Home গল্প জন্মভূমির টান

জন্মভূমির টান

দেলোয়ার হোসেন..

ঝিলে বসেছে অতিথি পাখির মেলা। নানা জাতের পাখিদের কলকাকলিতে চারদিক মুখর। ওরা দল বেঁধে উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে আবার ঝুপঝাপ নামছে ঝিলের জলে। দেখতে দেখতে তেতে ওঠে বেলা। কেউবা উড়ে যায় গাছের ডালে। কেউ বা ঝিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে ডানা ঝাঁপটে হালকা করে শরীর। একটি নীল গলার হাঁস একলা দাঁড়িয়ে, শরীর বিন্যাস করছিলো আপন মনে। লম্বা ঠোঁটে লেজের গোড়া থেকে এক প্রকার তৈলপদার্থ নিয়ে মেখে দিচ্ছিলো প্রতিটি পালকে। ফাঁকে ফাঁকে তুলার মতো ছোট ছোট পালক তুলে ফেলছিলো শরীর থেকে।
একটু দূরেই একটি কাছিম চোখ পিটপিট করে দেখছিলো হাঁসটাকে। কী ভেবে সে পায়ে পায়ে এগিয়ে এলো হাঁসটির কাছে।
Ñ কী ভাইয়া, ডানা দুটোকে সবল করে তুলছো বুঝি! আর ক’টা দিন পরই তো ফালগুনী হাওয়া বইতে শুরু করবে। তোমরা ফিরে যাবে নিজেদের দেশে আপন ঠিকানায়।
Ñ তুমি ঠিকই বলেছো কাছিম ভাইয়া। দেশে তো ফিরতেই হবে।
Ñ একটি বছর এ দেশে থেকে গেলে হয় না?
Ñ ইচ্ছে তো করে থেকে যাই। এই যে হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে তোমাদের দেশে আসি। শীত শেষে সবাই যখন ফিরতে শুরু করে তখন আর নিজেকে সামলাতে পারি না। দলে ভিড়ে ডানা মেলে দেই স্বদেশের পথে। তবে তোমাদের এই বাংলাদেশটিকে বড় ভালোবেসে ফেলেছি আমরা। এমন সুন্দর জলবায়ুর দেশ পৃথিবীতে আর কী আছে!
Ñ তাই তো বলছিলাম, এ বছর না হয় থেকেই যাও। ক’বছর ধরেই তো তোমাকে দেখছি। কথাটা বলি বলি করে আর বলা হয়ে ওঠেনি। আমি এই ঝিলেই বাস করি। আমার জন্মত এখানে। অন্যরা চলে গেলে এখানে প্রচুর মাছ পাওয়া যাবে। ঝিলপাড়ের ঐ গাছগুলোতে থাকতে পারবে। সকাল-বিকেল ঝিলপাড়ে আমরা গল্প করতে পারবো।
Ñ প্রতি বছর শীত মৌসুমে কত দেশ, নদী-নালা পার হয়ে তোমাদের দেশে আসি। তোমার কি কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না?
Ñ ইচ্ছে তো করে কিন্তু কী করবো? তবে সময় পেলে এক ঝিল থেকে আর এক ঝিলে চলে যাই। সেখানে দুই দিন থেকে আবার ফিরে আসি নিজের জন্মস্থানে। এখানকার সব কিছুই বড় আপন।
Ñ তোমাদের পূর্ব পুরুষরা স্থলপথে দৌড়ে যে রেকর্ড করেছিলো তা আমরা জানি। তোমরা কোনো কাজেই ফাঁকি দিতে জানো না। তাছাড়া আত্মবিশ্বাসও আছে তোমাদের। যে জাতি আত্মবিশ্বাস নিয়ে পরিশ্রম করে সে জাতি কখনো পিছে পড়ে থাকে না।
কাছিম হাসতে হাসতে বললো, ঘটনাটা তোমরাও জানো দেখছি। সেই যে একবার খরগোশের সাথে আমাদের এক পূর্ব পুরুষের দৌড়ের প্রতিযোগিতা হয়েছিলো। খরগোশ দ্রুত ছুটলেও শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হতে পারেনি। আমরা আমাদের ছোট ছোট পায়ে হাঁটলেও থামি না কোথাও।
হাঁস বললো, তোমাদের এই শিক্ষা থেকে আমরাও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছি। তাই তো রাত-দিন একটানা ডানা ঝাপটে এ দেশের বিল-ঝিলে এসে পৌঁছাতে পারি।
