Home উপন্যাস আট চোখের দুরন্তপনা

আট চোখের দুরন্তপনা

জাকির আবু জাফর।

পিয়ালদের বাড়িটি প্রায় জঙ্গলাকৃতির। ঘন গাছগাছালিতে ঘেরা চারপাশ, বিশাল বাড়ির মাঝখানে পিয়ালদের আটচালা ঘর। ঘরের খানিক পেছনেই প্রায় দীঘির মতো একটি পুকুর। শান বাঁধানো ঘাট। পুকরের চারপাশও গাছে ভরা। যেনো সবুজ দেয়াল। নানা রকম পাখির বাসা গাছের ডালে ডালে। চেনা অচেনা ফুলে ফলে ভরা বাড়িটি পিয়ালের অসম্ভব ভালোবাসার। অবশ্য ভয়ও জাগে। রাত হলেই নানারকম জীবজন্তুর হাকডাক। বড় বড় বাদুরের ভয়ঙ্কর ছোটাছুটি। ভূতুড়ে পেঁচার ডাক। আর খেঁক শেয়ালের হুক্কাহুয়া। সেই সাথে কুকুরের গলাফাটা চিৎকার। সবকিছু মিলে ভয় জমে থাকে রাতের বেলা। সকাল হলেই নানারকম মিষ্টি পাখির গান। কোথাও দোয়েলের শিস। কোথাও ঘুঘুর একমনে গেয়ে যাওয়া দারুণ আনন্দময়।
বাড়িটি কিনেছিলো পিয়ালের দাদা। দাদা এখন নেই। পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন। পিয়াল তখন শিশুটি প্রায়। দাদার কথা খুব মনে পড়ে। অনেক আদর করতেন দাদা। সাথে নিয়ে বাড়িটি ঘুরে বেড়াতেন। বিশেষ করে বিকেল বেরা বাড়ির চারপাশ ঘুরে আসতেন একবার। এ সময় দাদা ফল কুড়াতেন। আতা, পেয়ারা, পেপে, গাব, কলা আরো কত ফল। এমনকি শুকনো নারিকেল পড়ে থাকতো গাছের নিচে। নারিকেলও কুড়াতেন দাদা। কী যে আনন্দময় সময়টা কাটতো দাদার সাথে। আজ দাদা নেই। দাদার মুখটি খুব মনে পড়ে পিয়ালের। বাড়ি ঘুরে এসে ঠিক সন্ধ্যার আগে আগে শান বাঁধানো ঘাটে বসতেন দাদা। কতরকম গল্প বলতেন। ফুল চেনাতেন ফলও চেনাতেন। বলতেন গাছের নাম। পাখির নাম। কিন্তু ঘাটে বসলেই দাদা কেমন উদাসী হয়ে যেতেন। পুকুরের শান্ত পানির দিকে চেয়ে থাকতেন এক দৃষ্টিতে। মাঝে মাঝে হঠাৎ চোখ তুলতেন আকাশে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফিরে আসতেন পানির দিকে। ব্যাপারটি খারাপ লাগতো পিয়ালের। একদিন না বুঝেই জিজ্ঞেস করলো- দাদা তোমার অসুখ?
হেসে দাদা বললেন- নারে দাদু, আমার কোনো অসুখ নেই। এ সময় দাদার হাসিটাও কেমন জানি ম্লান মনে হলো পিয়ালের। সারাদিনের হাসির সাথে এ হাসির কোনো মিল ছিলো না। দাদার দৃষ্টিও বদলে যেতো এ সময়। তখন এতকিছু বুঝতো না পিয়াল। কিন্তু আজ বোঝে। মনের আয়নায় দাদার সেই দৃষ্টি সেই ম্লান হাসি আজো দেখতে পায় পিয়াল।
একদিন পিয়াল তার মাকে জিজ্ঞেস করলো- মা মনি বিকেল হলে দাদুর মনটা খারাপ হয় কেনো?
গালে আদর দিয়ে মা বললো- ওরে আমার সোনামনি কত কিছু ভাবে রে। কেনো মন খারাপ করবে দাদু! বড়দের কত চিন্তা থাকে। হয়তো তোমার দাদাও কোনো চিন্তা করেন। তুমি কিছু ভেবো না।
মায়ের কথায় পিয়ালও আর কিছু ভাবেনি সেদিন। কিন্তু পরের বিকেলে দাদুর সেই ম্লান মুখ। সেই উদাস দৃষ্টি। সেই পুকুরের শান্ত পানিতে আনমনা দৃষ্টি। ভাবিয়ে তোলে পিয়ালকে।
পরে কিছুটা বড় হয়ে জানলো পিয়াল- দাদীর সাথে বিকেলটা গল্প করে কাটাতেন দাদা। এই ঘাটেই। দাদী মারা যাবার পর থেকে দাদার এ অবস্থা। পিয়ালের আব্বাই বলেছে এই কাহিনী। এখন দাদা নেই। পিয়ালের আব্বাও কাছে নেই। দুবাইতে ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত তিনি।  প্রতি ছ’মাসে দেশে আসেন একবার। একমাস কি দেড় মাস থাকেন। তারপর চলে যান। অবশ্য প্রায় প্রতিদিন না হলেও একদিন দুদিন অন্তর ফোন করেন। গতকাল ফোন করেনি। আজ নিশ্চয় করবে। করলেই আজ জিজ্ঞেস করবে পিয়াল- দেশে এবার কবে আসবে? একটি মোবইল আর একটি কম্পিউটার আনতেই হবে। কারণ আব্বাই তো কথা দিয়েছে সপ্তম শ্রেণীতে প্রথম হলে কম্পিউটার কিনে দেবে আমাকে। সাথে একটি মোবাইলের কথা নিজ থেকে চাওয়াই যায়। ঘাটে বসে এসব ভাবছিলো পিয়াল।
পিয়াল এখন দুরন্ত কিশোর। পাড়া মাতিয়ে বেড়ায়। যত রকমের দুষ্টুমি সবই জানা আছে পিয়ালের। তমাল, শিমুল, রাসেল, রবিন এরা পিয়ালের বন্ধু। দল বেঁধে হৈ চৈ করে দিনরাত যেদিকে ছোটে সে দিকেই খবর রটে যায়। সম বয়সীরা বলে ‘পিয়াল বাহিনী’। বয়স্করা বলে দুষ্টের দল! আরো কত রকম নাম আছে পিয়ালদের। যে যাই বলুক ওরা ওদের মতোই। দিন নেই। রাত নেই । খেলাখেলি, ফালাফালি, হৈ চৈ আর আনন্দ ভীষণ। পাখি ধরা, ফল খাওয়া, ঝাঁপিয়ে পুকুরে পড়া, দীর্ঘ সময় সাতার কাঁটা। সবকিছু সদলবলে। শাসন বারন আছে। তবু সবকিছু চলে ওদের মতো। ওদের একটি ভালো দিক বাকি সবকিছুকে তুচ্ছ করে দেয়। সবাই লেখাপড়ায় ভালো। শুধু শিমুলটা ছাড়া। অসম্ভব ধরনের জেদি ছেলে শিমুল। ওর বাবা ছিলো শিক্ষক। হলে কি হবে লেখাপড়ার প্রতি কোনো আগ্রহ নেই ওর। কোনো রকম পাশ করার হলেই হলো। শেষমেষ গেলোবার ফেলই করলো। নবম শ্রেণীতে পড়ার কথা ওর। অথচ ফেল করে অষ্টম শ্রেণীতে যোগ হলো পিয়ালদের সাথে। কিভাবে এদের দলের সাথেও ভীড়ে গেলো। এখন নানা রকম দুষ্টুমির বুদ্ধি জোগায় পিয়ালদের। কখন কি করবে কোথায় কিভাবে করবে। অন্য সবার থেকে ওর বুদ্ধি বেশি কাজে দেয়। এ কারণে ওকে পছন্দ করে সবাই। শুধু রবিন ওকে সামান্যও সহ্য করে না। কেনো করে না এর কোনো কারণও খুঁজে পায় না কেউ।
কিন্তু ক’দিন ধরে শিমুলের কোনো পাত্তা নেই। হয়তো নানার বাড়ি। না হয় খালার বাড়ি বেড়াতে চলে গেছে। মাঝে মাঝে হঠাৎ উধাও হয়ে যায় ও। দেখা হলে জিজ্ঞেস করার আগেই বলে- একটু নানার বাড়ি গেছিলাম। নানু খবর পাঠিয়েছে। অথবা জরুরী খবর পাঠিয়েছে খালা। পিয়াল জানে ওর নানু মোটেই খবর পাঠায়নি। খালাও না। লেখাপড়া থেকে পালিয়ে বেড়ানোর বুদ্ধি ছাড়া কিছুই নয় এটি। তবু পিয়াল বলে- তোর নানু খালা তোকে অনেক আদর করে নারে-। জবাবে কিছুই বলে না শিমুল। কথা ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করে- রবিন, রাসেল, তমাল ওরা কোথায় রে?
ওরা আছে সবাই। কাল এসেছিলো। আজো আসবে। ওরা তোর কথা জিজ্ঞেস করলো কাল। তুই তো কাউকে কিছু না বলে পালিয়ে যাস। একটু খবর দিয়ে গেলে খুব ক্ষতি হয়ে যায় বল? বললো পিয়াল।
এ কথারও কোনো জবাব দেয়নি শিমুল। এভাবে শিমুল তার ব্যক্তিগত বিষয়গুলো গোপন করে পিয়ালদের কাছে। কেনো করে পিয়ালেরা জানে না কেউ। তবু বন্ধুত্ব। তবু এক সাথে চলায় কোনো বাধা নেই ওদের। শেষ বিকেলে পুকুর ঘাটে বসে এসব ভাবছিলো পিয়াল। শিমুলের সাথে দেখা নেই আজ তিনদিন। তমাল রবিন ওরাও জানে না কোথায় শিমুল। শিমুলটা কেনো যে নিজেকে লুকায়। কেনো যে আড়াল করে জানে না কেউ। তবে দুরন্তপনা মোটেই কমেনি। আবার ফাঁক পেলেই আনমনা হয়ে পড়ে।  তোর কি হলো রে শিমুল জিজ্ঞেস করলে বলে- আমার কিছু হয়নি তো! শিমুলের প্রতি কেনো যেনো মায়া জাগে পিয়ালের।
সূর্যটা প্রায় ডুবুডুবু। ডিমের কুসুমের মতো লাল মুখো সূর্য। মেঘের গায়ে থোকা থোকা রক্তজবার মতো ফুটে আছে রোদের রঙ। পিয়ালের চোখ যেনো আটকে গেলো সূর্যের দেহে। এই ঘাটে বসে কত সন্ধ্যা দেখলো সে। কত সন্ধ্যা কাটিয়েছে দাদুর সাথে। সন্ধ্যায় উড়ে যাওয়া কত পাখির ঝাঁক দেখিয়েছে দাদু। আজকের সন্ধ্যাটা কেমন যেনো অন্যরকম। জেগে উটেচে অন্য রঙে। বকের ঝাঁক উড়ে গেলো দক্ষিণ থেকে উত্তরে। আরেক ঝাঁক পাখি কালো পাখা মেলে তারাও উড়ে গেলো উত্তর দিগন্তে। বেশ লাগছিলো পিয়ালের। এসব পরিবেশে আনমনা হয়ে যায় ও।
হঠাৎ কাঁধে কারো হাতের চাপ অনুভব করে পিয়াল।
চোখ আকাশে রেখেই বললো- তুই এত দেরী করলি ক্যান তমাল?
ও খালি তমালই তোর দোস্ত! আর কেউ নেই, বলে একগাল হাসলো শিমুল। খানিকটা অভিমান করে পিয়াল বললো- নেই-ই তো। থাকলে যোগাযোগ থাকতো নিশ্চয়। তোর কোনো খবর আছে? আজ তিনদিন। কাউকে কিছু জানাসনি। বলিসনি কোথায় গেছিস। এখন জিনের মতো হঠাৎ কোত্থেকে এলি?
আরে আমি তো জ্বিন-ই বললো শিমুল। সবাই আমাকে জ্বিন বলে। তুইও বললি। মা তো জ্বিন ছাড়া কথাই বলে না। আমার স্বভাবের সাথে নাকি শুধুমাত্র জ্বিনের সভাবেরই মিল আছে। বুঝলি। মা যেখানে জ্বিন বলে তোরা তো বলবিই। বল বর আরো বর। বলে শান্তি পেলে আমার কোনো অসুবিধা নেই। বরং আনন্দই আছে। মানুষ হয়েও আমি জ্বিন।
পিয়াল বললো- নিশ্চয় তুই এমন কিছু করিস যা অস্বভাবিক। সে কারণে তোকে জ্বিন বলে।
জানিস এতে আমার বেশ সুবিধাই হয়েছে- বললো শিমুল।
পিয়াল জিজ্ঞেস করে- কী সুবিধা হলো রে?
এক গাল হেসে বলে শিমুল- সুবিধাটা একেবারে নগদ। আমার কোনো বায়না অপূর্ণ রাখে না কেউ। শুধু আম্মু ছাড়া। আমার বায়নার টায়নার পরোয়া করে না আম্মু। রাত দুপুরে ঘুরে বেড়াই বেশি বকাঝকা করে কোনো লাভ হয় না। খাবারের বায়না ধরলে প্রায় সাথে সাথে পওয়া যায়।
পিয়াল বললো- রাত দুপুরে ঘুরে বেড়ানোর সুবিধাতো আমারও আাছে। এতে তোর আর আলাদা কি বৈশিষ্ট হলো। আর খাবার? না বললেও পাই আমি।
তোর তো ভাই সব অন্যরকম। অন্য আয়োজন। পড়াশোনা ঠিক ঠাক। খাওয়া দাওয়া ঠিক। আমার তো সেসবের ভালাই নেই। মার বকাঝকা আর পিটুনি এই নিয়েই তো আছি। দু:খ আর বলি কারে। তবুও একরকম স্বাধীন রাজ্য আমার। ইচ্ছে হলেই বেরিয়ে পড়ি।
পিয়াল বললো- নারে শিমুল- লেখাপড়া না করা ভালো নয়। আমি তো আমার সিদ্ধান্ত নিয়েই রেখেছি। লেখাপড়া ভালো আমাকে করতেই হবে। ছাত্রজীবনে লেখাপড়া ঠিক থাকে তো সাত খুন মাফ।
সে আমি জানি পিয়াল। কিন্তু আমার যে লেখাপড়া ভালো লাগছে না আর।
জবাবে বললো পিয়াল- লেখাপড়া এমন বিষয় যে একে ভালো লাগাতে হয়। জোর করে হলেও। লেকাপড়া না থাকলে কি চলে?
এই তো তুই আবার উপদেশ দেয়া শুরু করলি। উপদেশ দিস না। উপদেশ শুনে শুনেই আমার এ দশা।
পিয়াল বললো- দু:খিত বন্ধু। ওসব থাক তবে। বল কই ছিলি তিনদিন?
মনে হলো পিয়ালের  কোনো কথাই শোনেনি শিমুল। পিয়ালের হাত ধরে বললো- চল আজ আবার একটু নদীর কূলে যাই। দুদিন আগে পূর্ণিমা গেছে। আজ চাঁদটি সন্ধ্যার একটু পরেই উঠবে। এ সময় নদীর কূলটা খুব ভালো লাগে। পিয়ালের হাত ধরে টানে শিমুল।
পিয়াল মোটেই অবাক হয় না। সে জানে এমন অদ্ভূত সব বিষয় শিমুলের মাথা থেকে বের হয়। সন্ধ্যার খানিক অন্ধকার তারপর চাঁদের আলো এবং নদীর কূল পিয়ালেরও পছন্দ। কিন্তু সন্ধ্যা তো লেখাপড়ার সময়। এখন অবশ্য কদিন স্কুল বন্ধ। নতুন বর্ষে এখনো শুরু হয়নি ক্লাস। কিন্তু আম্মুকে না বলে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? মনে মনে ভাবে পিয়াল।
এই তুই কি ভাবিস? বাহু ধরে এক রকম ঝাঁকানি দিলো শিমুল।
তুই তো জ্বিন। তোর তো কিছু না বললেও চলে। আমার এসব ম্যানেজ করতে হয়। ভাবছি আম্মুকে বলে যাওয়া উচিৎ। আজ আবার আপু  এসেছে। জানিস তো ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্রী। থাকে হলে। দুনিয়া ভেজে খায়। উল্টাপাল্টা হলে আমার কান ধরে টেনে লাল করে দেবে -বললো পিয়াল। তাছাড়া তমালও তো আসার কথা। একটু অপেক্ষা কর।
তুই তো দেখছি ভীতুর ডিম নয় শুধু একেবারে ভীতুর আন্ডা। মাকেও ভয় করিস। আপুকেও। চলবে কি করে? থাক তুই। একলাই যাবো আমি। বলেই দ্রুত হাঁটতে শুরু করে শিমুল।
যাচ্ছিস কই – দাঁড়া। আমি যাবো না বলেছি তোকে? বললো পিয়াল।
কিন্তু শিমুল দাঁড়ায় না। হনহন করে ছুটতে থাকে ও।
চিৎকার দিয়ে বললো পিয়াল- দাঁড়া। আমি যাচ্ছি তোর সাথে।
আমিও যাচ্ছি তোদের সাথে। পেছন দিক থেকে বলে উঠলো -তমাল। দুজনই ফিরে দেখলো তমালের দিকে। দীর্ঘ হাসি টেনে তমাল যোগ দিলো ওদের সাথে।

