Home উপন্যাস স্বপ্ন মেঘের সাগরবেলায়

স্বপ্ন মেঘের সাগরবেলায়

শাহনাজ পারভীন..

এক.
কথা ছিল আজ দেরি করে ঘুম ভাঙবে নাফির। কিন্তু না, আজ আজানের আগেই ঘুম ভেঙে বসে আছে তার। অথচ যখন খুব সকালে ঘুম ভাঙবার কথা থাকে তখন ওর ঘুম ভাঙাতে কী যে কষ্ট হয় আম্মুর! সেটা নাফি বোঝে। কিন্তু ওর আর কিইবা করার আছে? ও-ও তো চেষ্টা করে। কিন্তু ঘুমই তো ওকে ছাড়তে চায় না। ও ঘুমকে ছাড়তে চাইলেও ঘুম ওকে জড়িয়ে রাখে আষ্টেপৃষ্ঠে চুইংগামের আঠার মত।
এই অসময় ঘুম ভাঙলে ওর নানান ভাবনা মাথায় আসে। কেন এই সময় ওর ঘুমটা ভাঙল? নানান ভাবনা মাথায় আসার সাথে সাথেই ওর মনটা নরম আনন্দ-উৎফুল্লে ভরে যায়। উহ: কী মজা! ওর দিদা বলেন মুশকিলের পর আসান হয়। যত বড় মুশকিল তত বড় আসান! এ যেন তার বাস্তব উদাহরণ।
এবার ওর অ্যান্যুয়াল এগজাম শুরু হবার আগে দেশে যত ঝক্কি ঝামেলা। ও অত কিছু বোঝে না। শেষের দিকেই তো স্যার ম্যাডামরা কত তড়িঘড়ি করে পড়ান। বারবার রিভিশন করান। স্কুলের গাড়িই আসে না। তো স্যার ম্যাডামদেরই বা দোষ কী? গাড়ি না এলে ওরা স্কুলে যাবে কী করে? আব্বু অবশ্য ওকে স্কুলে পৌঁছিয়ে দিত। ছুটি হলে নিয়েও আসত। কিন্তু আব্বু প্রতিদিনই আম্মুকে বলত-
-কী যে করি সাইমা, প্রতিদিন ঐসময় তো অফিস থেকে বের হওয়া যায় না।  কী করা যায় বলো তো? ঐ সময় অফিসিয়াল বিজি আওয়ার। চাকরি তো বাঁচাতে হবে। খুব কাজের চাপ থাকে ঐ সময়টাতে।
– তুমি তো তোমার মোটরসাইকেল নিয়ে হুটহাট বেরোতে পারো। কিন্তু আমিই বা বের হই কী করে? স্কুলও তো  তোমার অফিসের কাছেই। আমার তো সম্পূর্ণ উল্টো পথ। শহরের এ মাথা আর ও মাথা।
-তা ঠিক।
প্রতিদিন এই সব শুনতে শুনতে ও স্কুলে যায় কিন্তু কাস ঠিক মতো হয় না। ছাত্রছাত্রীরাও ঠিক মত উপস্থিত হতে পারে না স্কুলে। স্কুলের গাড়িই যদি না চলে তো কয়জন আর নিজ দায়িত্বে এভাবে ঝক্কি ঝামেলা সহ্য করে স্কুলে আসতে পারে? ঐ স্কুলে অত বেশি টাকায় ভর্তি করা হয় বেশির ভাগ ছাত্রের পরিবহন সুবিধার কথা মাথায় রেখেই। এই স্কুলের অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীই স্কুলের বাসে আসা-যাওয়া করে। নাফিকেও অত বেশি বেতনের স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে ঐ গাড়ির সুবিধার জন্যই। নইলে ওর আপুরা তো বাড়ির পাশের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্কুলে কেজি নার্সারি পড়েছে। তখন আম্মুই ওদের আনা-নেয়া করতেন। এখন তো আম্মুরও চাকরি। ও স্কুলটাও সেরা  স্কুলের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। প্রতি বছর শহরের সবচেয়ে বেশি বৃত্তি পায় ঐ স্কুল থেকেই। যখন নাফির ফুলদিদা ঐ স্কুলের হেডম্যাম ছিলেন তখন স্কুলের সুনাম আরো বেশি ছিল। ফুলের মত সুন্দরী দিদা এই ফ্যামিলির সবার আইডল যেন। আম্মুও তো ঐ দিদাকে দেখেই দিদার মতই টিচার হতে চেয়েছিল। দিদার মত কাপড়ে ফুল তোলা, উল বোনা, রান্না করা, সবাইকে আপ্যায়ন করা দিদার মত সুন্দর করে কথা বলা সব দিদার কাছ থেকেই শিখেছে। আম্মু তো সময় পেলেই দিদার গল্প শোনায় নাফিকে। কী করে বড় হবার স্বপ্ন দেখতে হয় তা শেখায় দিদার মতই। শুধু আম্মুই বা কেন, এ ফ্যামিলির সবাই কম বেশি দিদার মতই হতে চায়। নাফির ভীষণ ভালো লাগে যে অত বড় একটা স্কুলের হেডম্যাম তার নিজের দিদা। কিন্তু হঠাৎই হজ করে আসার পরই দিদা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। স্কুলের চাকরিটাও বোধ হয় ছেড়ে দেবেন। ঐদিন আব্বু আর ফুলদাদা কী সব বলাবলি করছিল। ডাক্তার নাকি দিদাকে বিশ্রামে থাকতে বলেছেন। তাই আর ফুলদাদা চাইছেন না দিদা চাকরিটা করুক। আম্মুও এ নিয়ে মন খারাপ করছিল।
শেষ পর্যন্ত পরীা তো হলো। এবার নাফি প্লে গ্রুপ থেকে নার্সারীতে উঠবে। ওকে ভর্তি করানো হয়েছিল মার্চের শেষের দিকে। ওর আম্মু ভেবেছিল কর্তৃপ হয়ত এই সময় কাউকে ভর্তি নেবে না। কিন্তু  হেডস্যার আম্মুর পূর্ব পরিচিত ছিল বলেই ওকে সাথে নিয়ে স্কুলে গিয়েছিল। দেখা যাক কী হয়? ঐদিন নাফির সাথে কথা বলে ভাল লেগে গিয়েছিল ওর হেডস্যারের। স্যার ওকে জিজ্ঞেস করেছিল-
– ছড়া পার?
– হু, পারি তো। বিজ্ঞের মত উত্তর দিয়েছিল ও।
কৌতূহলী হয়ে স্যার বললেন, বলো তো একটা ছড়া।
– কী ছড়া? ইংরেজি না বাংলা?
– কী সর্বনাশ, তাই তো! কী ছড়া বলবে তুমি তাতো বলা হয় নি আমার? আচ্ছা তুমি একটা ইংরেজি ছড়াই বল।
ও সঙ্গে সঙ্গে আবৃত্তি করতে থাকে-
-Twinkle twinkle little star
How i wonder what you are
Up above the world so high
Like a diamond in the sky!
এর মধ্যে স্যারের ফোনটা বেজে ওঠে। গুরুত্বপূর্ণ কল দেখে সেটা এ্যাটেন্ড শেষে ওর আম্মুর দিকে ফিরে ওর স্যার বলেছিলেন-
-আপনার ছেলে অনেক ট্যালেন্ট। ওর ব্রেন খুব ভাল। ও অনেক মেধাবী। কিন্তু অনেক ছোট। তাছাড়া ওকে কেন বছরের প্রথমে না এনে এই সময় নিয়ে এলেন?
-আসলে আমি ভেবেছিলাম আগামী বছরেই ভর্তি করব। কিন্তু ও নিজেই ওর চাচাত ভাইয়ের স্কুলে যাওয়া দেখে আগ্রহ প্রকাশ করছে। প্রতিদিনই ওর ভাইয়ার স্কুলে যাওয়ার সময় আপনাদের স্কুলের গাড়ি দেখলেই ও বায়না ধরে, কান্নাকাটি করে। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ওর আপুর ফাইনাল পরীক্ষা আগামী মে মাসে। ওর আপু যখনি পড়তে বসে তখনি ও ওর আপুর সাথে পড়বে বলে বায়না ধরে।  তাই ভাবছি যদি ওকেও ভর্তি করানো যায় তাহলে ও নিজে নিজের পড়া, নিজের স্কুল নিয়েই ব্যস্তথাকবে। তাছাড়া এই কাসে তো পড়ার তেমন  কোন চাপও নেই।
– তা ঠিক বলেছেন। তবে সমস্যা হলো কাসে বাড়তি কোন সিট নেই। যে কয়টি সিট সেই কয়জনই স্টুডেন্ট। তারপরও দেখি কী করা যায়।
হেডস্যার হেডকার্ককে ডাকালেন। খাতাপত্র সব আনতে বলে ভর্তি নিতে বললেন। পিয়নকে ডেকে ঐ কাসে একটি এক্সট্রা ডেস্ক ঢোকাতে বললেন।
অনেকটা হেয়ালীর মধ্যেই ওকে স্কুলে ভর্তি করানো হয়। স্কুল, পরীক্ষা, রেজাল্ট এসব তেমন কিছুই জানা ছিল না ওর। ভর্তির পর নতুন বই নতুন মনোযোগ। বেশ মন দিয়েই কাস করল নাফি। কয়েকদিন পরই ওর প্রথম সাময়িক পরীক্ষা শুরু হয়। পরীক্ষা দিয়ে এসেই আম্মুকে জড়িয়ে ধরে বলল-
-আম্মু পরীক্ষা কী? পরীক্ষা তো নিল না স্যার। শুধু একটা কাগজ দিয়ে লিখতে বলল। আজ কাসে কোন হোম ওয়ার্ক দেয়নি।
– ওইটাই পরীক্ষা। পরীক্ষা মানে শুধু খাতায় লিখতে দেয়া। পরীক্ষার সময়  কোন কাস হয় না, হোম ওয়ার্ক দেয় না। আর এই যে তোমার হাতে যে কাগজে শুধু প্রশ্ন লেখা এটার নাম হল প্রশ্নপত্র।
– ও তাই? বলবে তো আমাকে। আমি তো সারাণ ভাবছিলাম পরীক্ষা মানে অন্যকিছু। আমাদেরকে পরীা দিচ্ছে না কেন স্যাররা?
ওর এই কথা শুনে ওর আম্মুর নানীর কথা মনে পড়ে যায়। বেশ আগে ওর মামাত ভাইয়ের রেজাল্ট বের হলে সবাই বলছে ইনামুল ফার্স্ট ডিভিশান এবং চারটে লেটার পেয়েছে। খুব ভাল রেজাল্ট করেছে ও।
ওর নানী তখন বলছিল, সেই কখন থেকে শুনছি চারটে লেটার পেয়েছে, ফাস ডিভিশান পেয়েছে কিন্তু দেখানোর কারো নাম নেই। কী ব্যাপার বলো তো তোমাদের?  না হই আমি মূর্খ মানুষ, তাই বলে কি দেখানোও যাবে না আমাকে?  দেখাচ্ছো না কেন লেটারগুলো?  কই বের করো তো দেখি! তখন ওর মামী বুঝিয়ে বলছিলো লেটার কী আর রেজাল্ট কী? ওগুলো দেখা যায় না। তখন নানী শান্ত হয়েছিল। নাফিও তো এ সব জানে না পরীা মানে কী?
ওর প্রথম পরীার রেজাল্টের দিন ও ওর আম্মুকে বলেছিল, আম্মু তুমি আজকে আমার সাথে চল। না হলে আমার সব রেজাল্ট মাটিতে পড়ে যাবে। আমি একটাও খেতে পারব না।
ওর মা অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাতেই ও বলেছিল, জানো আম্মু, কালকে স্কুলে যে মেরিডিয়ান চিপ্স দিয়েছিল, আমি একটাও খেতে পারি নি। আমি যেই প্যাকেট ছিঁড়তে গেছি অমনি প্যাকেটের সব চিপ্স মাটিতে পড়ে গেছে। আজকেও যদি সব রেজাল্ট প্যাকেট ছিড়তে গেলে পড়ে যায়? তাহলে কী খাবো? প্লিজ, আম্মু চল আমার সাথে।
ওর দিকে তাকিয়ে ওর মা দেখে চোখ থেকে একরাশ অনুনয় ঝরে পড়ছে মায়ের মুখের উপর। ওর মা তখন বিমূঢ় হয়ে যান। ভেবে পান না কী উত্তর দেয়া যেতে পারে তার সবচেয়ে প্রিয় পুত্রের এ প্রশ্নের! উনি কি তখন ঐ মুহূর্তে নিজেকে খুব অপরাধী ভাবতে থাকেন? না কি আহলাদিত? আহারে ছোট্ট ছেলে যে এখনও রেজাল্ট কী তাই বোঝেনা, তাকে ভর্তি করা হয়েছে স্কুলে! তাকে বসানো হয়েছে পরীক্ষার হলে। ওর মায়ের তখন নিজের ভর্তির পরিবেশটা চোখের সামনে ভাসে। প্রথম দিন তাকে কাস টুতে ভর্তি করানো হয়েছিল। তাকে ভর্তি করানো হয়েছিল বাড়ি থেকে বেশ দূরে একটা নামকরা বড় স্কুলে। বাড়ির পাশের স্কুলটায় তাকে ভর্তি করাতে চায় নি তার মা। তার মেজো ভাইয়াও পড়তো ঐ স্কুলের কাস থ্রিতে। কাস থ্রিদের ছুটি হতো চারটায় আর ইনফ্যান্ট থেকে কাস টু পর্যন্ত ছুটি হতো বেলা বারটায়। ঐ সময় পর্যন্ত তাকে বসে থাকতে হতো একা একা। তখন তো আর মায়েদের বাচ্চাদের স্কুল থেকে বাড়ি নেবার সংস্কৃতি চালু হয়নি। ভাইয়ার ছুটি হলে তবে তার সাথে যেতে হতো বাড়িতে। এই অবস্থায় বড় ভাইয়া স্কুলে গিয়ে বিষয়টা  হেডস্যারকে বললে স্যার তাকে কাছে ডেকে তার নাম তার পিতার নাম জিজ্ঞেস করলে ও চটপট উত্তর দিয়েছিল। অমনি স্যার ওর বড় ভাইকে বলে উঠলো-
– দাও এক টাকা। আর এক টাকা দাও।
-কেন স্যার?
