Home বিজ্ঞান আগামী দিনের টেলিস্কোপ

আগামী দিনের টেলিস্কোপ

সাকিব রায়হান..

দূরের জিনিস দেখার জন্য টেলিস্কোপ ব্যবহার হয়। বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর হাত ধরে যাত্রা শুরু হয়েছিল টেলিস্কোপের। গ্যালিলিও টেলিস্কোপের সাহায্যে বিভিন্ন গ্রহের পরিভ্রমণ পথ পরীক্ষা করে ঘোষণা দিয়েছিলেন সূর্য নয়, পৃথিবীই সূর্যের চারদিকে ঘোরে। বর্তমানে আধুনিক অনেক টেলিস্কোপ তৈরি হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা এখন টেলিস্কোপের নতুন যুগে প্রবেশের দ্বারপ্রান্তে রয়েছেন।
গ্যালিলিওর মৃত্যুর পর আইজ্যাক নিউটন টেলিস্কোপ নিয়ে কাজ শুরু করেন। পৃথিবীতে বর্তমানে প্রতিসরণ ও প্রতিফলন- এ দুই ধরনের টেলিস্কোপ ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতিসরণ টেলিস্কোপের উদ্ভাবক গ্যালিলিও গ্যালিলি এবং প্রতিফলন টেলিস্কোপের আবিষ্কারক আইজ্যাক নিউটন।
প্রতিসরণ টেলিস্কোপ : এ টেলিস্কোপের সামনে একটি অবতল লেন্স এবং অভিনেত্র হিসেবে একটি ছোট অবতল লেন্স থাকে। প্রতিসারক হিসেবে প্রতিসরণ টেলিস্কোপের মূল উপাদান হলো লেন্স। সামনের লেন্সটিকে প্রধান লেন্স বলে। এটি আলো সংগ্রহ করে এবং নলের ভেতর ছবি তৈরি করে। অভিনেত্র বিবর্ধক কাচের কাজ করে। ফলে দর্শক নলের ভেতর তৈরি ছবিটিকে অনেক বড় দেখতে পান।
প্রতিফলন টেলিস্কোপ : নিউটনের তৈরি এই টেলিস্কোপে প্রথমে একটি অবতল দর্পণে আলো আসে। দর্পণটি নলের ভেতর আলোকে কেন্দ্রীভূত করে। একটি সমতল দর্পণ আলোকে নলের অপর পাশে পাঠিয়ে দেয়, যেখানে থাকা অভিনেত্রটি আলোকে বা বস্তুর প্রতিবিম্বকে বিবর্ধিত করে। প্রায় সব বড় টেলিস্কোপই প্রতিফলন টেলিস্কোপ।
মহাকাশ গবেষণায় টেলিস্কোপ : বর্তমানে গবেষকেরা মহাকাশে প্রাণের অস্তিত্ব সন্ধানে নতুন টেলিস্কোপ স্থাপনের লক্ষ্যে কাজ করছেন। ই-ইএলটি নামক টেলিস্কোপটি হবে এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বড় টেলিস্কোপ। ইতোমধ্যে অক্সফোর্ড ও ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা নতুন এ টেলিস্কোপের নকশা প্রণয়ন করেছেন। ইউরোপিয়ান এক্সট্রিমলি লার্জ টেলিস্কোপ জ্যোতির্বিদদের দূরবর্তী গ্যালাক্সির তারা ও গ্রহের ছবি তুলতে বিশেষ সাহায্য করবে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। চিলির আটাক্যামা মরুভূমিতে তিন হাজার ৬০ মিটার উচ্চতায় গবেষকেরা টেলিস্কোপটি স্থাপনের প্রস্তুতি নিয়েছেন। বৃহত্তম এ টেলিস্কোপ স্থাপনে ৩৫ লাখ ব্রিটিশ পাউন্ড ব্যয় হবে। আধুনিক পদ্ধতির ত্রিমাত্রিক ছবি তুলতে সক্ষম টেলিস্কোপটি নির্মাণ হবে দ্রুত।
পানির নিচে টেলিস্কোপ : সুপারনোভা, বিগব্যাংকসহ মহাবিশ্ব বিষয়ে তথ্য উদঘাটনের জন্য বিজ্ঞানীরা ভূমধ্যসাগরের দুই মাইল নিচে প্রায় আধা মাইল দীর্ঘ একটি টেলিস্কোপ বসানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। প্রায় ২১ কোটি পাউন্ড খরচ করে তৈরি করা হবে নতুন ধরনের এ টেলিস্কোপটি। মাল্টি-কিউবিক কিলোমিটার নিউট্রিনো টেলিস্কোপ বা সংক্ষেপে কেএম৩এনইটি নামে এ টেলিস্কোপটি মহাশূন্য থেকে পৃথিবীতে আসা নিউট্রিনো কণা শনাক্ত করতে কাজ করবে। নতুন এ টেলিস্কোপ নিউট্রিনো কণার সন্ধান পাবে এবং সুপারনোভা, বিগব্যাংকসহ মহাবিশ্ব বিষয়ে নতুন তথ্য জানাবে। গবেষকেরা টেলিস্কোপটির নাম দিয়েছেন ‘মাল্টি-কিউবিক কিলোমিটার নিউট্রিনো টেলিস্কোপ’। মহাবিশ্বের জন্য নতুন জানালা উন্মুক্ত করতে যাচ্ছে কেএম৩এনইটি। নিউট্রিনো ব্যবহার করে এ বিশ্বের তথ্য জানার এ পদ্ধতির পুরো বিষয়টিই এক নতুন ধারণা। ভূমধ্যসাগরের নিচে বসানো বিশাল আকারের টেলিস্কোপটি আগামী তিন বছরের মধ্যেই তথ্য দেয়া শুরু করবে। টেলিস্কোপটিতে বিচ বল আকারের ১২ হাজার সেন্সর লাগানো হয়েছে, যা পানির নিচে এক ঘন মাইলের মধ্যে সাজানো থাকবে।
ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ : নাসার গবেষকেরা নাসার একজন প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জেমস ওয়েবের নামানুসারে তৈরি করেছেন জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ। সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারে নির্মিত ২৪ মিটার দীর্ঘ আর ১২ মিটার উচ্চতার এই টেলিস্কোপটি পৃথিবী থেকে দেড় মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে স্থাপনের পরিকল্পনা চলছে। সব ঠিকঠাক থাকলে ‘বিশ্বজগতের জানালা’ হিসেবে পরিচিত হাবল টেলিস্কোপকে ২০১৩ সালের জুন মাসে অবসরে পাঠানো হবে আর সূচনা হবে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের যুগ। এই প্রজেক্টটি পরিচালনা করছে নাসার গডার্ড স্পেস ফাইট সেন্টার। প্রায় ১৭টি দেশের এক হাজারেরও বেশি গবেষক ও প্রকৌশলী কাজ করছেন এই প্রকল্পে। আলোর প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের জন্য এই টেলিস্কোপে রয়েছে ক্যামেরার শাটারের মতো ৬২ হাজার ৪১৫টি ছিদ্র। এর মাধ্যমে খুব সহজেই তড়িৎ চৌম্বকীয় বর্ণালী স্পষ্ট ছবি ধারণ করতে সক্ষম হবে। হাবল টেলিস্কোপ পৃথিবী থেকে প্রায় ছয় শ’ কিলোমিটার দূরে থেকে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। অন্য দিকে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ পৃথিবী থেকে প্রায় দেড় মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে থেকে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করবে।
পৃথিবীর রহস্য উদঘাটনে টেলিস্কোপ : পৃথিবীর রহস্য উদঘাটনে তৈরি হবে সুপার টেলিস্কোপ। বিশ্বের খ্যাতিমান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিনস করপোরেশন (আইবিএম) নেদারল্যান্ডসের ইনস্টিটিউট ফর রেডিও অ্যাস্ট্রোনমির (অ্যাসট্রন) সাথে যৌথভাবে এক রেডিও টেলিস্কোপ তৈরির পরিকল্পনা করছে। এ টেলিস্কোপ সুপার কম্পিউটারের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। এ টেলিস্কোপ ও সুপার কম্পিউটারের মাধ্যমে মহাশূন্যের অজানা তথ্য ও পৃথিবী সৃষ্টির রহস্য উদঘাটন সম্ভব হবে। নতুন এ সুপার কম্পিউটার খুব স্বল্প পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যয়ে ব্যবহার করা যাবে। এর মাধ্যমে দুর্বল রেডিও সিগন্যাল বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। প্রায় এক হাজার ৩০০ কোটি বছর আগে মহাশূন্য তৈরির সময় যে বিগব্যাং হয়েছিল, তা থেকে বিচ্ছুরিত দুর্বল আলোক রশ্মিগুলো এ সুপার কম্পিউটারের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হবে।
নতুন এ রেডিও টেলিস্কোপের নাম স্কয়ার কিলোমিটার অ্যারে টেলিস্কোপ। নতুন এ সুপার টেলিস্কোপ তৈরির কাজ ২০১৭ সালে শুরু হবে। এ টেলিস্কোপটি অস্ট্রেলিয়া অথবা দক্ষিণ আফ্রিকায় স্থাপন করা হতে পারে। ২০২৪ সাল নাগাদ এটি তৈরির কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছে এর নির্মাতা কর্তৃপক্ষ। সৌরজগতের চারপাশের তথ্য, অন্ধকারাচ্ছন্ন বিষয় এমনকি বিশ্ব তৈরির রহস্যও এর মাধ্যমে জানা যাবে। নতুন এ টেলিস্কোপে সংযুক্ত সুপার কম্পিউটার বর্তমানের বেশ কয়েক লাখ সুপার কম্পিউটারের সমপরিমাণ শক্তিশালী হবে। প্রতিদিন এ টেলিস্কোপে সংযুক্ত সুপার কম্পিউটার দৈনিক ১ এঙাবাইট (১০ লাখ টেরাবাইট) তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারবে। এ প্রকল্পের বিষয়ে আইবিএমের প্রধান গবেষক রোনাল্ড লুজটেন জানিয়েছেন, ‘অতীতের বিষয় জানতে আমরা ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি উন্নতি করার চেষ্টা করছি। এ প্রকল্পে বিদ্যুৎ ব্যয়ের বিষয়টিও আমরা বিবেচনায় রাখছি। কারণ অদূর ভবিষ্যতে বিদ্যুৎসাশ্রয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।’এ টেলিস্কোপ তৈরিতে ১৫০ কোটি ইউরো ব্যয় হতে পারে বলে জানিয়েছে আইবিএম।

SHARE

Leave a Reply