছোট ড্রাগন রাখা আছে। ড্রাগনের মুখে থাকত বল। ভূমিকম্প হলে ড্রাগনের মুখ থেকে বল পড়তো নিচে অপেক্ষারত ব্যাঙের মুখে। তা দেখে বোঝা যেত কোন্ দিকে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে। এই যন্ত্র দিয়ে ৫০০ কিলোমিটার দূরে যে ভূমিকম্পের উৎপত্তি তার আগাম সংবাদ পাওয়া যেত।

মার্কেলি স্কেল দিয়ে ভূমিকম্প মাপা
ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দেখে মার্কেলি স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা মাপা হয়। এই স্কেলে রয়েছে মাত্রা ১ থেকে মাত্রা ১২ পর্যন্ত পরিমাপের ব্যবস্থা। মাত্রা ১ হচ্ছে সবচাইতে মৃদু ভূমিকম্প। সাধারণত এই মাত্রার ভূমিকম্প মানুষ অনুভব করতে পারে না। আর ১২ হচ্ছে সবচাইতে বেশি মাত্রার।

বিভিন্ন মাত্রার ভূমিকম্প
বন্ধুরা, তোমরা তো এখন প্রায়ই শুনে থাক ‘এত’ মাত্রার ভূমিকম্প আজ জাপানে আঘাত হেনেছে। আর ইন্দোনেশিয়ায় আঘাত হানা ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ‘অত’। এবার এসো এই মাত্রা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আকারে জেনে নেয়া যাক।
২ মাত্রা : উঁচু দালানে থাকলে খুব সংবেদনশীল কেউ কেউ হয়তো বুঝতে পারেন। এই মাত্রায় পাত্রের পানি নড়ে ওঠে।
৩ মাত্রা : ঘরের ভেতরে বিশেষ করে উঁচুতলায় থাকা লোকজন বুঝতে পারে। তবে বেশির ভাগ মানুষই এই মাত্রার ভূমিকম্প টের পায় না। ট্রাক চলাচলের সময় যে ধরনের কম্পন হয়, এই মাত্রায় ভূমিকম্পের অনুভূতিও অনেকটা সে রকম।
৪ মাত্রা : ঘরের ভেতরে থাকা লোকজন এই ভূমিকম্প টের পায়। দরজা-কানালা কাঁপতে থাকে। দেয়ালে ফাটল দেখা দিতে পারে।
৫ মাত্রা : এই মাত্রা ভূমিকম্প প্রায় সবাই বুঝতে পারে। বাসন-পেয়ালা, জানালার কাচ ভেঙে পড়তে পারে। এর দোলায় ঝুলিয়ে রাখা বড় বড় ঘণ্টা বাজতে শুরু করবে। বাড়ির খুব কাছ দিয়ে কোনো বড় ট্রেন গেলে যে কম্পনের সৃষ্টি হয়, ভূমিকম্পের অনুভূতিতা অনেকটা সেরকম।
৬ মাত্রা : এই মাত্রার ভূমিকম্পে ঘরের ভেতরে থাকা বড় বড় আসবাবপত্র উল্টে পড়তে পারে। দেয়ালের আস্তর খসে পড়ে। বুকশেলফের বই পড়ে যায়।
৭ মাত্রা : এ সময় দাঁড়িয়ে থাকাই মুশকিল হয়ে পড়ে। বাড়িঘরের আসবাবপত্র ভেঙে যায়। দুর্বল কাঠামো বা নকশার দালানকোঠা ভেঙে পড়তে পারে। চলন্ত গাড়িতে থাকা লোকজনও এই ভূমিকম্প টের পায়।
৮ মাত্রা : খুব পোক্তভাবে তৈরি ভবনেরও আংশিক ক্ষতি হতে পারে। কারখানার চিমনি ভেঙে পড়ে।
৯ মাত্রা : বাড়িঘরের ভিত নড়ে যেতে পারে। আতঙ্কজনক পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
১০ মাত্রা : বাড়িঘর ভেঙে যায়। রেলপাথ বেঁকে যেতে পারে।
১১ মাত্রা : বেশির ভাগ দালানকোঠা ভেঙে পড়ে। সেতু ধ্বংস হয়ে যায়।