– ওকে কাস থ্রি তে ভর্তি নেব। কাস টু তে ভর্তি হতে দুই টাকা। থ্রি তে ভর্তি হতে তিন টাকা।
– কিন্তু স্যার ও কি কাস থ্রির বই পড়তে পারবে?
– কেন পারবে না? শুনলে না ও কেমন স্পষ্ট ওর নাম  ওর পিতার নাম বলতে পারলো। ও অবশ্যই পারবে।
ব্যস, ভাইয়া আর কথা বাড়ায় নি। আর এক টাকা দিয়ে থ্রিতে ভর্তি করে দিয়ে এসেছিল। কিন্তু ওর আম্মু আবার ভাবে- সময় বদলেছে এখন। সেই সময় আর এই সময় কি কখনো এক হয়? তখন তো কাস থ্রি থেকে ইংরেজি পড়া শুরু হতো। ইংরেজি পরীক্ষা হতো মৌখিক। আর এখন…

দুই.
পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই ঈদ। কোরবানী ঈদ। ঈদে চাচারা সবাই আসে বাইরে থেকে। ওদের ঈদ শুরু হয়ে যায় ঈদের তিন চার দিন আগের থেকেই।
ছোট চাচা বাসায় এসেই ওকেসহ আপুদের নিয়ে যায় বড় বাজারে। বাজারের সব চেয়ে বড় মাছটা এনে উঠোনে রাখে। উঠোনের মাঝখানে সবাই গোল হয়ে বসে দিদার মাছ কাটা দেখে। ছোটদের সাথে সাথে তখন বড়রাও আনন্দে মেতে ওঠে। মেজো দিদা সেজো দিদা ছোট দিদা চাচাত চাচা ফুফুরা সবাই মিলে কী আনন্দ তখন! চাচা নিয়ে আসেন বিভিন্ন রকম মিষ্টি জিলিপি লুচি সবাই মিলে খায় আর দিদা কী যে হাসি মুখে থাকেন ঐদিনগুলো! নাফির ঈদ তখনি শুরু হয়ে যায়। মা ফাস্ক ভর্তি চা বানান। হাসি মুখে সবাই সেই চা মিষ্টি খায়।
এবার যে কী হলো?
মেজো চাচা ফোন করে বলেছেন, আসতে পারব না ভাই। এই তো নতুন বদলি হয়ে এলাম। এই মুহূর্তে এখান থেকে যাওয়া সম্ভব হবে না। দেশের এই অবস্থায় স্টেশন লিভ করা যাবে না। সেই সংবাদ শোনার পর থেকেই ওদের মন খারাপ।
মন খারাপের আর একটি বড় কারণ হলো যখনি ঈদে ওর চাচারা বাড়িতে আসেন তখনি ওর চাচার বন্ধুরাও সবাই ওদের বাড়িতে আসে। সফি চাচার ছেলে শাওন শান্ত সবাই আসে। ওরা ওর বন্ধু। একই স্কুলে আর্ট শেখে। কথা হয়েছিল এবার ঈদে ওরা আব্বু আম্মুর সাথে আসবে। কিন্তু চাচা না এলে তো সফি চাচাও ওদেরকে নিয়ে আসবেন না । মইন চাচা খালেক চাচা কেউই আসবেন না তাহলে। দেখা হবে না সজল আশফাক কারো সাথেই।
ওর চাচা প্রশাসনিক বড় কর্মকর্তা। এই দুই মাসে তার কতবার যে বদলী হল। এক জায়গায় দুই দিন তো অন্য জায়গায় তিন সপ্তাহ। শেষ পোস্টিংটা হয়েছে লোহাগাড়া উপজেলায়। বন্দর নগরী চট্টগ্রাম আর সর্ববৃহৎ সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারের মাঝখানের উপজেলা ওটা। ওর চাচী আম্মাই ওর আম্মুকে প্রস্তাব দিয়েছেন-
-বুবু, এবার তো আমাদের ঈদে বাড়ি যাওয়া হচ্ছে না। এক কাজ কর, তোমরা সবাই চলে এসো। এক সঙ্গে ঈদ করা যাবে। সমুদ্র দেখা যাবে, পাহাড়ে উঠা যাবে, বান্দরবানের মেঘলায় ঘোরা যাবে। চলে আসো তো।
– পাগলী মেয়ে। বলে কি? ঈদ করতে ওখানে যাবো তো গরু ছাগলের কী হবে? গরু ছাগল তো কেনা হয়েছে।
-আহ! তা তো মনে নেই। এক কাজ কর। ঈদের দিন সন্ধ্যায় সাউদিয়া বাসে রওনা দাও। সকালে এখানে পৌঁছে যাবে।
-ঈদের দিন সন্ধ্যায় কি বের হওয়া যাবে? সব তো ঠিকঠাক গোছগাছ হবে না তখনো। ভুড়ি, পায়া গোছানোর ঝামেলা আছে। ওগুলো তো বলতে গেলে বছরে একবারই হয়। কে আর অন্য সময় ভুড়ির ঝামেলা পায়ার ঝামেলা করে? সময় কোথায়? তাছাড়া গোশত বিলাতেও তো সন্ধ্যা হয়ে যাবে। ঐদিন কি আর বের হওযা যাবে?
– তা ঠিক। তবে ঈদের পরদিন চলে আসো।
শেষ পর্যন্ত ঠিক হয়েছে ঈদের পরের দিন সন্ধ্যায় যাবে তারা। যেহেতু ঈদের দীর্ঘ ছুটি পেয়েছে আব্বু আম্মু। তার সাথে যোগ হয়েছে সাপ্তাহিক দুইদিন ছুটি। অনেক ঘোরাঘুরি করা যাবে। নাফিও সমুদ্র দেখেনি, পাহাড় দেখেনি। তাছাড়া ওর চাচা চাচীরও অনেক অভিজ্ঞতা অনেক কথা জমা হয়ে আছে এ’কদিনে ওর আব্বু আম্মুর জন্য। চাচাত বোন দুটোও কান্নাকাটি করছে। বাড়িতে আসবে ঈদ করতে। সব মিলিয়ে ভালোই হবে। আহা! নাফির মন আনন্দে নেচে ওঠে।
এই সব কথা একটার পর একটা মনে পড়ে যাবার পর নাফির মনে পড়লো আজ সেই ঈদের পরের দিন। কাক্সিত সেই দিন। এই জন্যই ওর ঘুম ভেঙে যাবার সাথে সাথে ও বিছানা থেকে লাফিয়ে ওঠে। কতদিন ও অপো করেছে এই দিনটির জন্য। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কত স্বপ্ন-সাগরের ঢেউ, বালু চর পাহাড়…
আম্মুর বাবার বাড়ি নদীর তীরে হওয়ায় আম্মুর কী গর্ব। কী আনন্দ! সেই সব কত গল্প শুনিয়েছে নাফিকে। কিন্তু এখন আর ওর নানাবাড়ি যাওয়া হয় না সেইভাবে। মামারা এখন সবাই একেকজন একেক জায়গায়। কেউ ফরিদপুর কেউ ঢাকা কেউ আমেরিকা। নদীর পাড়ের কামারখালীতে এখন আর যাওয়া হয়না আগের মত।
– আম্মু ওঠো, ওঠো। আর ঘুমিয়ো না। আম্মু ওঠো প্লিজ, ওঠো না।
– আব্বু ঘুমাও। এখনো অনেক রাত।
ও ধীরে ধীরে উঠে ওর আপুদের ঘরের কড়া নাড়লো।
– আপু ওঠো। আপু ওঠো না প্লিজ।
– প্লিজ ভাইয়া, কাল অনেক রাতে ঘুমিয়েছি। ডিস্টার্ব করো না প্লিজ।  তোমাকেও তো বলেছিলাম অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমুতে। এখন এই ভোরে কেন উঠেছো? যাও আরো একটু ঘুমাও। আমরা তো যাব সেই সন্ধ্যায়। এখন উঠে কী করব?
নাফির মনটা একটু খারাপ হয়ে যায়। ও ধীরে ধীরে আবার ওর বিছানায় চলে আসে। ও বিছানায় আসলে কী হবে , ঘুম আর আসতে চায় না। অথচ অন্য দিন ওর ঘুম ভাঙাতে কী যে কষ্ট হয় ওর আম্মুর! ঠিক সাতটায় ওর গাড়ি আসে গেটে।
বড় ফুপুর কণ্ঠ শুনে ওর ঘুম ভাঙে। এরই মধ্যে বড় ফুফু এসেছে, ছোট ফুপু এসেছে। হৈ হুল্লোড় চেঁচামেচি।
ওর ঘুম ভাঙে আয়েশে। সারারাত নানা স্বপ্নে নানা কল্পনায় ওর ঘুম হয় নি। ভোররাতে ঘুম ভেঙে যাবার পর ও আবারো এসে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুমটা ঠিকমত হওয়ায় ওর মেজাজটা ফুরফুর করছে। ও বিছানায় শুয়ে শুয়েই শুনতে পায় ওর আম্মুর কণ্ঠ-
– চালের গুড়া, কুমড়োর বড়ি কতকিছু এনেছেন আপা?
-হ্যাঁ ছাইমা শোন, তোমরা কিছু রাখো আর ওদের জন্য কিছু নিয়ে যেও। তোমরা তো আর যাবে না বেড়াতে।
আমরাই বয়ে নিয়ে এলাম।
বিছানায় শুয়ে শুয়েই ও আম্মুকে জিজ্ঞেস করে, আম্মু, শাহিন তো এলো না। শাহিন যাবে না আমাদের সাথে?
– না আব্বু, ও যাবে না। ও গ্রামে গেছে ওর আম্মুর সাথে ঈদ করতে।
– তাতো জানি। ঈদ তো শেষ। ওকে ফোন দাও।
– ওর আম্মুর ফোন নেই।
– আম্মু তুমি ওদেরকে একটা ফোন কিনে দিবা? শাহিনের খুব সাগর দেখার ইচ্ছে, পাহাড় দেখার ইচ্ছে। ওর দেখা হয়নি ওসব।
– আচ্ছা এর পর যখন আমরা আবার যাব তখন ওকে নিয়ে যাব।
– ঠিক তো আম্মু?