নদীটি পিয়ালদের বাড়ি থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে। এই নদীর তীরেই বেড়ে উঠেছে পিয়ালরা। খেলাধুলা থেকে দুষ্টমি সব কিছুর সাক্ষী এ নদীটা। যে কারণে নদীকে অসম্ভব ভালোবাসে পিয়ালরা। অনেক বিকেল নদীর পারেই কাটে ওদের। একবার পূর্ণিমার মধ্যরাতে নদীর পারে গিয়েছিলো ওরা। অবশ্য ভীষণ চুপিসারে যেতে হয়েছে।  ফিরেও এসছে ঠিকঠিক। পিয়াল, তমাল, শিমুল ও রবিন চারজনই। সবাই পার পেয়ে গেলো। শুধু ধরা খেয়ে গেলো তমাল। ঘরে ঢোকার সময় টের পেয়ে গেছে তমালের আব্বা। সে কি ভয়ংকর ব্যাপার। চরম শাস্তি পেতে হয়েছিলো তমালকে। তবুও দল ছাড়েনি ও।
পিয়াল শিমুল তমাল হাটছে নদীর দিকে। পাশাপাশি। তখন সন্ধ্যার অন্ধকার কেটে গেছে প্রায়। পুবের আকাশে চাঁদের নিশানা পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। পিয়ালদের বাড়ি থেকে কোয়ার্টার কিলোমিটার দূরে বেড়িবাঁধ। তারপরই চর। চরের ওপর দুর্বা ঘাস। বেশ খানিকটা গাঢ় বটে। শীতকালে এসব ঘাসে কুয়াশা জমে থাকে। সকাল বেলাটা কুয়াশায় গোটা চর দুধের মতো দেখায়। এখন হেমন্তকাল।  হেমন্তে শেষ রাতে কিছুটা শিশির ঝরে। সন্ধ্যারাতে তেমন শিশির নেই। তবু ঘাসের ভেতর হাটতে বেশ আরাম লাগছে পিয়ালের। বললো- তোরা টের পাচ্ছিস ঘাসের আরাম।
আমি তোর মতো ভাবুক নই দোস্ত। আমার অতসব আরাম টারামের ভালাই নেই। আমি হলাম মোটা মাথার লোক। বুঝলি যা সবাই দেখে আমিও তাই দেখি। এক রকম খোচা দিয়েই কথাগুলো বললো শিমুল।
বারে আমি চিকন তবে মাথার লোক! আবার কবে হলাম ভাবুক। ঘাসের ওপর পা রাখতে যে আরাম তা বোঝার জন্য ভাবুক হবার দরকার নেই রে বন্ধু।
তমাল বললো- আমি আরাম টারাম বুঝি না। তবে ভেশ ভালো লাগছে হাটতে।
চাঁদ ততক্ষণে উঠে গেছে। বিশ্ব চরাচরে ছড়িয়ে পড়েছে চাঁদের স্নিগ্ধ মায়াবী আলো। এ আলো দুধ সাদা হলেও খানিকটা দূরের সব জিনিসকে কালো দেখায়। শুধু নদীটার বুক রূপালি আলোয় জ্বলতে থাকে।
নদীর কূলে এসে গেলো ওরা। একটি বাঁকের ঘন ঘাস দেখে বসলো তিনজন। মাঝখানে পিয়াল। শিমুল তমাল দুজন দুপাশে। এ বাঁকটি খানিকটা খাড়া। খাড়া বাঁকে সাধারনত কোনো নৌকা ভেড়ে না। কিন্তু এ বাঁকটায় বসার মজা আছে। মজাটা হলো এখান থেকে দক্ষিণে যতদূর চোখ যায় নদীটাকে পরিষ্কার দেখা যায়। নদীর বুকে যত নৌকা-লঞ্চ মাছ ধরার ট্রলার সবই চোখে পড়ে। রাতের বেলা এতকিছু দেখা যাবে না। তবুও ওরা বাঁকে বসলো যাতে নদীটার রূপালি শরীর দেখা যায়। তাছাড়া চাঁদটি একেবারে কপাল বরাবর।
চাঁদটি গোল হয়ে উঠেছে। সারা আকাশ জুড়ে চাঁদের আলোর পসরা। নদীতে চাঁদটি আনন্দময় আলোর বন্যা ছড়িয়েছে। নদীর পানি তত স্বচ্ছ নয়। বরং বেশ ঘোলা। ঘোলা পানিও রূপালি হয়ে উঠেছে চাঁদের আলোয়। নদীর পূর্ব পাড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বন বিভাগের বাগান। তারপর সীতাকুণ্ড পাহাড়। বাগান এবং পাহাড় মিলে বিশাল অন্ধকার জমে আছে ওপারে।
অবশ্য নদীর পশ্চিম পারেও বাগান ছিলো। স্লুইস গেইটের কারণে পানির প্রবাহ বেঁকে যায়। পানির স্রোত সোজা প্রবাহিত না হয়ে একটু বেঁকে নদীর পশ্চিম কূল ঘেঁষে ছুটতে থাকলো। আর স্রোতের এই পরিবর্তিত ধারাই ভেঙে নিলো নদীর পশ্চিম কূল। ভাঙলো তো ভাঙলো। চর, বাগান, বৃক্ষ এমনকি বাড়ি ঘর সবই ভেঙে নিলো। নদীর পশ্চিম কূলে চর ছিলো প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। এখন মাত্র দেড় কিলো হবে। অবাক হয়ে ভাবলো পিয়াল। এই তো সেই দিনও বাড়ি থেকে রওনা দিয়ে অনেক পথ হেটে আসতে হতো নদীর কূলে। আর আজ? আজ তো পঁচিশ মিনিট লাগলো মাত্র। শিমুলকে বললো পিয়াল- তোর মনে আছে নদীর আগের চেহারা?
আরে মনে থাকবে না? আসল নদী তো এখন নেই বললেই চলে। ওপারে যে বাগান সে বাগান তো নদীই ছিলো। বললো শিমুল।
তমাল বললো- বর্ষায় এই নদীতেই তো ধরা পড়তো ইলিশ। সেই রূপালি ইলিশ কোথায় গেলো। আহ্ কি স্বাদের মাছ। এক বাড়িতে রান্না হলে পাশের দুবাড়ি ঘ্রাণ পৌঁছে যেতো। সাবান দিয়ে হাত ধুলেও ঘ্রাণ যেতো না। আর আজ? ইলিশ মাছের সাখে রুই মাছের তফাৎই বোজা যায় না।
হ্যাঁ ঠিকই বলেছিস তমাল – পিয়াল সমর্থন করলো তমালকে।
একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো পিয়াল- দেখ এক সময় যেখানে নদী ছিলো আজ সেখানে বাগান। আর বাগানটি নদী হয়ে গেছে। কী সব অবাক করা কাণ্ড। এই তো মাত্র তিন বছর আগে তোদের বাড়ির আমজাদ ভাই উনার সাথে মাছ ধরতাম আমি। তখন তোদের সাথে খাতির হয়নি আমার। আমরা ডাকতাম আমজাদ ভাই- তাকে সবাই মাছের রাজা বলতো। কেউ মাছ না পেলেও আমজাদ ভাই কিছু না  কিছু মাছ পেতই। আমার ভাগ্যটাও বেশ ভালো। যে দিন সবাই খালি হাতে ফিরতো। সেদিনও অল্প হলেও মাছ পেতাম আমি।
তোর ভাগ্য তো মাটি ভাগ্য। যেখানে সেখানে মিলে। আমার ভাগ্য কিন্তু পাথরের নীচে। সহজে হাত দেয়া যায় না। বললো শিমুল। মা বলে আমার ভাগ্যই নাই। সবাই মাছ পেলেও আমি শূন্য হাতে ফিরতাম। মাছ আমার সাথে দেখাই দিতে চায় না।
শিমুলের বলার ঢং দেকে হেসেই ফেললো পিয়াল তমাল। পিয়াল বললো- তোর ভাগ্য যদি পাথরের নীচে থাকে তবে পাথরটা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দে। বাস্ ভাগ্য বেরিয়ে পড়বে। তারপর ভাগ্যটাকে ঝুলিয়ে নে গলায়। তখন তোর ভাগ্য তোর সঙ্গেই থাকবে। কে আর পাথর চাপা দেবে তাকে।
কিছুটা সিরিয়াস হয়ে গেলো শিমুল। বললো- তুই ইয়ার্কি করছিস আমার সাথে। দেখ আমি কিন্তু সত্যি সত্যি আমার ভাগ্যের ব্যাপারে দুশ্চিন্তায় আছি। আমার মনে হয় আমার জীবনে কিছুই হবে না। বরং যা আছে আমার হাত পড়লে সেটাও শেষ হয়ে যাবে।
এবার পিয়ালও কিছুটা সিরিয়াস হয়ে বললো- কী সব বলিস তুই। ভাগ্যকে জয় করতে হয় মানুষের। ভাগ্য নিজে ধরা দেয় না। বুঝলি।
অত বুঝে আমার কাজ নেই। তুই বুঝ। তোর ভাগ্য বুঝুক। আমি ভাগ্যহীন। ভাগ্যহীনই থাকি। অসুবিধা কি। এক রকম ক্ষোভ নিয়েই বললো শিমুল।
পিয়াল চুপ হয়ে যায়। ভাবে শিমুলের দু:খের কথা। আবার সে তাকায় চাঁদের দিকে। একটি দীর্ঘ মেঘ এসে চাঁদের মুখে বসে আছে। ছায়ার মতো হয়ে আছে চাঁদের আলো। দক্ষিণ আকাশ দেখে পিয়াল। না বৃষ্টি হবার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। একটিই মেঘ। সরে গেলে মুক্ত হয়ে যাবে গোলগাল চাঁদটি। তারপর আবার ছড়াবে উজ্জ্বল আলো। আবার ঝিকঝিক করছে নদীটি।
শিমুলের দিকে ফিরলো পিয়াল। নীরব চোখে চেয়ে আছে নদীর বুকে । মনে তার কি কথা চলছে কে জানে!
তমালও ফিরে আছে নদীর দিকেই।
নদীতে জোয়ার জেগেছে বেশ খানিকটা আগে। জোয়ারের পনিতে ফুলে উঠেছে নদীর বুক। একটার পর একটা ঢেউ এসে আঘাত করছে কূলে। একটু পর কূল ছাপিয়ে উঠবে চরের ওপর। ঢেউয়ের ঝাপটায় পিয়ালদের গায়ে ছিটকে পড়ছে পানি। খানিকটা নোনা। চেখে দেখে ওরা। আহ! দারুণ। কী আনন্দ। সমুদ্র আমাদের জন্য পানি পাঠিয়েছে। সেই পানি ভিজিয়ে যাচ্ছে আমদের -বললো পিয়াল।
মহা আনন্দের সাথে শিমুল বললো- আয় আজ না হয় গোসল করেই যাই। জোয়ারের পানি। দেখ কেমন একটু উষ্ণভাব। ঘোলা হলেও এ পানি মন্দ নয়।
খানিকটা প্রতবাদের স্বরে তমাল বললো- এমনিই খবর আছে আজ। আবার রাতের বেলা গোসল! আল্লাহ মাফ করো।
তুই আজীবন ভীতুই থেকে গেলি- তমালকে তিরস্কারের ভংগিতে বললো শিমুল। বললো- তোকে দিয়ে কিছুই হবে না।। তোর উচিৎ ঘরে বসে লেবানসুস চোষা। এসব অভিযানে আসা তোর উচিৎ নয়।