১২ মাত্রা : সবকিছু বিধ্বস্ত হয়ে যায়। মাটিতে ঢেউয়ের মতো সৃষ্টি হয়। বড় বড় পাহাড় সরে যায়। এমনকি এই মাত্রার ভূমিকম্পে নদীর গতিপথও বদলে যেতে পারে।
সুনামি
সাধারণত চাঁদ, সূর্য, বাতাস প্রভৃতির কারণে পানিতে ঢেউ ওঠে। সেই ঢেউ সমুদ্রতীরেই আছড়ে পড়ে। কিন্তু মাঝে মাঝে দৈত্যাকৃতি ঢেউ আঘাত হানে উপকূলে। ভাসিয়ে নিয়ে যায় উপকূলীয় এলাকার বাড়িঘর, মানুষ, গাছপালা সবকিছু। একে বলে সুনামি। সমুদ্রের তলদেশে তীব্র ভূমিকম্প বা সেখানে থাকা আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের কারণে সুনামি হয়ে থাকে।

ভূমিকম্পে যা যা ক্ষতি হতে পারে
ভূমিকম্পে ক্ষতির বিষয়টা আসলে ভূমিকম্পের পরিমাপের ওপর নির্ভর করে। তীব্রতার ওপর নির্ভর করে মৃদু, মাঝারি আর প্রচণ্ডÑ এই তিন ভাগে ভাগ করা যায় ভূমিকম্পকে। যতো বেশি তীব্র হবে, ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ততোই বাড়বে। অনেক দালানই ধ্বসে পড়তে পারে। তবে ক্ষয়ক্ষতি যাই হোক, প্রথম যে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে; কখনোই আতঙ্কিত হওয়া চলবে না। কারণ আতঙ্কিত হলেই বুদ্ধি ও চিন্তা করার ক্ষমতা লোপ পায়। মাথা ঠাণ্ডা রেখে এবার জেনে নাও ভূমিকম্পের সময় কী কী করা দরকার।

ভূমিকম্পের আগেই যা করবে
ভূমিকম্পের সময় কী কী করতে হবে জানার আগে চলো জেনে নিই, তারও আগে আমরা সতকর্তামূলক কী কী ব্যবস্থা রাখতে পারি। মানে, ভূমিকম্প যখন হওয়ার তখন তো হবেই। এর আগে আমাদের যা যা করা দরকার, তা হলোÑ
১.    প্রথমেই এই লেখাটা মনোযোগ দিয়ে পড়বে। তারপর যা যা করার ব্যাপারে পরামর্শ দেয়া হয়েছে, সেগুলো বাড়ির সবাইকে আর বন্ধু-বান্ধবদেরকেও জানাবে। যারা জানে না, তাদেরকেও জানাবে। তাহলে ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে অনেকটাই আমরা রক্ষা পাবো।
২.    গুরুত্বপূর্ণ কিছু কিছু জিনিস আগে থেকেই হাতের কাছে রেখে দেবে। যেমন ধরো, ব্যাটারিচালিত রেডিও, টর্চলাইট, দুটোর জন্যই অতিরিক্ত ব্যাটারি, বোতলজাত পানি, শুকনো খাবার, কম্বল, হুইসেল, বৈদ্যুতিক লাইন ও গ্যাসের লাইন বন্ধ করার যন্ত্র। টর্চ সবসময়ই হাতের কাছাকাছি রাখা দরকার। ঘুমানোর সময় তা বিছানায় বালিশের পাশেই রাখতে পারো।
৩.    ভারী ভারী কোনো জিনিসকে ওপরে ঝুলিয়ে রাখবে না কিংবা তাকের ওপরের দিকে না রেখে নিচের দিকে রাখো। বড়ো আয়না ও বড়ো বাঁধানো ছবি এমন জায়গায় ঝোলানো উচিত নয় যে জায়গাগুলোতে তোমরা সবসময় শোওয়া-বসা করো।
৪.    দাহ্য পদার্থ, মানে যেগুলো আগুন জ্বালাতে সাহায্য করে, যেমন তেল বা গ্যাসের কনটেইনারগুলো নিরাপদ দূরত্বে রাখো। নিরাপদ দূরত্ব মানে চুলা, ফারনেস, ওয়াটার হিটার, ওভেনÑ এগুলো থেকে দূরে রাখো।
