Home স্বাস্থ্য কথা ফুড অ্যালার্জি

ফুড অ্যালার্জি

ডা: এহসানুল কবীর..

মাঝে মাঝে আমরা বলে থাকি যে, অমুক ব্যক্তির প্রতি আমার একটু অ্যালার্জি আছে। অর্থাৎ আমরা বোঝাতে চাই অমুক ব্যক্তিটির সংস্পর্শ আমার জন্য অস্বস্তিকর, বিরক্তিকর ও ক্ষতিকর। তাই যতটা সম্ভব তাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। ফুড অ্যালার্জিও তদ্রƒপ আমাদের শরীরের জন্য অস্বস্তিকর, বিরক্তিকর ও ক্ষতিকরও বটে। শুধুমাত্র ফুড নয়, আমাদের চার পাশের কিছু কিছু জিনিস রয়েছে যার পরশে বা প্রভাবে আমাদের দেহে অ্যালার্জি হতে পারে। যেমন, ব্যবহার্য জিনিসপত্র, ধুলাবালি, পোশাক-পরিচ্ছদ, খেলাধুলার সরঞ্জাম, ফুলের পরাগরেণু, পারফিউম ইত্যাদি। তবে আজকে ফুড অ্যালার্জি নিয়েই আলোচনা করব।
ফুড অ্যালার্জি কাকে বলে?
এটা হলো বিশেষ বিশেষ খাদ্যের প্রতি এমন এক ধরনের অস্বাভাবিক উদ্দীপনা যা আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সাথে সংঘর্ষ বাধিয়ে বাহ্যিকভাবে কিছু লক্ষণ  প্রকাশ ঘটায়।
কখন শুরু হয়?
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, ১ বা ২ বছর বয়স থেকেই ফুড অ্যালার্জির সূত্রপাত ঘটে। ক্রমশ তা প্রকট আকার ধারণ করে এবং তা বারবার হতে দেখা যায়। আবার কোনো কোনো ধরনের ফুড অ্যালার্জি দেরিতে বা হঠাৎ করেই শুরু হয়ে যেতে পারে। তবে সবারই ফুড অ্যালার্জি হবে এমনটি নয়। ব্যক্তিবিশেষ ও খাদ্যবিশেষে একেক জনের একেক রকমের ফুড অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে। কারো হয় সাময়িকভাবে আবার কারোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি বা চিরস্থায়ী ফুড অ্যালাজি। তবে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সের কিশোর-তরুণদের ফুড অ্যালার্জির প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
তবে ফুড ইনটলারেন্স ভিন্ন কথা?
হ্যাঁ অনেকে ফুড ইনটলারেন্সকে ফুড অ্যালার্জির সাথে মিশিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। কিন্তু দুটোই ভিন্ন ব্যাপার। আসলে ফুড ইনটলারেন্সের বাংলা হলো খাদ্য অসহিষ্ণুতা। এটা আদতে ফুড অ্যালার্জি নয়। কারো কারো এই খাদ্য অসহিষ্ণুতা থাকতে পারে। তবে ফুড অ্যালার্জির সাথে পার্থক্য হলো এসব খাবার কখনোই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে প্রভাবিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করে না। তাই এটা ফুড অ্যালার্জির মতো বিপজ্জনক বা ক্ষতিকারক নয়। ফুড ইনটলারেন্সে শুধুমাত্র হজমের ব্যাঘাতজনিত কারণে কিছু সমস্যা দেখা যায় মাত্র।
ফুড অ্যালার্জির প্রাদুর্ভাব কেমন?
২০০৭ সালের এক জরিপে দেখা যায় যে, ১৮ বছর বয়সের নিচে শিশু-কিশোর তরুণদের মধ্যে ফুড অ্যালার্জির প্রাদুর্ভাব ছিল প্রায় ৩০ লাখের মতো  যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৩.৯% বেশি অর্থাৎ এটার প্রাদুর্ভাব সময়ের সাথে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৯৭ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত এই হার বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছিল ২৮%-এ। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো অন্যান্য অ্যালার্জির চেয়ে ফুড অ্যালার্জির প্রাদুর্ভাবটা ২-৪ গুণ বেশি।