Ñ তোমরা কতো দেশ দেখতে পাও। কতো সাগর, নদী, বিল-ঝিল পিছে ফেলে তারপর এখানে আসো। মাঝে মাঝে আমারও খুব ইচ্ছে করে অন্য কোনো দেশে যাই। সেখানে কিছুদিন ঘুরে ফিরে আবার ফিরে আসি। স্থলপথে গেলে দীর্ঘ সময়ের দরকার। তবু এক একবার মনে হয় বেরিয়ে পড়ি। শুনেছি কত প্রতিবন্ধী মানুষও হুইল চেয়ারে করে পৃথিবী ঘুরছে। কত মানুষ তাদের সাহায্য করছে। আমরা বাঘ, ভল্লুক, কুমির বা অন্য কোনো পশু-পাখিকে ভয় করি না। ভয় শুধু এই মানুষকে। সে মানুষ ছোটই হোক আর বড়ই হোক। পথে ঘাটে তারা আমাদের দেখলেই আমাদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে শুরু করে দেয়। তখন তারা বুঝতেই চাইবে না যে, কাছিমরাও বিশ্ব ভ্রমণে বের হয়েছে। তাই ভাবি, তোমাদের মতো আকাশপথে যদি কোথাও যেতে পারতাম!
Ñ ইচ্ছে থাকলে অবশ্য উপায় হয়। কিন্তু আমরা আমাদের পিঠের ওপর করে তোমাকে কখনো নিয়ে যেতে পারবো না। তা ছাড়া এ কথাও মিথ্যা নয় যে, তোমরা পরিশ্রমী কিন্তু বোকা।
Ñ হ্যাঁ, এ বদনামও রয়েছে আমাদের। আমাদের পূর্ব পুরুষেরা একবার তোমাদের পূর্ব পুরুষদের কাছে বিদেশ ভ্রমণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। আন্তরিক হয়ে তোমাদের স্বজাতি দু’টি হাঁস একটি কাঠির দুই প্রান্তে দু’জন ঠোঁট দ্বারা কামড়ে ধরেছিলো। আর আমাদের স্বজাতি এক কাছিম কামড়ে ধরেছিলো কাঠির মাঝখানে। সেভাবেই তিনটি প্রাণী উড়ে যাচ্ছিলো আকাশপথে। দৃশ্যটার কথা মনে হলে এখনো বড় ভালো লাগে। কিন্তু এমন অবাক করা দৃশ্য দেখে মানুষরাতো হাসবেই। আর কিশোর-কিশোরীরা সেদিন কৌতূহলী হয়ে নানা কথা বলেছিলো। কাছিম ভাইয়াও রাগ করে বলেছিলো তোদের মুখে ছাই পড়–ক। অমনি ওপর থেকে ঠাস করে পড়লো এসে মাটিতে।
শেষে যা হবার তাই হলো। অবস্থা বুঝে ধৈর্য ধরতে হয়। নিন্দুকের কথায় সবসময় কান দিতে নেই। সবুরে মেওয়া ফলে। এই সব ভালো কথা মানুষ কিংবা পশু-পাখিরা বুঝেও বুঝতে চায় না।
Ñ কাছিম ভাইয়া তুমি ঠিকই বলেছো। অবুঝ মানুষের কারণে আমাদের কতো স্বজাতি উপজাতিরা এ দেশের মাটিতে প্রাণ দিয়েছে। মানুষ ফাঁদ পেতে জাল পেতে এবং গুলি করে মেরেছে আমাদের পূর্ব পুরুষদের। মানুষ কেন বুঝতে চায় না যে, তাদের মতো আমরাও এই প্রকৃতির সন্তান। আমরা আছি বলেইতো পৃথিবীটা এতো সুন্দর। তুমি কী বলো?
Ñ তুমি হাজার কথার এক কথা বলেছো। এখন অবশ্য পশু-পাখি, জীব-জানোয়ারদের নিয়ে মানুষ অনেক ভাবছে। তারা বুঝতে পেরেছে, তাদের মতো অন্যান্য প্রাণীদের এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। সরকার তো কঠোর ভাষায় বলে দিয়েছে, পশু-পাখিদের আর হত্যা করা চলবে না। অতিথি পাখিদের ধরা কিংবা মারাও দণ্ডনীয় অপরাধ।
Ñ সেই জন্যই তো শীত শুরু হতে না হতেই আমরা দেশ ছেড়ে বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাই। না গিয়ে উপায় কী! দেশে প্রচণ্ড শীত। তো দেশ ভ্রমণের ব্যাপারে আমি তো তোমাকে একটা পরামর্শ দিতে পারি।
Ñ তোমরা জ্ঞানী, নানা রকম অভিজ্ঞতা তোমাদের। বলো শুনি।
Ñ যদি ঈগল অথবা বড় কোনো পাখির সাথে কখনো তোমার কথা হয়, তাহলে তাকে তোমার ইচ্ছার কথাটা বলো।