৫.    বড় বড় ও লম্বা ফার্নিচারগুলোকে যেমন শেলফ, ফ্রিজ, সোফা এইসব জিনিস দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখবে, যাতে কম্পনের সময় তা গায়ের ওপর এসে না পড়ে।
৬.    সবার জন্য হেলমেট কিনে রাখতে পারো। যাতে করে ভূমিকম্পের সময় মাথায় হেলমেট পরা যায়। যদি কোনো কিছু ধ্বসেই পড়ে, তাহলে ক্ষতিটা কম হবে।
৭.    বাড়ির সবার সঙ্গে বসে ‘প্ল্যান অব অ্যাকশন’ ঠিক করতে হবে। মানে ভূমিকম্পের সময় কী কী করবে, কোথায় আশ্রয় নেবে, কাকে জানাবে ইত্যাদি।
ভূমিকম্পের সময় যা করবে
১.    যদি তুমি ঘরের ভেতরে থাকো, তাহলে রেড ক্রিসেন্টের পরামর্শ অনুযায়ী, সবচেয়ে উত্তম পন্থা হলো, ‘ড্রপ-কাভার- হোল্ড অন’ বা ‘ডাক-কাভার’ পদ্ধতি। অর্থাৎ, কম্পন শুরু হলে মেঝেতে বসে পড়তে হবে। এরপর শক্ত টেবিল বা ডেস্কের নিচে ঢুকে কাভার নিতে হবে। এমন ডেস্ক বেছে নিতে হবে, যাতে প্রয়োজনের সময় সেই কাভারসহ নড়াচড়া করা যায়। তাদের মতে, ভূমিকম্পে বিল্ডিং খুব বেশি কলাপস বা ভেঙে না পড়লেও আশপাশের টুকিটাকি জিনিস গায়ের ওপর পড়ে হেড-নেক-চেস্ট ইনজুরি হতে পারে। তাই এগুলোর হাত থেকে বাঁচার জন্যই ডেস্ক বা এরকম কিছুর নিচে কাভার নেয়া জরুরি।
২.    হেলমেট কেনা থাকলে দ্রুত হেলমেট পরে নেবে।
৩.    কখনোই জানালার কাছে কিংবা বড় আয়না ও ভারী ঝুলন্ত কোনো কিছুর নিচে আশ্রয় নেবে না। ঘরের দেয়ালের পাশেও দাঁড়ানো অনুচিত। যদি একান্তই দাঁড়াতে হয়, তাহলে বাইরের দিকে যে দেয়াল আছে, সেদিকে দাঁড়াও।
৪.    যদি বাড়ির কেউ রান্নার কাজে ব্যস্ত থাকে, তাকেও কভার নিতে হবে। কিন্তু কভার নেয়ার আগেই দ্রুত চুলা নিভিয়ে ফেলতে হবে। কারণ, যদি ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়, তাহলে আগুন জ্বালানো থাকলে গ্যাস লাইন ফেটে সেই আগুন সারা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
৫.    যদি তুমি বাইরে থাকো, তাহলে খোলা জায়গাতে চলে যেও। আশপাশে বড় বিল্ডিং, ব্রিজ, পাওয়ার গ্রিড লাইন, টাওয়ার কিংবা বড় গাছ আছে কি-না দেখে নিও। এগুলো থেকে যতটা পারো দূরে থেকো।
৬.    যদি তুমি গাড়ির মধ্যে থাকো, তাহলে আস্তে আস্তে গাড়ি থামিয়ে ফেলো। তারপর রাস্তার ধারে গাড়ি থামিয়ে গাড়ির ভেতরেই অবস্থান করো। এখানেও একই কথা, বড় কোনো গাছ, বৈদ্যুতিক ট্রান্সফর্মার, ওভার ব্রিজ এগুলোর নিচে গাড়ি রাখা যাবে না।

ভূমিকম্পের পর যা করবে
১.    প্রথমেই দেখো কেউ আহত হয়েছে কি-না। আহত হলে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। বেশি আহত হলে হাসপাতালে নিতে হবে।