তমালও কম যায় না। বললো- হায়রে আমার সাহসী রে। মার হাতের মার খেয়ে ধ্যান্দা হয়ে থাকিস। স্কুল পালিয়ে বেড়াস টিচারের ভয়ে। আমাদের সাথে কেবল বীরত্বের বাহাদুরী। চিনি তোকে। আর বলতে হবে না।
এই তোরা কী শুরু করলি! অযথা ঝগড়া বিবাদ রাখ। দেখ জোয়ার চর ভাসিয়ে দিচ্ছে। -বললো পিয়াল
চরটা ধীরে ধীরে ঢালু হয়ে নদীর কূলে নেমেছে। জোয়ারও কূল থেকে কিছুটা ধীরেই উঠছে উপরের দিকে। আনন্দে পানি ছিটাচ্ছে পিয়ালেরা।
হেমন্তে জোয়ারের জোর বেশি থাকে না। বর্ষা হলে এতক্ষণে গোটা চর জোয়ারের পানিতে সয়লাব হয়ে যেতো। এইতো গেলো বর্ষায় দুপুর বেলা তুমুল বৃষ্টি। তার ভেতর ভরা জোয়ার। জোয়ার যখন চর ভাসিয়ে ছুটছে- পিয়াল, শিমুল, তমাল, রবিন সবাই ঠেলা জাল দিয়ে ধরলো মাছ। ছোট চিংড়ি, টেংরা, বেলে এবং নানা রকমের পোনা মাছ। বড়ই খুশির বিষয় ছিলো সেদিন। ভয়ের ব্যপারও কম ছিলো না। একটি টেংরা মাছের পিঠের কাঁটা শিমুলের পায়ের পাতায় পুরোটাই ঢুকে গেলো। পিয়াল যখন টান দিয়ে খুললো সে কি রক্তের স্রোত। রবিনের বুদ্ধিতে রক্ষা পেলো সে। পিয়ালের লুংগি চিরে মজবুত করে বাঁধা হলো। তারপর বন্ধ হলো রক্তঝরা। কিন্তু ব্যথায় কালো হয়ে গেলো শিমুল। আবার তমালের জালে ঢুকে পড়লো এক বিশাল দাঁড়াশ সাপ। ভয়ে সেকি চিৎকার তমালের। সে দিন ভীষণ সাহসী হয়ে উঠেছিলো রবিন। তমালকেও উদ্ধার করলো ও।  সেদিনের কাজে রবিনকে খুব প্রশংসা করেছিলো পিয়াল। কৃতজ্ঞতা জানালো শিমুল তমালও।
আজ রাতের জোয়ারে মাছ ধরা যাবে না। কিংবা মাছ ধরার প্রস্ততিও ওদের নেই। আজ অন্য আনন্দ। শুধু দেখে যাওয়া। শুধু অনুভব করা। যদিও পিয়াল তমাল দুজনেই ভেতরে ভেতরে খুব ভয় করছিলো। কি জবাব দেবে বাড়িতে। বিষয়টা বুঝতে দিচ্ছিলো না শিমুলকে। কিন্তু শিমুল জানে ওদের ভয়ের খবর। সেও বুঝতে দিচ্ছে না ও যে জানে। ওর ইচ্ছে আরো অনেকটা সময় কাটিয়ে যাবে এখানে। ফলে গল্প শুরু করে দিলো শিমুল। নৌকা ভ্রমনের গল্প।
ততক্ষণে জোয়ার আরো কিছুটা প্লাবিত করলো চরের। আরো একটু উপরে উঠে এলো ওরা।
বুঝলি পিয়াল- আমাদের ইচ্ছে হলো আমরা দশজন নৌকা ভ্রমণ করবো। কাসে প্রস্তাবটা আমিই রাখলাম। আমদের ফার্স্টবয় তন্ময় ছাড়া সবাই এ ভ্রমণে দারুণ উৎসাহী। তন্ময়কে বাদ দিয়েই আয়োজন হলো নৌকা ভ্রমণের। ঠিক হলো দিনক্ষণ। প্রস্তুতিও চললো। নৌকা ঠিক করার দায়িত্ব পড়লো আমার ঘাড়ে। আমার মামাতো ভাইয়ের সহযোগিতা নিলাম আমি। নদীর তীরে স্লুইস গেট থেকে পশ্চিমে জেলে পাড়া। তোরা তো জানিসই। গেলাম ওর সাথে। বেশ চমৎকার একটি নৌকা। প্রায় নতুন। মাঝি রাজি হয়ে গেলো। খুব অল্প ভাড়াই বলতে হবে। গত বছর এ সময়টাই। এ সময় জেলেদের ব্যস্ততা থাকে কম। অতএব অল্প বাজেটে পেয়ে গেলাম নৌকা। দুদিন পরেই যাত্রা। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলো। কি খাবো না খাবো ঠিকঠাক করে নিলাম সব। দুদিন পরেই যাত্রা শুরু হলো। স্লুইস গেট থেকেই। হৈ হৈ রৈ রৈ ব্যপার। আমরা সব কিশোর। মাত্র অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি। এ আয়োজনে আমাদের আনন্দের সীমা রইলো না। আমাদের সবার অভিভাবকই উদ্বিগ্ন ছিলো। কিন্তু শান্ত নদী। নদীতে তখন মরা কাটাল। সামান্য জোয়ার জাগে। তাও ঘোলা পানি। দক্ষ মাঝি পাওয়ায় কারো অভিভাবকই শেষ পর্যন্ত নারাজ ছিলো না।
তুই তো আমাদের একবার বলতে পারতি শিমুল -দুষ্টুমির হাসি হেসে বললো পিয়াল।
সাথে সাথে তমালও বললো- তাই তো শিমুল আমাদের বললে কী হতো? তোদের সাথে আমদের নৌকা ভ্রমণটাও হয়ে  যেতো। তোর ভাগতো কমতো না।
একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শিমুল বললো- সত্যিই তোদের বললে অনেক মজাই হতো। তবে তোরা তো তখন জুনিয়র ছিলি। ফেল করে আমি হয়ে গেলাম তোদের সহপাঠী। ফেল করবো জানলে তোদের বলতাম হয়তো। ম্লান হাসলো শিমুল।
থাক এত কৈফিয়ত দিতে হবে না। পেল করেছিস তো কি হয়েছে। এবার ভালো করবি। বাস্। বল তোর গল্প। বললো পিয়াল

আবার শুরু করলো শিমুল : স্লুইস গেট থেকে আমাদের গন্তব্য ছিলো বন বিভাগের সেই বাগান। একদা গভীর নদী ছিলো যেখানে। সেই গভীর নদীর বুকে এখন সবুজ গাছগাছালি বেড়ে উঠেছে। বেড়ে উটেছে বাগান।
পিয়াল তমাল খুব আগ্রহ নিয়ে শোনে শিমুলের গল্প। আবহটা এমন যে গল্প শুনতে দারুণ লাগছে।
বলছে শিমুল : স্লুইস গেট থেকে রওনা দেবার কথা থাকলেও রওনা দিতে হয়েছে জেলে পাড়ার বাঁক থেকে।
কারণ? জিজ্ঞেস করলো তমাল।
কারণ স্লুইস গেটে যে কয়টি ডোর ছিলো বর্ষায়  তার সব কটি এক সাথে খুলে দেয়া হয়। ফলে পানির প্রবাহ তীব্র হতে থাকে। গেটের ডোরগুলো খানিকটা পশ্চিমমুখী। আর নদীটাতো সোজা দক্ষিণে। ফলে ডোর খোলার সাথে সাথে তীব্র পানির স্রোত গিয়ে বাড়ি খায় নদীর পশ্চিম কূলে। শুরু হয় নদীর ভাঙন। দেখিস না চরটা ভেঙে কত ছোট হয়ে গেছে। এদিকে বাঁকা স্রোত আমাদের চরটা ভেঙে চুরে নদী বানিয়ে দিচ্ছে। আর ওপারে চর গজাচ্ছে মাইলের পর মাইল। সুতরাং ভাঙনের ফলে স্লুইস গেট থেকে আমরা নৌকায় উঠতে পারিনি। উঠেছি জেলে পাড়া থেকে। নৌকা চলা শুরু হলো। শুরু হলো আমাদের নৌকাভ্রমণ। নদী ভ্রমণ। দুপুরের পরপর যাত্রা শুরু হলো আমাদের। ক্রমান্বয়ে রোদ পড়ে গিয়ে নরম হতে থাকে। আমরাও এগুতে থাকি বাগানের দিকে। নদীর বুকে নীলাকাশ কেমন সুন্দর পিয়ালতো জানিস। তুই তো আবার ভাবুক মানুষ। দেখিস আবার কবিতা লেখা শুরু করে দিস না। তাহলে আমরা আর টিকিটিও পাবো না তোর।
পিয়াল জানে ওকে ইচ্ছে করেই খোঁচা দিয়েছে শিমুল। বললো পিয়াল:- কবিতা লিখতে পারলে তো দারুণ হতোরে। মনের কথা লিখে যেতাম সব। হয়ে যেতাম সেলিব্রেটি। অটোগ্রাফ নেয়ার জন্য ধরনা দিতি তোরা। আহ্ কি আনন্দ হতরে। সে যাই হোক গল্পটা শেষ কর। রাত অনেক হয়েছে।
এই তো তুই মোরগের মতো কথা বললি। সন্ধ্যা হলে মোরগ যেমন খাঁচায় ঢুকে পড়ে। তোর অবস্থাও তাই মনে হচ্ছে।
তুই তো তাহলে শেয়ালের মতো কথা বললি। শেয়াল যেমন সন্ধ্যার পর ধীরে ধীরে বের হয়। তারপর গভীর রাত এমনকি সারারাত ঘুরে বেড়ায়। খাবার খোঁজে। মুরগী খোঁজে। বললো পিয়াল।
হো হো হেসে তমাল বললো – যুৎসই জবাব দিলিরে পিয়াল। যেমন কুকুর তেমন মুগুর। একেবারে খাপের খাপ্ মমতাজের বাপ্।
দুজন মিলে বেশ ঘায়েল করলো শিমুলকে। শিমুল কিন্তু নির্বিকার। যথারীতি সে তার গল্পের দিকে আহবান করে পিয়ালদের। আবার শুরু করলো- আমরা যখন নীলাকাশ নিয়ে কথা বলছি। তখন কামরুল নামের একটি ছেলে নীলাকাশ নিয়ে গানই শুরু করলো। কামাল গাইলো নদী নিয়ে। কবি জসীমউদ্দীনের লেখা সেই বিখ্যাত গান ‘উজান গাঙের নাইয়া-ভাটির গাঙের নাইয়া’। এভাবে দারুণ আনন্দের ভেতর ছুটছে আমাদের নৌকাটি। বেশ খানিক পথ পাড়ি দিলাম আমরা। ধীরে ধীরে সেই সাজানো বাগান আমাদের চোখের সামনে পরিষ্কার হচ্ছে। যত এগুই ততই বড় হচ্ছে বাগান। অনেক বড় বড় গাছও দেখছি আমরা। এক সময় প্রায় বাগানের পাশে এসে পড়লাম। নতুন চরের যেখানে শেষ ঠিক সেখান থেকে কিছুদূর বাবলা গাছের সারি। তারপর শুরু হয়েছে মুল বাগান। শুনেছি বাগানে বিভিন্ন জাতের পশুপাখি বাস করে। বিশেষ করে বানর আর হরিণ দর্শকদের আকর্ষণ করে। আর একটু পরেই আমাদের নৌকাটি কূলে ভীড়বে। নেমে যাবো আমরা। শুরু হবে বানর আর হরিণ নিয়ে খেলা। যারা আগে বানর দেখেনি কিংবা হরিণ কোনোদিন দেখেনি তারা প্রত্যেকে অসম্ভব আনন্দের জোয়ারে ভাসছে। বাগানের কূল ধরেই আমাদের নৌকাটি এগিয়ে যাচ্ছে। মাঝি খুঁজছে পছন্দমত জায়গা। পেলেই নৌকা ভেড়াবে।
-হ্যাঁ, মাঝি ঘোষণা দিলো তার পছন্দের জায়গা পেয়ে গেছে সে। ঠিক এক মিনিটের মাথায় নৌকা ভিড়বে। সবাই প্রস্তুত নেমে পড়ার জন্য। ঠিক এ সময় ঘটে গেলো ঘটনাটা। সাত আটজনের একটি ডাকাত দল আক্রমন করলো আমাদের নৌকাটি। একটি সরু নৌকায় এলো ডাকাতেরা। বাগানের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা একটি প্রায় মরা খাল থেকে ছুটে এলো নৌকাটি। আমাদের নৌকার ঠিক সামনে এসে পড়লো। আকস্মিক এ ঘটনায় আমাদের মাঝি টাল সামলাতে হিমসিম খেয়ে গেলো। আমাদের নৌকাটি স্থির হবার আগেই পাঁচ ছয়জন লাফিয়ে উঠে কিল ঘুষি শুরু করলো সাথে গালাগালি। ডাকাত সর্দার হবে হয়তো- সে নির্দেশ দিলো – একজনও জায়গা থেকে নড়বে না। চিৎকার তো দূরের কথা। শব্দই করা যাবে না। একটি রিভলবার নাচিয়ে বললো- চিৎকার দিলে ফুটো করে দেবো। ভয়ে আমরা শব্দ ভুলেই গেছি।
ডাকাত সর্দারের আবার গম্ভীর নির্দেশ কার কাছে কি আছে বের কর। সময় ত্রিশ সেকেন্ড। এর মধ্যে না বের করলে তল্লাশী করবো। তল্লাশীতে পাওয়া গেলে তার আর রক্ষা নেই। একটু থামলো শিমুল।
তারপর –  পিয়াল-তমাল এক সঙ্গেই প্রশ্ন করলো।
তারপর আর কি আমরা সবাই ছাত্র। তাছাড়া নৌকা ভ্রমণে কিইবা থাকে? বেশ কটা ক্যামেরা, প্রায় সবার ঘড়ি আর পাঁচটি মোবাইল পেয়ে গেলো ওরা। ভাবলাম এবার বোধয় মুক্তি পাবো আমরা। কিন্তু হলো না। ওদের চোখ সাংঘাতিক। সাগর নামে একটি ছেলে আমার বন্ধু। ও কোনো কিছুই জমা দেয়নি। দেহ তল্লাশী করলো ওর। পাঁচ হাজার টাকা পাওয়া গেলো ওর প্যান্টের পকেটে। আর যায় কোথায়। ডাকাতেরা এক কথার মানুষ। যা বলেছে তাই করেছে। সাগরের পকেট থেকে টাকাটা নিলো একজন। অন্য একজন দুহাত ধরে সাগেরকে ফেলে দিলো নদীর স্রোতে। কি ভয়ংকর ছিলো সেই দৃশ্যটি! বাঁচাও শব্দটি শেষ করতে পারেনি সাগর। তার আগেই নদীর স্রোতে ঘোলা পানিতে তলিয়ে গেলো ও। কাঁপন ধরে গেলো আমাদের সবার শরীরে। ভয়ে নি:শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। আর কারো গায়ে হাত তুললো না ডাকাত দল। ধুপধাপ করে আমাদের নৌকা থেকে ওদের নৌকায় উঠে গেলো সবাই। অতিদ্রুত টেনে গেলো নৌকাটি। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে চলে গেলো আমাদের থেকে অনেক অনেক দূরে।
উত্তেজিত কণ্ঠে বললো পিয়াল- সাগরের কি হলো?
শিমুল বললো:- আমরা তখন সাগরকে খুঁজছি। প্রায় মিনিট খানেক পর আমাদের থেকে প্রায় দুশ গজ দূরে ভেসে উঠলো সাগর। বাঁচাও বলে একটি চিৎকার শুনলাম ওর। এটাই ছিলো আমাদের সাথে ওর শেষ শব্দ। স্রোতের তীব্রতায় শেওলার মতো ভেসে গেলো সাগর। আমরা যেনো কাঁদতেও ভুলে গেছি।
সাগরকে আর পাওয়া গেলো না? উৎকণ্টিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো তমাল।
পাওয়া গেছে। কিন্তু সেও আরেক কাহিনী। আজ এ পর্যন্ত। চল ফিরে যাই। আমার অবস্থা যাই হোক তোদের দুজনের তো খবর আছে। বললো শিমুল।
পিয়াল বললোÑ কথাটা বেখাটি বলিসনি। আমাদের খবর তো আছেই। আজ কিন্তু তোরও খবর আছে। তোর বর্ণিত ঘটনা তো সত্যি। কিন্তু কল্পনার গল্প মনে হচ্ছে। বরং গল্পকেও হার মানায়। শেষটা শুনলে আরো মজা হতো। তবে আজ আর নয়। মা আর আপু মিলে কি যে করে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। দরজা হয়তো খুলবেই না।
এত ভয় পাস কেন্? বাপের বেটা না তুই? কিছুটা খেপে গেলো শিমুল।
পিয়াল বললো : আরে নারে ভয়ের কি আছে বাপ। ভয় করলে কি প্রায় অর্ধ রজনী ধরে তোর সাথে কাটাই এই এখানে- নিঝুম চরে।
তা ঠিকই -বললো শিমুল। ঠিক আছে চল ফিরে যাই আজ।

