Home গল্প কষ্টের কালবৈশাখী

কষ্টের কালবৈশাখী

মুন্না আহমদ..

দমকা হাওয়া বইছে। কালো মেঘে ঢেকে আছে আকাশ। যেন ঘন বিষাদে জমে আছে গগন। ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। সাথে আছে বুক কাঁপানো মেঘের গর্জন। গাছগুলো বাতাসের সাথে তাল মেলাতে পারছে না। জানালার সামনে রাখা টবে নয়নতারা গাছটিও দোল খাচ্ছে। প্রকৃতির এ নির্মম খেলা বিষদ মনে উপভোগ করছে নিশাদ। প্রকৃতির অবস্থা দেখে সে বুঝতে পারছে নির্মম কালবৈশাখী আসছে।
তবে এ কালবৈশাখী ওর কাছে তেমন ভয়ের কারণ হচ্ছে না, যেন আরো ভালো লাগছে। ভয় না পাবার একটা কারণও আছে। বিষাদময় ঘটনা ঘটেছে ওর জীবনে এই তো দুই-তিন দিন আগে। অন্তরে এখনও দুঃখ জমাট বেঁধে আছে। দুঃসহ প্রকৃতির অবস্থা অর্থাৎ কালো মেঘে ঢাকা আকাশের বুকে বিদ্যুৎ চমকানো যেন তার সাথী হয়েছে, এ জন্যই তার ভাল লাগছে। দুই বছরের ছোট ভাই শান্ত। সারাদিন খেলা একমাত্র ছোট ভাইটির পাশে বসে। নানা অঙ্গভঙ্গি, কথার ঢং বড়ই আনন্দ দেয় শান্তকে। আর বিভিন্ন খেলনা তো আছেই। শান্তর একটা হাসি মন ভরিয়ে দেয় নিশাদের। বিভিন্ন গল্পের বই তাকে পড়ে শোনায় নিশাদ। কি-ইবা বোঝে শান্ত। কিন্তু তার হাসি মুখে ভূতের গল্পে, ভূতের অঙ্গভঙ্গি দেখে মায়াবী চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসে শান্ত। এতেই নিশাদ খুশি। টিফিন টাইমে নিশাদ বিদ্যালয়ের কোণে বিশাল ঝাকড়া রেইনট্রি গাছটার নিচে বসে টিফিন খাচ্ছে। কিন্তু খাওয়া যে হচ্ছে না। ভাইটির কথা বারবার মনে পড়ছে। মা যে কী দু’জনের মাঝে সবসময় দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়।’ অভিমান হয় নিশাদের। এমন একটা ভাই আমার কিভাবে রেখে আসি? হাজার না, একটা মাত্র ভাই আমার। তাও একমাত্র খেলার সাথী। গভীর মনে চিন্তা করে নিশাদ।
একমাত্র বলার কারণও আছে। ওর মতে, বন্ধু সেই যে মুখে বন্ধু উচ্চারণ করে না, ভাইসুলভ আচরণ করে, আপনজনের মত। মনের কথা বুঝবে। অন্ধকার থেকে আলোর পথে ডাকবে, ভালো কাজের উপদেশ দেবে। এই তো কয়েকদিন আগেও একটা কবিতা পড়ল প্রকৃতি-বন্ধু সম্পর্কে। বন্ধু হলে এরকমই হবে।
এটাই ওর বৈশিষ্ট্য। খাওয়ার অর্ধেক রুচি হল, বাকি দেয়ালের ওপাশে ফেলে দিল, যাতে মায়ের বকুনি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
বিদ্যালয় ছুটি হলো ৩টায়। স্কুল থেকে বেরিয়ে নিশাদ দেখল রাস্তার মোড়ে একজন বেলুন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নানা রঙের বেলুন- লাল, নীল, হলুদ ইত্যাদি। তার সহপাঠীরা বেলুন কিনতে বেলুনওয়ালার কাছে ভিড় জমাল। নিশাদ ভাবল, শান্তর জন্য একটা বেলুন নিলে কেমন হয়? ও খুব খুশি হবে। কিন্তু কী রঙের নেব।
নিশাদ বেলুনওয়ালার দিকে মনোনিবেশ করল। দেখল তার সহপাঠীরা ততক্ষণে বেলুন নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটা দিয়েছে। বেলুনওয়ালার নিকট দু’টি বেলুন অবশিষ্ট আছে। সেও চলতে শুরু করেছে। ‘ও বেলুনওয়ালা ও বেলুনওয়ালা।’ নিশাদ দৌড়ে চলল তার দিকে। আমাকে একটা বেলুন দেবেন না? কোনটা নেবে? বেলুন ওয়ালার নিকট লাল আর কালো এ দু’টি বেলুন আছে। ‘ওই যে লালটা।’
‘নাও। এর দাম দশ টাকা।’ বেলুনওয়ালা বলল।
এ কথা শুনে মুহূর্তে নিশাদের মুখ বিষণ্ন হয়ে গেল। তার কাছে তো মাত্র আট টাকা আছে। বেলুনওয়ালা বিষয়টি অনুধাবন করল। কারণ, এটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার তার কাছে। সে হাসি মুখে বলল, ‘কত আছে?’
আট টাকা নিশাদ উত্তর দিল।
‘দাও। আর এই বেলুনটি নিয়ে নাও। খুশি এখন?’ বেলুনওয়ালা টাকা নিয়ে বেলুন দু’টি নিশাদের হাতে দিল। নিশাদের আনন্দ দেখে কে? আট টাকায় দু’টি বেলুন।
বেলুনগুলো নিয়ে নিশাদ উচ্ছ্বাসে লাফিয়ে লাফিয়ে ঘরে ঢুকল। ‘মা! মা! শান্ত কোথায়? আমি ওর জন্য বেলুন এনেছি।’