কোন কোন খাদ্যে ফুড অ্যালার্জি হয়?
এটা স্বতঃসিদ্ধ কথা নয় যে নিম্নোক্ত খাদ্য দ্বারা সবারই ফুড অ্যালার্জি হবেই। হতেও পারে  আবার নাও হতে পারে। তবে ৯০% যেসব খাদ্য দ্বারা ফুড অ্যালার্জি হতে দেখা যায় সেগুলো হলোÑ
১.    দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার
২.    ডিম
৩.    মাছ (বিশেষ করে সামুদ্রিক)
৪.    গম ও গমজাত খাদ্য
৫.    বাদাম, মটরশুঁটি, বাদামের গায়ের লালচে খোসা
৬.    শামুক ও ঝিনুক জাতীয় খাবার (চিংড়ি, কাঁকড়া)
৭.    ভোজ্যতেল বা এর বীজ
৮.    তামাক, সিগারেট
৯.    তরমুজ, ফুটি, বাঙ্গি, শসা
১০.    আলু, গাজর, আপেল, নাশপাতি, জাম, টমেটো
১১.    শাকজাতীয় খাবার
১২.    আলু বোখারা, কিশমিশ
লক্ষণ কী তাহলে?
১.    শরীরের এক জায়গায় বা যত্রতত্র চুলকানি শুরু হয় এবং ক্রমশ এর তীব্রতা বাড়ে।
২.    ত্বকে লালচে দানা বা চাকার মত ফুলে ওঠে।
৩.    ঠোঁট, জিহ্বা, গলা ফুলে যায়, লালচে হয়ে যায়।
৪.    নাক দিয়ে পানি পড়ে।
৫.    হাঁচি, কাশি, অস্থিরতা, যন্ত্রণা হওয়া।
৬.    বুকে ব্যথা, নাড়ির গতি কমা-বাড়া, নিম্ন রক্তচাপ, মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট এমনকি অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
৭.    সাধারণত এসব খাবার গ্রহণের ১ ঘণ্টার মধ্যেই লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে।
রোগের গতিধারা কী হতে পারে?
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এ রোগটা নিরাময় হয়ে যায়, এসব খাবার তখন সহনীয় হয়। কোনো ক্ষতি করে না। আবার ১/৩ অংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে ঐসব খাবার পরিত্যাগের ১-২ বছরের মাথায় সম্পূর্ণ নিরাময় হয়। আবার কারো কারো ক্ষেত্রে চিরস্থায়ী বাসা বাঁধে এবং সুযোগ পেলেই মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।
অতএব চিকিৎসা কী হবে?
আসলে ফুড অ্যালার্জির জন্য নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। শুধুমাত্র  দরকার হয় সচেতনতার ও লক্ষণ বুঝে সাময়িক চিকিৎসা। তাই প্রথমেই শনাক্ত করতে হবে কার কোন খাদ্যে ফুড অ্যালার্জি রয়েছে এবং তা যথাসম্ভব পরিহার করা। আর ওষুধের বেলায় কথা হলো একটি হিস্টাসিন জাতীয় ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেয়া হয়। তীব্রতাভেদে সেটা প্রয়োগ করা হয় অথবা ক্ষেত্রবিশেষে হাসপাতালে ভর্তি করেও চিকিৎসা দেয়া লাগতে পারে।
প্রতিরোধের উপায় কী?
১.    সংশ্লিষ্ট খাদ্য এড়িয়ে চলাই উত্তম প্রতিরোধ।
২.    রোগের লক্ষণ দেখা মাত্রই ব্যবস্থা গ্রহণ।
৩.    যারা শিশুকালে মাতৃদুগ্ধ পান করেছে তাদের ক্ষেত্রে ফুড অ্যালার্জি কম হয় অথবা হয় না বললেই চলে।
অতএব সাবধান! শত্রু ভয়ঙ্কর!!
লেখক : শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ

SHARE

Leave a Reply