দুই.
বিকেল বেলা। পিয়ালদের বাড়িতে নাস্তার দাওয়াত। দাওয়াত দিয়েছে শায়লা। পিয়ালের বড় বোন। পিয়ালের সব বন্ধুরা অংশ গ্রহণ করলো দাওয়াতে। শিমুল, তমাল, রবিন সবাই। এরা সবাই জানে শায়লা আপু আসা মানে একটি দাওয়াত অপেক্ষা করছে ওদের জন্য। এই দাওয়াতটা বেশ আনন্দঘন। কখনো দুপুরে খাওয়ার দাওয়াত। কখনো বিকেলে নাস্তার দাওয়াত। কখনো দুটোই থাকে। যে দিন দুপুরের দাওয়াত পড়ে সেদিন বিকেলে নাস্তাও থাকে। ফলে দুপুরের দাওয়াতটাই ওদের বেশি পছন্দ। বিশেষ করে শিমুলের। শিমুল বরাবরই নিজের বাসা থেকে পালিয়ে বেড়াতে চায়। সুযোগ পেলেই সৎ ব্যবহার করে তার। হয়তো লেখাপড়ার বিষয়ে কিংবা অন্য কোনো ব্যপারে শিমুলের মা-বাবার শাসন থাকেই। এটাকে পছন্দ করে না শিমুল। তাই উসিলা খোঁজে। কোনো রকম বাহানা পেলেই কাজে লাগাতে একদম দেরী করে না।
নাস্তার টেবিলে সবাই। হাতে বানানো ক’পদের পিঠা তৈরী করেছে শায়লা। নারিকেল বর, ডিমকুয়া, সবজি দিয়ে ঝাল পিঠা। সংগে পায়েশ। শায়লার নারিকেল বর আর পায়েশ এই দুটোর জন্য প্রত্যেকে লোভে থাকে। সেই লোভাতুর জিনিসগুলো টেবিলে সাজানো। দেখেই সবাই জিব নেড়ে নিলো একবার। প্রতিটি পিঠা আলাদা আলাদা প্লেটে সাজানো। একটি মেলা মাইনের বড় বাটিতে পায়েশ। পিয়াল শিমুল দুজনের লোভ পায়েশের ওপর। শায়লার পায়েশটা অন্যরকম। পানি ছাড়া, শুধু দুধ দিয়ে রান্না করা। চেহারাটা দেখলেই খেতে ইচ্ছে করে।
শায়লা তার এক বান্ধবী থেকে পায়েশ রান্না শিখেছে – এ গল্প পিয়ালদের সাথে একাধিকবার করেছে ও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকিজ্ঞানের ছাত্রী সে। ভর্তি হবার পর বন্ধুত্ব হলো নোয়াখালির মেয়ে রিয়ার সঙ্গে। শামসুন্নাহার হলে থাকার সুবাধে বন্ধুত্ব জমে গেছে বেশ। আবার বাড়িতে আসা যাওয়ার সাথী হয় দুজন দুজনের। বাস্ আর কি। দুবান্ধবীর এখন দারুণ সম্পর্ক। রিয়ার আম্মা মূলত রন্ধন শিল্পী। পায়েশটা রিয়ার আম্মার রেসিপি। রিয়ার আম্মা থেকে রিয়া শিখেছে। রিয়া থেকে শায়লা।
নাস্তার টেবিলে বসলো সকলে। পিয়ালকে বসতে বাধ্য করলো শায়লা। পিয়াল ভেবেছিলো পরিবেশনে বোনকে সাহায্য করবে। কিন্তু সে সুযোগ দিলো না শায়লা। বললো- মেহমানের মতো ঠিকঠিক বসে খাও। বাকি সব দায়িত্ব আমার। অতএব পিয়ালকেও শিমুলদের মতো মেহমান হয়ে থাকতে হলো। ওরা খাচ্ছে। গল্প করছে শায়লা। এর মধ্যে কয়েকবার দেখভাল করে গেলো পিয়ালের মা।
শায়লার কাছে পিয়ালের বন্ধুরা অনেক আদরের। যতবার বাড়ি আসবে ততবারই জমাবে আসর। নানান কথা বলছে শায়লা। ফাঁকে ফাঁকে প্লেটে তুলে দিচ্ছে পিঠা। খুব মজা করে খাচ্ছে সবাই।
শিমুল বললো : আপুটা যদি আরো ঘনঘন বাড়ি আসতো। আমাদের ভাগ্যটা আরো ভরপুর হতো। খেয়ে খেয়ে মানুষ হয়ে যেতাম। শিমুলের কথায় হেসে উঠলো সবাই। শুধু তমালটা একটু গম্ভীর। ও খাচ্ছে কিন্তু ফূর্তি নেই মনে। বিষয়টি লক্ষ করলো শায়লা। বললো : তমাল বাবুর মন খারাপ কেনো। মায়ের বকুনি খেয়েছো নাকি!
কোনো জবাব দেয় না তমাল। রবিন বললো- ও ধীরে ধীরে গবেষক হয়ে উঠছে আপু। গবেষকরা কম কথা বলে। সবাই হাসলো আরেক চোট।
তবুও প্রতিক্রিয়া নেই তমালের। শিমুল বললো – ও গালে আস্ত পিঠা চালান করেছে বোধয়। কথা বলবে কি করে? আবার হাসলো সবাই।  হেসেই বললো পিয়াল- তুই যা করিস তমালও তাই করলো নাকি।
ঠিক তখন ভেতরে কারো কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। কান খাড়া করে শায়লা। মহিলা কণ্ঠ। শায়লার আম্মুর সাথে কথা বলছে। বলছে খানিকটা উচ্চ স্বরে। এবং বলছে পিয়ালকে ঘিরে। হ্যাঁ ওই তো পিয়ালের নামেই কথাগুলো হচ্ছে। ডাইনিং টেবিলে পিয়ালেরা সবাই চুপ এবং স্থির। কিন্তু উসখুস করছে তমাল। তখনই ভেসে এলো কথাটি- আমার ছেলেকে নষ্ট করছে পিয়াল। এতক্ষণে সবার কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেলো। কণ্ঠটি তমালের মার। বিচার নিয়ে এসেছে পিয়ালের মার কাছে। অভিযোগটা পিয়ালের বিরুদ্ধেই। পিয়ালের সাথে আড্ডা দিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তমাল। লেখাপড়ায় মন নেই। শুধু খেলাধুলা আর গালগল্প। কাল গভীর রাত পর্যন্ত কই ছিলো জিজ্ঞেস করেন তো পিয়ালকে। বলে থামলো তমালের মা।
সাথে সাথে জবাব দিলো পিয়ালের মা : কেনো আপনার ছেলেকে জিজ্ঞেস করেননি?
হ্যাঁ করেছি তো। ও তো বললো পিয়ালের সাথে নদীর কূলে গেছিলো। কথাটি কি সত্য?
আপনার ছেলেকে আপনি অবিশ্বাস করেন? আমি তো আমার ছেলেকে কখনো অবিশ্বাস করি না। আমার ছেলে মিথ্যে কথা বলেও না। অন্যায় করলেও স্বীকার করে। আমিও ওকে ক্ষমা করে দেই। বড় অপরাধ হলে শাস্তি দেই। আপনার ছেলে যা বলেছে পিয়ালতো তা-ই বলেছে। এখন লেখাপড়া কম। স্কুল বন্ধ। ওরা তিনবন্ধু মিলে গেছে নদীর কূলে। এতে অসুবিধার কি হলো? অবশ্য আমি পিয়ালকে শাসিয়েছি কেনো আমাকে বলে যায়নি একারনে। আমি আমার ছেলেকে বলে দিয়েছি যা খুশী দুষ্টুমি করো। কিন্তু বেয়াদবী করবে না কারো সাথে। আমার ছেলেও তাই। ও কারো সাথে বেয়াদবী করেছে এমন কথা কেউ বলতে পারেনি। এক নাগাড়ে অনেকগুলো কথা বললো পিয়ালের মা।
শায়লা বললো- দেখুন চাচী ছেলেকে অবিশ্বাস করলে ও কিন্তু খারাপ হয়ে যাবে। বরং ওকে বিশ্বাস করলে ও দায়িত্বশীল হবে। মিথ্যে বলবে না আপনার কাছে।
খানিকটা যেনো লজ্জাই পেলো তমালের মা। বললেন- আপনাদের মতো করে আমি তো ভাবতে পারি না। ও বাইরে গেলে আমার শুধু মনে হয় এই বুঝি খারাপ কিছু করে ফেললো। তাছাড়া, একটু কণ্ঠ নামিয়ে দম নিয়ে বললো- শিমুল ছেলেটি পিয়ালের ঘনিষ্ট। কিন্তু শিমুল তো ফেলই করলো এবার । ফেল করা ছেলের সাথে থেকে তমালও যদি লেখাপড়া খারাপ করে! আমার ভয়টা এখানে।
কথাটা কানে যেতেই মাথা নিচু করলো শিমুল। লজ্জায় লাল হয়ে গেলো চেহারা।
তমালের মাথা তো আগেই নিচু করা।
বাকি রইলো পিয়াল, রবিন।
যেহেতু পিয়ালের বিরুদ্ধে অভিযোগ-চুপ করে আছে পিয়ালও।
কথা বললো রবিন : তোরা দেখি সবাই আসামীর কাঠগড়ায়। আমি একাই তবে বিচারপতি হয়ে যাই। বিচার করি তোদের। রায় ঘোষণা করছি আমি-তোদের প্রত্যেকের তিন মিনিটের ফাঁসি। পরিবেশ হালকা করতে চাইলো রবিন।
অন্য সময় হলে অট্ট হাসিতে ফেটে পড়তো সবাই। এখন অট্টো হাসির জায়গায় ঠাই পেলো মুচকি হাসি। সেই সাথে কিছুটা সহজ হয়ে গেলো সকলেই।
রবিনের বিচারের রায় শুনলো শায়লা। বললো- বাহ্ দারুণ দারুণ! রবিন। ওরা তিনজন তো আসলেই আসামী হয়ে গেছে। বিচারটা হয়েছে যথাযথ। বলে হাসলো শায়লা।
তমালের মা চলে গেলো। আবার নীরব হয়ে গেলো তমাল। কথা বললো শিমুল- দেখ তমাল তোর বিষয়টি তোকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তুই ভালো ছাত্র থাকবি নাকি খারাপ হয়ে যাবি। তবে আজ আমি কথা দিচ্ছি তোদের; আবার আমি ভালো ছাত্রের কাতারে দাঁড়াবো। চাচীর কথা শুনে আমার মনে হলো এভাবে সবাই হয়তো আমাকে নিয়ে ভয় পায়। সব চেয়ে বেশি ভয় পায় আমার মা। আমি আমার মাকে ভয় থেকে মুক্ত করতে চাই।
তাহলে তুই কিন্তু মি. কিন হয়ে যাবি। আমাদের সাথে আর আড্ডা ফাড্ডা দিবি না? বললো রবিন।
পিয়াল বললো- নারে ও হয়ে যাবে মহান দরবেশ। ওর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারবে না কেউ। আমাদের সাথে থাকবে কি করে ও। পিয়ালের কথায় আবার হাসলো রবিন। বললো- যত দু:খ আমাদেরই পিয়াল।
রেগে গেলো শিমুল। তোরা দুজন ইয়ার্কি করছিস। আমি কি বলেছি তোদের সাথে আর আড্ডা দেবো না। গল্প করবো না। একশবার আড্ডা  দেবো। হাজার বার গল্প করবো। সেইসাথে করবো লেখাপড়া ব্যাস্।
এতদিন করিসনি কেন্? কেন্ ফেল করলি তুই? এতক্ষণে কথা বললো তমাল।
তমালের দিকে চোখ তুলে নীরব হয়ে গেলো শিমুল। খানিক চুপ থেকে নরম গলায় বললো- এর জন্য আমিই দায়ী। আর দায়ী আমার মা। মা আমাকে পারলে চব্বিশ ঘন্টাই পড়ার টেবিলে রাখতে চাইতো। মায়ের ভয়ে আমিও বসে থাকতাম পড়ার টেবিলে। মাঝে মাঝে ফাঁকি ঝুকি দিয়ে উঠে যেতাম। বিনিময়ে মাও বকাঝকা, মারধর দিতো। একদিন না পড়ার অপরাধে এমন মারা মারলো একরকম বেহুশ হয়ে গেছি আমি। কিন্তু মার থামেনি। সে থেকে লেখাপড়ার প্রতি দারুণ অনিহা জন্ম নিলো আমার। ফলাফল খারাপ হতে লাগলো। শেষতক করলাম ফেল। ফেল করে মনে হলো ক্ষতিটা আমারই। আমি লেখাপড়া না করলে কার কি আসে যায়।
ও বাবা এ কাকে দেখছি যে! এতো দেখি নিজামউদ্দিন আওলিয়া। সাবাস শিমুল চালিয়ে যাও- আমরা আছি তোমার সাথে -বললো রবিন।
কি কাজে ভেতরে গেছিলো শায়লা। ঢুকেই শুনলো রবিনের শ্লোগান। বললো- যে প্রতিজ্ঞা করেছে শিমুল তোমরা ওকে উৎসাহ দাও। বলেই আবার ফিরে গেলো নিজের কাজে।
সবাই বললো- হ্যাঁ হ্যাঁ আমরা অনেক উৎসাহ দিলাম। অনেক উৎসাহ তোকে শিমুল।
শিমুল তোমার ভয় নেই। আমরা তো আছি-ই -আবারো বললো রবিন।
এই রবিন তুই আজকাল বেশি দুষ্টু হয়ে গেছিস। আয় এবার ঘাটে যাই। তারপর বাই বাই। বললো পিয়াল।
এই তুই তো কবিতা লেখার আগে মিল শুরু করে দিলি -গা ঝাড়া দিলো শিমুল। আরো বললো- তুই সত্যিই কবিতা লেখা শুরু করবি নাতো?
কবিতা লেখা অত সহজ? খালি শব্দের সাথে মিল হলেই কি কবিতা হয়ে যায়? ঘাটের দিকে যেতে যেতে বললো পিয়াল।
ও বাবা এতো দেখি মহাপণ্ডিত -বললো শিমুল।
তবে কিভাবে হয় শুনি। সিরিয়াস ভংগিতে দাড়িয়ে গেলো রবিন। বলুন পণ্ডিত মশাই। আপনি তো কবিতার সবকিছু জেনে গেছেন বলুন তবে কিভাবে হয় কবিতা।
রবিনের সিরিয়াসনেস দেখে হেসে ফেললো পিয়াল। তোর বেশ উন্নতি হয়েছে রে রবিন। শিমুলের উপস্থিত বুদ্ধি তোর ওপর ভর করেছে বোধয়।
এই তো দিলি সব শেষ করে। শিমুলের বুদ্ধি আমার ওপর ভর করবে কেনো। আমার বুদ্ধিই আমার ওপর ভর করেছে। বলে হো হো করে হাসলো রবিন।
পিয়াল একবার রবিনের দিকে চাইলো। তারপর হাটা শুরু করলো ঘাটের দিকে। সাথে হাটছে শিমুল রবিন তমাল। শেষ বিকেলটা ঘাটেই কাটাবে ওরা।