২.    এবার দেখো, বাড়ির কতোটুকু ক্ষতি হয়েছে। যদি বেশি ক্ষতি হয়, তাহলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসো। ততোক্ষণ পর্যন্ত বাড়ির ভেতর ঢুকবে না, যতোক্ষণ পর্যন্ত না নিরাপত্তাকর্মীরা এসে বাড়িটাকে নিরাপদ বলে ঘোষণা করছে।
৩.    বাড়ির ভেতর অন্ধকার হয়ে এলে টর্চ জ্বালাও। আগেই ম্যাচ জ্বালাবে না। কারণ, গ্যাসের পাইপ ফেটে গেলে সারা বাড়িতে আগুন ধরে যেতে পারে ওই একটা ম্যাচের কাঠির জন্যই।
৪.    যদি গ্যাসের গন্ধ পাও, তাহলে নিশ্চিতভাবেই ধরে নিতে হবে গ্যাস লাইন লিক করেছে। তাড়াতাড়ি করে দরজা-জানালা খুলে দাও। এবার গ্যাসের মিটার বন্ধ করে দাও। তারপর দ্রুত তোমার এলাকার গ্যাস ডিসট্রিবিউটরকে জানাও।
৫.    যদি বিদ্যুৎ চলে যায়, তাহলে আগে মেইন সুইচ বন্ধ করো। এবার বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির প্লাগ খুলে ফেলো। কারণ, হঠাৎ করে বিদ্যুৎ চলে এলে যদি স্পার্ক করে (স্ফুলিঙ্গ হয়) আর যদি গ্যাস লাইন ফাটা থাকে, তাহলেও আগুন ধরে যেতে পারে।
৬.    যদি বাড়ির বাইরে বের হয়ে আসো, তাহলে সিঁড়ি ব্যবহার করবে। লিফট ব্যবহার না করাই ভালো।

ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়লে
১.    ধুলোবালি থেকে বাঁচার জন্য আগে থেকেই সঙ্গে রাখা রুমাল, তোয়ালে বা চাদর দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে রাখো।
২.    আবারো বলছি, ম্যাচ জ্বালাবে না। দালান ধ্বসে পড়লে গ্যাস লিক হয়ে আগুন ধরে যেতে পারে।
৩.    অযথা চিৎকার করবে না। চিৎকার করলে যে শুধু শক্তিক্ষয় হবে, তাই নয়; বরং নাকে-মুখে ধুলোবালি ঢুকে যেতে পারে। ভালো হয় সঙ্গে একটা হুইসেল রাখতে পারলে। মানুষজনের অস্তিত্ব টের পেলে হুইসেল বাজাও নয়তো পাইপ কিংবা অন্য কোনো কিছুতে বাড়ি দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করো।
এবার বন্ধুরা, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি জেনে নাও। ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি যাই হোক, প্রথম যে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে; কখনোই আতঙ্কিত হওয়া চলবে না। কারণ আতঙ্কিত হলেই বুদ্ধি আর চিন্তা করার ক্ষমতা লোপ পায়। মাথা ঠাণ্ডা রেখে তারপর চিন্তা করতে থাকবে, কী কী তোমার করণীয়। আরেকটা ব্যাপার, ভূমিকম্প হয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর আবারো ছোট ছোট আকারে কয়েকটি মৃদু কম্পন হয়ে থাকে। এগুলোকে বলে আফটার শক বা বড় ভূমিকম্পের পরের কম্পন। এই কম্পনের জন্য সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, যদি কোনো ঘরবাড়ি নড়বড়ে হয়ে যায়, তাহলে এই আফটার শকেও সেগুলোর বেশ বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।

প্রাণীরা পেয়ে যায় ভূমিকম্পের
আগাম বার্তা!
