Home নিয়মিত গুডবাই দ্যা ওয়াল

গুডবাই দ্যা ওয়াল

মিজানুর রহমান মিজান..

চীনের মহাপ্রাচীর আছে; ভারতের? ভারতের আছে রাহুল দ্রাবিড়, দ্যা ওয়াল অব ইন্ডিয়ান ক্রিকেটÑ এমনই বলা হতো তাকে নিয়ে। এ বছরের মার্চ মাসে ঘোষণা করলেন ব্যাট প্যাড নিয়ে ভারতের হয়ে আর মাঠে নামছেন না সাবেক এই ভারত অধিনায়ক। ১৯৯৬ সাল থেকে শুরু করে ২০১২; মাঝের ১৬ বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারের সমাপ্তি টানলেন বিশ্ব ক্রিকেটের নন্দিত এই ব্যাটসম্যান। দ্রাবিড়ের জন্মস্থান ভারতের মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে, তবে বেড়ে উঠেছেন ব্যাঙ্গালোরে। বার বছর বয়স থেকে ক্রিকেটে নিয়মিত তিনি, সে সময় থেকেই প্রতিনিধিত্ব করেছেন তার নিজ প্রদেশের। ক্যারিয়ারের একদম শুরুতে ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি উইকেট রক্ষকের দায়িত্বটাও পালন করতেন তিনি, কিন্তু পরবর্তীতে তার কোচ ও কয়েকজন সিনিয়র ক্রিকেটারের পরামর্শে উইকেট কিপিং বন্ধ করে দেন। ১৯৯১ সালের ফেব্র“য়ারিতে ভারতীয় ঘরোয়া রনজি ট্রফিতে অভিষেক হয় তার। পুরো মৌসুমে ৬৩.৩ গড়ে ৩৮০ রান করা দ্রাবিড় ইঙ্গিত দেন সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের। যদিও তার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের শুরুটা মোটেই অমন সাফল্যময় ছিল না। ১৯৯৬ সালে সিঙ্গার কাপে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে অভিষেকের পরপরই দল থেকে বাদ পড়েন ভালো করতে না পারায়। তবে নিজেকে প্রমাণ করতে খুব অপেক্ষা করতে হয়নি তাকে। ওই বছরই ইংল্যান্ডের সাথে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে তার টেস্ট অভিষেক হয়। পরপর দুই টেস্টে ৯৫ ও ৮৪ রানের ইনিংস খেলে দলে জায়গা ধরে রাখেন। তবে দ্রাবিড় তার জাত চেনান ১৯৯৬-৯৭ মৌসুমে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে। জোহানেসবার্গ টেস্টে দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ১৪৮ রানের ইনিংস খেলে নিজের প্রথম সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন। পরের ইনিংসের ৮১ রানও ছিল সর্বোচ্চ যা তাকে প্রথমবারের মতো ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার এনে দেয়। এরপর আর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৯৯ সালে এসে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ভারত ভালো করতে না পারলেও দ্রাবিড় ছিলেন দারুণ সফল। তার করা ৪৬১ রান ওই বিশ্বকাপের একজন ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ স্কোর। ২০০১ সালে এসে কলকাতায় লক্ষ্মণের সাথে জুটিতে খেলেন এক মহাকাব্যিক ইনিংস। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওই টেস্টে ভারত ফলো অনে পড়ে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করে। পঞ্চম উইকেট জুটিতে দু’জনের ৩৭৬ রানের পুঁজি জয় এনে দিয়েছিল পরাজয়ের শঙ্কায় থাকা ম্যাচে। সে ম্যাচে দ্রাবিড়ের সংগ্রহ ছিল ১৮০ আর লক্ষ্মণ করেছিলেন ২৮১ রান। কিন্তু এত সাফল্যের পরও দ্রাবিড় ছিলেন শচীনের ছায়ায় ঢাকা। ২০০২ সালে এসে তিনি নিজেকে বের করে আনেন সেই ছায়া থেকে। টানা ৪ শতকে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন ভারতের মেরুদণ্ড হিসেবে। ২০০৩ সালের বিশ্বকাপে ভারত ফাইনালে খেলেছিল যেখানে দ্রাবিড় ছিলেন দলের সহ-অধিনায়ক। ওই সময়ে দলে একজন বাড়তি ব্যাটসম্যান খেলানোর স্বার্থে পুনরায় তুলে নিয়েছিলেন কিপিং গ্লাভস। ২০০৩-০৪ মৌসুমে রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে করা ২৭০ রানের ইনিংস তার সর্বোচ্চ। ওই ইনিংসটি সময়ের প্রেক্ষিতে যে কোনো ভারতীয় ব্যাটসম্যানের জন্য দীর্ঘতম ইনিংস। ম্যাচটিতে তিনি ইনজুরি আক্রান্ত সৌরভ গাঙ্গুলীর পরিবর্তে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। এটি সহ টেস্টে মোট ৫টি ডাবল সেঞ্চুরি রয়েছে তার। এক্ষেত্রে একটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো তার প্রতিটি ডাবল সেঞ্চুরিই পূর্বেরটার চেয়ে বড় (যথাক্রমে ২০০*, ২১৭, ২২২, ২৩৩, ২৭০)। ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে ভারত তার নেতৃত্বেই অংশগ্রহণ করে যা ছিল ভারতের একটি ব্যর্থ মিশন। এ সময়টাতে দ্রাবিড়ও খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। কিছুদিন পর অধিনায়কত্ব হারান সৌরভ এবং দলের দায়িত্ব দেয়া হয় রাহুলকে। দ্রাবিড় প্রথমবারের মতো বড় ধরনের সমালোচনার মুখে পড়েন ২০০৪ সালে। জানুয়ারিতে বল টেম্পারিংয়ে অভিযুক্ত হন তিনি। একই বছরের মার্চ মাসে মুলতানে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চলমান টেস্টে তার একটি সিদ্ধান্ত ভীষণ সমালোচিত হয়। নিয়মিত অধিনায়ক সৌরভ ইনজুরিতে থাকায় দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন রাহুল। টেস্টের দ্বিতীয় দিনে শচীন টেন্ডুলকার ১৯৪ রানে অপরাজিত থাকা অবস্থায় তিনি ইনিংস ঘোষণা করেন, যদিও দিনের তখনও ১৬ ওভার বাকি ছিল। ২০০৭ সালের বিশ্বকাপের ফলাফল ও ফর্মহীনতায় অধিনায়কত্ব হারান তিনি। একই সঙ্গে ওয়ানডে দল থেকে বাদও পড়েন। এর পর থেকেই ওয়ানডেতে অনিয়মিত হয়ে পড়েন তিনি যদিও টেস্ট খেলছিলেন নিয়মিতই। ২০০৯ সালে এসে ওয়ানডে দল থেকে বাদ পড়ার পর পুনরায় ওয়ানডে স্কোয়াডে ডাক পেতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ২০১১ সাল পর্যন্ত। ডাক পাবার পরই তিনি ঘোষণা করেন যে এটাই হবে তার শেষ ওয়ানডে সিরিজ। ওই সিরিজে ভারত ভীষণ বিপর্যয়কর অবস্থায় পড়ে। টেস্ট সিরিজ হারে ৪-০ ব্যবধানে। তবে এর মাঝে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ছিলেন দ্রাবিড়, করেছিলেন চোখ ধাঁধানো ৩টি শতরান। পরের অস্ট্রেলিয়া সফরে আর এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেননি। দলের সাথে ব্যর্থ হন নিজেও। শেষ পর্যন্ত ২০১২ সালের ৯ মার্চ ঘোষণা করেন অবসরের। ১৬ বছরের ক্রিকেট ক্যারিয়ার তাকে দিয়েছে দু’হাত ভরেই। ক্রিকেটের বাইবেল খ্যাত উইজডেন ২০০০ সালে তাকে সেরা পাঁচের অন্তর্ভুক্ত করে। আইসিসিরি বর্ষসেরা পুরস্কার প্রবর্তনের প্রথম বছর অর্থাৎ ২০০৪ সালেই তিনি নির্বাচিত হন বর্ষসেরা ক্রিকেটার হিসেবে। দ্রাবিড়ই প্রথম ব্যাটসম্যান যার সকল টেস্ট খেলুড়ে দলের বিরুদ্ধে রয়েছে শতরানের ইনিংস। ২১০টি ক্যাচ নিয়ে তিনি টেস্ট ক্রিকেটের সর্বোচ্চ ক্যাচের তালিকায় শীর্ষে। শচীনের পর টেস্টে ১৩০০০ রান পূর্ণ করা মাত্র দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান তিনি, আর ওয়ানডের ১০০০০ রানের অভিজাত ক্লাবে তার সদস্য পদ ৬ নম্বরে (ভারতীয়দের মাঝে তৃতীয়)। শচীনের সাথে ১৯টিসহ ভিন্ন ভিন্ন ১৮ জন পার্টনারের সাথে রয়েছে ৮০টি শতরানের জুটির বিশ্বরেকর্ড। এর মাঝে ওয়ানডের দু’টি সর্বোচ্চ রানের জুটির অংশীদার তিনি, সৌরভের সাথে ৩১৮ এবং শচীনের সঙ্গে ৩৩১ রানের জুটি।
আরও একটি অনন্য রেকর্ডের অধিকারী তিনি। একই অধিনায়কের অধীনে কমপক্ষে ২০টি টেস্ট জয়ী হয়েছে এমন দলের মোট সংগৃহীত রানে সর্বোচ্চ অবদান তার। সৌরভের অধীনে ভারত যে মোট ২১টি টেস্ট জয়ী হয়েছে সে ম্যাচগুলোর মোট সংগৃহীত রানের শতকরা ২৩ ভাগের উৎস ছিল তার ব্যাট। অর্থাৎ প্রতি ৪ রানে প্রায় ১ রান।  ইউনিসেফের দূত হিসেবেও ছিলেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রিবক তার একটি বিজ্ঞাপনে দ্রাবিড়কে উপস্থাপন করেছিল ‘দ্যা ওয়াল’ হিসেবে যা পরবর্তীতে রাহুলের শ্রেষ্ঠ পরিচিতি হয়ে ওঠে। বিশ্ব ক্রিকেটে প্রায় বিলুপ্ত হতে বসা ধ্রুপদী শিল্পী ব্যাটসম্যানদের অন্যতম তিনি। ক্রিকেট বিশ্ব এমন শিল্পীকে অবশ্যই মিস করবে।

SHARE

Leave a Reply