তিন.
সকাল সকাল তমালের মাকে দেখে চমকে উঠলো পিয়াল। তমাল নিশ্চয় কোনো অঘটন ঘটিয়েছে এর মধ্যে। কি ঘটিয়েছে এখন সেটিই জানার বিষয়। জানাও গেলো। কাল রাতে বাড়ি ফেরেনি তমাল। কেনো ফেরেনি কিছুই জানে না তমালের মা।
পিয়াল অবাক হলো। সন্ধ্যার সময় বিদায় নিলো বাড়ি যাচ্ছে বলে। তাহলে কোথায় গেলো ও। কাউকে কিছুইতো বলেনি। তবে কি মায়ের ওপর অভিমান করে চলে গেলো কোথাও।
এখন কি করবো আমি। কোথায় খুঁজবো! কে আমাকে সাহায্য করবে। কান্না করছে তমালের মা।
পিয়াল বললোÑ আমরাই খুঁজবো চাচী। আপনি ধৈর্য ধরুন। আত্মীয় স্বজনের বাসায় খবর নিন।
বাবা মোবাইলে সম্ভাব্য সব বাড়িতে খবর নিয়েছি। শহরে আমার এক আত্মীয়ের বাসা আছে। সেখানেও খবর নিয়েছি। তমালের বাবার আত্মীয়ের বাসা ঢাকায় ওখানেও খবর নিলাম। ওদের ওখানেও যায়নি। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না কোথায় গেলো আমার মানিকটি। ওর বাবা বেঁচে থাকলে এতক্ষণে কত জায়গায় কবর নিতো। আমার বড় ছেলেকে এ খবর জানাইনি এখনো। সেই সুদূর অষ্ট্রেলিয়ায় দু:খের খবর কি করে বলবো আমি। শুনলে ছেলেটি একা একা অসম্ভব কষ্ট পাবে।
আপনি বাড়ি যান চাচী। আমরা খুঁজবো ওকে। আশেপাশের কোনো বাড়িতে হয়তো আছে। পিয়ালের কথায় কিছুটা নির্ভরতা পেয়েছে তমালের মা। পিয়াল যা বলে তাই করে। মিথ্যে বলার অভ্যাস নেই ওর- এ কথা জানে তমালের মা।
তবু ছেলে মানুষ পিয়াল। দ্বিধা নিয়ে ফিরে গেলেন তিনি। বলে গেলেন- তোমাদের বন্ধু – ওকে খুঁজে দাও বাবা।
শিমুলের সাথে কথা ছিলো আজ পাখি ধরবে ওরা। দুদিন বাদে স্কুল খুলে যাবে। কাস শুরু হলে লেখাপড়ার চাপে চ্যাপ্টা। পাখি ধরার অবসর কোথায় তখন। সুতরাং দুটো দিন বেশ করে কাজে লাগাবে এই ছিলো পরিকল্পনা। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আজকের দিন ছিলো পাখি ধরার দিন। এখন পাখি ধরা  লাটে উঠলো। সব পরিকল্পনা মাটি। পথে পথে খুঁজতে হবে তমালকে। তমালটা বড় পাজি। কথা নেই বার্তা নেই। হঠাৎ হাওয়া। আরে বাবা এত অভিমান কিসের। মা বাবা ছেলে মেয়েকে শাসন করবে এটা তো খুবই স্বভাবিক কথা। এতে অভিমানী হওয়ার কি আছে। মনে মনে এসব ভাবছে পিয়াল।
নাস্তা খেয়ে পিয়াল দেরী করেনি আর। বেরিয়ে পড়লো ও। প্রাথমিক গন্তব্য শিমুলের বাড়ি। পিয়ালদের বাড়ি থেকে দুটো বাড়ি পরে তমালদের বাড়ি। তারও দু’বাড়ি পরে শিমুলদের বাড়িটি। পিয়াল সোজা শিমুলদের বাড়ি চলে গেলো। এ সময় শিমুলকে খুবই দরকার। জরুরী বিষয়ে শিমুলের বুদ্ধি ভালো।  খোঁজাখোঁজির ব্যপারে ওর তুলনা নেই। দুজন মিলে সহজেই খুঁজে নেবে তমালকে।
শিমুলদের দরজায় পিয়াল। দরজাটি দারুণ কারুকাজ করা। শিমুলের আব্বু রসিক মানুষ। বেশ নকশা করে বনিয়েছে দরজাটি। দরজায় দাড়িয়ে  ডাক দিলো শিমুলকে। শুনে দরজা খুললেন শিমুলের মা। খানিকটা রাগান্বিত চেহারা তার। পিয়ালকে দেখে বললেন- ও তুমি! শিমুলকে দরকার! খুঁজে নাও  কোথায় আছে ও। ও কাল রাতে বাড়ি ফেরেনি। বলেই দরজাটা বন্ধ করে দিলো।
পিয়ালের মাথায় কেউ যেনো হঠাৎ বাড়ি দিলো। কি করবে বুঝতে পারছিলো না। কয়েক মুহূর্ত অবুঝের মতো দাঁড়িয়ে রইলো দরজায়। যখন বুঝলো এখানে দাঁড়িয়ে থাকা আরো অপমান- অমনি পা বাড়ালো ও। আগে বের হতে হবে শিমুলদের বাড়ি থেকে।  তাপর সিদ্ধান্ত নেবে-যাবে কোথায়। দ্রুত পায়ে বেরিয় এলো রাস্তায়। রাস্তাটি ডানে চলে গেছে নদীর কূল পর্যন্ত। বাঁয়ে চলে গেছে শহরে। শহর মানে জেলা শহরে। শিমুলদের বাড়ি থেকে শহর মাত্র বার কিলোমিটার। পাকা রাস্তা। খুব সহজে চলে যাওয়া যায় শহরে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ভাবলো পিয়াল। কোন দিকে যাবে ও। শহরে? নাকি নদীর দিকে। নাকি আশপাশের বাড়িগুলোয় খোঁজ নেবে একবার।
শুধু তমাল ছিলো ওর লক্ষ। এখন যোগ হয়েছে শিমুল। তমালকে খোঁজা ওর নিজের এবং তমালের মায়ের তাগিদ। আর শিমুলকে ওর নিজের তাগিদেই খুঁজতে হবে। দুজনই ওর বন্ধু। অথচ কেউ ওকে কিছুই বললো না। অভিমানে বুকটা ভারী হয়ে ওঠে পিয়ালের। তাহলে বন্ধুত্বের সম্মান রাখলো কোথায়। এসব ভাবার এখন সময় নয়। খুঁজতে হবে ওদের। কিন্তু কোথায়? কিভাবে শুরু করবে? ভাবলো আরো কিছুক্ষণ। রবিনকে সাথে নেবে? না থাক পরক্ষনেই বাতিল করলো সিদ্ধান্ত। একাই খুঁজবে ও। শহরের দিকে পরে। আগে নতুন গড়ে ওঠা চরের বাড়িগুলো খুঁজবে। গরুর খামার আর ভেড়ার টঙ। বিশেষ করে শিমুলের এসব জায়গার কোনো একটাতে লুকিয়ে থাকার সম্ভাবনা আছে। নদীর কূলে গেলেই শিমুল টঙঘর দেখিয়ে বলতো- এখানে থাকার মজাই আলাদা। চারপাশে শূন্য। মাঝখানে দোতলা সমান উঁচু টঙ। শোঁ শোঁ বাতাসের শব্দ। আহা! বড়ই মজার ব্যপার হবে নিশ্চয়। শিমুলের এসব কথা মনে পড়ছে পিয়ালের। সুতরাং পিয়াল সিদ্ধান্ত নিলো সবগুলো টঙঘর আজকের মধ্যে দেখতে হবে। তারপর খামার বাড়িগুলো এরপর অন্য জায়গা। পিয়ালের প্রাথমিক ধারণা তমাল যেতে পারে শহরের দিকে। এমনকি ঢাকায়ও যেতে পারে। শহর ওর ভীষণ পছন্দ। কিন্তু শিমুল তমাল দুজন যদি যুক্তি করে চলে যায় কোথাও? হঠাৎ মনে প্রশ্ন দেখা দিলো পিয়ালের। হ্যাঁ তাইতো দুজন একসাথেও তো যেতে পারে। পরক্ষণেই ভাবে- নাহ্। শিমুল কোনোভাবেই তমালের সাথে পালাবে না। সে যাই হোক পিয়াল আগে টঙঘরসহ চরের বড়িগুলো খুঁজবে। লক্ষ শিমুল। তমালের ফয়সালা পরে হবে। শিমুলকে পাওয়া গেলে দুজন মিলে উদ্ধার করবে তমালকে। শুরু হলো পিয়ালের অভিযান। একটি দুটি করে টঙঘরগুলো দেখে ফিরছে পিয়াল। জিজ্ঞেস করছে রাখালদের। সবার প্রায় একই কথা এমন কোনো ছেলের দেখা পায়নি তারা। না শিমুলের মতো কেউ। না তমালের মতো। তবুও হতাশ হয় না পিয়াল। মনের জোর বাড়ায়। নিশ্চয় শিমুলকে পেয়ে যাবে এই চরেই।
দুপুর খরতাপ ছড়াচ্ছে। হাটতে হাটপতে কান্ত হয়ে গেলো পিয়াল। পানির পিপাসাও পেয়েছে বেশ। ক্ষুধাও জেগেছে। কিন্তু পানির পিপাসাটা অতি তীব্র। পানি না খেলে বেশিদূর হাটা সম্ভব হবে না আর। সামনে একটি মোষের খামার। খামারে পানি পেতে পারে এমন একটি সম্ভাবনা আশাবাদী করে পিয়ালকে। ধীরে ধীরে উঠে আসে খামারীর ঘরে। ঘরটা বেশ খানিকটা উঁচু ভিটায়। দেখতে ছোটখাটো টিলার মতো। টিলার উপরেই শনের ঘর। চৌচালা ঘরটি কিছুদিন আগে ছাউনি বদল করা হয়েছে। এখনো নতুন শন। দুপুরের খাঁ খাঁ রোদে একরকম ঝিকঝিক করছে। উপরে ওঠার পথটা খানিকটা সরু। টিলার তিনপাশে উঁচু জায়গা। এক পাশে বিরাট দীঘি। এই দীঘিতে মোষগুলো গরমে নেমে পড়ে ইচ্ছেমতো। পানি থেকে উঠে উঁচু জায়গায় বসত করে। এসব দেখতে দেখতে উঠছিলো পিয়াল। পিয়ালের লক্ষ টিলার ঘরটিতে তৃষ্ণা মেটানোর মতো পানি সংগ্রহ করা। শেষতক উঠে এলো। না দেখা যায় না কাউকে। ডাক দিলো পিয়াল- কেউ কি আছেন? একটু পানি খাবো। নাহ্ কেউ জবাব দেয় না। কথাও বলে না।
খোলা দরজায় দাঁড়ালো পিয়াল। ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখলো একজন বৃদ্ধ নামাজ পড়ছে। অপেক্ষা করছে পিয়াল। নামাজ শেষ করে অতি ধীরে সালাম ফিরালো লোকটি।
পিয়াল বললো- একটু পানি খাবো চাচা। পাওয়া যাবে খাওয়ার পানি? হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো বৃদ্ধ। ইশারায় বসতে বললো। দ্রুত বসে পড়লো পিয়াল। বৃদ্ধ জায়নামাজ থেকে উঠলেন। হাতে তার তসবিহ দানা। বললেন- এখানে কিসের কারণে? বৃদ্ধের গলার আওয়াজটা কেমন যেনো অন্যরকম। বহুদিন কারো সাথে কথা না বললে যেমন হয়।
পিয়াল বললো- একটু পানি। খুব পিপাসা পেয়েছে। পিয়ালের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত একবার দেখে নিলো বৃদ্ধ। মুখে কোনো কথা বললেন না। ঘরের এক কোণ থেকে একটি জগ আর একটি গ্লাস এগিয়ে দিলেন পিয়ালকে। গ্লাসে পানি ঢেলে ঢকঢক করে গিলে ফেললো এক গ্লাস। তারপর আরেক গ্লাস। তারপর আরো এক গ্লাস। কি ভীষণ তৃষ্ণায় বুকটা শুকিয়ে উঠেছে। পানি খেয়ে যেনো আবার সজীব হলো বুক। লোকটা আবার জায়নামাজে বসে তসবিহ ঘোরাচ্ছে। চোখ তার আধবোজা। পিয়াল ভেবেছিলো শিমুলের কথা জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু বৃদ্ধের অবস্থা দেখে কিছু বলার সাহস হলো না। সিদ্ধান্ত নিলো চলেই যাবে। কিন্তু বলে যাবে নাকি না বলেই চলে যাবে- সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। বোকার মতো দাড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো পিয়াল। না বৃদ্ধ চোখ খোলে না। ঠোঁট নাড়ছে আর তসবিহ দানা টিপ টিপ ঝরছে। পিয়াল সিদ্ধান্ত নিলো ও না বলেই চলে যাবে। কারণ ওর হাতে সময় নেই। আরো কটি খামার বাড়ি ঘুরতে হবে ওকে। দিনে দিনেই শেষ করতে চায় খামার বাড়িগুলো।
ঘুরে পা বাড়ালো পিয়াল।
আহ্ থামোÑ বৃদ্ধের গম্ভীর কণ্ঠ পিয়ালের পা কে থামিয়ে দিলো। দরজার পাশে একটি জলচৌকি দেখিয়ে বসতে বললো।
মন্ত্রমুগ্ধের মতো কোনো কথা না বলে বসে পড়লো পিয়াল। বুকের ভেতর ধুকধুক করছে। এতক্ষণে ভয় কাবু করে ফেলছে পিয়ালকে। কিন্তু বৃদ্ধের নির্দেশ অমান্য করার সাহস তার নেই। সুতরাং ভেতরে ভয় থাকুক তাই নিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে তাকে।
বৃদ্ধ আবার আগের মতো চোখ বুজে ঘুরাচ্ছে তসবিহ দানা। এখন আর তসবিহ দানার দিকে খেয়াল নেই পিয়ালের। এখান থেকে কি করে পালাবে- কি করে বৃদ্ধের দৃষ্টির আড়ালে যাবে এমন চিন্তাই করছে সে। একবার ভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে দৌড় দেবে। বৃদ্ধ নিশ্চয় ওকে ধরার জন্য দৌড়াবে না। দৌড়ালেও ওর সাথে পেরে ওঠবে না বৃদ্ধ। কিন্তু পরক্ষণেই তার এ চিন্তা বাতিল হয়ে যায়। আবার সাহস সঞ্চয় করে। আবার বাতিল হয়ে যায়। পিয়াল নিজের কাছে নিজেই অচেনা হয়ে পড়ে। ভাবে কেনো এখানে পানি চাইতে এলো। আবার ভাবে এসে ঠিকই করেছে। শিমুল যদি এখানে লুকিয়ে থাকতো! এভাবে যুক্তি পাল্টা যুক্তি খাড়া হয় তার ভেতর। কিন্তু কোনো যুক্তিই বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না।
তাহলে ও কি করবে এখন। কি করা উচিৎ তার। আবার সিদ্ধান্ত নেয় পালাতেই হবে তাকে। বৃদ্ধের দিকে তাকায়। আগের মতই চোখ বুজে আছে বৃদ্ধ। পিয়ালের চোখ বৃদ্ধের দিকে। শব্দহীন দাঁড়াতে হবে ওকে। তারপর এক কদম ফেললেই দরজার বাইরে চলে আসবে ও। খুব সাবধানে উঠে দাড়াচ্ছে পিয়াল।
আহ্- তসবিহ্সহ উপরের দিকে হাত তুলে আবার নামালো বৃদ্ধ। বসে থাকার নির্দেশ দিলো। তসবিহ দানা ঘুরাচ্ছে আগের মতই। ভারী বিপদের গন্ধ পাচ্ছে পিয়াল। কোনোভাবেই এই বৃদ্ধলোকটিকে আর স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না তার। কিন্তু করারও কোনো উপায় নেই। বুকের ভেতর দলা পাকাচ্ছে ভয়ের রশি।
সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে অনেক দূর। ক্ষুধায় অবস্থা কাহিল। যদিও এই মুহূর্তে ক্ষুধার চেয়ে ভয় তাকে কাবু করে ফেলেছে। কিছুই সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না ও।
পিয়ালের কেবলই মনে হচ্ছে লোকটি ওর মনের কথা বুঝে যাচ্ছে। এভাবে কেটে গেলো আরো কিছুক্ষণ। ভয়ের অনুভূতিটা ভোতা হয়ে যাচ্ছে। তীব্র হচ্ছে ক্ষুধার কষ্ট। এটাও যেনো বুঝে ফেললে বৃদ্ধ।
জায়নামাজ থেকে উঠলো লোকটি। ঘরের পূর্ব দক্ষিণ কোণে গেলো। একটি ছোট সিলভারের কলস ওখানে। তার একটু উপরেই বেড়ার সাথে দুই মাথায় আটকানো তারে বাঁধা একটি তক্তা। তার ওপর উপুড় হয়ে আছে বড় সাইজের দুটি গ্লাস। একটি হাতে নিলো বৃদ্ধ। গ্লাসটি মাটিতে রেখে কলসি থেকে কি যেনো ঢাললো। ঝোলানো তক্তার উপরে কাপড়ের একটি পুটলি। বৃদ্ধ নামিয়ে নিলো পুটলিটি। তক্তা থেকেই তুলে নিলো একটি প্লেট। পুটলি থেকে কি যেনো নিলো প্লেটে।  বেড়ার দিকে মুখ করে এসব করছে বৃদ্ধ। ফলে দেখতে পাচ্ছে না প্লেট, গ্লাসে কি নিলো লোকটি। কয়েক মুহূর্ত। তারপর এক হাতে গ্লাস আর অন্যহাতে প্লেট নিয়ে ফিরে এলো পিয়ালের কাছে। প্লেট গ্লাস সামনে রেখে বললো- বিসমিল্লাহ্ পড়ে খাও।
পিয়ালের চোখের সামনে এক গ্লাস দুধ আর একমুষ্ঠির বেশি পরিমান চিড়া প্লেটের বুকে।
ক্ষুধার তীব্রতা এত বেশি এটাকে খুব সামান্য আহার মনে হচ্ছে পিয়ালের। তবু কিছুটা হলেও নিভবে ক্ষুধার আগুন। চিড়া চিবানো শুরু করলো দ্রুত। একটু পরপর চুমুক দেয় দুধে। এভাবে বেশ খানিক সময় লেগে গেলো চিড়াগুলো শেষ করতে। চিড়া শেষ করে যখন দুধের গ্লাসে শেষ চুমুক দিলো তৃপ্তিতে ওর ভেতরটা শান্ত হয়ে উঠলো। পিয়ালের ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। এর থেকে বেশি হলে ও আর খেতেই পারতো  না। অবাক হলো পিয়াল। বৃদ্ধ কি তার ক্ষুধার পারিমাপও জেনে গেছে।
ঘরময় পায়চারী করছে লোকটি। একবারও পিয়ালের দিকে তাকাচ্ছে না। পিয়াল বসে আছে এ অনুভূতিও নেই তার।
এ সুযোগে পিয়াল পালাবে কি? ভাবছে সে। কিন্তু না। ওর সাহস ওকে সহযোগীতা করছে না।
পিয়ালকে অবাক করে দিয়ে বৃদ্ধ বললো- যা চলে যা। কাল আবার আসিস।
দম বন্ধ করে ছুটলো পিয়াল। পারলে উড়াল দিয়ে যায়।  কিন্তু কদম দ্রুত চলে না। মনে হচ্ছে আবার সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে বৃদ্ধটি। এইবুঝি বললো- থাম। অমনি থেমে যাবে পিয়ালের পা। না। বৃদ্ধ নির্দেশ দেয়নি। পিয়ালও দ্রুত নেমে এলো রাস্তায়। তার প্রশ্ন কে এই বৃদ্ধ! কেনো এভাবে এই খামার বাড়িতে। কেনো আবার আসতে বললো ওকে? অসম্ভব এদিকে আর পা বাড়াবে না ও।