– হ্যাঁ ঠিক আছে।
নাফি বিছানা থেকে নেমে দৌড়ে এসে ওর আম্মুকে জড়িয়ে ধরে একটু আদর করে দেয়। অমনি আম্মুর মনে পড়ে যায় ওর বড় আপুর কথা। মুনার ছোট বেলায় তখন বাসায় কাজ করত রোস্তমের মা গোলাপী। শীতের সকালে ওদের বাসায় ডিম আলু রান্না হত প্রায়ই। গোলাপীকে ওর দিদা একটা ডিম দিত। গোলাপী সেখান থেকে রোস্তমকে অর্ধেক ডিম দিত। কিন্তু মুনাকে দিত একটা ডিম। ওর আম্মু প্রায়ই খেয়াল করত সবার অগোচরে অথবা খেতে ইচ্ছে করছে না বলে রোস্তমকে খানিকটা  ডিম ভেঙে দিত মুনা। তো একদিন ওর আম্মু রান্না করছে আর মুনাকে ছবি আঁকা শেখাচ্ছে। মুনা আস্তে করে বড় একটা গোল বল এঁকে তার মধ্যে অনেক ছোট ছোট বল আঁকল। আঁকা শেষ করে দৌড়ে মায়ের গলা ধরে আদর করে বলল, আম্মু কড়াইতে তো এখনো অনেক জায়গা আছে। বোস্তমের জন্য একটা আস্ত ডিম দেব? ওর মা তাকিয়ে দেখল বড় বল টা হলো কড়াই আর ছোট ছোট বল হলো ডিম। ওর খুব ভালো লেগেছিল ঐটুকু একটা বাচ্চা মেয়ের মধ্যে মানবতার এত উচ্চ প্রকাশ দেখে।
সেদিন ও আর একটা কথাও বলতে পারেনি। বাচ্চা একটা মেয়ে যে রোস্তমকে এখনও রোস্তমও বলতে পারে না বোস্তম বলে। সেই মেয়ের কাছে হেরে যেয়ে শুধু এইটুকু বলতে পেরেছিল, দাও মা বোস্তমকে একটা আস্ত ডিম দাও। এবার থেকে দিদাকেও বলব একটা আস্ত ডিম দিতে। আমিও বোস্তমকে একটা আস্ত ডিম দেব।
সেই থেকে ওর আম্মু  রোস্তমকে একটা আস্ত ডিম দিত। আর কখনোই ওর সামনে দুই রকম করতো না।
শাহিন ওদের বাসায় টুকিটাকি কাজকর্ম করে, ফায়ফরমাশ এই আর কি। ওকে ওর দিদা নিয়ে এসেছে গ্রাম থেকে। নাফিকে সে অনেক আদর করে। ওর সাথে সময় দেয়, খেলা করে। নাফিও শাহিনকে অন্য চোখে দেখে। ছেলেটি অনেক সহজ সরল। ও এ বাসায় আসার কয়েকদিন পর নাফির এক চাচার বিয়ে হয়েছে। নাফির আম্মু কি এক প্রয়োজনে ওকে পাঠিয়েছে নতুন মামীর কাছে। ও ফিরে এসে ওর আম্মুকে বলেছিল, মামী, নতুন ভাবী কইছে- ভাবী আসতাছে আপনার কাছে।
– শাহিন তুই কাকে ডেকেছিস?
– ঐ তো আপনি যারে কইছেন ঐ নতুন ভাবীরে।
– ভাবী বলছিস কেন? ওতো তোর মামী হয়।
– অইতো, কারো নতুন বিয়ে অইলে তারে ভাবী কইতে অয়। কয়দিন  আগে আমার নিয়ামদ্দি ভাইয়ের বিয়ে অইলো, আমরা তারে ভাবী কই।
– আরে পাগল, সে তো তো ভাইয়ের বউ বলে ভাবী বলিস কিন্তু এতো তোর মামী হয়।
– ভাবী কইলেও অয় মামী। নতুন বউ না, ভাবী কইলেও অয়।
-আচ্ছা তোর যা ইচ্ছে তুই বলিস। এখন যা।
সেই শাহিনকে নিয়ে যেতে চায় নাফি। ও কি জানে, একজন মানুষের সমুদ্র, পাহাড় দেখে আসতে কত টাকা খরচ লাগে? তারপরও ওর আম্মুর খুব ভাল লাগে যে, তার ছেলে মেয়েদের মধ্যে সব মানুষকে অকাতরে ভালবাসবার  এই মহৎ গুনটা আছে।
সারাদিন গোছগাছ হৈ হুল্লোড় কেনা কাটা আনন্দ উল্লাসে কাটলো। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় চিটাগাংগামী সাউদিয়া বাসে চড়ে বসলো ওরা।
আঙ্গুর, প্যাড়াসন্দেশ, জামতলার সাদেকগোল্লা, রান্না করা সেমাই, ভুনা গোশত, আপুদের জন্য জামা কাপড়সহ ওদের শীতের কাপড় চোপড় বিশাল বিশাল লাগেজ। নাফির মনে হলো ওরা যেন কোন এক স্বপ্নপুরীতে যাচ্ছে। শুধুু নাফি কেন ওর বোন মুনা আর মুমুও ভীষণ খুশি। এমনকি ওর আম্মুও। ওদেরও কখনো সমুদ্র দেখা হয় নি। ওর আব্বু অবশ্য বছর তিনেক আগে একবার গিয়েছিল। বায়না ধরায় মুনা মুমুকে বলেছিল, আমি আগে ঘুরে আসি। পথ ঘাট চিনে আসি। তারপর তোমাদের নিয়ে যাব। ঐ পর্যন্তই। ওদের আর যাওয়া হয় নি সমুদ্র আর পাহাড় দেখতে।

তিন.
বাস চলতে শুরু করলো। মিষ্টি একটা ভালোলাগা ঘিরে থাকলো সবার মনে। নিরিবিলি অন্ধকার নির্জনতাকে খান খান করে ওদের সাউদিয়া চলতে শুরু করলো। ঈদের পরের দিন রাতের ফাকা রাস্তার ছম ছম করা ভয়কে ছাড়িয়ে ঝম ঝম বৃষ্টি নেমে পড়লো। মুমুর নতুন কেনা  মোবাইলের মনোমুগ্ধকর গান ওদের ভ্রমণ পর্বকে করে তুলল  মোহনীয়।
বৃষ্টি, শীত, ভয়, নির্জনতা, আতংক, ভালো লাগা, কম্বলের ওম, এসি গাড়ির নাসতার প্যাকেট, মায়ের আদর, আব্বুর সন্ধিৎসু দৃষ্টি, আপুদের উল্লাস, আনন্দ, গল্প সব মিলিয়ে নাফির মনে হলো- ও যেন এই প্রথম জীবনের এরকম একটা সুখের মুহূর্ত অনুভব করছে। ওর স্বপ্ন স্বপ্ন মনে হচ্ছে। ইস, যদি এই পথ শেষ না হতো! কেক কোক ক্রেকারস্ সাগরের ঢেউ পাহাড়ের চূড়া স্বপ্নময় অনুভূতি নাফিকে এক অন্য রকম স্বপ্নময়তায় আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
এই শীতে পদ্মার বুক হঠাৎই দুলে উঠলো। শান্ত থির ঢেউ অশান্ত বেসামাল হয়ে উঠলো। মাঝ নদীতে স্রোতের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, আতংক ভয় হঠাৎই এতণের ভালোলাগা উবে গেল। মুহূর্ত আগের যে স্বপ্নময় ভালোলাগা  অনুভূতি হঠাৎ-ই জীবনের শেষ মুহূর্তের মত আতংকগ্রস্থ করে ফেললো বাস ভতি যাত্রীর সবাইকে। লাইলাহা ইল্লা আনতা সোবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজজ্বলেমীন। লাইলাহা ইল্লা আনতা সোবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজজ্বলেমীন।
লা ইলাহা ইল্লাহ আনতা…। ইন্না লিল্লাহি অ ইন্না ইলাইহী রাজেউন। ইন্না লিল্লাহি অ ইন্না ইলাইহী রাজেউন। ইন্না লিল্লাহি অ ইন্না ইলাইহী রাজেউন…। বাসভর্তি রব উঠলো আল্লাহু আকবর। আল্লাহু আকবর। কেউ কেউ সরবে আজান দিচ্ছেন। কেউবা বলছেন ভোলানাথ রা কর। ভোলানাথ রা কর…। ঝড়ের রাতের বিপদ থেকে উদ্ধার পাবার মত আস্তে আস্তে সব শান্ত হল।
বাসের সবাই বলাবলি করছে দুই নদীর সংযোগস্থল তো, এ রকম হয়ই মাঝে মাঝেই। নাফি ওসব বোঝে না। তবে হঠাৎ অন্য রকম ভালোলাগায় ভরে গেল নাফির মন। জীবন মানে কি এ রকমই? এই ভালোলাগা আবার এই আতংকে কেঁপে ওঠে মন? ও জানে না সেসব। ও বোঝে না…
এতকিছু বোঝে না। তবে হঠাৎ ওঠা ঢেউয়ের তাণ্ডব থেকে মাঝ নদীতে রা পাওয়ার পর কী যে শান্তি, কী যে অপার ভালোবাসা! জীবনের প্রতি মায়া, পুনর্বার জীবনকে ফিরে পাবার আনন্দ যে পেয়েছে শুধু সেই জানে জীবন মানেই দুঃখের পরের প্রশান্তিÑকর্মের পরের বিশ্রাম আর সংগ্রামের পরের নিরেট বিজয়ের মুকুট পালক। মায়ের এইসব কথা শুনতে শুনতে নাফি মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে।
কী একটা শব্দ, হৈ হুল্লোড় কানে যাওয়াতে নাফির ঘুম ভাঙল। জানালার কাঁচ গড়িয়ে বাইরে আলো। লোকজনের হাঁটাহাঁটি গরম কাবাবের সুগন্ধ ওকে আকৃষ্ট করলো। ও জানালা দিয়ে ওর চোখকে প্রসারিত করলো। ‘কুমিল্লা রেস্টহাউস।’ সেই যে বাসে উঠেছে তারপর আর নামেনি বাসযাত্রীর কেউ। বাসটা থামতেই হুড়মুড় করে সবাই নামতে শুরু করলো। বাস প্রায় খালি। ও ওর আম্মুর কোলে মাথা রেখে দেখছে সবকিছু। বাসের মধ্যে অন্ধকার। হঠাৎ ও দেখলো ওর সামনের সীটে ওর আপুদের ব্যাগ কে যেন লম্বা হাতে তুলে নিচ্ছে। গায়ে শাল জড়ানো লোকটা অনেক লম্বা। ওর সজাগ দৃষ্টিতে ও ওর আম্মুকে ঘা দেয়। ওর আম্মুকে ডাকে। ওর আম্মু উঠে দাঁড়াতেই লোকটা দ্রুত ব্যাগটা রেখেই সামনের দরজা দিয়ে নেমে যায়। লোকটাকে ও আগেই দেখেছিল। যখন ওদের গাড়িটা এসে থামে তখনি লোকটা ঐ ক্যান্টিনের বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল। লোকটা অসম্ভব সুন্দর এবং অনেক লম্বা হওয়ায় ওর দৃষ্টি কেড়েছিল। ও ভেবে পায় না এ বাসের যাত্রী না হওয়া সত্ত্বেও কেন লোকটা বাসে উঠেছিল? ওর মায়ের কথায় ও টের পায়-
লোকটার মতলব খারাপ ছিল। সবাই যেহেতু বাথরুমে কিংবা ক্যান্টিনে গিয়েছে এই ফাঁকে কিছু হাতিয়ে নেয়া যায় কিনা? ও ভেবে পায় না মানুষগুলো এত নীচ হয় কি করে? দেখতে তো অনেক ভদ্র… উনাকে দেখে তো খারাপ কিছু মনে হয় না। তবে…
পাহাড়ের পেটের ভেতর দিয়ে সূর্য উঠলো। ও অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলো সূর্যোদয়। ও এর আগে কখনো এত সুন্দর করে সূর্যোদয় দেখেনি। কী অপূর্ব! সারি সারি গাছের সারি,  নাম না জানা অসংখ্য পাখি কিচির মিচির করছে, রংধনুর মত সাতরং ছড়ানো আকাশ, ঝিরিঝিরি বাতাস সব মিলিয়ে ওর চোখের সামনে পদ্মর মত সূর্যটা ফুটে উঠলো। ও অবাক হয়ে ল্য করছে ওদের বাসটা কখনো পাহাড়ের বুকের উপর, কখনো পেটের মধ্যে, কখনো পাহাড়ের পাশ দিয়ে আবার কখনো পাহাড়ের মাথার উপর অনেক উপরে উঠে যাচ্ছে। পাহাড় কেটে রাস্তা বানানো হয়েছে। ও মুগ্ধ চোখে একবার রাস্তার এ পাশে একবার ও পাশে দেখতে লাগলো। রাস্তার ও পাশের পাহাড়ের চূঁড়ায় বিশাল বিল্ডিং ও পাশে পাহাড়ের চূঁড়া ভর্তি গাছ, হেলান দেয়া সূর্য প্রকৃতি, পাখি! ঝাঁকে ঝাঁকে পাহাড়ী  ময়না পাখি উড়ছে দল বেঁধে। ও এর আগেই পাহাড়ী ময়নার কথা শুনেছে ওর মামার কাছে। পাহাড়ী ময়নাগুলো খুব দ্রুত মানুষের কথা বুঝতে পারে, কথা বলতে পারে। ওর খুব শখ সম্ভব হলে একটি পাহাড়ী ময়না কিনে নেবে। কথা শেখাবে নিজের মত করে। কী সুন্দর ময়না পাখি! ও খেই হারিয়ে ফেলছিলো। এ কী সুন্দর! ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখির ওড়াউড়ি। কত রকম কত রংয়ের! এই পাখিগুলোর নাম জানতে হবে ওর ভাবতে ভাবতেই একবার এপাশে দেখছে একবার ওপাশে দেখছে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে। একবার আব্বু একবার আম্মু একবার আপুদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার চেষ্টা করছে। দেখো আপি দেখো আপু কী সুন্দর ! আম্মু দেখো, আব্বু দেখো। ও আনন্দে চিৎকার করতে থাকে। চিৎকার করতে করতেই ও সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থাকে বারবার। দেখো আপি, দেখো আপু, দেখো আব্বু দেখো আম্মু… আমি কিন্তু ফিরবার পথে একটা ময়না পাখি নিয়েই যাব। খুব কাছ থেকে দেখব কিন্তু অতিথি পাখিদের। আব্বু মনে থাকে যেন। আম্মু মনে রাখবা কিন্তু।
ছোট আপুর কবুতর আছে। সেখান থেকে ওকে দুটো বাচ্চা দিয়েছিল। বেশ ক’বার বাচ্চা ফুটে অনেকগুলো হয়েছে। ও কাউকে খেতেও দিতে চায় না। কাউকে দিয়ে দিতেও চায় না। সময় পেলেই কবুতরের পেছনে সময় ব্যয় করে। যতবারই ওর আম্মু ও গুলো জবাই করতে চায় অথবা ওর শিব্বির চাচাকে দিয়ে দিতে বলে ও কিছুতেই রাজি হয় না তাতে। ও নিজেই খেতে দেয়। পশু পাখির প্রতি ওর দরদ খুব ছোট বেলা থেকেই।
সেই যে ও যখন খুব ছোট তখন ওদের লাল মোরগটা উঠোনের ডান পাশের ছোট্ট মেহেদী গাছটা উপড়ে দিলে কী কান্না! কান্না চোখেই বারবার বলছিল, ছোট আপু তোমার লাল মুরগীর স্বামীটা আমার মেন্দী গাছ মেরে ফেলছে। এবার ওকে জবাই কর কিন্তু…।
ওর মুখে লাল মুরগীর স্বামীর কথা শুনে কতদিন যে তাই নিয়ে হেসেছে সবাই। ও  মোটেও তাতে লজ্জা পায় নি।
– কেন মা মুরগীটাই তো বাচ্চাদের খেতে দেয়। ও তো সারাণ মারামারি করে। ওকে জবাই করে ফেল। ও তো ডিমও দেয় না কোনদিন। ওকে বাঁচিয়ে রেখে লাভ কী?
