Home নিয়মিত ঈদের আনন্দ আয়োজনে ওরাও থাকুক পাশে

ঈদের আনন্দ আয়োজনে ওরাও থাকুক পাশে

হারুন ইবনে শাহাদাত……

বোশেখ মাসের ঊনিশ তারিখ/ দিনটি ছিলো শনি/ সদরঘাটে নামলো এসে/ মায়ের সাথে রনি। /……./ কাজের খোঁজে যায় যেখানে/ খাচ্ছে শুধু ধোঁকাই/ গাঁয়ের রনির ঢাকায় এসে/ নামটা হলো টোকাই। – একজন কবির ছড়ায় ছড়ায় রনির টোকাই হওয়ার কাহিনী এভাবেই তুলে ধরেছেন। শিশুরা আমাদের সুন্দর আগামীর প্রতিনিধি। কিন্তু আমাদের অবহেলায় প্রতিদিন আত্মপরিচয় হারিয়ে টোকাইয়ে পরিণত হচ্ছে লাখো শিশু। এ কথা সবার জানা সমৃদ্ধ দেশ গড়তে প্রয়োজন মানুষ, টোকাই নয়। আমরা যতদিন টোকাই নামের এসব পথশিশুদের সমাজের মূল স্রোতের সাথে সম্পৃক্ত করতে পারবো, ততদিন স্বপ্নের সোনালি সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। প্রতিবছর এক মাস মাহে রমজানের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে বঞ্চিতের দুঃখ বোঝার শিক্ষা দেয়ার পর আসে ঈদুল ফিতর। এর দুই মাস পর আসে ত্যাগের মহিমায় মোমিনের অন্তর আলোকিত করতে ঈদুল আজহা। পবিত্র এ দু’টি দিন কি একবারও আমাদের মনে উদিত হয় টোকাই নামের এসব বঞ্চিত শিশুদের মুখচ্ছবি।
আমাদের এ প্রিয় বাংলাদেশে পরিবার পরিজন বিচ্ছিন্ন হয়ে পথের ধারে ফুটপাথে, রেলস্টেশনে যারা বসবাস করে তাদেরকে কেউ বলে পথশিশু কেউ বা বলে পথকলি। আবার এমন শিশুও আছে যাদের পরিবার আছে কিন্তু দরিদ্রতার কারণে হে ভালোবাসা বঞ্চিত। তারা সারাদিন পথে পথে ঘুর বেড়ায়। কাগজ টোকায় (কুড়ায়) ডাস্টবিনে ময়লা টোকায় পেটের ক্ষুধা মেটানোর জন্য। ১৯৭৮ সালের আগে তাদেরকে কি নামে ডাকা হতো জানি না। দেশের বিখ্যাত কার্টুনিস্ট রফিকুন্নবী যিনি র’নবী নামে সবার কাছে পরিচিত তিনিই প্রথম তাদের নাম দিয়েছেন টোকাই। আমেরিকান কার্টুনিস্ট সুলজের ‘চার্লি ব্রাউন’ চরিত্র তাকে অনুপ্রাণিত করে এ চরিত্রটি নির্মাণে। আমাদের সমাজের সঙ্গতি নিঃসঙ্কোচে তুলে ধরতে তিনি পথশিশুকে প্রতীকী চরিত্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন। আমাদের দেশে বর্তমানে পথশিশুর সঠিক হিসাব পাওয়া জানা কঠিন। কারণ তাদের নির্দিষ্ট কোন ঠিকানা নেই। ঢাকা সিটি করপোরেশনের কাছেও নগরীর পথশিশুদের কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই। ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) অনুমান রাজধানীতে বর্তমানে পথশিশুর সংখ্যা এক লাখ ২০ হাজার। সরকারি বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেশে মোট পথশিশুর সংখ্যা আট লাখ। ২০০১ সালে সরকারি শিশু জরিপে দেশে পথশিশুর সংখ্যা ছিল চার লাখ ৪৫ হাজার ২২৬। গত ১০ বছরে এর সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণ। এর মধ্যে ৭৫ ভাগ পথশিশুর বাস রাজধানী