প্রাণীদের ভূমিকম্প বোঝার ক্ষমতাকে অনেকেই উড়িয়ে দেন। তারা বলেন, প্রাণীরা তো অনেক কারণেই ভিন্ন আচরণ করতে পারে। এই যেমন ধরো, ক্ষুধা লাগলে বা মন খারাপ হলে। কিন্তু এমন ঘটনা তো আর একবার দু’বার হয়নি। আর বেশির ভাগ সময়ই দেখা গেছে পশু-পাখিদের এই ভিন্ন আচরণ কোনো না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবর দিচ্ছে। একবার দেখা গেলো, হেইচেং শহরে হঠাৎ ইঁদুর আর খরগোশরা ওদের গর্ত ছেড়ে আর সাপেরা তাদের শীতনিদ্রা ছেড়ে বেরিয়ে এলো। এই তো ১৯৭৫ সালের কথা। কী হলো জানো? প্রাণীদের এই উদ্ভট আচরণ দেখে চীনের রাজা জারি করলেন এক উদ্ভট হুকুম। শহরের সব মানুষকে শহর খালি করে চলে যেতে হবে। আর সেই শহরে মানুষও কম ছিলো না, ১০ লাখ! কিন্তু রাজার হুকুম, অমান্য করার সাধ্য কার? যেমন হুকুম সবাই তেমনি কাজ করলো। শহরের প্রায় সবাই-ই চলে গেল। তখন কী হলো? রিখটার স্কেলে ৬ মাত্রার বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্প মানে খুবই খারাপ ধরনের ভূমিকম্প। আর হেইচেংয়ে হলো ৭.৩ মাত্রার একটা ভূমিকম্প! একবার চিন্তা করো, ইঁদুর, খরগোশ আর সাপেরা যদি ওই অদ্ভুত আচরণ না করতো, আর তা দেখে রাজা যদি সেই অদ্ভুত হুকুম না জারি করতেন, তবে কী যে হতো!
আর একবার হলো কি জানো? কোনো এক মে মাসের ৫ তারিখে চীনের এক রাজ্যের সব ব্যাঙ রাস্তায় মিছিল বের করলো, আর চিড়িয়াখানায় জেব্রারা তাদের খাঁচার দরজা দিয়ে তাদের মাথা বের করে দিতে চাইলো, হাতিরা শুঁড় তুলে কান্নাকাটি শুরু করলো এবং ময়ূররা তো একসাথে কর্কশ কণ্ঠে এমন ডাকাডাকি শুরু করে দিলো যে সবাই তাজ্জ্বব! আর সত্যি সত্যিই ঐ মাসেরই ১২ তারিখে ভূমিকম্প হলো। প্রাণীরা অমন অদ্ভুত কাণ্ড কোথায় করেছিলো জানো? ভূমিকম্প যেখানে হলো, তার থেকে মাত্র ৬০০ মাইল পশ্চিমের একটা চিড়িয়াখানায়।
আচ্ছা, ইন্দোনেশিয়াতে ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর যে সুনামিটা হলো তখন মানুষ বেশি মারা গিয়েছিল, নাকি পশু-পাখি? বেশি মারা গিয়েছিল মানুষ। প্রায় দেড় লাখ। কেন? কারণ ওই যে, প্রাণীরা তো আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিল যে ওখানে একটা মারাত্মক ভূমিকম্প হবে। আর তাইতো ওরা সাবধান হয়ে গিয়েছিল এবং ৯ মাত্রার মারাত্মক ভূমিকম্প ও তার ফলে যে ভয়ঙ্কর সুনামি হলো তার হাত থেকে বেঁচে গেলো।

শেষ ভূমিকম্প