একান্ত মনেই বলে যাচ্ছিল নিশাদ। ‘জানো মা! বেলুনওয়ালা আমাকে আট টাকায়…।’ এই বলেই নিশাদ থেমে গেল। ততক্ষণে সে ড্রয়িং রুমে এসে গেছে। চেয়ে দেখল দাদি চেয়ারে বসে কাঁদছেন। নিশাদ কাছে গিয়ে বলল, ‘দাদু, কী হয়েছে? কাঁদছ কেন? মা কোথায়? শান্ত কোথায়?’
দাদী তাকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ‘শান্তর অবস্থা খুব খারাপ। গতকাল যে ঝড় হয়, প্রচণ্ড বাতাসে হয়ত ঠাণ্ডা লেগে ওর নিউমোনিয়া হয়ে গেছে। তুই স্কুলে যাওয়ার পর ওর অবস্থা গুরুতর হয়। তোর বাবা ওকে নিয়ে হাসপাতালে গেছে।’ দাদী একটা একটা শব্দ বলছেন আর ভাঙা কাচের টুকরো যেন একটা একটা ঘা দিচ্ছে।
নিশাদের চোখ দিয়ে অঝর ধারায় অশ্রু ঝরতে লাগল। হাজার চেষ্টা করেও কথা বের করতে পারল না। তাই, দাদীকে সান্ত্বনা দেয়া হলো না।
সূর্য অস্ত গেল। কালো আঁধার ঢেকে ফেলল আকাশ। নিশাদ জানালার পাশে দাদীর কোলে মাথা রেখে পায়ের কাছে জানালার দিকে মাথা কাত করে বসে আছে। চোখ এখনো শুকায়নি। মা-বাবার অপেক্ষায় আছে। ঘণ্টা বাজিয়ে ঘড়ি জানিয়ে দিল ৯টা বেজে গেছে। নিশাদ শরীরটা দুর্বল অনুভব করল। কিন্তু প্রকাশ করল না। কারণ, বিদ্যালয় থেকে ফিরে ও এখনো কিছু খায়নি।
হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠল। নিশাদ বাঁধনহারা হরিণের মতো সর্বশক্তি প্রয়োগ করে দরজার দিকে দৌড় দিল। তখনও কি সে বুঝতে পেরেছিল তার জন্য কী কালবৈশাখী অপেক্ষা করছে? দরজা খুলে নিশাদ বাবাকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। ‘আব্বু, শান্ত কোথায়?’ নরম স্বরে নিশাদ জিজ্ঞেস করল।
কিছু না বলে আব্বা ঘরে ঢুকে গেলেন। হঠাৎ মা নিশাদকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন উচ্চঃস্বরে।
‘মা, ওমা, কী হয়েছে? শান্ত কোথায়? কাঁদো কণ্ঠে নিশাদের প্রশ্ন।
‘বাবা, আমাদের শান্ত আর নেই। ও আমাদের ছেড়ে চলে গেছে চিরদিনের জন্য।’ চাপা বেদনা উপচে পড়া কণ্ঠে মা উত্তর দিলেন।
কথা শুনে নিশাদের ওপর যেন ঝড় বইতে লাগল। কাঠের মত স্থির হয়ে রইল ও। চোখ দিয়ে বর্ষার ধারার মত পানি ঝরছে।
‘মা, ওমা, তুমি কী বলছ? তুমি মিথ্যা বলছ। শান্তকে এনে দাও মা। আমি ওর জন্য বেলুন এনেছি। ওর সাথে খেলব বলে। মা, ওমা, শান্তকে এনে দাও। আমার ভাইকে এনে দাও।’ নিশাদ অশান্তভাবে মাকে প্রশ্ন করছে। ওর কচি মনটা যেন এক মহা অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছে। তাদের কান্নার আওয়াজ শুনে বাবা ও দাদী ছুটে এলেন। সান্ত্বনা দিতে লাগলেন দু’জনকে। নিশাদ মাকে ধরে জোরে জোরে কাঁদছে।
মা হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেলেন। একি! তার চেয়ে তার এ ছেলেটি বেশি অন্ধকার দেখছে। তিনিও নিশাদকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন।
‘মা, তুমি আমার ভাইকে এনে দাও। আমি ওর সাথে খেলব। মা।’ শোকের ছায়াতলে নিমজ্জিত এ শিশুটির ফুলতুল্য মন কেমন করছে আমাদের কাছে তা সহজেই অনুমেয়।
আজ নিশাদ দাঁড়িয়ে আছে কালবৈশাখীর তাণ্ডব উপভোগ করতে। ঝড়ের এ ভয়ঙ্কর রূপ দেখেও চতুর্থ শ্রেণীর এক ছাত্রের জন্য তা ভয়ের কারণ হচ্ছে না। বাতাসের ঝাপটায় জানালাগুলো ঠাস ঠাস করে লাগছে। হঠাৎ বৃষ্টির ঝাপটার নিশাদের ভাবনায় ছেদ পড়ল। দেখল বাইরে অঝর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে ও গর্জন হচ্ছে। ও পেছনে তাকাল, দেখল বেলুন দু’টি খাটের এক কোণের স্ট্যান্ডের সাথে বাঁধা। ওর চোখ পড়ল লাল বেলুনটির দিকে। দেখল শান্ত সেই মায়াবী চোখে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসছে। কিন্তু কালোটির দিকে যখন চোখ পড়ল তখন তার কষ্টের কথা মনে পড়ল, সেই কষ্টের কালবৈশাখীর কথা!

SHARE

Leave a Reply