Home ফিচার নাম তার জেলিফিশ

নাম তার জেলিফিশ

মাহমুদ হাসান..

সাগরের চিরঅন্ধকারাচ্ছন্ন গভীরে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় প্রাণী বাস করে। সাগরতল থেকে ওঠা তেল খেয়ে সেখানে বিচরণ করছে আলোকোজ্জ্বল জেলিফিশ, টিউবওয়র্মর মতো প্রাণীরা যারা এত দিন ছিল মানুষের অগোচরে। সাগরের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার (তিন মাইল) গভীরে ১৭৬৫০টি প্রাণীপ্রজাতি শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা যার মধ্যে আরও রয়েছে চিংড়ি, কোরাল, স্টারফিশ, কাঁকড়া। সূর্যের আলো সাগরের এতটা গভীরে পৌঁছাতে পারে না। এই আলো সাগরের প্রায় ২০০ মিটার পর্যন্ত গভীরে যেতে পারে। এর নিচে পানির তীব্র চাপপূর্ণ এলাকা শুধুই মরুভূমিময় মনে করা হয়েছিল এতদিন। প্রাণীরা সেখানে বেঁচে আছে ব্যাকটেরিয়ার ওপর নির্ভর করে; ব্যাকটেরিয়া ভেঙে মিথেন অথবা তেলে পরিণত হয়, এছাড়াও প্রাণীরা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আসা খাবার, যেমন তিমির মৃতদেহ খেয়েও বেঁচে থাকে।
জেলিফিশ, নামটা শুনলেই কেমন পাউরুটিতে মাখানোর জেলি কি মাশরুমের মতো কোনো মাছের কথা মনে হয়, তাই না? তোমাদের অনেকে হয়তো ন্যাশনাল জিওগ্রাফি নয়তো ডিসকভারি চ্যানেলে ওদেরকে দেখেও থাকতে পারো। আর যারা ‘ফাইন্ডিং নিমো’ দেখেছো, তারা তো ওদেরকে চিনবেই। মজার ব্যাপার হচ্ছে, নাম জেলিফিশ হলেও ওরা কিন্তু আসলে মাছই নয়!
আমাদের পৃথিবীতে যত প্রাণী আছে, তাদেরকে মোটামুটি ৯টি পর্বে ভাগ করা হয়েছে। এদের মধ্যে একটি পর্ব হলো ‘নিডারিয়া’। এই নিডারিয়া পর্বের হাইড্রোজোয়া শ্রেণীর প্রাণী হলো জেলিফিশ। আর মাছ হলো ‘পিসেস’ শ্রেণীর প্রাণী। মাছের কিন্তু আমাদের মতো মেরুদণ্ডও আছে। কিন্তু জেলিফিশের আবার এই মেরুদণ্ডের বালাই-ই নেই। তাই নামের মধ্যে ‘ফিশ’ থাকলেও আসলে ওরা মাছ নয়। ভাবছো, তবু কেন আমরা ওদেরকে মাছ বলি? হ্যাঁ, এই একই প্রশ্ন সম্ভবত ওদেরও। তাই তো আমাদের সাথে রাগ করে ডাঙা থেকে বহুদূরে সাগর-মহাসাগরে থাকে ওরা!