ঢাকায়। এসব শিশুর মধ্যে ৫২ ভাগ ছেলে ও ৪৭ ভাগ মেয়ে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউশন অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) ২০০৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশে পাঁচ লাখ ২৫ হাজার পথশিশু আছে। ২০১৪ সালে এ সংখ্যা দাঁড়াবে ৯ লাখ ৩০ হাজারে। একই সময়ে ইউনিসেফের দেয়া তথ্যে বলা হয়, বাংলাদেশে মোট ছয় লাখ ৭৯ হাজার ৭২৮ পথশিশু রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ।
ঈদ উৎসবের আনন্দে সবাইকে শরিক করতে পারলেই পরিপূর্ণতার তৃপ্তি পাওয়া যায়। ঈদের পবিত্র আর পুণ্যের আলোয় দূর হয সমাজের অসঙ্গতি। এ দায়িত্ব আমার আপনার সবার।  বিশেষ করে রাষ্ট্রের নাগরিকদের অভিভাবক হিসেবে  দায়িত্ব পালনের শপথ গ্রহণকারী সরকারের উচিত সবার আগে বঞ্চিতদের পাশে দাঁড়ানো। বাংলাদেশ পৃথিবীর দরিদ্র দেশগুলোর একটি। এখানে প্রতিদিন বাড়ছে ভুখা মানুষের সংখ্যা। দারিদ্র্যের কশাঘাত আর অশিক্ষার অন্ধকারের শিকার মানুষেরা হারাচ্ছে মানবিক গুণাবলি। যার প্রভাবে ভাঙছে পরিবার, বাড়ছে  বন্ধনমুক্ত শিশু-কিশোরের সংখ্যা। ঈদের হাসি ঠোঁটে বাঁকা চাঁদের আগমনে এসব বঞ্চিত অবহেলিত ছিন্নমূল শিশু-কিশোরদের মনে আনন্দের বান ডাকে না। অথচ সরকারের সুষ্ঠু পরিকল্পনা আর বিত্তশালীদের একটু ইচ্ছেই পারে তাদেরকে ঈদের খুশিতে শামিল করতে। আমরা নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা)-এর জীবনের সেই ঐতিহাসিক ঘটনা। ঈদের নামাজ পড়ে একদিন মদিনার রাস্তা দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন  আমাদের প্রিয় নবীজি। তিনি দেখতে পেলেন রাস্তার পাশে একটি ছেলে কাঁদছে। তিনি তাকে কোলে তুলে বাড়িতে নিয়ে গেলেন। মা-বাবা হারা এ এতিম শিশুটি নবীর (সা) আদর পেয়ে দুঃখ ভুলে ঈদের খুশির দিনে হাসলো তৃপ্তির হাসি। মহানবী (সা) এইদিন থেকে শিশুটিকে সন্তানের মতো আদর  দিয়ে লালন পালন করেছেন।
রাজধানী ঢাকার অলি গলি বস্তি আর ব্যস্ত রাস্তায় ফুল কিংবা অন্য কোন পণ্য হাতে যে শিশুরা প্রতিদিন দৌড়াচ্ছে। পথশিশু পথকলি যে নামেই তাদের ডাকি না কেন?  ওরা আমাদের এ সমাজেরই অংশ। ওদেরও অধিকার আছে, আছে পবিত্র ঈদের আনন্দ আয়োজনে শরিক হওয়ার। আসলে ওরা রনি, বনি সুলেখা, মীম, ফেলানি, হাবিব, গোলাম, রহমত, সোহেল এমন লাখো নামের সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। ঈদের খুশির দিনে তাদেরও পরতে ইচ্ছে করে নতুন জামা, পাঞ্জাবি, টুপি। ওদের মন চায় সেমাই, পিঠাপুলি, পোলাও গোশত কোরমা খেতে। কিন্তু  তাদের  এ চাওয়া স্বপ্নই থেকে যাবে যদি আমরা এগিয়ে না আসি। তাই আমাদের সবার পবিত্র দায়িত্ব যার যতটুকু সামর্থ্য আছে তাই নিয়ে ওদের পাশে দাঁড়ানো।

SHARE

Leave a Reply