বন্ধুরা, বর্তমানে পৃথিবীব্যাপী যেসব ভূমিকম্প হয়, সেগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় ঠিক, কিন্তু তোমরা কি জানো এই পৃথিবীতে সর্বশেষ একটা ভূমিকম্প হবে যার ফলে পুরো পৃথিবীটাই ধ্বংস হয়ে যাবে? হ্যাঁ, মহাগ্রন্থ আল কুরআনে এ বিষয়ে একটি সূরা নাজিল করে আল্লাহপাক সে সম্পর্কে সম্যক অবগত করেছেন তাঁর প্রিয় বান্দা মানুষকে। মহান প্রভু তাঁর সবচেয়ে সুন্দরতম সৃষ্টি মানুষকে অত্যন্ত ভালোবাসেন। তাই এই দুনিয়ায় মানুষ কিভাবে চলবে তাও বলে দিয়েছেন। আমরা ভূমিকম্প থেকে বাঁচার জন্য নানান আগাম প্রস্তুতি নিয়ে থাকি বা নেয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু যেদিন এই ভূমিকম্পের ফলে পৃথিবীটাই ধ্বংস হয়ে যাবে, তার জন্য প্রস্তুতি নিতে ভুলে যাই। ভূমিকম্পবিষয়ক কুরআনের ওই সূরাটি হচ্ছে সূরা আল যিলযাল। সেখানে এই ভূমিকম্প সম্পর্কে কী বলা আছে এবার সেটা জেনে নাও।
আমাদের এই পৃথিবীর জীবনটা ক্ষণস্থায়ী। চিরস্থায়ী জীবন রয়েছে শেষ বিচারের পর। আমরা যেমন স্কুল, কলেজ বা মাদরাসার পরীক্ষার জন্য একটি জায়গায় মিলিত হই এবং সেখানে ভালো করতে পারলে সে অনুযায়ী ভালো ফল পাই এবং খারাপ করলে তার জন্য ফেল করিÑ পাস করলে উপরের ক্লাসে উঠি এবং ফেল করলে উঠতে পারি না, তেমনি এই পৃথিবীটাও মানুষের জন্য পরীক্ষার হলের মতো। এখানে যে মানুষটি ভালো করবে সে পুরস্কার পাবে। খারাপ করলে তার জন্য শাস্তি ভোগ করতে হবেÑ তুমি পড়া না পারলে তোমার আব্বু-আম্মু ও টিচার যেরূপ শাস্তি দিয়ে থাকেন।
যেদিন পৃথিবীতে চূড়ান্ত ভূমিকম্প হবে সেদিন পৃথিবী ভীষণভাবে কাঁপবে। এখন যেমন পৃথিবীর কোনো একটি অংশে ভূমিকম্প হয়, সেদিন কিন্তু এটা হবে সমগ্র পৃথিবী জুড়েই। তখন পৃথিবী তার ভেতরের সবকিছু বাইরে বের করে দেবে। এই কথাটিই সূরা ইনশিকাকের ৪ নম্বর আয়াতে এভাবে বলা হয়েছে, “আর যা কিছু তার (পৃথিবীর) মধ্যে রয়েছে তা বাইরে নিক্ষেপ করে দিয়ে খালি হয়ে যাবে।” মরা মানুষগুলো সেদিন বাইরে বের হয়ে আসবে। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তার শরীরের বিভিন্ন অংশগুলো এক জায়গায় জমা হয়ে নতুন করে আবার সেই একই আকৃতি সহকারে জীবিত হয়ে উঠবে যেমন সে প্রথম জীবনের অবস্থায় ছিল। জীবনের সমস্ত কথা ও কাজ এবং যাবতীয় আচার-আচরণের রেকর্ড ও সাক্ষ্য-প্রমাণের যে বিশাল স্তূপ তার গর্ভে চাপা পড়ে আছে সেগুলোকেও বের করে বাইরে ফেলে দেবে পৃথিবী। সোনা, রূপা, হীরা, মণি-মাণিক্য এবং অন্যান্য যেসব মূল্যবান সম্পদ ভূ-গর্ভে সঞ্চিত রয়েছে তার বিশাল বিশাল স্তূপও সেদিন জমিন উগড়ে দেবে। মানুষ দেখবে, এগুলোর জন্য তারা দুনিয়ায় প্রাণ দিতো। এগুলো কবজা করার জন্য তারা পরস্পর হানাহানি ও কাটাকাটি করতো। হকদারদের হক মেরে নিতো। চুরি-ডাকাতি করতো, জলে স্থলে দস্যুতা করতো। যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হতো এবং এক একটি সম্প্রদায় ও জাতিকে ধ্বংস করে দিতো। আজ এসব কিছু তাদের সামনে উপস্থিত। অথচ এগুলো এখন আর তাদের কোনো কাজে লাগবে না বরং উল্টো তাদের জন্য আজাবের সরঞ্জাম হয়ে রয়েছে।