চার.
সন্ধ্যা নেমে গেছে আগেই। শিমুল তমাল কারো সন্ধানই পেলো না পিয়াল। মনটা খুবই খারাপ। তমালের মা হয়তো বসে আছে পিয়ালদের বাড়িতে। পিয়াল হাটছে ধীরে। ইচ্ছে করেই। দেরী হোক। যাতে দেখা না হয় তমালের মার সাথে। রাত তখন আটটা। পিয়াল ঢুকলো বাড়িতে। ওর ধারণা ঠিক নয়। তমালের মা ওর অপেক্ষায় নেই। কিছুটা অবাক হলো পিয়াল।
ঘরে ঢুকতেই দেখা হয়ে গেলো পিয়ালের মার সাথে। এক নজর দেখলো ও। বেশ থমথমে মার মুখ। দেখে মনে হয় যে কোনো সময় বজ্রপাত হবে। পিয়াল তার কক্ষে গেলো। পিছে পিছে গেলো ওর মা। দুপুরে কোথায় খেয়েছিস শুনি। বন্ধুদের জন্য নিজেকে কোরবান করে দেবে! খাওয়া নেই নাওয়া নেই। দিন গিয়ে রাত এলো কোনো খবর নেই। সব কিছু থেকে মুক্ত হয়ে গেছিস মনে হয়। আসুক এবার তোর বাবা। সব বলবো আমি। স্বাধীনতা দিছি বলে যা ইচ্ছে তাই করবি নাকি। সারাদিনের জমানো রাগ ঝেড়ে দিলো পিয়ালের ওপর। ঝেড়ে হনহন করে চলে গেলো রসুইঘে নে তখনো ভাসছিলো তমালের মার ব্যথিত মুখ। পিয়ালের মা বেরিয়ে যেতেই রুমে ঢুকলো শায়লা। বলে রর দিকে।
কোনো কথাই বললো না পিয়াল। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আঙুল খুঁটছিলো। ওর  মন খারাপ করিস না। দুপুরে খেতে আসিসনি ক্ষেপে গেছে মা।
তমালের মা আসছিলো? পিয়ালের প্রশ্ন।
নারে আসেনি। একটি খারাপ খবর আছে। তমালদের ঘর ডাকাতি হয়েছে সন্ধ্যা বেলায়। মারধর করেছে তমালের মাকে। আর তমালতো রক্তাক্ত। দেখতো বিপদের ওপর বিপদ। থামলো শায়লা।
পিয়াল যেনো বোবা হয়ে গেলো। শায়লার দিকে চোখ তুলে চেয়ে রইলো ভাষাহীন।
শায়লাই বললো ফের- গতকাল থেকে উধাও তমাল। সারাদিন খবর নেই। ডাকাতির মুহূর্তেই কোত্থেকে উদয় হলো। ঘরে ঢুকেই পড়লো ডাকাতদের কবলে। আর যায় কোথায়। আচ্ছা করে মেরে রক্তাক্ত করলো। আহারে মানুষ কত নির্মম হয়। আবার থামলো শায়লা।
তবু কথা বলে না পিয়াল। শায়লার দিকে চেয়েই আছে। ও যেনো শায়লার কথা বিশ্বাস করতে পারছে না। কিন্তু এতো বানানো কথাও নয়। বুকের ভেতর বেদনার পাথর বসে আছে যেনো।
শায়লা বললো- শোন পিয়াল তোর উচিৎ তমালকে দেখে আসা। ওকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রাতের বেলাতো যাওয়া যাবে না। সকাল সকাল গিয়ে দেখে আসিস। বারবার জিজ্ঞেস করছে তোর কথা। কাপড় চোপড় ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে আয়। খাবো। খুব ক্ষুধা লেগেছে। বলেই চলে গেলো শায়লা।
দপ করে খাটে বসে পড়লো পিয়াল। কতক্ষণ মনে নেই তার। শায়লার তাড়া খেয়ে উঠলো ও।

খুট খুট শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো পিয়ালের। কোন দিকে হলো শব্দটা বোঝার চেষ্টা করে সে। না এখন আর শব্দ নেই। রাত কটা বাজে! ওয়াল ঘড়িটার দিকে তাকায়- ৩টা। এ ঘড়িটার বিশেষ বৈশিষ্ট্য অন্ধকারে জ্বলে। পিয়ালের ছোট খালা লন্ডন থেকে ঘড়িটা এনেছিলো ওর জন্য। খুবই খুশি হয়েছিলো পিয়াল।  অন্তত: রাতে সময় দেখার জন্য আলোর সাহায্য দরকার হবে না। প্রথম প্রথম রাতে হঠাৎ ঘুম ভাঙলে ভয় লাগতো ঘড়িটা দেখে। যেনো মনে হতো অন্ধকারের গায়ে একটি বাঘের চোখ সেঁটে আছে। এখন অভ্যস্ত। ভয় সরে গেছে। বরং ভালোই হয়েছে। ঘুম ভাঙলেই সময় দেখা যায়। সময় দেখেই ওঠা যায় ঘুম থেকে।
পিয়াল কান সজাগ করে রাখে। না আর কোনো শব্দ নেই। ক্লাস, স্কুল, শিমুল, তমাল এলোমেলো কিছু ভাবনা মনের পর্দায় ঝিলিক দিয়ে যায়। এভাবে কিছুক্ষণ। তারপর মনের অজান্তে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমেও নানা রকম স্বপ্নের আনাগোনা। নদী ভাঙন। টঙঘর। খামারের সেই বৃদ্ধ। কোনোটাই পরিষ্কার নয়।
আবার খুট খুট শব্দ। আবার ভাঙলো ঘুম। কোন দিকে শব্দটা হলো বুঝতে পারে না সে। জানালা লাগানোই আছে। দরজাটাও আটকানো। শোয়ার সময় রুমের দরজা জানালা বন্ধ করতেই হবে ওর। আজও তাই করেছে। কিন্তু শব্দটা কোথায় হয়। রুমে নাকি বাইরে? ঘড়িতে সাড়ে ৩টা বাজে। পাশ ফিরে ঘুমানোর চেষ্টা করছে পিয়াল। শরীরটা একটু ভারী লাগছে। ভয় কাবু করছে বোধয়। বালিশের পাশেই বেড সুইচ। সুইচ টিপতে ইচ্ছে করছে না। এ সময়ের আলো আরাম নষ্ট করে। আলো জ্বালাতে ভালো লাগছে না পিয়ালের। ভয় হলে হোক তবুও না। পিয়ালের বোন শায়লা সম্পূর্ণ বিপরীত। সামান্য কিছু হলেই টিস্ করে জ্বালিয়ে দেবে লাইট। মাঝে মধ্যে লাইট অফই করে না।
এপাশ ওপাশ করে আবার ঘুমের সাথে মিতালী হয়ে গেলো। একটু পরেই খেচ্ খেচ্ শব্দ। নিঝুম নিস্তব্ধ রাত। গ্রামের রাত অনেক ভারী। নি:শব্দেরও একটি ওজন আছে মনে হয়। খেচ্ খেচ্ শব্দটি কানে এসে বাজে পিয়ালের। বালিশ থেকে সামান্য মাথা তুলে শব্দের উৎস খোঁজে। আবার খেচ্ খেচ্। শুয়ে সহসা শব্দের দিক বোঝা যায় না। আবার মাথা তোলে বালিশ থেকে। এবার আঁচড়ের শব্দ। মনে হচ্ছে জানালায়। জানালার দিকে চেয়ে আছে পিয়াল। খচ করে খুলে গেলো জানালার একটি পার্ট। সাথে সাথে ভেসে উঠলো লালের কাছাকাছি দুটি আলোর মার্বেল। কয়েক সেকেন্ড। তারপর মেঝেতে লাফিয়ে পড়লো আলোর মার্বেল দুটি। একটি কালো বিড়াল প্রায় অন্ধকারে মিশানো রঙ। চেয়ে আছে পিয়ালের দিকে। জ্বলজ্বল করে জ্বলছে দুটি চোখ।
গোটা শরীরের সমস্ত পশম খাড়া হয়ে গেলো এক নিমিষে। ভেতর থেকে ভয় যেনো গলায় এসে আটকে গেছে। অতিদ্রুত সুইচে হাত দিলো। না সুইচটিও জায়গায় নেই। যেনো সরে গেছে। কয়েক সেকেন্ড। খুঁজে পেলো সুইচ। চাপলো। জ্বলে উঠলো আলো। কয়েক সেকেন্ড যেনো কয়েক ঘন্টার মতো মনে হলো পিয়ালের।
আলো জ্বলার সাথে সাথে বিড়ালটি লাফিয়ে পার হয়ে গেলো জানালা। দড়মড় করে উঠে গেলো পিয়াল। অবাক হলো- জানালাটি খুললো কি করে! জানালার দিকে এগিয়ে যায় পিয়াল। ছিটকিনির দিকে তাকিয়ে নিজেকেই বোকা ভাবলো ও। দ্রুত লাগাতে গিয়ে ছিটকিনিটি হুকের উপরেই উঠে গেছে। ফলে জানালা থেকে গেলো খোলা। এ সুযোগই নিয়েছে বিড়ালটি।
কিন্তু বিড়াল কেনো ওর ঘরে? নিজেকে প্রশ্ন করে পিয়াল। জবাবও জোগাড় করে সে। হয়তো ঘরে ঢোকার আর কোনো পথ নেই। জানালায় উঠে আঁচড় কেটেছে। খুলে গেছে জানালা। বাস্ ঢুকে পড়লো। জানালার ছিটকিনিটা লাগিয়ে দিলো। ফিরে গেলো খাটে। মনের সন্দেহ দূর করার জন্য আবারও দেখে নিলো ছিটকিনি। না। এবার ঠিকই লেগেছে।
রাত ৪টা বেজে গেছে। সকালের এখনো দুঘন্টা বাকি। আবার ঘুমাবে নাকি পছন্দের কোনো বই পড়ে রাতটা কাটিয়ে দেবে ভাবছে পিয়াল। ঘুমাতে আর ইচ্ছে করছে না। আবার বই পড়তেও চাইছে না মন। অথচ এ দুটোর একটি ওকে করতেই হবে। কিন্তু দুটোর কোনোটিই করলো না ও। হঠাৎ মনে হলো ঘরে আকস্মিক কালো বিড়াল ঢোকার কাহিনী এবং তার সাথে কেমন ভয় তাকে জড়িয়ে ধরেছিলো লিখে রাখবে ও। টেবিলে গোছানো বই খাতার ভেতর থেকে একটি ডায়রি টেনে নিলো হাতে। ডায়রিটি খুবই সুন্দর। শিমুল উপহার দিয়েছিলো তাকে। শিমুলকে দিয়েছিলো ওর মামা। ডায়রিটি হাতে নিতেই শিমুলের কথা মনে পড়ে গেলো ওর। আজ আবার খুঁজতে যাবে শিমুলকে। হাসপাতালে তমালকে দেখে ছুটবে শিমুলের উদ্দেশ্যে। পিয়ালের দৃঢ় বিশ্বাস শিমুল গ্রাম ছেড়ে কোথাও যায়নি।

পাঁচ.
হাসপাতাল থেকে পিয়াল যখন বের হলো তখন সকাল ১১টা। তমালকে দেখে ওর মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেলো। ওর মনে একটাই প্রশ্ন মানুষ কেনো মানুষকে এমন আঘাত করে। মানুষ কেনো ডাকাত হবে। কেনো হবে চোর-বদমাশ। ইচ্ছে করলে তো যে কোনো মানুষ ভালো কাজ করতে পারে। হ্যাঁ সত্যিই পারে। বড় হয়ে এ কথাটি সত্যে পরিণত করবো আমি। ভাবতে ভাবতে হাসপাতাল থেকে উঠে এলো রাস্তায়। দাঁড়িয়ে খানিক্ষণ চিন্তা করলো কোথায় যাবে ও। শিমুলকে খুঁজে পেতেই হবে ওর। শিমল ওর সবচেয়ে ভালো বন্ধু। ফেল করেছে ঠিক কিন্তু অনেক মেধাবী ও। ফেল করার জন্য দায়ী তো ওর মা। অতিরিক্ত শাসন ওকে নষ্ট করেছে।
আরে এসব কি ভাবছে ও- বড় মানুষের মতো ভাবনাটা বড় হয়ে গেলো। নিজের ব্যপারে নিজেই মতামত দেয় পিয়াল। কিন্তু ভাবনাটা বড় হলেও একে সঙ্গেই রাখবে ও। রাখবে বাস্তবের সাথে।
হাসপাতাল থেকে প্রায় হাটা পথ দূরত্বে পিয়ালের মামার বাড়ি। একবার কি ঢু দিয়ে যাবে? মামাতো ভাইটি পিয়ালের সম বয়সী প্রায়। মাত্র ছমাসের বড় পিয়াল। ভাই বোন নেই ওর। ফলে পিয়ালই এখন ওর ভাই। নাম তার তুহু। নামটি পিয়ালের খুব পছন্দ।  মাঝেমধ্যে পিয়াল তাকে বলে- এই তুহু হু হু করে কোথায় যাও।
তুহু তখন পেট ফাঠা হাসি হাসে। হেসে বলে- ভাইয়া তোমার মধ্যে কবির স্বভাব আছে। লিখবা নাকি কবিতা।
নারে নামের সাথে ধাম মিলিয়ে দিলেই কি কবিতা হয়ে যাবে? এটা হবে গোবিতা। হা হা হা – একসাথে হেসে ওঠে দুজন।
তুহুর কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় পিয়াল। একবার দেখে যাবে ওকে। সুতরাং মামার বাড়ির দিকেই পা বাড়ালো ও।
পিয়ালকে পেয়ে ভীষণ খুশি হলো তুহু। এ গল্প সে গল্প কত গল্প জমে ছিলো তার। পিয়ালকে শোনাবে সব। বললো- ভাইয়া তোমার কিন্তু আজকে যাওয়া চলবে না। দিনের বেলা ঘুরে বেড়াবো। আর গল্প করবো সারারাত। তুহুর আবেগ এতটা প্রবল ওর হাতে যে সময় নেই কথাটি বলতেই পারছে না।
তুহু বলছে : জানো ভাইয়া আব্বু আম্মু হজ্বে যাচ্ছে এবার। আমিও যাচ্ছি। তুমিও চলো আমাদের সাথে। আব্বুকে বলবো আমি। তুমি গেলে আব্বুও খুশি হবে। তুমি আমি একসাথে ঘুরে বেড়াবো। সত্যি বলো যাবে? তুহু সিরিয়াস।
পিয়াল বললো : সে পরে দেখা যাবে। এখনো অনেক দেরী হজ্বের। তুহুর মুখের ওপর না বলতে পারলো না পিয়াল। তুহুকে কাছে টেনে কানে কানে বললো- আজ কিন্তু আমি থাকছি  না। আমার অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যপার আছে। তোমাকে এখন বলবো না। পরে বলবো। ঠিক তখনই মিষ্টি আর শরবত হাতে এলেন পিয়ালের মামী। পিয়ালকে তুহুর কানে কানে কথা বলতে দেখে তিনি ভাবলেন- প্রায় একই বয়সী দুটি ছেলে। অথচ দুজনের মধ্যে কত ব্যবধান। তুহু এখনো একেবারে বাচ্চাদের মতোন। আর পিয়াল? বেশ দায়িত্ববান ছেলে। এ কারণে  পিয়ালকে অসম্ভব আদর করেন তিনি।
মিষ্টি আর শরবত খেলো পিয়াল। বললো- এখন যাই মামী?
সে কি তুমি দুপুরে না খেয়ে যাবে কোথায়?
এক জায়গায় যাবো মামী। তোমাদের একটু দেখে গেলাম। তুহুকে আগেই কাবু করে রেখেছে পিয়াল। সুতরাং হৈ চৈ আর হলো না তুহুর পক্ষ থেকে। উঠে দাঁড়ালো। হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে বললো- ভালো থেকো তুহু। তুহু দ্রুত বললো- আরে  তোমাকে এগিয়ে দেবো না আমি! চলো বলে হাত ধরে টান দিলো পিয়ালের। দোয়া করবেন মামী আল্লাহ হাফেজ বলে বাসা থেকে বের হলো দুজন।
আবার কবে আসবে ভাইয়া -জিজ্ঞেস করলো তুহু।
পিয়াল বললো : যে কোনোদিন এসে পড়বো দেখিস। আর আসলে একটা রাততো কাটিয়েই যাবো তোর সাথে।
হ্যাঁ তাহলে খুব মজা হবে। তোমাকে বলার মতো অনেক গল্প জমে আছে।
তোর গল্প শুনতে অনেক মজা হবে নারে – বললো পিয়াল।
সে আমি জানি না ভাইয়া। মজা পেলেও পেতে পারো। কিন্তু আমি গল্প বলতে পারবো- এটাই আমার মজা। হেসে হেসে বললো তুহু।
কথা বলতে বলতে রাস্তায় এসে পড়লো দুজন। পিয়াল বললো- তুই এবার যা তুহু আর যেতে হবে না তোর।
আরেকটু যাই?
আর কই যাবি। আমি তো চলেই যাবো। ঘাড়ে হাত রেখে বললো পিয়াল যাও- আল্লাহ্ হাফেজ। দেখা হবে আবার।
তুহু বললো : হ্যাঁ ভাইয়া দেখা হবে-বাই বাই। দুজন দুদিকে পা বাড়ায়। ক’কদম এগিয়েই পেছন ফিরলো তুহু। বললো- আরে ভাইয়া তোমাকে তো একটি কথা বলা হয়নি।
পিয়াল জায়গায় দাড়িয়ে উল্টা ঘুরলো তুহুর দিকে। মুখে হাসি টেনে বললো- কি কথা বাকি রয়ে গেলে রে আবার শুনি।
তুহু বললো : তোমার সেই বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছে আমার।
কোন বন্ধুর সাথে দেখা হলো রে?
সেই যে আমাদের বাসায় একবার নিয়ে এলে-নাম শিমুল।
হ্যাঁ শিমুল। কবে কোথায় দেখা হলো! পিয়ালের কণ্ঠ বেশ উত্তেজিত।
কি ভাইয়া কোনো সমস্যা!
না- আগে বল কবে কোথায় দেখা হলো? অতিদ্রুত নি:শ্বাস নিচ্ছে পিয়াল।
এই তো গতকাল বিকেলে দেখা হলো। তার আগের দিন বিকেলেও দেখা হয়েছে।
কোথায়, কোথায় দেখলি?
ওই যে আমাদের দুটো বাসা পরের বাসার সামনে। সাগর ভাইদের বাসায় বেড়াতে এসেছেন। আজো থাকবেন। একবার আমাদের বাসায় আসবে বলেছেন।
আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো খবরটি উদ্বেলিত করলো পিয়ালকে। বললো- চলতো দেখি। এখন পাওয়া যাবে তো?
হ্যাঁ – যাবে না কেনো। নিশ্চয় পাওয়া যাবে। চলো।
একরকম দৌড়ে ছুটলো পিয়াল। তুহু তাল মেলানোর  চেষ্টা করছে দ্রুত।
ডোর বেল চাপলো পিয়াল। উত্তেজনায় চাপটি বেশ জোরেই লেগে গেলো। বেজে উঠলো একটি পাখির ডাক কিচ্ কিচ্ কিচ্। ভীষণ শব্দ করে ধীরে ধীরে থেমে গেলো। অল্প ক’সেকেন্ডের মধ্যে দরজাও খুলে গেলো। খোলা দরজায় একজন মধ্যবয়সী মহিলা। সাগরের মা।
আস্সালমুআলাইকুম আন্টি। সাগর ভাই বাসায় আছেন? জিজ্ঞেস করলো তুহু।
ওতো বাসায় নেই।
শিমুল আছে এখনো? প্রবল উত্তেজনায় জিজ্ঞেস করলো পিয়াল।
হ্যাঁ আছে। দুজনই এক সাথে কই যেনো গেলো। বসো তোমরা। চলে আসবে। আশেপাশেই গেছে কোথাও।
তুহু বললো : না আন্টি বসবো না এখন। শিমুল ভাইকে দরকার ছিলো। আবার আসবো আমরা।
দুজন ফিরে এলো রাস্তায়।
পিয়াল বললো : আমরা এখন কোথাও যাবো না। এখানেই থাকবো। সাগরদের বাসা থেকে একটু ডানে গেলো ওরা। একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ পিচ রাস্তার পাশেই। কৃষ্ণচূড়ার নিচেই বসে পড়লো ওরা। পিয়ালের চোখ সাগরদের বাসার দিক থেকে সরছে না। ওর বুকে চলছে তোলপাড়। মনে প্রশ্ন। সত্যিই কি শিমুলকে পেয়ে যাবে ও।
তুহুকে জিজ্ঞেস করে : তুই ঠিক ঠিক দেখেছিস তো শিমুলকে?
কি যে বলো ভাইয়া। শিমুল ভাইকে দেখে ভুল করবো আমি! তোমার প্রিয় বন্ধু। তোমাদের পুকুর ঘাটে আড্ডায় কতবার দেখেছি। আমাদের বাসায় আসলো তোমার সাথে। আচ্ছা তুমি এতো উত্তেজিত কেন ভাইয়া? পিয়াল খানিক দীর্ঘশ্বাস টেনে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বললো- ওকে আমার খুব দরকার। গত ৩দিন দেখা নেই ওর সাথে। তুহুর কাছে গোপন করে শিমুলের পালিয়ে যাওয়ার খবর।
খানিক্ষণ দুজনই চুপচাপ। পিয়ালের দৃষ্টি সাগরদের বাসার দিকে। তার দৃষ্টির একটিই ভাষা- কখন শিমুলকে দেখতে পাবে?
তুহু মাঝে মাঝে কৃষ্ণচূড়ার ডালে বসা কটি শালিকের খেলা দেখছে। শালিকগুলো খুব আনন্দ করছে। মাঝেমধ্যে জুড়ে দিচ্ছে গান।
শিমুলের পরিবার শিমুলকে আর খুঁজবে না মনে হয়। শিমুলের মা টা অনেক পাষাণ। রাগও বেশি। অসম্ভব মেজাজী। অল্পতেই মারধর। সামান্য অপরাধের জন্য বিশাল শাস্তি। নিজের মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ থাকে না পিয়ালের । ভাবে- আমার মায়ের মতো মা খুব কমই আছে। ছোটখাটো অপরাধের জন্য তো কিছুই বলে না। আর বড় অপরাধ করলে শাস্তিটাও দেবেন ঠিক ঠিক। কোনো বিষয়ে বাড়াবাড়ি নেই। লেখাপড়ার ব্যপারেও যত্নশীল। চাপাচাপি নেই। আবার ছেড়েও দেন না। এমন মা-ই দরকার ঘরে ঘরে। ভাবতে ভাবতে কিছুটা আনমনা হয়ে পড়ে পিয়াল।
পিয়ালদের পেছন দিক থেকে দুটি ছেলে এসে দাঁড়ালো কৃষ্ণচূড়ার পাশে। দুজনকেই তুহু দেখতে পেয়েছিলো আগেই। তারও আগে তুহুকে দেখলো ওরা। একজন মুখে আঙুল তুলে কথা না বলতে ইশারা দিলো তুহুকে। ইশারা দিয়ে একটি হাত রাখলো পিয়ালের ঘাড়ে। ঘাড়ে হাতের স্পর্শে সচেতন হয়ে ওঠে পিয়াল। সাগরদের বাসার দিক থেকে চোখ না ফিরিয়েই বললো- কিরে তুহু কিছু বলবি।
হ্যাঁ বলবো- তুই এখানে কি করছিস!
বিদ্যুৎ চমকের মতো চমকে ফিরে তাকালো পিয়াল। তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে শিমুল। উত্তেজনায় আবেগে উঠে শিমুলকে জড়িয়ে ধরলো। বললো- তুই এত নিষ্ঠুর শিমুল?
ঠিকই বলেছিস। আমি নিষ্ঠুর। নিষ্ঠুর না হয়ে উপায় কি বল? মুখের হাসি মিলিয়ে গেলো শিমুলের।
পিয়াল বললো- সে যাই হোক একবার আমাকে তো বলতে পারতি।
হ্যাঁ পারতাম। ভাবলাম সবকিছু ছিন্ন হয়ে যাক। থাক সেসব কথা। পরিচয় করিয়ে দেই তোর সাথে। এ হলো সাগর। আমার বন্ধু। ও কাস নাইনে। এক কাসে ছিলাম আমরা। এখন ও আমার সিনিয়র জানিসতো কাহিনী। কিন্তু আমাদের বন্ধুত্ব ঠিকই আছে। আরেকটি পরিচয় দেই ওর- তোর মনে আছে নৌকা ভ্রমণের গল্প।
হ্যাঁ হ্যাঁ  বলেছিলি। ওই যে বাবলা বন দেখতে গিলি! পড়লি ডাকাতের কবলে। বললো পিয়াল।
হ্যাঁ- ওই যে ডাকাতেরা একটি ছেলেকে ফেলেদিলো নদীতে-এই সেই ছেলে, সাগর। ভাগ্য জোরে ওকে পেয়েছি আমরা। সে গল্পতো তোদের বলাই হয়নি।
অবাক হয়ে গেলো পিয়াল। বারবার দেখছিলো সাগরকে। বললো- কিভাবে বাঁচলো রে?
সেই কাহিনী আরো অবাক করার। একটি কুমির চোয়ালের ওপর নিয়ে কূলে তুলে দিলো ওকে। ও অচেতন অবস্থায় পড়েছিলো অনেক্ষণ। তারপর একটি জেলের নজরে পড়লো। জেলের অসিলায় বেঁচে গেলো সাগর। অবশ্য আরো একজন মানুষ এর সাথে জড়িত। জেলের কাছ থেকে নিয়ে যিনি সেবা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছিলেন সাগরকে। একজন বৃদ্ধ মানুষ। তিনিই নিয়ে এসেছিলেন সাগরকে।। কিন্তু তার কোনো পরিচয় আমরা জানি না। কোথায় বাড়িঘর কিছুই না। এক দুটি শব্দ ছাড়া কোনো কথা বলেন না তিনি। এ যাবত বলেনি কোথায় তার বাড়ি ঘর। কোত্থেকে এলেন তিনি। সে যে এলেন আর যাননি ফিরে। মাত্র দুদিন ছিলো সাগরদের বাসায়। তারপরই চলে গেলেন আমাদের  চরের একটি খামার বাড়িতে। ওই খামারী বৃদ্ধকে একটি ঘর ছেড়ে দিয়েছে। সেখানে তিনি দিনরাত নামাজ পড়েন আর তসবিহ্ জপেন। একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো শিমুল- আজ সকালে সেই মুরুব্বি মারা গেছেন।
শুনে ইন্নালিল্লাহ… পড়লো পিয়াল। কোথায় সেই মুরুব্বি? চল দেখে আসি!
হ্যাঁ সেখানেই যাবো আমরা। চল। বললো শিমুল।
তোমরা একটু দাড়াও আমি আম্মুকে বলে আসি বলে দৌড় দিলো সাগর।
তুহু বললো- আমিও যাবো। আমিও আম্মুকে বলে আসি। সেও দিলো দৌড়।