এই অবারিত ভালোলাগার মধ্যেই বাসটা থেমে গেল। সকাল সাতটায় বাস পৌঁছে গেল চিটাগাং বাসস্ট্যান্ডে। বাস থেকে নামতেই ওর চোখ তো ছানাবড়া!
– আরে খোকন চাচা আপনি? কখন এলেন?
-এই তো এলাম এখন। কেমন আছো তুমি চাচ্চু? হাত বাড়িয়ে চাচা খানিক আদর করে দিল নাফিকে।
খোকন চাচা ওর দিদার ভাইয়ের ছেলে। এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার তিনি। চাচীও থাকেন কোয়ার্টারে। কথা হয়েছে কক্সবাজার থেকে ফিরবার পথে ওরা আসবে খোকন চাচার বাসায়। চাচা এখন দেখা করতে এসেছে ওদের সাথে। ওদেরকে লোহাগাড়া পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসবে। প্রিয় খোকন চাচাকে দেখে ওর মনটা খুশিতে ভরে গেল। চাচা ওর জন্য চিপস জুস চকলেট এনেছে সাথে। ও আর এক দফায় খুশি হয়।
ওরা ধীরে সুস্থে রেস্টরুমে গেল। সেখানে বাথরুমে হাতে মুখে পানি দিয়ে সবাই ফ্রেশ হয়ে নিল।  হালকা কেক, গরম চা খেল। তারপর অন্য একটা লোকাল বাসে উঠলো ওরা। এ বাসটা সাউদিয়া গ্রুপের বাসের মত অত ভাল নয়। স্থানীয় লোকজনই বেশি উঠেছে এতে। এ বাসটা কক্সবাজার পর্যন্ত যাবে। ট্যুরিস্টও আছে কিছু। সব মিলিয়ে নাফির ভালোই লাগছে।
দীর্ঘ ভাঙাচোরা আঁকাবাকা রাস্তা পার হয়ে বাস এসে থামলো কর্ণফুলির তীরে। সেখানে এবং আশেপাশে যত দূর চোখ যায় অতিথি পাখির এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখে ওরা ভীষণ আপ্লুত হয়ে পড়ল। আকাশে শত শত পাখির ওড়াউড়ি, ডানা ঝাঁপটানি আর কিচিরমিচির ডাকাডাকিতে কী এক অপূর্ব মোহনীয় দৃশ্যের অবতারণা হয় যেন। নাফি চাচার গলা জড়িয়ে চিৎকার করে চাচাকে দেখাতে লাগলো সেসব। চাচা দেখেন কী অবস্থা!
– হ্যাঁ আব্বু, অক্টোবর মাসের শেষের দিক থেকেই পাহাড়, সাগর, নদী আর ম্যানগ্রোভ বনে ঘেরা আমাদের এই অপরূপ বাংলাদেশের প্রকৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে অতিথি পাখি। বিভিন্ন জলাশয় বা লেকের পানিতে হাঁস জাতীয় পাখির খুনসুটি আর অবিরত ডুবসাতার-লুকোচুরির দৃশ্য মানুষকে কাছে টানে।
– চাচা এরা কোন দেশ থেকে এসেছে? এদেরকে অতিথি পাখি বলা হয় কেন?
– হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এরা উত্তর মেরু, সাইবেরিয়া, ইউরোপ, মঙ্গোলীয়া, চীন, নেপাল, জিনজিয়াং, তিব্বতের লাদাখ ও ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে এদেশে অস্থায়ী নীড়ে কিছু দিন বসবাস করতে আসে বলেই এদেরকে অতিথি পাখি বলে। ইংরেজিতে এদেরকে বলা হয় মাইগ্রেটরি বার্ড আর বাংলায় পরিযায়ী পাখি।
– আরে টিচারের অবস্থা দেখ। ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানার অবস্থা আর কি। টিচার কাস নেয়া শুরু করেছে ভাইপোর। তা বলি কাস শেষে এই বাসের মধ্যে ভাইপোর কি পরীক্ষও নেয়া হবে?
ভাবীর হাল্কা রসিকতায় খোকন চাচাও বলে ওঠে, আরে না না। এই ছোট্ট ভাইপোর পরীক্ষা নিয়ে আমার পোষাবে না। বরং বড় কাসের ছাত্রী হলে পোষাত আমার। কি বলো মামনি তাই না, ঠিক বলেছি তো?
খোকন চাচা আম্মুকে কথাগুলো বলে আবার আপুদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করে।
নাফির খুব ভালো লাগে চাচার গল্প বলে যাবার মত কথাগুলোকে। ও আবার চাচার মনোযোগ আকর্ষণ করে।
– চাচা, ঐ পাখিগুলোর নাম কী? প্লিজ একটু বলেন না।
– বিভিন্ন পাখির বিভিন্ন নাম। তারমধ্যে নর্দার্ন পিনটেইল, স্বচ্ছ পানির বালিহাঁস, খয়রা, বুনোহাঁস, ছোট সারস, বড় সারস, হেরন, নিশাচর, ডুবুরি পাখি, কাদাখোঁচা, গায়ক রেন, রাজসরালি, টিকিহাঁস, পাতিকুট, খরচা, চকাচকি, গাঙচিল, কালোকুট, ফিস ঈগল ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
-কত রকম পাখি চাচা? কত নাম?
-হ্যাঁ, চাচু, শুধু এশিয়া আর ইউরোপেই আছে ৬২০ প্রজাতির পাখি। এর মধ্যে কিছু বিলুপ্ত হয়ে গেছে, কিছু বিলুপ্তির পথে। ‘৮০র দশকে এক পরিসংখ্যানে বাংলাদেশে ৩৫০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখির অস্তিত্ব সনাক্ত করা হয়। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে ১৭৬ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি ও ৩০০ প্রজাতির দেশী পাখির দেখা মেলে।
– মাঝখানে কাগজে দেখলাম তোমাদের  ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে মেলা বসেছিল। পাখিদের এই বিশ্ব ভ্রমণের প্রতি সম্মান জানিয়ে পাখিপ্রেমীরা বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস পালন করছেন।
– হ্যাঁ ভাবী, সে এক বিশাল কাণ্ড কারখানা। সে কমিটিতে আমিও ছিলাম। সে না দেখলে বোঝা যাবে না পাখি নিয়ে কত কিছু…
-তাই তো বলি, তুমি তো পাখি নিয়ে বিশাল থিসিস লেখার জ্ঞান যোগাড় করে ফেলেছো।
মায়ের কথার মধ্যে আবারও নাফি ঢুকে পড়ে, চাচা, তাহলে সবাই পাখি মারে কেন?
-সবাই তো মারে না চাচু। যারা এই অতিথি পাখি মারে তারা ভাল মানুষ না।
– আমিও তাই বলি চাচা।
– হ্যাঁ চাচু, আমাদের জীবনের স্বার্থে ভবিষৎ প্রজন্মের স্বার্থে নিরাপদ পৃথিবী গড়তে অবশ্যই এদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কোনক্রমেই এদেরকে মারতে দেয়া যাাবে না।
এরই মধ্য ধীরে ধীরে বাস কখন ফেরিতে উঠেছে ওরা টেরই পায় নি। কর্ণফুলি নদীতে কী বড় বড় ঢেউ! ছোট্ট ফেরিগুলো ভর্তি বাস ট্রাকে। ছোট্ট ছোট্ট মুড়ির টিনের মত গাড়ি। ওর কাছে সব নতুন মনে হলো। সবই চেনা তারপরও কেমন নতুন নতুন অনুভূতি, খুব ভালো লাগছে ওদের। মায়াবী সকালে ও পাহাড় ছেড়ে এখন নদীর মাঝখানে। সূর্যটাও পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে এসে মাঝ নদীতে উথাল পাথাল সাঁতার কাটছে। ওর ভীষণ ভালো লাগছে। ওর সাথে সাথে সূর্যটাও যাচ্ছে। ওর বন্ধু যেন!
বাস যখন লোহাগাড়া বাসস্ট্যান্ডে থামলো অমনি সরকারি গাড়িটা ওদের দিকে এগিয়ে এলো। চাচা পাঠিয়েছেন। মোবাইলে কিছু সময় পর পরই আম্মু আব্বুর কথা হচ্ছিল চাচা চাচীআম্মার সাথে। গাড়ি বেশ কিছুটা আসার পর সারি সারি রং করা গাছের শেষ লাইনে ‘নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবন’ ফলকটি একপাশে রেখে গাড়িটা ধীরস্থির রাজা ধীরাজের মতন বাঁক নেয় বামে। ওইভাবে গাছগুলো যেন সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ওদেরকে অভিনন্দন জানাচ্ছে, স্যালুট জানাচ্ছে! স্বাগত জানাচ্ছে। যেভাবে গত মাসে ওরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ওদের স্কুলে আসা ইন্সপেকশন অফিসারদের রিসিপশান জানিয়েছিল ঠিক ঐভাবে নির্জন রাস্তার দু’ধার দিয়ে রং করা একই মাপের মেহগনি গাছগুলো যেন ওদেরকে রিসিপশান জানাচ্ছিল। কুর্নিশ করছিলো। ঐ মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে দেখতেই লোহার গ্রীলের ঘটাং শব্দে ওর ধ্যান ভেঙে যায়। ওরা পৌঁছে গেছে মূল বাসার সীমানায়। দারোয়ান গেট খুললো সশব্দে। তখন ঘড়ির কাঁটা সকাল ন’টায়।
পিয়ন উমেদাররা সব এগিয়ে এলো। লাগেজগুলো ধরে ধরে সাবধানে নামালো। আব্বু আম্মুকে সালাম জানাল। ও নামল সবার শেষে।
ওর চাচাত বোন দুটির তখনো ঘুম ভাঙেনি। ওদের আসার শব্দে ওরা সব ঘুমানোর পোশাক পরেই সশব্দে বিছানা থেকে নেমে এলো। আনন্দ জড়াজড়ি কোলাকুলি। নাফির মনে হলো সত্যি আজই যেন ঈদ! আজ আবার ঈদ। ঈদের আনন্দ!

চার.
দুপুরবেলায় নাফি খাবার টেবিলে এসে অবাক হয়ে গেল। আস্ত আস্ত মুরগী, বিশাল সব মাছ, খাসির একটা আস্ত রান! কি অবস্থা এটা! ও অবাক হয়ে ওর চাচাত বোন মাঈশাকে জিজ্ঞেস করলো, আপি, তোমরা মুরগী কেটে রান্না করো না? মাছ পিস করো না? এ রকম আস্ত করেই খাসির রান রান্না হয়?
– না ভাইয়া, আমরা কেটেই রান্না করি। ওগুলো গতকাল এক প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে এসছে। এখানে এরা এরকম আস্ত করে রান্না করে।
– ও।
চিটাগাং থেকে ডি. সি সাহেব আসবেন। আম্মু, চাচী আম্মা, বাবুর্চি মিলে হাতে হাতে সব রেডি করলো।
-জানো, ডিসি আংকেল এক জন কবি।
– কবি মানে, যিনি কবিতা লেখেন, তানহা আপু?
