Home বিশেষ রচনা মাছশিকারি মাছরাঙা

মাছশিকারি মাছরাঙা

মাসুম কবীর..
মাছরাঙা পাখিকে দেখলেই মনে হবে অত্যন্ত শান্ত ও ধৈর্যশীল। জলাশয়ের কাছাকাছি কোনো ডালে বা কোনো তারে বসে থাকে, নড়াচড়াও কম করে। মাছ কোন্ এঙ্গেলে আছে সেটা তার সূক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে দেখে নেয়। আর যখনই মাছের অবস্থান টের পায় সাথে সাথে তীর গতিতে মাছের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মাছ কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাছরাঙা তাকে ধরে ফেলে। কিছুক্ষণ পর দেখা যায় একটা ছোট্ট মাছ চঞ্চুর ফাঁকে ঝটপট করছে।
আগের দিনে বিল-বাঁওড়ের ধারে কিংবা পুকুর পাড়ে মাছরাঙা পাখির মাছ ধরার এই আকর্ষণীয় দৃশ্য নজরে পড়তো। শিকারের পর গাছের ডালে বসে মাছরাঙা শিকার করা মাছ খেত। এখন মাছরাঙার সংখ্যা কমে গেছে। সচরাচর মাছরাঙার আর মাছ শিকার চোখে পড়ে না।
এরা Coraciiformes বর্গের Alcedinidae, Halcyonidae ও Cerylidae গোত্রভুক্ত খাটো পুচ্ছ, বড় মাথা, সুচালো ঠোঁটের আটোসাটো গড়নের একটি পাখি। শিকার ধরার জন্য পানির দিকে মাথা নিচু করে ছোঁ মারে, প্রায়শ পানির ভিতরে ঢুকে যায়, শিকারকে গাছের ডালে নিয়ে ফিরে আসে এরপর কয়েকবার আছাড় মারে তারপর শূন্যে ছুড়ে দিয়ে মাথার দিক থেকে গিলে ফেলে।
পৃথিবীব্যাপী ৯৪ প্রজাতির মাছরাঙা রয়েছে। আর বাংলাদেশে আছে ১২ প্রজাতির মাছরাঙা। তবে আমাদের দেশে সচরাচর যে মাছরাঙা বেশি দেখা যায় তার নাম BlythÕs Kingfisher (Alcedo hercules); এরা দৃশ্যত আকারে বেশ বড়, মিশ্র হরিৎ বনাঞ্চলে দেখা যায়। আরও কিছু মাছরাঙার সাথে তোমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।
ছোট নীল মাছরাঙা
নীল মাছরাঙা লম্বায় প্রায় ১৮ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। স্ত্রী-পুরুষ দু’জনে দেখতে একই রকম। গায়ের উপরের পালক উজ্জ্বল নীল, শরীরের কিনারে ও ডানায় সবুজের ছোঁয়া আছে। মাথায় কালচে নীল রঙের টানাটানা দাগ বিশেষভাবে নজরে পড়ে। পায়ের রঙ লাল।
এরা সোজাসুজি এবং বেশ দ্রুত উড়তে পারে। নিজের এলাকার রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধানে খুব সতর্ক।
মার্চ থেকে জুন মাস হচ্ছে এদের প্রজননকাল। কোনো জলাশয়ের পাশের খাড়া ঢালে গর্ত করে বাসা বানায়। একসাথে ৫-৭টি ডিম পাড়ে। বাংলাদেশের সবখানেই এই মাছরাঙা দেখা যায়। এদেরকে ইংরেজিতে বলে Common Blue Kingfisher আর বৈজ্ঞানিক নাম Alcedo atthis ।
সাদা বুক মাছরাঙা
সাদাবুক মাছরাঙা লম্বায় ২৮ সেন্টিমিটার হয়। এদের মাথা, ঘাড় ও পেট গাঢ় বাদামী রঙের। চিবুক, গলা ও বুকের উপর সবুজের আভা আছে। ডানার পাশে একটা কালচে পট্টি চোখ জুড়িয়ে দেয়। ওড়ার পালক কালো, গোড়ার দিকে উপরিভাগ সাদা ও ছোট। লম্বা ভারী সূচালো চঞ্চু, রং গাঢ় নিসপ্রভ লাল। পায়ের রঙও লাল। আর নখর ধূসর।
সাদা বুক মাছরাঙার খাদ্য তালিকায় আছে ঘাসফড়িং, ঝিঁঝিঁ পোকা, গঙ্গা ফড়িং, পিঁপড়ে, উই ইত্যাদি। এছাড়া কীটপতঙ্গ, কাঁকড়া-বিছে, তেঁতুলে বিছে, কেন্নো, কাঁকড়া, ব্যাঙ, টিকটিকি, গিরগিটি, ইঁদুর এবং ছোটখাটো অসুস্থ ও দুর্বল এবং ছানা পাখি। মাছ প্রধান খাদ্য তালিকায় পড়ে না। তবুও এর নাম মাছরাঙা।
বাংলাদেশ ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইন্দোচীন, ফরমোজা ও ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা ও আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত এই মাছরাঙ্গাকে দেখা যায়। বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশে চারটি উপজাতি আছে। প্রত্যেকটা মাছরাঙা পাখির নিজস্ব এলাকা আছে। এই জায়গাটিতে অন্য কোনো মাছরাঙার প্রবেশাধিকার নেই। তাই অন্য কোনো প্রজাতি কাছে এলেই তাড়িয়ে দেয়।
জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাসে এরা ডিম পাড়ে। নদী বা খালের খাড়া পাড়ে গর্ত করে বাস করে। চার থেকে সাতটি ডিম একসাথে পাড়ে। বাচ্চা পালনসহ সংসারের সব কাজ স্ত্রী-পুরুষ দু’জনে সমানভাবে করে। এদেরকে ইংরেজিতে বলে White breasted kingfisher, White-throated Kingfisher বা Smyrna Kingfisher  আর বৈজ্ঞানিক নাম Haleyn smyrensis ।
ছিট মাছরাঙা
এর অন্য নাম পারকা মাছরাঙা। ইংরেজি নাম Pied Kingfisher আর বেজ্ঞানিক নাম Ceryle rudis । সাদা আর কালো পালকে মেশানো থাকে শরীর যার আকার প্রায় ১৭ সেন্টিমিটার।
মেঘ হও মাছরাঙা
কী চমৎকার নাম, তাই না? হ্যাঁ বন্ধুরা, এরা প্রায় ৩৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। গাছে চুপটি করে বসে থাকে আর শিকার পেলেই তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই মাছরাঙার ইংরেজি নাম Stork Billed Kingfisher এবং বৈজ্ঞানিক নাম Halcyon Capensis ।
লাল মাছরাঙা
এরা আকারে ২৫ সেন্টিমিটার এর মতো হয়। পা-গুলো তুলনামূলক বড় ও বেশ শক্তিশালী। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, চীন ও ভারতে এদের দেখা মেলে। এই পাখিটির ইংরেজি নাম Ruddy Kingfisher এবং বৈজ্ঞানিক নাম Halcyon coromanda ।
সবুজ মাছরাঙা
এটিও একটি দৃষ্টিনন্দন পাখি। এরা Halcyonidae পরিবারের গেছো মাছরাঙা। পাখিটিকে ইংরেজিতে Collared Kingfisher, White-collared Kingfisher বা Mangrove Kingfisher নামে ডাকা হয়। বৈজ্ঞানিক নাম Todiramphus chloris ।
বাদামী মাছরাঙা
এই প্রকার মাছরাঙার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিশাল লাল ঠোঁট। মাথা, গলা ও পেটের দিক বাদামী হলুদ রঙের। পুচ্ছ ঘন বাদামী, পিঠ ও পাছা উজ্জ্বল ফ্যাকাশে নীল। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে এদের প্রধান বাস। সেখানে এদেরকে সর্বাধিক দেখা যায়। বাদামী ডানা মাছরাঙার ইংরেজি নাম Brown-winged Kingfisher আর বৈজ্ঞানিক নাম Pelargopsis amauroptera ।
কালো মাছরাঙা
মাছরাঙা যে শুধু নানান মিশ্র বর্ণেরই হয়, তেমনটি ভাবার কারণ নেই। এই কালো মাছরাঙার নাম শুনেই হয়তো সেটা এতক্ষণে বুঝে গেছো। হ্যাঁ, কালো মাছরাঙাও আছে। এদেরকে প্রধানত সেন্টমার্টিন ও উপকূলীয় অঞ্চলে দেখা যায়। কালো মাছরাঙার ইংরেজি নাম Black-capped Kingfisher আর বৈজ্ঞানিক নাম Halcyon pileata ।
বুনো মাছরাঙা
এটিও একটি উল্লেখযোগ্য মাছরাঙা। এর উপরের পালক ঘন নীল বা হালকা বেগুনি আর নিচের দিকের পালক কমলা হলুদ। ঠোঁটের রং প্রবাল লাল। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এদের পায়ে থাকে তিনটি আঙুল। এর ইংরেজি নাম Oriental Dwarf Kingfisher । বৈজ্ঞানিক নাম Ceyx erithacus ।

পাখি আমাদের পরিবেশের একটি অংশ। এরা বিভিন্নভাবে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে আমাদেরকে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে সহায়তা করে। এদের চাল-চলন, স্বভাব-চরিত্র, রূপ-রং প্রভৃতি আমাদেরকে মুগ্ধ করে। আর মাছরাঙা পাখির কথা এতক্ষণ যা বললাম তা থেকে তো এটা বোঝা যাচ্ছে যে, এদেরকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদেরই কর্তব্য। এদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে আমাদের নিজেদেরই স্বার্থে। অথচ দেখ, এই সুন্দর পাখিটি এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। এজন্য কোনো পাখিই যাতে করে আমাদের কারণে কষ্ট না পায় এবং হারিয়ে না যায় সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখা সবার দায়িত্ব।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply