Home নিয়মিত স্নেহের পরশ

স্নেহের পরশ

মুহাম্মাদ দারিন

‘আমি এখানে কেন? কেউ কোন কথা বলছো না কেন?’
পুরো ঘরটা শূন্য। কোন আসবাবপত্র নেই। একটা দরজা এবং দু’পাশে দুটো জানালা আছে, ও দুটোও বন্ধ। ধবধবে সাদা মেঝে। দেয়াল ও সিলিংয়ের রঙও সাদা। কোথাও কোন ফ্যান বা বাতি নেই। অথচ ঘরের প্রতিটি ইঞ্চি জায়গা দেখা যাচ্ছে। চোখে কোন সমস্যা হচ্ছে না। তাপমাত্রা স্বাভাবিক। না শীত না গরম। এ এক ভিন্ন পরিবেশ।
সমস্ত ঘরময় আমার কথার প্রতিধ্বনি হতে লাগল, ‘আমি–আমি এখানে–এখানে কেন–কেন? কেউ– কেউ কথা–কথা বলছো–বলছো না–না-কেন–কেন–কেন–কেন?’
আমার ভয় বেড়ে গেল প্রতিধ্বনি শুনে। একেতো শূন্য ঘর, তার ওপর মনে হচ্ছে আমার চারপাশে যেন অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। আশপাশে মানুষ থাকলে যেমন অনুভূত হয় ঠিক তেমন হচ্ছে।
ভয়ে আমার সমস্ত শরীর ভার হয়ে যাচ্ছে। জিহ্বা যেন দাঁতের কারাগারে অসুস্থ বন্দী। পড়ে আছে এক পাশে কাত হয়ে। অনেক কষ্টে ওকে সুস্থ করে বললাম, ‘তোমাদের দেখা যাচ্ছে না কেন? চুপ করে আছো কেন? কথা বল?’
শুরু হলো প্রতিধ্বনি। সহ্য করতে না পেরে দুই হাতের দুই শাহাদাৎ আঙুল দুই কানে পুরে মাথার ভেতর চিহিহিহি শব্দ শুনতে লাগলাম।
সর্বশেষ প্রতিধ্বনি ইথারে মিলিয়ে যাবার পর কান থেকে হাত সরিয়ে বললাম, ‘আমার কিন্তু ভয় করছে। তোমরা যদি কথা না বল, দেখা না দাও তাহলে আমি জ্ঞান হারাবো কিন্তু। অলরেডি আমার মাথার ভেতর ভোঁ ভোঁ শুরু হয়ে গেছে।’
সাথে সাথে দুই জানালা আর দরজা খুলে গেল। আমার কথার প্রতিধ্বনি হল খুব আস্তে।
আমার সম্মুখে ছিল দরজা। দৃষ্টি প্রসারিত করলাম ঐদিকে। দৃষ্টিশক্তি কোথাও বাধাপ্রাপ্ত হলো না। অসীম শূন্যতায় তাকিয়ে থেকে আমার চোখ ব্যথা করে উঠলো। বন্ধ করলাম এক মুহূর্ত চোখ।
দরজার দিকে এগিয়ে যাওয়ার বাসনা মনে জাগলো। উঠাতে চাইলাম ডান পা। ওটা যেন কয়েক মণ ভারী হয়ে গেছে। শত চেষ্টাতেও নাড়াতে পারলাম না। চোখ খুললাম। তাকালাম ডানের জানালায়। কোন পর্দা বা গ্রিল নেই। চোখের অবস্থা একই হলো। তাকালাম বামে। অবস্থার কোন পরিবর্তন নেই। তাহলে কি এই ঘরটা শূন্যে! আর শূন্য ঘরে এক দল অদৃশ্য ভূতের সাথে আমি অবস্থান করছি।
ভাবতেই আমার কণ্ঠ চিরে গোঙানির শব্দ বের হলো।
‘এই ভিতু ছেলে থামো।’ মৃদু ধমক দিল কে যেন।
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে থেমে গেলাম আমি। কে কথা বলে? কোথা থেকে বলে?
হঠাৎ আমার তিন হাত সামনে একজন মানুষ দৃশ্যমান হলো। ভয়ে আমার অবস্থা করুণ।
‘এই ভিতু ছেলে, ভয়ের কোন কারণ নেই।’ বলল দৃশ্যমান ব্যক্তি।
নিজের মনকে সান্ত্বনা দিয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে এনে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম আমি। কণ্ঠে এসে আটকে গেল কথাটা। বিষুম খেলাম। শুরু হলো কাশি। একাধারে পাঁচটা কাশি দিয়ে তবেই থামলাম। ততক্ষণে যা হবার তা হয়ে গেছে!
অদৃশ্য থেকে দশ-বারজন মানুষ এসে জড়ো হয়েছে ঘরে। আমার ধারণা তাহলে ঠিকই ছিল। এই ঘরে মানুষ বা জিন-ভূত যা কিছু হোক ছিল।
নিজেকে আবারও বোঝালাম খুব করে। কিন্তু ভয়টা আমার থেকে যেতে চাচ্ছে না। শীতের কাঁথার মত জড়িয়ে থাকতে চাচ্ছে সাথে।
জোর করে কণ্ঠ চিরে বের করলাম,‘তোমরা জিন-ভূত না জাদুকর।’
‘তোমার কী মনে হয়?’ প্রথম দৃশ্যমান লোকটি বলল। মনে হচ্ছে সে-ই এদের নেতা ।
আমি কোন উত্তর না দিয়ে ঘুরে ফিরে সকলের আপাদমস্তক দেখতে লাগলাম। পোশাকে-আশাকে অস্বাভাবিক কিছু মনে হল না। মানুষগুলোকে মানুষ বলেই মনে হচ্ছে।
আমার ভেতরের ভয়ের সুতা কে যেন লাটাই দিয়ে ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিচ্ছে বলে অনুভূত হচ্ছে।
শুনেছি জিন-ভূতেরা নাকি মানুষের আকার ধারণ করতে পারে। আবার জাদুকরও নাকি অদৃশ্য হতে পারে। তাহলে এরা জিন-ভূত না জাদুকর !
আচ্ছা পরীক্ষা করলে কেমন হয়? কিন্তু ঘরেতো কিছুই নেই। তবুও কিছু একটাতো করতেই হবে।
মগজ দৌড়াতে শুরু করেছে তার নিজস্ব গতিতে। সবকিছুই হার মানে যার গতির গাছে। লাগাম টেনে ধরলাম মগজের দৌড়ের। ইতোমধ্যে সে কিছু একটা স্থির করে নিয়েছে।
নেতাগোছের লোকটির সামনে এগিয়ে গেলাম। পা এবার মগজের কমান্ড শুনলো। লোকটির দিকে তাকিয়ে কোমরে দু’হাত বেঁধে বললাম, ‘আমি যা করবো তোমাদের তা করতে হবে।’
ও কোন উত্তর দেয়ার আগেই আমি বললাম, ‘সকলে তার ডান হাত কাঁধ বরাবর উঁচু কর। হাতের পাঁচ অঙুল সোজা কর। ঠিক আমার মত।’
সকলে আমাকে ফলো করলো। আমি টেনে নিজের ডান চোয়ালে এক চড় বসিয়ে দিলাম। আমার মুখ দিয়ে বের হলো ‘আউ।’
সাথে সাথে খেয়াল হল ঘরময় মৃদু প্রতিধ্বনি হল ‘ঠাস–ঠাস–ঠাস।’
মানুষগুলো সকলে একযোগে নিজেদের মুখে চড় মেরে তাল সামলাতে না পেরে মেঝেয় পড়ে গেছে।
প্রত্যেকে আউ-উউ করে বাম হাত দিয়ে নিজেদের ডান চোয়াল ডলতে ডলতে উঠে দাঁড়াচ্ছে।
আমার অবস্থাও কাহিল। নিজের মুখে খুব জোরে মেরেছি। হয়তো আঙুলের দাগ বসে গেছে। জ্বালা করছে। আমি প্রস্তুত থাকায় পড়ে না গেলেও ব্যথা লেগেছে খুব বেশি। ডান হাত পিঠে বেঁধে বাম হাত দিয়ে গাল মালিশ করছি।