জেলিফিশ পৃথিবীতে বাস করছে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন বছর (১ মিলিয়ন বছর= ১০,০০,০০০ বছর) ধরে। পৃথিবীতে মোট ২,০০০ প্রজাতির জেলিফিশ আছে। আজ তোমাদেরকে সবচেয়ে সুন্দর জেলিফিশগুলোর গল্প বলব।
বক্স জেলিফিশ
জেলিফিশের সব প্রজাতির মধ্যে এরাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। তাই এদের বলা হয় ‘সাগর বোলতা’। দেখতে এরা অনেকটা জেলি বা ঘনকের মতো। তাছাড়া এরা খুব দ্রুত সাঁতরাতেও পারে। আর গায়ের রঙ স্বচ্ছ বলে এদেরকে সহজে দেখাও যায় না। এদের আবার পেটে অনেক চোখ থাকে। আর সেই চোখগুলোর জন্যই ওদেরকে দেখতে এতো ভয়ঙ্কর লাগে। এরা দেখতে খুব সুন্দরও বটে। এদের নেমাটোসিস, যা দিয়ে এরা শিকার করে, সেটা এতই ঘন হয় যে এদের বিষ দিয়ে খুব সহজেই ৬০ জন মানুষকে মেরে ফেলা যেতে পারে। আর এই বিষের কার্যকারিতাও এত দ্রুত যে, এর আক্রমণের ৩ মিনিটের মাথায় মৃত্যু হয়ে যেতে পারে।
অ্যাকুয়েরা ভিক্টোরিয়া
এদের আরো একটা নাম আছে- স্বচ্ছ জেলিফিশ। কারণ এদের গায়ের কোনো রঙ-ই নেই! দেখতেও একদম স্বচ্ছ। জেলিফিশের শরীরের ভেতর থেকে অনেক সুতার মতো এক ধরনের অঙ্গ বের হয়, এগুলোকে টেন্টাকেলস বলে। এদের টেন্টাকেলসে ‘নেমাটোসিস’ বলে একটা জিনিস থাকে, যার সাহায্যে এরা শিকার করে। এদের শরীরে আবার জিএফপি প্রোটিনও থাকে, যার কারণে এরা দেখতে হয় নীলাভ সবুজ রঙের। এই প্রোটিন ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা এমন খরগোশ বানিয়েছেন, যা অন্ধকারেও জ্বলতে থাকে! তাছাড়া এই জিএফপি থেকে আলঝেইমার রোগের ওষুধ বানানোরও কাজ চলছে। কাজেই এই জেলিফিশ শুধু সুন্দরই নয়, অনেক কাজের কাজিও বটে!
ফ্লাওয়ার হ্যাট জেলিফিশ
নাম শুনেই বোঝা যায় এদের বিশেষত্ব কী। হ্যাঁ, এদের মাথায় গোলাপি রঙের একটা হ্যাটের মতো থাকে। আর এই হ্যাটটার জন্যই এদেরকে অপরূপ সুন্দর লাগে। তবে সুন্দর হ্যাট পরা দেখে এদেরকে আবার আদর করতে যাওয়া ঠিক হবে না। এদের বিষ খুবই যন্ত্রণাদায়ক। তবে এরা মানুষের জন্য তেমন ক্ষতিকর নয়। কারণ, এরা সাধারণত ছোট মাছ খেয়ে বেঁচে থাকে। আর থাকে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও জাপানের সাগরে।
বাথিকোরাস বউলোনি
জেলিফিশের এই প্রজাতিটি মানুষের চোখে পড়েছে খুব বেশিদিন হয়নি, মাত্র বছর দশেক আগে। আর আবিষ্কারের পরপরই এদের নিয়ে মহা হইচই পড়ে গিয়েছিলো। এরা প্রধানত আর্কটিকের আশপাশের গভীর সমুদ্রে বাস করে। এদের শরীরে মোট টেন্টাকেলস আছে আটটি। আর অদ্ভুত আকৃতির এই জেলিফিশগুলোর মাথায় প্যাঁচও কম নেই। সাঁতার কাটার সময় এরা কী করে জানো? যে টেন্টাকেলসগুলো বিষাক্ত, সেগুলো সামনের দিকে রেখে তবেই সাঁতার কাটে।
কোস্টারিকান জেলিফিশ