– হ্যাঁ, উনার একটা বইও আছে বাজারে। আমাদের বাসায়ও আছে। তোমাকে দেখাবো। উনি আসবেন। আমরা সবাই কবিতা শুনবো।
– তাহলে তো অনেক মজা হবে। ভালোই হবে খুব কাছ থেকে একজন কবিকে দেখতে পাবো।
ঐদিন ওদের অনেক মজা হলো। ডিসি আঙ্কেল, চাচা, আব্বু, আম্মু, চাচী আম্মা আপিরা সবাই মিলে সন্ধ্যায় কবিতার আসর বসলো। কেউ গান গাইলো। কেউ কবিতা আবৃত্তি করলো।
শুধু বিকালে চাচার বাসার বিরাট ক্যাম্পাসটা ঘুরে ফিরে দেখলো সবাই। বিশাল দোতলা বাড়িটার নীচের তলায় ড্রইং, ডাইনিং, কিচেন, গেস্ট, বাবুর্চি, সার্ভেন্ট রুমসহ ভেতরের বাড়িতে খোলা উঠোন। আর দোতলায় রিডিংরুম, লিভিং রুম, এবং আলাদা আলাদা বেড রুম তিনটা। এটাস বাথসহ লম্বা বারান্দায় নান্দনিক সৌন্দর্য সবার মন কাড়ে। নানা প্রজাতির বনসাইসহ বিশাল ফুলের বাগান মূল বাড়ির দু’ধারেই। গেটের দুপাশে সারি সারি পাতাবাহার, বাগানবিলাস, গেটজুড়ে রজনীগন্ধ্যা, ডালিয়া, রঙ্গন, রাধাচুঁড়া, বিভিন্ন জাতের গোলাপের সাথে শীতকালীন মৌসুমী ফুলের নজর কাড়া রং দৃশ্যে ওরা মুগ্ধ। এক পাশে সবজি বাগান। সান বাঁধানো সিঁড়ি ধাপে ধাপে নেমে গেছে পুকুরের নীচ পর্যন্ত। চাষ করা বড় মাছ পুকুরের অল্প পানিতে লাফালাফি করছে। সিঁড়ি ঘেষে ঝাঁকে ঝাঁকে নাইলোটিকা ভেসে বেড়াচ্ছে। এত সুন্দর মন মাতানো দৃশ্য চোখে না দেখলে আন্দাজ করা যায় না- আসলেই তা কতটা সুন্দর!
– জানো ভাইয়া, এই পাঁচিলের ওপাশে বড় ড্রেন আছে। ড্রেন থেকে লাফিয়ে ওঠা ব্যাঙ খায় ওরা।
– কারা খায় ব্যাঙ?
– তারা এখানে থাকে। ওদের বাড়ি ঐখানেই। ঝিনুক আন্টি বলেছে, ওরা তনচংগা।
– সে কী আপু? কেমন দেখতে?
– তুমি জানো না? ওরা উপজাতি।
– ও উপজাতি! মানে তো ওরাও মানুষ। আমি ভাবলাম…
-তুমি দেখেছো?
-না, না, আমি দেখিনি। তবে শুনেছি। ঝিনুক আন্টি দেখেছে। ওরা প্রতিদিন ব্যাঙ ধরে।
– তাহলে চল, আমরা যেয়ে দেখে আসব।
-বাবারে পাঁচিলের ওপাশে যাওয়া যাবে না! আম্মু নিষেধ করে দিয়েছে।
– কেন?
– কেন তাতো জানিনা। তবে যাওয়া যাবে না শুধু এইটুকুই জানি।
-আমরা তো বাড়িতে আশে পাশে সব জায়গায় যাই। এখানে যাওয়া যাবে না কেন?
– তা জানি না ভাইয়া। ওটাতো আমাদের দেশ আমরা যা ইচ্ছা তাই করতে পারি। কিন্তু এখানে তো আমরা…
এইটুকু বলেই তানহা থেমে যায়। আর কথা বাড়ায় না।
কিন্তু নাফির মনে এই আশ্চর্যজনক বিষয়টা ঘুরপাক খেতেই থাকে। তারপরও ও আপুর সাথে বাগানে চলে আসে।
চাচা আম্মার নানা জাতের নানা টবের বনসাইগুলো গেটের দু’পাশের লাইনে সাজানো। গেট থেকে একটু দূরে সরে এসে বড় রডের দোলনা, গোল সেন্টার টেবিলের চারপাশে সাজানো চেয়ার, ফুল তোলা কভারে ঢাকা সুদৃশ্য মোড়া, নিম গাছের মিহি বাতাস, বিকেলের সুবাসিত কফি, মিষ্টি, পায়েশ, ডিসি আঙ্কেলের কবিতা পাঠ সব সবকিছু নাফিকে অন্যরকম ভালোলাগা দেয়। সন্ধ্যার কিছু পরেই ও নীচতলা হলরুমে টিভিতে কার্টুন দেখতে দেখতে ঘুমে ঢুলু ঢুলু করে। আম্মু ওকে খাইয়ে দেন নিজ হাতে।
পরদিন বেশ বেলা করেই ঘুম ভাঙে নাফির। সারাদিনের হৈ হুল্লোড়-ওপর নিচ-আগের রাতের জার্নি ওকে অনেকণ ঘুম পাড়িয়ে রাখে।
ওর ঘুম ভাঙতে না ভাঙতেই তানহা আপুর জোর উল্লাস, এই তো নাফি ভাইয়া উঠেছে। ওঠো ওঠো রেডি হও। আমরা আজ বান্দরবান যাব। পাহাড় দেখব। পাহাড়ে উঠব।
– আম্মু কোথায়?
– নিচে খাওয়ার টেবিলে।
– চল, আম্মুর কাছে যাই।
– ঐ যে ড্রাইভার আঙ্কেল আসছে। মাঈশা আপুর কণ্ঠে ওরা আরো দ্রুত নিচে নামে।
আব্বু আম্মু চাচী আম্মা আর নাফিরা পাঁচ ভাইবোন যখন বান্দরবানের পথে, ওর মেজো চাচা তখন জরুরি মিটিংয়ে। ওদেরকে গাড়িতে তেল ভর্তি করে দিয়ে ড্রাইভারকে সব বুঝিয়ে দিয়ে ওকে যেতে হয়েছে জরুরী মিটিংয়ে। যখনি জোরে কোন ঝাকুনি কিংবা দুলুনিতে গাড়ি জাম্প করে অমনি ওরা ছড়া কেটে গেয়ে ওঠে-
‘মুড়ির টিন মুড়ির টিন-
বাজছে কেমন রিনিঝিন- রিনিঝিন।’
সরকারি পুরোনো মডেলের গাড়িটাকেই ওরা মুড়ির টিন বলে মজা করছিলো। কিন্তু যখন বিভিন্ন জরুরি চেকপোস্টে অন্য আধুনিক মডেলের পাজেরো জীপগুলোকে দাঁড় করিয়ে চেক করছিলো, তখন ওদের ঐ সরকারি পুরোনো মডেলের গাড়িটি দেখেই স্যালুট দিয়ে চেক না করেই সবার আগে ছেড়ে দিচ্ছিলো।
নাফি এসবের ভিতরের কথা বুঝতে পারছিলো না, কিন্তু এটা বুঝতে পারছিলো যে, ঐ রাস্তায় ওর চেয়ে দামী ওর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গাড়ি আর একটাও ছিলো না।
ওদের গাড়ি যখন পাহাড়ের বুক বেয়ে ধীরে ধীরে উপরে ওঠে তখন গাড়ির সপ্রীডও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে ওদের আনন্দ উল্লাস চেঁচামেঁচি। এমন আকাশের কাছে ওরা চলে আসে যেন হাত দিয়ে যে কোন মুহূর্তে আকাশটা, আকাশের মেঘগুলো ছুঁয়ে ফেলবে। আবার যখন ধীরে ধীরে পাহাড় বেয়ে সুড়–ৎ করে সমতল ভূমিতে নেমে আসে তখন অন্য রকম আনন্দ, অন্য রকম উল্লাস, অন্য রকম মজা করে ওরা সবাই। পাহাড়, বৃক্ষ, আকাশ আর সমতল ভূমি ছুঁয়ে ছুঁয়ে ওরা মেঘলা পর্যটন কেন্দ্রে এসে থামে। ওখানে তাঁত শিল্পের মেয়েরা কিভাবে দ্রুত হাতে তাঁত তৈজস বুুনছে বাচ্চাগুলোকে সুতোর দোলনায় শুইয়ে রেখে তা দেখতে দেখতে রাস্তার পাশে চায়ের জন্য থামে। চা খেতে খেতেই দেখতে থাকে পাহাড়ের খাঁজ কেটে তৈরি সিঁড়ি বেয়ে মেয়েরা একই সাথে অনেকগুলো পানি ভর্তি হাড়ি মাথায় নিয়ে কোন কিছু না ধরেই কিভাবে সরাসরি উপরে উঠে যাচ্ছে! বাচ্চাগুলোও কিভাবে অভ্যস্ত এতে। খালি পায়ে দ্রুত তালে উঠে যাচ্ছে তাদের বাসগৃহে, পাহাড়ের চূঁড়ায়।
ফেরার পথে এখানে আবার থামবো বলে গাড়ি রওনা হলো চিম্বুক পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। শুরু হলো নতুন খেলা। দূর থেকে যখনি দেখা যায় গাড়ি এবার পাহাড়ে উঠবে অমনি মাঈশা তানহা চেঁচায়-
‘ড্রাইভার আঙ্কেল গাড়ি থামানÑআমরা হেঁটে হেঁটে পাহাড়ে উঠব।’
বসের মেয়ে বলে কথা! সঙ্গে সঙ্গে ড্রাইভার গাড়ি থামায়।
সবাই দুপ দাপ করে নামতে থাকে। ছুটতে থাকে নির্জন রাস্তা দিয়ে দ্রুত। দৌঁড়াতে থাকে আবার কখনো সখনো। শীতের সকালে ওরা ঘামতে থাকে। ওদের সাথে সাথেই ওদের মতই উপভোগ করে ওদের আম্মু আব্বু চাচীআম্মা।
অনেক দূরের উঁচু পাহাড়ে উঠতে উঠতে গলা ছেড়ে আবৃত্তি করে-
‘চল চল চল
ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল
নিম্নে উতলা ধরণী তল
অরুণ প্রাতের তরূণ দল
চল রে চল রে চল।
চল চল চল।’
যখন হাঁপিয়ে যায় তখন আবারো চেঁচামেচি-
– ‘ড্রাইভার আঙ্কেল, উপরে আসুন। গাড়িতে উঠব।’
ড্রাইভার সাহেব কোন কথা বলেন না। উনিও জানতেন যেন, এভাবেই ওরা এখনি তাকে উপরে যেতে বলবে।

পাঁচ.
অনেক দূর থেকেই জল প্রপাতের ছলাৎ ছলাৎ গান শোনা যাচ্ছিল। অপূর্ব সুন্দর! আবার ওরা গাড়ি থেকে নামলো। দৌড়ে নেমে গেল নীচে। সবাই। কিক! কিক! ছবি তুললো অনেক।
ওখানে কী সুন্দর মেলার মত বাজার বসেছে। বিক্রি হচ্ছে হরেক রকম জিনিসপত্র। গারো মেয়েদের সে বাজার থেকে উলের চাদর, বিছানার বেডসীট, কম্বল, মাফলার আরো কত কী যেন আম্মু চাচী আম্মা কিনল। কিনল কুল তেতুল কামরাঙা আচার আরো কত কী!
শৈলপ্রপাতের একেবারে নীচে নেমে গেলো আপুরা। আব্বুও গেল ওদের সাথে। আম্মুরাও যেতে চেষ্টা করলো কিন্তু তার গভীরতা এবং প্রকৃতি এত ভীতপ্রদ যে যেকোন মুহূর্তে পা পিছলে অনেক গভীরে চলে যেতে পারে। তাই তারা থামলো কিছুটা নেমেই। কিন্তু রোমাঞ্চকর ভীতিপ্রদ আতংকিত সেই শৈলপ্রপাতের একদম শেষ রেখা দেখে ছাড়বেই ছোট আপু। সে ছুটছে তো ছুটছেই। আব্বু তার পেছনে পেছনে যাচ্ছেন। এক সময় ছোট আপু তার পায়ের সেন্ডেল খুলে হাতে নিল। নইলে পা পিছলে যেতে পারে যে কোন মুহূর্তে। এবার আর পায় কে? সে তার অভিযান চালাতে তৎপর যেন। উচ্চ কণ্ঠে ছোট আপু আবৃত্তি করতে থাকে-
থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে
দেখব এবার জগৎটাকে
কেমন করে ঘুরছে মানুষ
যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।
দেশ হতে দেশ দেশান্তরে
ছুটছে তারা কেমন করে,
কিসের নেশায় কেমন করে
মরছে যে বীর লাখে লাখে।
কিসের আশায় করছে তারা
বরণ মরণ যন্ত্রণাকে। …
দৌঁড়ে এসে মাঈশা আপু শুরু করে-
খোকা চায় পাখি- পাখি চায় বন- স্বাধীন মুক্ত প্রাণ,
কণ্ঠে তাহার জাগে ক্ষণে ক্ষণে নীল আকাশের গান।
খোকা ভাবে মনে, এ পাখি তাহার – গান সে শোনায় তায়
জানে না তো কভু কান্না তাহার – সুর হয়ে বাহিরায়।…

-এই মাঈশা শোনো, ওদিকে যেয়ো না  আর।
মায়ের ডাকে থমকে দাঁড়ায় মাঈশা। কিছুণ থেমে সামনে তাকায় আবার। দূরে ছোট আপুকে দেখে দৌড় দেয় সেদিকে।
ওর আম্মু এর মধ্যেই বুঝে গিয়েছে আজ আর কোন শাসন বারণ মানবে না তারা। বাধ্য হয়ে তাই চুপ করে থাকে। নিজেও ওদের পিছু পিছু হাঁটতে থাকে ধীরে ধীরে।
আব্বু আম্মু যতই নিষেধ করুক না কেন, আর যেয়ো না ভিতরে, কিন্তু সে শুনছে না সেসব কিছুই। আর কি করেই বা শুনবে? এত সুন্দর প্রকৃতি যে তার শেষ না দেখে ফিরে আসা যায় না। কিন্তু তার যেন শেষ নেই, তার যেন সমাপ্তির কোন রেখা নেই। এক সময় দেখা গেল পানির রেখা ঘন কালো হয়ে শাখা নদীর খালের মত অনেকটা শান্ত ধীর চলছে আয়েশে। দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ দিগন্ত রেখা নীল আকাশ সীমানার অনন্ত রং সোনা রোদ ঝিরি ঝিরি বাতাস, মাঠ ভরা সোনালী ধানের দুলে ওঠা, আহ! কী সুন্দর! এক সময় শান্ত হল আপুরা সবাই। নাফির পায়েও হালকা বালু মিশ্রিত কাদা। সেও পায়ের কেড্স খুলেছে আপুর দেখাদেখি। ক্যামেরায় ছবি উঠছে কিক কিক।
শৈলপ্রপাত থেকে উপরে উঠে এসে আবারো চা পান করলো সবাই। সুন্দর কেক বিস্কিট ছোট ছোট কলা আর লাল চা। দোকানের সামনে সারি সারি বাঁশের বেঞ্চ লাগানো। আপুরা আচার খেলো কাড়াকাড়ি করে। কেনাকাটা রেস্ট চা সব শেষে ওরা চললো চিম্বুক পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। চিম্বুক পাহাড়ের সুউচ্চ মিনারে যখন পৌঁছলো তখন সূর্য একটু হেলে পড়েছে মাথার উপরে। হাত দিয়ে মেঘ ছুঁয়ে রোদ ছুঁয়ে দূরে জমে থাকা কুয়াশার চাদর দেখে অসম্ভব অনন্ত সুন্দরের মাঝে মিশে যেয়ে যখন বান্দরবান রেস্টহাউসে পৌঁছলো তখন ঘড়িতে প্রায় তিনটা। ওখানকার খানসামারা সব ব্যস্ত হয়ে উঠলো। রেস্টহাউসের রুমগুলো সব খুলে দিল। গাড়ি থেকে নামালো দুপুরের লাঞ্চ। চাচী আম্মা টিফিন কেরিয়ার ভর্তি ভুনা গোস্ত ভুনা খিচুড়ি সালাতের জন্য শসা পিয়াজসহ কোল্ড ড্রিঙ্কস সবই নিয়েছে গাড়িতে। খানসামারা সব ডাইনিং টেবিলে থরে থরে সাজিয়ে দিলো রেস্টহাউসের প্লেট গ্লাস পানির জগ। সালাদ তৈরি করে দিল। পাশের হোটেল থেকে আনল ওখানকার নামকরা দই।
আয়েশ করে খেয়ে নামাজ পড়ে একটু রেস্ট নিয়ে বেরিয়ে পড়লো সবাই। ফেরার পথে  মেঘলা  পাহাড় মেঘলা পর্যটন কেন্দ্র ঝুলন্ত ব্রীজ এইসব দেখার ইচ্ছেয় বান্দরবান থেকে সবাই দ্রুত গাড়িতে উঠে এসে বসলো।
মেঘলা পাহাড় ঘেষে ধাপে ধাপে সিঁড়ি বেয়ে বহুদূর পর্যন্ত নীচে নেমে গেল ওরা। লাইন দিয়ে বসানো আছে সিমেন্টের চেয়ার। ওখানে বসে চাচী আম্মা কেমন ভাবুক হয়ে গেলেন।
– কী ব্যাপার? তুমি কোথায় হারিয়ে গেলে মুকু?
আমি একটা কবিতা পড়বÑ বলেই সঙ্গে সঙ্গে শুরু করে তানহাÑ
মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।

তুমি যাচ্ছ পাল্কিতে, মা চ’ড়ে
দরজা দুটো একটুকু ফাঁক ক’রে,
আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার ’পরে
টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে।
রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরে খুরে
রাঙা ধুলোয় মেঘ উড়িয়ে আসে।।
কবিতার ধুম লাগে যেন। নাফিও সবার দেখাদেখি আবৃত্তি শুরু করে-
একটি ছেলে
পড়া ফেলে
সন্ধ্যা থেকে
আঁকছে বসে ছবি
গাঁয়ের ছবি
নায়ের ছবি
দিগন্ত মাঠ
পথের রেখা সবি।
মা বলছেন
পড়তে বসো
ইংরেজি বা অংক কষো
সন্ধ্যা হতেই পাঠটা গেল চুকি?
কিন্তু তাহার দুষ্টু ছেলে
পাতার উপর পাতা মেলে
আঁকছে আঁকিবুকি
সব ভুলে সে খাতার উপর ঝুঁকি…
সবার অজান্তেই বড় মেয়ে হঠাৎ কড়া অভিভাবক হয়ে যায় যেনÑ কী ব্যাপার তোমাদের বলোতো? এই দূর দেশে কি তোমরা কবিতা পড়তে এসেছো? ওপারে যাবে না? চলো তো। এখনি সন্ধ্যা নামবে যে!
– তাই তো চলো। দেখ দেখ কী সুন্দর চিলগুলো দূরে তাদের সোনালী ডানায় রোদ মেখে ঘরে ফিরবার প্রস্তুতি নিচ্ছে যেন।
এক অপরূপ ভালো লাগা মেখে নিয়ে কাঠের ঝুলন্ত ব্রীজ পার হয়ে ওরা পৌঁছে গেল ওপারে। অবিন্যস্ত কলাবাগান হাতিদের দূরে ঘুরে বেড়ানো আস্ত কলাগাছ টেনে খাওয়া দেখতে দেখতে ওরা পৌঁছলো মেঘলা চিড়িয়াখানায়। চিড়িয়াখানায় ছোট বড় খাঁচায় রয়েছে বেশ কিছু জীবজন্তু। ওখানে ঘটল আশ্চর্য রকম এক ঘটনা। তানহা আপু বানরের খাঁচার গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে দেখছিল। দূরে একদল দুষ্টু ছেলে বানরদের খেপাচ্ছিল। সবার অজান্তে সেই খাঁচা থেকে একটি বানর দৌঁড়ে এসে তানহা আপুর ছোট চুলের ঝুঁটি ধরে টানছিল। নাফিরা কেউ বিষয়টি খেয়াল করেনি। কিন্তু যে ছেলেগুলো বানরদের খেঁপাচ্ছিল ওরাই দৌঁড়ে এসে বানরের কবল থেকে তানহাকে ছাড়িয়ে নেয়। ভাগ্যিস তেমন কিছু হয়নি।
ওরা ঘুরে ঘুরে দেখছিলো সব। এ ওর মত ডাকছিলো সবাই সবাইকে। তখন হয়তো নাম শুনেছে ওরা।
“মাঈশা, চন্দনাঈশ যাইবা?”
সেই ছেলেগুলোই আবার মজা করছিলো ওদের সাথে। পিছু পিছু আসছিল। শেষ পর্যন্ত যখন দেখল ওরা টিএনওর গাড়িতে উঠল, অমনি ছেলেগুলো দে ছুট!
মেঘলা ঝুলন্ত ব্রীজ চিড়িয়াখানা পর্যটন কেন্দ্র দেখে গাড়িতে উঠতে উঠতে সন্ধ্যা। বাসায় ফিরতে ওদের রাত হয়ে গেল বেশ।
বাসায় ফিরে এলে ওর চাচা ওদের সাথে যেতে পারে নি বলে খুব আফসোস করছিল। পরদিনও ঠিক এগারটায় শুরু হবে মিটিং ওর অফিসে। নিঃশব্দ পরিবেশ নীরবতা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সব মিলিয়ে ওর চাচা ভীষণ টেনশানে আছেন। ওরা এ বেলায় আর বের হবে না। টিভি দেখে ওরা দুপুরটা ঘরে বসে কাটায়। বিকালে গেল স্থানীয় মাইজবিলা গুচ্ছগ্রাম এবং ওখানকার বিশেষ আলোচিত স্থাপনা  রাবার ড্যাম্প দেখতে। সে দৃশ্য নিজের চোখে না দেখলে বোঝার উপায় নেই। বড় রাবার দিয়ে কি করে পানি আটকেছে। রাবার  ব্রীজের এপাশে পানিতে উত্তাল ঢেউ, ওপাশে চিকন রেখার মত ঠাণ্ডা নরম পানির বয়ে যাওয়া। অবাক ব্যাপার!
নাফি এই সব বিষয় নিয়ে ভাবতে ভাবতেই দেখতে পায় ওদের গাড়ি নব্বইটি পরিবার নিয়ে গড়ে ওঠা মাইজবিলা গুচ্ছ গ্রামে। প্রতিটি পরিবারের জন্য আলাদা আলাদা ভাবে তৈরি একেকটি বাড়ি। সে বাড়িতে শোবার ঘর, রান্না ঘর, টয়লেট, একটু ছড়ানো উঠোন, সবজির বাগান, হাস মুরগির খামার, লাল সূর্য, টুকরো টুকরো মেঘের উড়োউড়ি সে এক অপূর্ব দৃশ্য।
ছোট্ট ছোট্ট চায়ের দোকান। জটলা জটলা আড্ডা। গুচ্ছ গ্রামে গাড়ি ঢোকার সাথে সাথে মাতব্বরসহ গ্রামের লোকজন সব হাজির। ছোটাছুটি আদর আপ্যায়ন। ঐ গভীর গ্রামেই মুহূর্তে এসে গেল আপেল, আঙ্গুর, কলা, বিস্কিট, কেক, বরই, দুধ চা।
অভিভূত হয়ে যায় নাফিসহ ওরা সবাই।
ফেরার পথে নাফিদের চলন্ত গাড়ির সামনে নাফি গাড়ির হেডলাইটের আলোয় দেখতে পায় তাড়া খাওয়া খরগোশের ভয়ার্ত মুখ। ওরা নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ায়, ছুটে বেড়ায় রাস্তায়। এভাবে গাড়ির মুখোমুখি হয়ত খুব বেশি হয়নি। তাহলে নিশ্চয় সতর্ক থাকত। তারপরও গাড়ি থামে না। কারণ ফিরতে হবে তাড়াতাড়ি। আজ ওখানকার স্থানীয় চেয়ারম্যানের বাড়িতে দাওয়াত। বাসায় ফিরে রেস্ট নিতে না নিতেই পাশের ফাট থেকে আসেন কবি ঝিনুক জোবাইদা।
– ভাবী, আপনাদের দাওয়াত করতে আসলাম। ভাবীদেরসহ আপনাদের কাল দুপুরে আমার বাসায় দাওয়াত।
কথাগুলো বলতে বলতে টেবিলে নামিয়ে রাখেন রান্না করা গরুর আস্ত নলা। এটা ওদিককার প্রিয় খাবার। গরুর রানের নীচের অংশ আস্ত করে ধনে পাতা দিয়ে রান্না করা। ওটা নিয়ে সকলে মিলে খাওয়া শেষ করতে না করতেই গাড়ির হর্ণ বেজে ওঠে সশব্দে।  চেয়ারম্যান সাহেব দুটো গাড়ি পাঠিয়েছেন ওদের সকলকে নিয়ে যাবার জন্য। অনেক পীড়াপীড়িতেও চেয়ারম্যান সাহেবের এই দাওয়াতের হাত থেকে রা পাওয়া যায়নি।
অবশেষে কী আর করা? আঁকাবাকা রাস্তা পাহাড় সমতল ভূমি মাঠ পেরিয়ে চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়িতে যেয়ে ওরা দেখল হুলস্থুল ব্যাপার!
টেবিলে বিশাল এক সিংহ দাঁড়িয়ে আছে কেশর দুলিয়ে। ড্রইংরুমের এক পাশে আয়েশে শুয়ে আছে মা বাঘিনীটা। কোনভাবেই বোঝার উপায় নেই ওগুলো আসল নাকি ডুপ্লিকেট! নাফির মনটা ভয়ে কেঁপে ওঠে। মায়ের কাছ ছাড়া হয় না সে। ডাইনিং টেবিলে যেয়েও চোখ ছানাবড়া। বড় সাইজের বারটা মুরগির আস্ত রোস্ট। খানজা সাজানো পঁচিশটি কবুতরের ফ্রাই। বেশ কিছু গরুর নলা, বড় রুপচাদা,  পাঁচ-ছয় কেজি ওজনের আস্ত রুই মাছের ফ্রাই সাজানো টেবিলের মাঝখানে। চারপাশে আছে খাসির রেজালা, কই, মাগুর, গলদা চিংড়ি, ইলিশ,  পোলাও, পরোটা, চৌদ্দ রকম নাস্তাÑনাফি অবাক হয়ে ভাবছে এ কোথায় এলাম? এরা মাছ মুরগি গরু খাসী কাটতে জানে না?
বিভিন্ন রকম ফিরনী, পায়েশ, পিঠা, পুডিং, কাষ্টার্ড, কেক, আপেল, মিষ্টি, বেদানা, কমলা, আঙ্গুর, চা, কফিÑ সে এক এলাহী কাণ্ড কারখানা। এলাহী কাণ্ড কারখানা তাদের বাড়ির নির্মাণ শৈলীতেও। চিটাগাংয়ের আদি বনেদী ফ্যামিলি এরা। বিশাল বিশাল ব্যবসা। চাচী আম্মার মুখে শুনেছে- যে নতুন টিএনও আসুক না কেন তারা এভাবেই আপ্যায়ন করে।
চেয়ারম্যান মুখ কাঁচুমাচু করছে, স্যার, কিছু খাওয়াতে পারলাম না।’
ওর চাচা তত ধমকাচ্ছেন, আরে করেছেন কী? আগে জানলে আমি কিছুতেই আসতাম না।
– না স্যার,  দেশ থেকে বড় ভাই ভাবী এসেছেন। বাচ্চারা এসেছে। না আসলে কি হয় স্যার?
মুমু, মুনা, নাফি বুঝতে পারে না কেন সারাণ ওর চাচা তার মুখটা গোমরা করে রেখেছিল। পরে বুঝল উদ্দেশ্য অন্যকিছু। যে কর্মকর্তা আসেন তাদেরকে এরা এভাবেই তাদের ব্যবসার স্বার্থে খুশি রাখতে চায়। রাখে। কাউকে পারে কাউকে পারে না।

ছয়.
পরদিন ভোর হল। আবার উল্লাস আনন্দ চেঁচামেচি।
‘হৈ হৈ রৈ রৈ।
পাতে পাতে চিড়ে দই।’

একবার উপর তলা একবার নীচ তলা। এই করে কেটে গেল সকাল বেলা।
আটটা বাজতে না বাজতেই ড্রাইভার এসে হাজির। আজ ওরা যাবে কক্সবাজার। যাবার পথে ডুলা হাজরা সাফারী পার্ক দেখে যাবে। দেখবে বহু আকাক্সিত সমুদ্র নীলের বন্যা। সেন্ট মার্টিন দ্বীপের স্বচ্ছ পানিতে রঙিন মাছদের ঘোরাঘুরি দেখবে।
সকালে বাসায় নাস্তা করা যাবে না। দেরি হয়ে যাবে। নাস্তা বাইরে সারতে হবে অথবা গাড়িতে।
বাসা থেকেই ওরা সবজি, ডিম ওমলেট, সেমাই, মিষ্টি, বড় ফাস্ক ভর্তি চা নিয়ে নিল গাড়িতে। রাস্তায় ভালো রেস্টুরেন্ট থেকে পরোটা নিয়ে নিলেই গাড়িতে বসে নাস্তা করা যাবে। সময় বাঁচবে তাহলে।
দুই পাশে সারি সারি বন। শাল, সেগুন, মেহগনি, দেবদারুদের সারি, ছোট নদী পিছনে ফেলে ওদের গাড়ি ছুটে চলছে সশব্দে। গাড়িতেই খাওয়া হচ্ছে। গল্প, গান, হাসি ইচ্ছেমত চা। আজ চাচা আছেন সাথে। অন্যরকম আনন্দ।
ওদের গাড়ি একেবারে ডুলা হাজরায় এসে থামলো। টিকেট কেটে ওরা ঢুকলো ডুলা হাজরা সাফারী পার্কে। গেটের সামনেই বিশাল ডাইনোসরের মূর্তিটা জীবন্ত হয়ে ধরা দিল ওদের কাছে। এতই জীবন্ত যে ওর গায়ে হাত দিতে ভয় পায় নাফি। এ পাশে গবেষণা কেন্দ্র, ওপাশে প্রশিণ কেন্দ্র, মাঝখানে বাগান, সারি সারি পথ। অভয়ারণ্য, গাড়ি এ্যালাউ। দুই পাশে গভীর কৃত্রিম বন। মাঝখানে গড়ি চলছে ধীরে ধীরে। বন কাঁপিয়ে ডেকে উঠছে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ানো হাতির পাল, ঝাঁক ঝাঁক হরিণ, বন গরু, বানর, শেয়াল। একটু এগিয়েই বড় খাঁচায় ময়ুরের পেখম তোলা, বড়-ছোট খাঁচায় কুমিরের রোদ পোহানো, আয়েশি ভঙ্গিতে শুয়ে থাকা। গভীর বনে গাঢ় অন্ধকার, গা ছমছমে ভয়। মনে হয় যেন সত্যিকারের কোন গহীন অরণ্যে এসে পড়েছে ওরা। নাফি মায়ের কাছ থেকে একটুও সরে না আর! যখন তখন যে কোন ভয়ঙ্কর পশু ওদেরকে আক্রমণ করবে।
একটা নির্দিষ্ট সময় পর পর্যন্ত আর গাড়ি এ্যালাউ নয়। সেখান থেকে পায়ে হাঁটা পথ। একবার উঁচু একবার নীচু। হঠাৎ হঠাৎ সামনে পড়ছে একেক ধরনের জীব জন্তুর আবাস স্থল। স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ানো হাতির পিঠে ছবি তুলছে কেউ কেউ। অনেক চেষ্টা করেও নাফিকে হাতির পিঠে উঠানো গেল না। তবে পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলল ওদের সাথে সবাই। অথচ হাতির পিঠে উঠবার শখ ওর অনেক আগের থেকেই। যখন টাউন হল ময়দানে সার্কাস পার্টি এসেছিল তথন থেকেই ওর হাতির পিঠে উঠবার শখ। কিন্তু সুযোগ যখন হাতের মুঠোয় এল তখন আর উঠবে না বলে কান্না জুড়ে দিল।
সব ঘুরে ঘুরে দেখল ওরা। তারপর ওখান থেকে হালকা চা নাস্তা সেরে গাড়িতে এলো ওরা। গাড়ি চলতে শুরু করল স্বপ্নের কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। দু পাশে অসম্ভব মনোরম দৃশ্য। লাল পাহাড়, শাল সেগুনের দীর্ঘ বন ছাড়িয়ে অনেক দূর থেকেই  যখন সাগরের রেখা আর গর্জন শোনা যাচ্ছিল তখন ঘড়িতে বেলা বারটার কাটা ছুঁই ছুঁই। অনেক দূর থেকেই সাগর ওদেরকে হাতছানি দিচ্ছিলো শব্দে আর সৌন্দর্যে। মাইলকে মাইল সমুদ্রের বীচ দেখতে দেখতে ওদের নাগালের সীমায় চলে এলো অবশেষে।
গাড়ি থেকে দৌড়ে লাফিয়ে নেমেই ওরা ছুটে চললো সাগরের নীল পানিতে পা ডুবানোর জন্য। দ্রুত হাতে পরে নিল সাগরে নামার পোশাক। ওদেরকে বীচ লাবনীতে রেখে ওর চাচা চাচীআম্মা গেল রেস্টহাউসের ব্যবস্থা করতে।
ওর আব্বু ছাতা ভাড়া করলো দুটো। সেখানে ওদের বাড়তি কাপড় ব্যাগ রেখে নেমে গেল সাগরের দুরন্ত জলের সাথে দুরন্তপনায়!
বিশাল সমুদ্রের ঢেউ গভীর নীল দেখতে দেখতে নাফি নিজেকে আবিষ্কার করলো একেবারে একটি বালুকণার মত। কি বিশাল কি বিরাট কি মহিমান্বিত কি আশ্চর্য কি সবল কি সহজ কি বিরাট বিরাট সমুদ্রের ঢেউ! কিন্তু ও যেন একটুও ঘাবড়ালো না। যে জীবনে সামান্য পুকুরের পানিতে পায়ের পাতা ডুবায়নি সে কেমন অবলীলায় হাফ প্যান্ট পরে একা একা নেমে গেল পানিতে। কোন চিৎকার নেই, কোন চেঁচামেচি নেই। শুধু উল্লাস শুধু ভালোলাগা ভালোবাসা, গভীরের সাথে মিশে যাওয়া। মাথার উপর খোলা আকাশ, দূরে দিগন্তে মিশে যাওয়া গভীর সমুদ্র- কী বিরাট সৌন্দর্যের মাঝখানে এসে পড়ল ওরা! উড়ে বেড়ানো হাজারো পাখির ডেকে ওঠা নাম না জানা পাখির ঝাঁক- কিচির মিচির।
বড় বড় ক্যামেরা ঘাড়ে করে ক্যামেরাম্যানরা বেড়াচ্ছে যত্রতত্র। নিবেদিত প্রাণ এরা, ছবি তুলবেন আপা? ছবি তুলবেন? খুব বড় করে সুন্দর ছবি হবে আপা।
নাফির আম্মু আগেই ওর চাচার কাছ থেকে শুনেছিল এরা খুব সুন্দর ছবি তোলে। যদিও একটা দুইটা ছবির কথা বললে তুলবে আট দশটা। কিন্তু ডেলিভারীর সময় সুন্দর ছবিগুলো দেখলে কেউ আর রাগ করে না। বরং ক্যামেরা ম্যানকে ধন্যবাদ দেয়। ওদের ছবি তোলা দেখে ওর আব্বু হঠাৎই ভীষণ রেগে যায়, নিজেদের ক্যামেরা রেখে ওদের কাছ থেকে ছবি তুলবার দরকারটা কি?
ওর আম্মুর বেশ মন খারাপ হলো। তা সত্ত্বেও বেশ কয়েক স্নাপ ছবি তুললো সবাই।
দূর থেকে সাগরের ঢেউগুলো যখন পাহাড়ের মত ধেঁয়ে আসছিল তখন ভীষণ ভয় করছিলো। কিন্তু ঢেউগুলো যখন কূলে এসে পায়ের কাছে আছড়ে পড়ে মিলিয়ে যাচ্ছিলো তখন ওর কাছে ম্যাজিক মনে হচ্ছিল সেসব। আনন্দে লাফালাফি করছিল। ওর মনে পড়ে গেল গত বছর নানাবাড়িতে পুকুরে মাছ মারার দৃশ্য। ঘোলা পানিতে পা ভিজানোর দৃশ্য। সে রকম ঘোলা পানির মধ্যে বালির সাথে স্রোতের সাথে উঠে আসছে শামুক ঝিনুক লাল নীল রংয়ের অপূর্ব সব সমুদ্র সম্পদ। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা ঝিনুকের ঝাড়বাতি মালা দুল আরো কত কি নিয়ে ছুটে ছুটে বেড়াচ্ছে।
Ñনিন আপা দশটাকা।
নাফির আম্মু ওদের প্রতি দরদ নিয়েই প্রয়োজনবিহীন কিছু জিনিস কেনে। কফি ঝালমুড়ি ডাব ক্যান্ডি কত কি খেতে থাকে ওরা। বড় বড় ঢেউয়ে ভিজতে থাকে। আকাশ কাঁপানো রোদে শুকাতে থাকে, বাতাসে বাতাসে ওদের চুল ওদের জামা ওরা নিজেরাও উড়তে থাকে। টায়ারে ভাসতে থাকে। ক্যামেরায় ছবি তুলতে তুলতে ওরা আনন্দ করতে থাকে। এর মধ্যে ওর চাচা চাচীআম্মা ফিরে এসেছে রেস্টহাউসের সীট বুক করে। এবার চাচা চাচীআম্মার সাথে মিলে আরো মজা।
ধীরে ধীরে জোয়ারের পানি কমতে থাকে। ওদের ছাতাগুলোও সরতে থাকে। সী বিচ আরো বড় হতে থাকে। আস্তে আস্তে একটু ভিড় পাতলা হয়ে আসে। ওরা ফিরে যায় রেস্টহাউসে।
বক্স ভর্তি গরুর গোস্ত ভুনা রুই মাছ ফ্রাই সবজি চিকন চালের সাদা ভাত বের করে ওর চাচী আম্মা। পিয়ন রেস্টহাউসের থালা গ্লাস সার্ভ করে। পর পর তিনটে রুম নিয়েছে ওরা। অনেক বড় বড়। সুন্দর পরিপাটি বিছানা থরে থরে সাজানো। কে কোন খাটে রাতে ঘুমাবে তাই নিয়ে হৈ হুল্লোড়ে মেতে ওঠে নাফি মাঈশা তানহা। মুমু মুনা সবাই।
নাফির এখানে এসে অন্য রকম ভালো লাগে। কী যে ভালো লাগে ও তা বোঝাতে পারবে না। কাউকে বলেও বোঝাতে পারছে না। শুধু মনে হচ্ছে স্বপ্ন  স্বপ্ন। কেন যে আরো আগে ওরা সমুদ্র দেখতে আসেনি?