ঘরময় এক অদ্ভুত দৃশ্যের সৃষ্টি হয়েছে। আমি ব্যথা ভুলে ‘হি–হি–হি’ করে হাসতে লাগলাম। অবশ্য স্বস্তি পেলাম এই ভেবে যে, এরা জিন-ভূত না। এরা হয় জাদুকর না হয় অন্যগ্রহের প্রাণী। এরা যে প্রাণী এটা নিশ্চিত। কারণ এদের অনুভূতি আছে।
‘এই ছেলে পিত্তি জ্বালানো হাসি থামাও।’ বলে উঠলো ডান পাশের একজন।
আমি আরো জোরে হেসে উঠলাম।
‘অ্যাই থামো।’ ধমকে উঠলো আমার বাঁ পাশের একজন।
‘এ্যাঁ থামো।’ আমি মুখ ভেংচি কাটলাম। ‘খুব লেগেছে তাই না। আমাকে এখানে কেন এনেছো? কাল আমার পরীক্ষা। আমি আমার পড়ার টেবিলে পড়ছিলাম। আমাকে আমার ঘরে রেখে এসো। নইলে আরো মার খাওয়াবো।’
‘এই ত্যাদোড় ছেলে থামো। অতো বকর বকর করছো কেন? পড়ার টেবিলেতো বসে ঝিমাচ্ছিলে।’ বলল পেছন থেকে একজন।
আমি ঘুরে দাঁড়ালাম ওর দিকে। বললাম, ‘খুব বীরত্ব ফলাচ্ছো তাই না। লজ্জা করে না। একজন ছেলেকে মারতে দল বেঁধে এসেছো। কাপুরুষ কোথাকার?’
ফাটা বেলুনের মত চুপসে গেল লোকটি। কোন মতে বলল, ‘আমরা তোমাকে মারতে এখানে আনিনি। অন্য এক কাজ আছে আমাদের।’
‘তাহলে আমাকে এভাবে ঘিরে ধরেছো কেন?’
‘বললাম তো তোমাকে আমরা মারবো না। অন্য এক কাজ আছে আমাদের। তা ছাড়া তুমিতো তোমার পড়ার টেবিলে বসে ঝিমাচ্ছিলে।’ বলল পূর্বের লোকটি।
‘আমি আমার পড়ার টেবিলে বসে ঝিমাবো, ইচ্ছে হলে নাচবো, গাইবো। যা খুশি তাই করবো। তাতে তোমার কী?’ রাগে আমার শরীর কাঁপতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে এক একটাকে ধরে কিলিয়ে আলুর ভর্তা বানিয়ে ফেলি। কিন্তু একজনকে ধরলে তো সকলে আমাকে ধরে ভর্তা বানাবে। অগত্যা নিজেকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করতে লাগলাম। মনে মনে আউজুবিল্লাহ পড়তে পড়তে বসে পড়লাম রাগ কমানোর জন্য।
পেছন থেকে দুই কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেলাম। আর বুঝি রক্ষা নেই আমার। এখনই ঐ দুই হাত হয়তো আমার গলায় যাবে। তারপর গলা চিপে মেরে ফেলবে আমাকে।
‘আচ্ছা আমি আমার তের বছর জীবনে কি অনেক পাপ করেছি? আমার তো কিছু দায়িত্ব-কর্তব্য ছিল। সেগুলো কি আমি যথাযথভাবে পালন করেছি? নাহ্ সবতো পারিনি। কিছু হয়তো করার চেষ্টা করেছি। এ জন্য মহান স্রষ্টা কি আমাকে ক্ষমা করবেন?’ শেষের কথাগুলো হয়তো একটু জোরে বলেছিলাম।
‘অনুশোচনাকারীকে তোমার আমার প্রভু খুব ভালোবাসেন। তোমার চেষ্টা তুমি চালিয়ে যাও। ফলতো দেবেন মহান প্রভু।’ আমার বাম কাঁধে আর মাথায় পেলাম তার স্নেহের পরশ। উঠে দাঁড়িয়ে ঘুরে দেখি নেতাগোছের লোকটি।