জেলিফিশের এই প্রজাতিটি কোস্টারিকার উপকূলে থাকে। এরা দেখতে অনেকটা বহুভুজ আকৃতির। ভাবছো, ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ, পঞ্চভুজ- এদের নাম তো শুনেছি; কিন্তু এই বহুভুজটা আবার কী জিনিস? ত্রিভুজের থাকে তিনটা বাহু বা রেখা, চতুর্ভুজের থাকে চারটা, পঞ্চভুজের থাকে পাঁচটা। আর বহুভুজের থাকে চারটার বেশি। মানে পঞ্চভুজও এক ধরনের বহুভুজ। এই জেলিফিশগুলোও হয় এমন অদ্ভুত আকারের। আর অন্য জেলিফিশদের তুলনায় এরা কিন্তু একটু আলাদা। কারণ লার্ভা মানে বাচ্চা জেলিফিশ থেকে এরা একলাফে পুর্ণবয়স্ক জেলিফিশ হয়ে যায়। এদের জীবনে কৈশোর, যৌবন বলে কিছুই নেই। এরা দেখতে গাঢ় গোলাপি রঙের হয়। আর থাকে সমুদ্রের প্রায় ৮,০০০ মিটার গভীরে।
ফুট লং টেন্টাকেলস জেলিফিশ
এরা বেশ লম্বা। তা প্রায় ১ ফুট পর্যন্ত হয়, মানে পায়ের সমান হয় আরকি। আর থাকে কোথায় জানো? পশ্চিম আটলান্টিকের বরফ শীতল পানিতে। সেখানকার তাপমাত্রা কত জানো? মাইনাস ৬০ ডিগ্রিরও অনেক নিচে। কতো ঠাণ্ডা পানি রে বাবা! এদের দেহ নরম ও টিউব আকারের এবং দেখতে বাদামি, লালচে বাদামি থেকে কমলা রঙের হয়ে থাকে। দেখতে অনেক সুন্দর হলেও চাইলেই এদের পুষতে পারবে না। কারণ এদের থাকার জন্য অনেক বড় অ্যাকুরিয়াম আর প্রচুর আলো প্রয়োজন। আর আত্মরক্ষার জন্য এদের টেন্টাকেলসে থাকে বিষকোষ। যখনই বিপদে পড়ে, এই বিষকোষ-ওয়ালা টেন্টাকেলস দিয়ে ওরা শত্রুদের গায়ে পেঁচিয়ে ধরে।
মুন জেলিফিশ
জেলিফিশের সমস্ত প্রজাতির মধ্যে এদেরকেই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। অনেকে আবার আদর করে এদেরকে সসার জেলিও বলে। আর এরা দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি চলনও ছন্দময়। ভাবছো, এদের নাম মুন মানে চাঁদ হলো কিভাবে? ওরা দেখতে একদম পূর্ণিমার পূর্ণ চাঁদের মতোই। তাই এদের এমন নাম। এরা মেডুস, প্লাঙ্কটন আর মলাস খেয়ে বেঁচে থাকে। আর একটা অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে এদের মায়েরা বাচ্চা দেয়ার কয়েক মাস পরেই মারা যায়।
ফিয়ালেলা জ্যাপাই
জেলিফিশের নাম দেয়ার যে কত নিয়ম আছে! যেমন এই ফিয়ালেলা জ্যাপাই জেলিফিশের নামের কারণটাই শোনো। যে বিজ্ঞানী এই জেলিফিশের নামকরণ করেছিলেন, তার প্রিয় শিল্পী ছিলেন ফ্রাঙ্ক জ্যাপা। তার নামের অনুকরণেই সেই বিজ্ঞানী এই জেলিফিশটির নামই দিয়ে দিলেন জ্যাপাই! এই গল্প শুনে ফ্রাঙ্ক জ্যাপা খুশির চোটে তো সরাসরি সেই বিজ্ঞানীর কাছেই চলে গিয়েছিলেন। আর এই প্রজাতির জেলিফিশের সবচেয়ে মজা কি জানো? এদের টেন্টাকেলসগুলো সারা জীবন ধরে আকারে তো বাড়েই, সংখ্যাতেও বাড়তে থাকে।
রোপিলেমা এস্কুলেন্টাম
এই জেলিফিশগুলোকে আবার ‘চায়না টাইপ’ জেলিফিশও বলা হয়। কারণ চীনের উপকূলে এদের প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। এরা দেখতে কিছুটা লালচে রঙের। আর মাথার উপরে আছে এক ছাতার মতো অঙ্গ, যার ব্যাস ৩০০-৬০০ মিলিমিটার (১০ মিলিমিটার = ১ সেন্টিমিটার)। এরাই জেলিফিশের একমাত্র প্রজাতি যাদের খাওয়া যায়। তাই জাপানে রীতিমতো এদের চাষ করা হয়।