ছয়.
দুই রিকসায় রওয়ানা দিলো পিয়ালরা। পিয়ালের সাথে শিমুল। সাগর তুহু এক রিকসায়।
শিমুল পিয়ালকে বললো- শোন আমি কিন্তু আর বাড়ি ফিরবো না। সাগরদের বাসায় কয়েক দিন থাকবো। তারপর যদি কোনো ব্যবস্থা হয় একটি রুম ভাড়া নেবো। না হয় চলে যাবো শহরে।
কোনো ব্যবস্থা বলতে কি বোঝাচ্ছিস?
এই ধর টিউশনি কিংবা কোনো কোচিং সেন্টারে কাস নেয়ার সুযোগ।
দেখ শিমুল এসব পাগলামী করিস না। তুই বাড়ি ফিরে যাবি। লেখাপড়া করতইে হবে তোকে।
হ্যাঁ লেখাপড়া তো করতেই হবে। এবং ভালো করেই করতে হবে। আমি সিদ্ধান্ত নিছি লেখাপড়ায় আর ফাঁকি দেবো না। কিন্তু বাড়িতে থাকবো না আমি।
আমি তোর দু:খ বুঝি শিমুল। কিন্তু মনে রাখিস মা তো মা। খারাপ হলেও মা। তোর মায়ের মনে কষ্ট দিস্ না।
বারে তুই তো দেখি ওয়াজ শুরু করলি। এমন কথা বলা খুব সহজ। কিন্তু ঘটনা ঘটলে টের পাওয়া যায়। যেমন আমি পাচ্ছি।
আমি ওয়াজ করছি নারে বন্ধু। শোন পৃথিবীতে মায়ের মতো কেউ হয় না।
কিন্তু তুই কি জানিস পৃথিবীতে আমার মায়ের মতো এমন নিষ্ঠুর মাও নেই। শিমুলের কণ্ঠ কান্নায় ধরে এলো। বললো- আজ চারদিন আমি বাড়ি নেই। কোথায় আছি সে খবর কি নিছে আমার মা। ত্ইু বল- তোর কাছেও কি একবার খবর নিতে গেছে?
কোনো কথা বলে না পিয়াল। মাথা নিচু করে ভাবছে সে। সত্যিই তো ওর মা তো একবারও খবর নেয়নি। আসলে কারো মা কি এত নিষ্ঠুর হয়!
এ সময় হঠাৎ থেমে গেলো রিকসা। বাস্তবে ফিরে এলো দুজন। বিশাল মসজিদ প্রাঙ্গন। লোকে লোকারণ্য। মসজিদ প্রাঙ্গন ভরে রাস্তা পর্যন্ত মানুষের ঢল।
শিমুল বললো : এখানেই জানাজা হবে বৃদ্ধের। সাগর তুহু ওদের রিকসাও এসে গেছে। রিকসা থেকে নেমে ওরা এগোয় কফিনের দিকে। মসজিদের সামনে খাটিয়ায় শুয়ে আছে বৃদ্ধের মৃত দেহ। সাদা কাফনের ভেতর লুকিয়া আছে বৃদ্ধের মুখ। খাটিয়ার পাশে দাঁড়ানো ইমাম সাহেব। এই ইমামের কাছেই মক্তবের পাঠ নিয়েছিলো পিয়াল। কোরআন শরীফ খতম কারিয়েছিলেনও তিনি। যারা দেখতে চান মোড়ানো কাফন খুলে তিনিই দেখাচ্ছেন।
পিয়ালরা এগিয়ে গেলো খাটিয়ার কাছে। ইমাম সাহেবকে সালাম দিয়ে খাটিয়ার পাশেই দাঁড়ালো। কাউকে দেখাতে দেখাতে সালামের জবাব নিলেন তিনি। দেখানো শেষ হলে যখন সোজা হয়ে দাঁড়ালেন- চোখ পড়লো পিয়ালদের ওপর। সাথে সাথেই বললেন- আরে পিয়াল কোথায় ছিলে তুমি। কয়েক দফা খবর দেয়া হয়েছে তোমাদের বাড়িতে।
শুনে পিয়ালের চেহারার রঙ বদলাচ্ছে। অপ্রস্তুত হয়ে গেলো প্রায়। বোকার মতো চেয়ে থাকে ইমাম সাহেবের মুখের দিকে। বুঝতে পারে না কেনো তার জন্য খবর দেয়া হলো।
ইমাম সাহেব বললেন- এই বৃদ্ধ মানুষটি মৃত্যুর আগে তোমাকে দেখতে চেয়েছিলো পিয়াল।
কথাটা কানে যেতেই সারা শরীরে একটি কাঁপুনি খেয়ে গেলো পিয়ালের। কে উনি? ওকে কেনো দেখতে চাইবে! প্রশ্ন জাগে মনে।
তোমাকে তো দেখতে পারেনি। তুমিই দেখো এখন। বলে মুখ থেকে কাফনের কাপড়টি সরিয়ে দিলেন।

বৃদ্ধের চেহারায় চোখ পড়তেই আবার কাঁপুনি খেলো পিয়াল। হ্যাঁ! ইনি তো খামার বাড়ির সেই বৃদ্ধ যিনি গতকাল দুপুরে অত্যন্ত যত্ন করে তাকে দুধ চিড়া খাইয়েছেন। মনে ভেসে উঠলো জায়নামাজে বসা এক দরবেশ মানুষের ছবি। আধবোঁজা চোখে নড়ছে দুটি ঠোঁট। আর হাতের আঙুলের ফাঁকে টিপটিপ ঝরছে তসবিহ দানা। কাল যিনি জীবন্ত। আজ তিনি মৃত। কিন্তু দেখে পিয়ালের মনে হচ্ছে শুভ্র কাফন জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে মানুষটি। গতকাল থেকে আরো বেশি সৌম্য শান্ত চেহারা। আরো উজ্জ্বল। শিমুল, সাগর, তুহু সবার চোখ বৃদ্ধের চেহারায়।
হঠাৎ সাগর বৃদ্ধের পায়ে হাত রেখে সালাম করলো। তারপর দুহাতে দুচোখ ঢেকে কেঁদে উঠলো।
চোখের অশ্রু দিয়ে শেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো সাগর।

সাত.
জানাজা নামাজ শেষে দাফন সম্পন্ন হলো। সবার সাথে এক মুঠো করে কবরে মাটি দিলো পিয়ালরা। ওরা দাঁড়িয়ে থাকলো কবরের পাশে। ততক্ষণে উপস্থিত সবাই চলে গেছে যে যার গন্তব্যে। দাঁড়িয়ে আছে ওরা চারজন।
সাগর বললো : চল শিমুল আমাদের ফিরতে হবে।
তুহু পিয়ালকে বললো : ভাইয়া আমিও যাই।
কেউ যাবে না এখন -বললো পিয়াল। না খেয়ে এই ভরদুপুরে কোথায় যাবে তোমরা? হ্যাঁ তোমাদের সাথে আমিও যাবো। যাবো, কিন্তু আমাদের বাড়ি।
পিয়াল এতটা দৃঢ়তার সাথে বললো যে কেউ কথা বললো না। শুধু গাঁই মাই করছে শিমুল। ও চেয়ে আছে পিয়ালের দিকে।
পিয়াল বললো : দেখ শিমুল একটি কথাও বলবি না। আয় আমার সাথে। বলে শিমুলের হাত ধরে টান দিয়ে হাটা শুরু করলো। পাশাপাশি পিয়াল-শিমুল। পেছনে সাগর তুহু।
মসজিদ থেকে গোটা দশেক বাড়ির পরেই পিয়ালদের বাড়ি। তার দুবাড়ি আগের বাড়িটিই শিমুলদের।
পিয়াল মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়- শিমুলদের বাড়ি হয়েই যাবে নিজের বাড়ি। যদিও ভরদুপুর। হলে কি হবে। শিমুলের মার সাথে শিমুলের দেখা করিয়েই চলে যাবে সবাই। কারণ বিকেল পর্যন্ত শিমুল নাও থাকতে পারে। কোনো ফাঁকে পালিয়ে গেলে ওর মায়ের সাথে দেখা হবে না আর।
হাটতে হাটতে পৌঁছে গেলো শিমুলদের বাড়ির রাস্তার মাথায়। হঠাৎ থামলো পিয়াল। কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে নিলো। তারপর বললো- আমি এখন যা বলবো তোমাদের সবাইকে তাই করতে হবে। কারো কোনো আপত্তি চলবে না এখন।
শিমুলের বাম হাতে ধরলো পিয়াল। বললো- এসো আমার সাথে। বলেই হাটতে শুরু করলো শিমুলদের বাড়ির দিকে।
শিমুল আগেই বুঝতে পেরেছিলো এমন ঘটনাই ঘটবে।
প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলো সে। কোনো লাভ হলো না। পিয়ালের দৃঢ়তার কাছে হেরে গেলো শিমুল। তার মনে ক্ষোভ এবং ভয় দুটিই কাজ করছে। দুটোই মায়ের প্রতি।
শিমুলদের দরজায় নক করলো পিয়াল। কেউ খুললো না দরজা। আবার করলো। না। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখাই যাচ্ছে। আবার কিছুটা জোরে নক করলো।
এবার খুলে গেলো দরজা। আসসালামুআলাইকুম চাচী বলে মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ হয়ে গেলো পিয়াল। দরজায় দাড়িয়ে আছে শিমুলদের বুয়া।
শিমুলকে দেখেই বললো- আমনে কুনাই হলাই গেসেন। খালাম্মায় খুব অসুস্ত। বড় অসুক অইসে খালাম্মার। কাইল্যাত্তুন খালি আমনের কতা কয়।
এতক্ষন শিমুল যেনো কিছুই শুনছিলো না। হঠাৎ যেনো ফিরে আসলো ও। একরকম দৌড়ে ঘরের ভেতরে গেলো। মায়ের রুমে। পিছে পিছে পিয়ালেরা। বিছানায় কাতর হয়ে শুয়ে আছে শিমুলের মা। চোখ বন্ধ। মলিন চেহারা। কষ্টের চিহ্ন ফুটে আছে মুখে। দেখে ভীষণ মায়া হলো শিমুলের। দরদ মাখা কণ্ঠে ডাকলো শিমুল- মা।
চোখের পাতা কেঁপে গেলো একবার। কিন্তু চোখ খুললো না।
আবার ডাকলো- মা।
ধীরে ধীরে চোখ খুললেন। দেখলেন তার দিকে খানিকটা ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে শিমুল।
ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন- আমার শিমুল এসেছে। আয় আমার বুকে আয়। দুর্বল হাত বাড়িয়ে দেয় শিমুলের দিকে।
মা -বলে মায়ের বুকে মাথা রাখে শিমুল।
আমি তোর ওপর অনেক অত্যাচার করেছিরে শিমুল। এত শাসন করা উচিৎ নয় বুঝলাম আমি। সব কষ্ট ভুলে যা।
শিমুলের মায়ের দুচোখ অশ্রুতে ভরে যায়। অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে শিমুলের চোখ থেকেও।
পিয়ালদের চোখও ভিজে উঠলো আনন্দের অশ্রুতে।

SHARE

Leave a Reply