মানুষ জমিনের ওপর যা কিছু করেছে তার সবকিছু সে কিয়ামতের দিন বলে দেবে, জমিন সম্পর্কে এ কথাটি প্রাচীন যুগে মানুষকে অবাক করে দিয়ে থাকবে, এতে সন্দেহ নেই। কারণ তারা মনে করে থাকবে, জমিন আবার কেমন করে কথা বলবে? কিন্তু আজ পদার্থবিদ্যা সংক্রান্ত নতুন নতুন জ্ঞান-গবেষণা, আবিষ্কার-উদ্ভাবন এবং সিনেমা, লাউড স্পিকার, রেডিও, টেলিভিশন, টেপরেকর্ডার ও ইলেকট্রনিকস ইত্যাদির আবিষ্কারের এ যুগে জমিন তার নিজের অবস্থা ও নিজের ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি কিভাবে বর্ণনা করবে একথা অনুধাবন করা মোটেই কঠিন নয়। মানুষ তার মুখ থেকে যা কিছু উচ্চারণ করে তার পূর্ণ অবয়ব বাতাসে, রেডিও তরঙ্গে, ঘরের দেয়ালে, মেঝে ও ছাদের প্রতি অণু-পরমাণুতে এবং কোনো পথে, ময়দানে বা ক্ষেতে কোনো কথা বলে থাকলে সেখানকার প্রতিটি অণু-কণিকায় তা গেঁথে আছে। আল্লাহ যখনি চাইবেন এগুলোকে এসব জিনিসের মাধ্যমে তখনই হুবহু ঠিক তেমনিভাবে শুনিয়ে দিতে পারবেন যেভাবে সেগুলো একদিন মানুষের মুখ থেকে উচ্চারিত হয়েছিল। মানুষ জমিনের যেখানেই যে অবস্থায় যে কোনো কাজ করেছে তার প্রতিটি নড়াচড়া ও অঙ্গভঙ্গির প্রতিচ্ছবি তার চারপাশের সমস্ত বস্তুতে পড়েছে এবং সেগুলোর মধ্যে সেসব চিত্রায়িত হয়ে রয়েছে। একেবারে নিকষ কালো আঁধারের বুকে সে কোনো কাজ করে থাকলেও আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্বের অধীন এমনসব রশ্মি রয়েছে যেগুলোর কাছে আলো-আঁধার সমান, তারা সকল অবস্থায় তার ছবি তুলতে পারে। এসব ছবি কিয়ামতের দিন একটি সচল ফিল্মের মতো মানুষের সামনে এসে যাবে এবং সারাজীবন সে কোথায় কী করেছে তা তাকে দেখিয়ে দেবে। বন্ধুরা, সেদিন মানুষের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও তার কাজের সাক্ষী দেবে।
এ কারণে আমাদেরকে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। এবং যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে দুনিয়ার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “সাবধান, ছোট গোনাহসমূহ থেকে নিজেকে রক্ষা করো। কারণ সেগুলো সব মানুষের ওপর একত্র হয়ে তাকে ধ্বংস করে দেবে।” তিনি আরো বলেন, “জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচো তা এক টুকরো খেজুর দান করার বা একটি ভালো কথা বলার বিনিময়েই হোক না কেন।” আরো সুন্দর কথা বলেছেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, “কোনো সৎকাজকেও সামান্য ও নগণ্য মনে করো না, যদিও তা কোনো পানি পানেচ্ছু ব্যক্তির পাত্রে এক মগ পানি ঢেলে দেয়াই হোক অথবা তোমার কোনো ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে কথা বলাই হোক।”

SHARE

Leave a Reply