টিউরিটপসিস নিউট্রিকুলা
কখনো কি ভেবে দেখেছো মানুষের জীবনচক্র যদি এমন হতো, বুড়ো হয়ে জন্ম নিয়ে ধীরে ধীরে বয়স কমে আসে এবং শিশু হয়ে মৃত্যুবরণ করছে? কেমন হতো তাহলে? হ্যাঁ, মানুষের মধ্যে এটি দেখা না গেলেও প্রাণিজগতে কিন্তু বিষয়টি একেবারেই দুর্লভ নয়, অন্তত একটি প্রাণীর জীবনধারা ঠিক এভাবেই চলে আসছে। সফলভাবেই এরা মৃত্যুকে এড়িয়ে চলছে এবং এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একমাত্র প্রাণী যে তার জীবনচক্রের মাধ্যমে মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়ে চলেছে। প্রাণীটির নাম টিউরিটপসিস নিউট্রিকুলা। নামটা শুনতে খটমট লাগলে আরেকটু সহজ করে দিচ্ছি, এটি এক প্রজাতির জেলিফিশ।
কিন্তু কিভাবে মৃত্যু এড়িয়ে চলে টিউরিটপসিস নিউট্রিকুলা? জেলিফিশের জীবনচক্রে দু’টি ধারা রয়েছে- পলিপয়েড বা অপরিণত এবং মেডুসা বা পরিণত। অন্য সব জেলিফিশ যেখানে পলিপয়েড থেকে মেডুসার দিকে যায়, মাত্র ৪-৫ মিলিমিটারের টিউরিটপসিস নিউট্রিকুলা ঠিক উল্টো দিক থেকে এর জীবনচক্র শুরু করে। প্রতিটি প্রাণীর মতোই এদের দেহও কোষ দিয়ে তৈরি। অন্য প্রাণীদের দেহকোষ পরিবর্তিত হতে যেখানে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর লেগে যায়, সেখানে জেলিফিশের ক্ষেত্রে এটি মাত্র কয়েক ঘণ্টার কাজ। এর শরীরের অপরিণত বা অকার্যকর কোষগুলো পরিণত বা গুরুত্বপূর্ণ দেহকোষে রূপান্তরিত হওয়ার পাশাপাশি উল্টো প্রক্রিয়াটাও ঘটতে থাকে। ফলে মেডুসা থেকে পলিপয়েড হয়ে আবারো মেডুসায় ফিরে যায় এরা।
জীবনচক্রের মেডুসা ধারায় থাকার সময় জেলিফিশটি দেখতে অনেকটাই একটি ঘণ্টার মতো, ধীরে ধীরে এটি পলিপয়েড ধারার দিকে যেতে থাকে, এটির আকৃতি ছোট হতে থাকে এবং এক সময় মাত্র ১ মিলিমিটার জেলিফিশে রূপান্তরিত হয়। এ সময়ে এদের শরীরে নরম অস্থিবিহীন শুঁড়ের সৃষ্টি হয়। কোনো কোনো জেলিফিশে আটটি পর্যন্ত শুঁড় দেখা যায়। এই শুঁড়গুলো আবারো এক সময় মেডুসায় রূপ নেয়। ফলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এদের মৃত্যু নেই। তাই বলে এরা কিন্তু একেবারেই মৃত্যুর ধরাছোঁয়ার বাইরে নয়। একমাত্র ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ এলাকায় পাওয়া এই জেলিফিশের রয়েছে অসংখ্য শত্রু। বর্ণিল রঙের হওয়ায় সহজেই এটি মাছ বা অন্য সামুদ্রিক প্রাণীকে আকৃষ্ট করে। বেশির ভাগ টিউরিটপসিস নিউট্রিকুলাই পলিপয়েড ধারায় যাওয়ার আগেই অন্য প্রাণীর খাদ্যে পরিণত হয়। এছাড়া নানা অসুুখ বিসুখেও এরা মেডুসা অবস্থাই পার হতে পারে না। ফলে ‘অমর’ হয়েও এটি আসলে আক্ষরিক অর্থে অমর নয়।

SHARE

Leave a Reply