ড্রেস চেঞ্জ করে লাঞ্চ সেরে ওরা তাড়াহুড়ো করে বের হলো আবার। ওদের গাড়ি ছুটে চললো সমুদ্রের দিকে। দূর থেকে সমুদ্রের গর্জন ওদেরকে হাতছানি দিতে লাগলো। তবে এই সময়ের গর্জনে যেন কেমন কান্না কান্না ভাব। ও বেলার গর্জনে মনে হচ্ছিল হুঙ্কার আর বেলাশেষের বেদনায় একাকীত্বের যন্ত্রণায় সমুদ্রের গর্জনে যেন কান্না মিশে আছে।
যে যার মতো সূর্যাস্ত উপভোগ করতে থাকলো ওরা। হঠাৎ করে নাফি এবং ওর আম্মু আবিষ্কার করলো ওদের পাশে কেউ নেই। শুধু ওরা দুজন। চাচা চাচী আব্বু আপুরা সব কোথায়? এরই মধ্যে দেখা গেল একজন বয়স্ক মহিলা তার ছেলেকে খুঁজতে খুঁজতে কাঁদছে আর চেঁচামেচি করে দৌঁড়াচ্ছে। নাফিও মহিলার ছেলেটার জন্য চিন্তিত হয়ে পড়ল। কী অবাক ব্যাপার! এক সময় নাফিই ছেলেটিকে খুঁজে পায় সমুদ্র তীরের একপাশে। মায়ের কাছে দেবার পর মহিলা যে কী খুশি হলো ওকে জড়িয়ে ধরে। আদরে আদরে দোয়ায় দোয়ায় শুভ কামনায় তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। নাফির আম্মু শুরু করলো মোবাইলে রিং করা। যেখানে রিং হয় সেখানেই ব্যস্ত। বেশ খানিকটা পর মোবাইলে পাওয়া গেল সবাইকে। ওরাও নাফিদের খুঁজছে ঐভাবে আলাদা আলাদা হয়ে। যার যার মত সূর্যাস্ত দেখে ওরা সবাই মিলেমিশে এক জায়গায় হয়ে গেল বার্মা মার্কেটে। ইচ্ছেমত কেনাকাটা করে শহরের সুন্দর রেস্টুরেন্টে গেল সান্ধ্যকালীন চা নাস্তা খেতে। বার্গার ত›দ্রুর শিক কাবাব চা কোক কফি আইসক্রিম যার যার ইচ্ছেমত।
নাফি একটা ত›দ্রু এবং কিছু শিক কাবাব নিল। কিন্তু ওর খাওয়ার চাহিদা খুবই কম। চাচাদের বিভিন্ন গল্প শুনতে যেয়ে ওর আর বেশি খাওয়া হল না। সেন্টমার্টিনের গল্পÑআনন্দ সবার মধ্যে একটা স্বাপ্নিক আবহ তৈরি করে দিয়েছে। সেখানে ছোট ছোট বিষয়ের যেন কোন গুরুত্বই নেই। বিশাল আকাশের মত হয়ে গেছে সবার মন। লজ্জা, ভয়, উৎকণ্ঠা সব দূর হয়েছে মুহূর্তে। এক নিমিষে সাহসের পাখায় উড়াল দিচ্ছে যেন সবাই। এইভাবেই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পাল্টে গেল নাফিও। কাউকে কিছু না বলে সে খুব বড় মানুষের মত হাতের ইশারায় দোকানের ওয়েটারকে ডাকল।  সে কাছে এলেই বিজ্ঞের মত বলে ফেলল, আঙ্কেল একটা পলিথিন দেন তো।
ওয়েটার বাচ্চা একটা ছেলের মুখে এত সাবলীল পলিথিন চাওয়ার কথা শুনে হকচকিয়ে গেল যেন। আস্তে করে বলল
-এই তো আঙ্কেল দিচ্ছি।
ঘটনার আকস্মিকতায় ওর বড় আপু ছোট আপু আম্মু সবাই এক সাথে বলে উঠল, কেন পলিথিন দিয়ে তুমি কি করবা?
-আমি আর খাব না। আমার খাবারগুলো নিয়ে যাব রেস্টহাউসে। ওখানে যেয়ে খাব। রাতে আমি আর ভাত খাব না।
কথাগুলো বলেই মুখটা লজ্জায় লাল করে ফেলল যেন।
ও এমন আবেগের সাথে বড় মানুষের মত করে কথাগুলো বলল যে, কেউ আর ওর কথার কোন উত্তর দিতে পারল না। সবাই একসাথে হেসে উঠল। তাতে ও যেন আবার একটু লজ্জা পেল। কিন্তু আনন্দের আতিশয্যে কোন অভিযোগও করল না। বরং ও-ও ওদের সাথে একসাথে হাসিতে ফেটে পড়ল।
-ভাই আমরা সেন্টমার্টিনের টিকেট কেটে রেস্টহাউসে ফিরে যাব এবার।
চাচা আব্বুকে কথাগুলো বলতে না বলতেই আপুদের উল্লাস আবারো ঝরে পড়ে বাতাসে।
– ও সেন্টমার্টিন কী মজা! আপুরা সব একসাথে চিৎকার করে উঠল। চাচা বললেন-
– শোন, সেন্টমার্টিন হচ্ছে বাংলাদেশের সুইজারল্যাণ্ড। যা বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ। এ দ্বীপের মূল আকর্ষণ সামুদ্রিক কাঁকড়া, কাছিম, প্রবাল, মুক্তা আর বিভিন্ন প্রজাতির মাছের প্রাকৃতিক অ্যাকুরিয়াম। বিমোহিত করবার মত জিনিস সব। না দেখলে বোঝা যাবে না কী অপরূপ স্বচ্ছ পানিতে ঝাঁক ঝাঁক মাছেদের ঘুরে বেড়ানো। কী যে অসম্ভব সুন্দর, কী যে অসীম সুন্দর চোখে না দেখলে আন্দাজ করা যাবে না। ঐ পানিতে পা ডুবানো হাত ছুঁয়ে থাকা  কী রকম ভালো লাগা সব দৃশ্য!
– ও! কী মজা!
– কিন্তু একটা কথা আছে…
– কী কথা চাচা?
-যাবার সময়ে কিন্তু লঞ্চ ডুবে যাবার উপক্রম হয়। ঢেউয়ের তালে ভেসে থাকা লঞ্চ কিন্তু সহজেই ডুবে যেতে চায়। তখন আবার কান্নাকাটি করলে চলবে না। বুঝেছো তো সবাই?
-বুঝেছি, ডোবার মত হয়, কিন্তু ডোবে না। তাই তো?
নাফির কথায় চাচা আশ্চর্য হয়ে বলে ওঠেন, কী ব্যাপার নাফি তুমি এত বুদ্ধি কোথায় পেলে?
– কেন, আপনিই তো বললেন চাচা, ডুবে যেতে চায়, ডোবার মত হয়। তাই আমি বললাম। ডুবে তো আর যায় না।
-তুমি ভয় পাবে না? এরকম হলে তুমি কাঁদবে না তো।
-না, কাঁদবো কেন? সবাই তো থাকব। তাহলে আর কান্না কেন? আমার ম্যাডাম বলেছেন সবকিছু। ভয় পেলে চলবে না। ওরকম হবেই।
-বাব্বা রে, তাহলে তো আর কোন ভয় নেই আমাদের? কী বলো সবাই?
– হ্যাঁ, অবশ্যই। কেন ভয় থাকবে আমাদের? আমরা সবাই অনেক বেশি বেশি মজা করব।
এক সঙ্গে বাচ্চারা সবাই চিৎকার করে ওঠে, চাচা ঐখানে তো অনেক নারকেল গাছ আছে। আর কী কী আছে?
– শোন, সারাদিন দেখবার মত অনেক কিছুই আছে। বিস্তীর্ণ এলাকা, রেস্টহাউস, হোটেল, মোটেল, দ্বীপ অনেক কিছুই আছে।
নাফির আব্বু ও চাচা গেল আগামীকাল ভোরের  সেন্টমার্টিনের টিকেট কাটতে। ওর আম্মুরা কেনাকাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আর ওরা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলো কক্সবাজারের রাতের দৃশ্য।
কিছুণ পর ওর আব্বু চাচা ফিরে এলো থমথমে মুখ নিয়ে।
– কী ব্যাপার?
উনাদের থমথমে মুখ দেখেই আম্মু কি কিছু আঁচ করতে পারলো?
– সেন্টমার্টিন যাওয়া যাচ্ছে না।
– কেন?
চাচীআম্মার উদ্বিগ্ন মুখ চকিত ওদের মুখ ঘুরে আসে।
-অবরোধ শুরু হবে। আগামী পরশু থেকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য অবরোধ। এ খবর শোনার সাথে সাথে ভাই সেন্টমার্টিন যাবার প্রোগ্রাম বাতিল করেছে। ভাইদেরকে আগামীকাল বাড়িতে ফিরে যেতে হবে। ভাবীরও অফিস খুলে যাবে এরইমধ্যে।
-কী আশ্চর্য?
-আশ্চর্যের কী হলো? সেন্টমার্টিন গেলে আমাদেরকে লোহাগাড়ায় আটকে থাকতে হবে। বাড়িতে ফেরা হবে না। অফিসের ছুটি শেষ। ঈদের ছুটি শেষে অফিসে জয়েন করতে হবে তো? না কি?
– তা তো, আমারও অফিস…
নাফির আম্মু আব্বুর চিন্তারেখা একে একে সবার মধ্যে অনুরণিত হলো। বিষাদের ছায়া পড়লো সবার মুখে। ওরা রেস্টহাউসে ফিরে গেল মন খারাপ নিয়ে। ওদের বহু আকাক্সিত রেস্টহাউসের বিছানায় ঘুম হবে না। ছোটদের বিছানা কাড়াকাড়ির আনন্দ মাটি হয়ে গেল মুহূর্তেই।
পিয়ন ড্রাইভার একে একে রেস্টহাউস থেকে লাগেজগুলো বের করতে লাগলো। দূরে তখন অনেক রাতের ঘণ্টা বাজছে। নাফির মনটা হঠাৎই কান্নায় উপচে ওঠে। ও চুপ করে থাকে। খানিকণ পর অনুভব করে সন্ধ্যার সমুদ্র কি তার কান্নার আওয়াজ দিয়ে তাদেরকে বিদায় জানাচ্ছিল? ও কান পাতে। আবারও সমুদ্রের গর্জন ওর বুকে কান্না হয়ে আছড়ে পড়ে। গাড়ি ছুটে চলছে দ্রুত। গাড়ির শব্দের সাথে ওর কান্নার শব্দ একাকার হয়ে যায় যেন। ওর আম্মু টের পেয়ে ওকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরেন।
Ñকেঁদোনা। আব্বু কেঁদোনা। তোমার  ছোট আপুর ফাইনাল পরীার পরই আমরা আবার আসব। আবার এসে আমরা সরাসরি সেন্টমার্টিনে যাব।  কেঁদো না আব্বু প্লিজ!
ওর আম্মুর আদরে ও সান্ত্বনায় নাফি ধীরে ধীরে শান্ত হয়। নিকট ভবিষ্যতে আবার আসতে পারবে বলে আনন্দে হেসে ওঠে। সে হাসি অন্ধকার রাস্তার শত শত জোনাক পোকার আলোর সাথে মিশে যায়। সে হাসি হাজার তারার ঝিলিকের সাথে একত্রে হেসে ওঠে যেন। ও জোরে চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে, আমরা আবার আসব। তখন শাহিনকেও অবশ্যই নিয়ে আসব। তখন আরো অনেক মজা হবে।
সুন্দর রাতের মোহনীয় দৃশ্য দেখে ওর বড় আপু আবৃত্তি শুরু করে-
‘আমাদের সময় হলো যে যাবার-
বিদায় সমুদ্র, বিদায় পাহাড়
খুব শ্রীঘ্রই দেখা হবেই আবার
ভালো থেকো, বিদায়,
শুভ বিদায়, শুভ বিদায়…।’

SHARE

Leave a Reply