Ñ আমি বললেই কি ওরা ওদের পিঠের ওপর করে আমাকে নিয়ে যেতে রাজি হবে?
Ñ নিতেও পারে, আবার না-ও নিতে পারে। তুমি কি সিন্দাবাদের সেই গল্পটা কখনো শুনেছো? সেই যে বিশাল পাহাড়ের ওপর গোলাকার সাদা পাথরের পাশে লুকিয়ে ছিলো সিন্দাবাদ। গুনছিলো মুক্তির প্রহর। ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিলো মৃত্যুর দিকে। একদিন হঠাৎ আকাশ কালো করে বিরাট একটা ঈগল এসে নামলো সেই সাদা পাথরের ওপর। তখন সে বুঝলো, এটা পাথর নয় ঈগলের ডিম। সিন্দাবাদ তখনই বুদ্ধি করে তার মাথার পাগড়ি দিয়ে ঈগলের পায়ের সাথে বেঁধে ফেললো নিজেকে। ঈগলটা কিছুই বুঝতে পারলো না। তারপর পাখিটা উড়ে এলো একটা বনাঞ্চলে। সেখানেই নিজেকে মুক্ত করে নিলো সিন্দাবাদ। বেঁচে গেলো সে যাত্রা।
কথায় কথায় বেলা গেলো। সে দিনের মতো গল্পটা শেষ করে কাছিম ডুব দিলো ঝিলে আর হাঁসটা উড়ে গিয়ে বসলো গাছের ডালে। সন্ধ্যার ছায়া নামলো। দেশী-বিদেশী পাখিদের কলকণ্ঠে মুখর হলো ঝিলের পাড়। তারপর নেমে এলো নীরবতা।
হাঁসটি কাছিমকে বন্ধু হিসেবে পেয়ে বড়ই খুশি। সুজলা সুফলা শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশে একটি বছর থেকে যাওয়ার আমন্ত্রণে হাঁসটির মন নেচে উঠলো। মনে মনে সে ভাবলো, দেখতে দেখতেই তো চলে যাবে কয়টা মাস। তারপর আবার সেই শীত। তখনই না হয় শীত শেষে আকাশের নদী সাঁতরে চলে যাবো স্বদেশে। এদেশে এখন পশু-পাখিদের আর আগের মতো জীবনের ভয় নেই। শুধু বিল আর ঝিলই নয়, উড়ে উড়ে দেখবো বাংলার সবুজ গ্রাম, শহর-বন্দরÑ যেখানে যা কিছু আছে। দেশে ফিরে সবাইকে বলতে পারবো আমার অভিজ্ঞতার কথা। এমন সুন্দর দেশ পৃথিবীতে আর কি আছে?
পরদিন সকাল হতেই কাছিম এসে অপেক্ষায় থাকলো ঠিক একই জায়গায়। কখন তার হাঁস বন্ধুটি আসবে। কখন সে মন খুলে কথা বলবে তার সাথে। ঝিলজুড়ে চলছে অতিথি পাখিদের ডুবসাঁতার। ঝাঁক বেঁধে উড়ছে, ডাকছে আবার ঝুপঝাপ নামছে ঝিলের জলে।
জলকেলি শেষ হলে কাছিমের বন্ধু হাঁসটি এসে দাঁড়ালো আগের জায়গায়। ডানা ঝাড়তে ঝাড়তে খুঁজলো কাছিম বন্ধুকে। পায়ে পায়ে এগিয়ে এলো কাছিমটিও। শুরু হলো দুই বন্ধুর গল্প। একজনের স্বপ্ন, একটি বছর বাংলার জল- হাওয়ায় বাংলার পাখিদের সাথে কাটিয়ে দেয়া। আরেকজনের স্বপ্ন বিদেশ ভ্রমণ।
এই সব কথা নিয়ে প্রতিদিন গল্পে গল্পে ফুরিয়ে গেলো শীত। ফালগুনী হাওয়ায় চঞ্চল হয়ে উঠলো প্রকৃতি। একদিন নীরব রাতের প্রহর ভেঙে অতিথি পাখিরা ছোট ছোট দল বেঁধে আকাশে উড়লো স্বদেশের পথে। দেখতে দেখতে শেষ হয়ে এলো পাখিদের মলো। দু’ দশটি পাখি তখনো রয়েছে ঝিলের জলে। কাছিমের হাঁস বন্ধুটিও আছে সেই সাথে। একদিন ঝিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে কাছিমটা তার বন্ধুর অপেক্ষায়। সারাটা দিন কাটালো কিন্তু হাঁসটির দেখা আর পেলো না। কাছিমটা তখন মনে মনে ভাবলো স্বদেশের টান সে বড় কঠিন টান। আমিও কি পারবো বাংলার এই সোঁদাগন্ধমাখা মাটির মায়া ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে?

SHARE

Leave a Reply