‘হ্যাঁ মান্ষুই সেরা। আমরা এসেছিলাম তোমার ওপর কিছু পরীক্ষা চালাতে। উল্টো তুমি আমাদের গিনিপিগ বানিয়ে ছাড়লে।’ আমার চোখে চোখ রেখে বলল লোকটি।
‘তার মানে তোমরা কারা?’ আমার জিজ্ঞাসা।
‘আসলে আমরা যে কে এটা আমরাও জানিনে।’ উত্তর নেতার।
‘বুঝলাম না।’ অবাক হয়ে জানতে চাইলাম আমি।
‘ছাড়ো ওসব কথা।’ পরম স্নেহে দুই হাতে ও আমার মাথার সমস্ত চুল এলোমেলো করতে করতে বলল,‘কখনও তোমার দায়িত্ব-কর্তব্যের কথা ভুলে যেও না। সবসময় মহান স্রষ্টাকে স্মরণ রেখ।’
আমি দু’চোখ বন্ধ করে ওর স্নেহটুকু উপভোগ করছিলাম। তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম কখন জানিনে।
মাথায় স্নেহের পরশ আর কাঁধে মৃদু ঝাঁকি অনুভব করলাম। কে যেন আমাকে ডাকছে। বলছে, ‘আব্বু সোনা ওঠো। এভাবে পড়ার টেবিলে ঘুমালে তো চলবে না।’
আমার সমস্ত চেতনা ফিরে এলো। আস্তে মাথা তুলে দেখি পাশে আম্মু দাঁড়িয়ে আছেন।
আমি ফ্যাল ফ্যাল করে তার দিকে তাকালাম। আমি রাতে পড়তে পড়তে টেবিলে বইয়ের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
আম্মু আমার ডান চোয়ালের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠলেন। বললেন, ‘তোমার চোয়ালে কে মেরেছে?’ থুঁতনি ধরে উঁচু করে ভাল করে দেখে বললেন, ‘একি! পাঁচ আঙুলের দাগ বসে গেছে দেখছি।’
আমি বাম হাতে মাথা চুলকে বললাম, ‘কই কেউতো মারেনি।’
মনে পড়লো সমস্ত ঘটনা। আম্মুকে কি ওসব বলবো? বললে বিশ্বাস করবেন তো? সত্যি কি আমাকে ওরা নিয়ে গিয়েছিল? কিভাবে নিল আমাকে? এলামই বা কী করে? তাহলে কি সব স্বপ্ন ছিল? আমার ডান হাত চলে গেল ডান চোয়ালে। হ্যাঁ, ব্যথাতো এখনও আছে। ফুলেও গেছে।
তাহলে আম্মুকে কি বলব? হয়তো টেবিলে ঘুমানোর সময় মুখে মশা বসেছিল। আর মারতে যেয়ে হয়তো এই অবস্থা করেছি।
‘কী হলো? কী ভাবছো? মুখে কে মেরেছে?’ আম্মু সিরিয়াস হয়ে জানতে চান।
‘মনে হয় মুখে মশা বসেছিল। ওটা মারতে এই অবস্থা করেছি হয়তো।’ কোন মতে বললাম আমি।
আম্মু পরম স্নেহে আমার মাথাটা তার কোলে টেনে নিয়ে বললেন,‘ পাগল ছেলে আমার। নিজের মুখে কেউ এভাবে মারে !’

SHARE

1 COMMENT

  1. প্রতিমাসের কিশোরকন্ঠ নিয়মিত চাই।আর প্লিজ কমপক্ষে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সবগুলা দিয়েন।গোয়েন্দা উপন্যাস,রকিব হাসানের কিশোর উপন্যাস এগুলা বেশি দিয়েন…

Leave a Reply to সূর্যগ্রহন Cancel reply