Home নিয়মিত মন্তুর ঈদ

মন্তুর ঈদ

আশিক-উর-রহমান

গ্রামের পূর্ব পাড়য় বিলের ভেতর একমাত্র যে বাড়িটি অবস্থিত সেটাই করিম শেখের বাড়ি। করিম শেখ খুবই গরিব। বিলের  ভেতর ছোট্ট ভাঙা এক কুটিরে পরিবার নিয়ে অতি কষ্টে দিন যাপন করে সে। করিম শেখের একমাত্র ছেলে মন্তু। ছেলেটি রোগা ও হ্যাংলা। বুকের হাড়গুলো তার বেরিয়ে গেছে। মাথাটি দেহের তুলনায় অনেক বড়।
গ্রামের ছেলেরা তাকে নিয়ে ঠাট্টা উপহাস করে। অনেকে তাকে মাথামোটা বলে ডাকে। কেউ কেউ ইয়ার্কিচ্ছলে মন্তুকে এমন মার মারে যে মন্তু রাস্তার মধ্যে লুটিয়ে পড়ে। বেহুঁশ হয়ে যায়। করিম শেখ খুঁজে খুঁজে তাকে বাড়ি নিয়ে যান। করিম শেখ অন্যের ক্ষেতে দিনমজুরের কাজ করে। সে দিন আনে দিন খায়। একবেলা খেলে দুইবেলা অনাহারে থাকতে হয় তাঁদের। এইভাবে চলছিল করিম শেখের সংসার।
গ্রামের সবচেয়ে বিত্তশালী ব্যক্তি হলেন আব্দুস সোবহান খাঁ। তিনি খুব দয়ালু লোক। কয়েক মাস আগে তিনি শহরে গিয়ে শহরেই সপরিবারে বসবাস শুরু করেন। গ্রামে তার শত শত বিঘা জমি, চিংড়িঘের, বাগানবাড়ি ও পুকুর আছে। তিনি মাঝে মধ্যে বাড়ি এসে এগুলো তদারকি করেন। তিনি করিম শেখের অভাব ও কষ্ট দেখে মনে খুব দুঃখ পান। একদিন তিনি করিম শেখকে শুধান, ‘কিরে করিম মিয়া, দিনকাল যাচ্ছে কেমন?’ করিম শেখ জবাব দেয়, ভালা না খাঁ সাব। একটু দেরি করে খাঁ সাহেব বলেন, ‘আমার সাথে শহরে যাইবা? সেইখানে একটা কাজে তোমারে  ঢোকাইয়া দেব। আমার বাড়ি খাইবা আর কাজ করবা।’ করিম শেখ কিছুক্ষণ ভাবে। খাঁ সাহেব আবার শুধান, ‘কী মিয়া, কী ভাবছ? যাইবা শহরে? করিম শেখ আস্তে করে ঘাড় নেড়ে সম্মতি দেয়। খাঁ সাহেব বলেন, ‘কাল তুমি ভোরে আমার বাড়ি যাইবা। সকালেই আমরা ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেব।’ করিম শেখ মাথা নাড়ায়।
পরদিন একটি পুঁটলিতে কিছু জামাকাপড় নিয়ে আব্দুস সোবহান খাঁর সাথে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয় করিম শেখ। মনে তার অনেক স্বপ্ন। একদিন সে সচ্ছল হবে। তার আর দুঃখ-কষ্ট থাকবে না। মন্তুকে সে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মত মানুষ করে গড়ে তুলবে। এভাবে নানা ধরনের স্বপ্ন মনে আঁকতে আঁকতে করিম শেখ ঢাকায় পৌঁছে যায়।
ঢাকায় গিয়ে সোবহান খাঁ করিম শেখকে একটা রিকশা কিনে দেন আর তার থাকার জন্য আলাদা একটা কক্ষ দিয়ে দেন। করিম শেখ সারা দিন রিকশা চালায়। দিনপ্রতি তার যথেষ্ট আয় হয়। সে তার স্বপ্ন পূরণের ইচ্ছা নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে। মাঝে মধ্যে করিম শেখ বাড়ি আসে। স্ত্রী-পুত্রের খোঁজ-খবর নিয়ে ২-৩ দিন পর আবার ঢাকায় চলে যায়।
এমনি করে রমজান মাস এসে যায়। মন্তু তার পিতাকে বলে, ‘আব্বা, ঈদের সুমায় আমার জইন্যে শহর থেইক্কা একসেট জামা-প্যান্ট আইনা দিবা?’ ছেলের কথা শুনে করিম শেখের চোখ অশ্রুতে ভরে যায়। তার ছেলের ভাল জামা-কাপড় নেই। স্ত্রী পরীবানুর পরনেও সবসময় থাকে শতছিন্ন কাপড়। সবারই মনে চায় পরিজনদের একটু ভাল কিছু দিতে। কিন্তু ভাল জামা-কাপড় কেনার সামর্থ্য করিম শেখের নেই। সে ভাবে, এবার শহর থেকে মন্তুর জন্য জামা, প্যান্ট ও স্ত্রীর জন্য শাড়ি আনবে। সে এক বুক আশা নিয়ে ঢাকায় চলে যায় আর বলে যায়, ঈদের আগের দিন সে ঈদের জামা-কাপড় নিয়ে বাড়ি চলে আসবে। মন্তু খুশি হয়।
ঈদ এসে যায়। মন্তু পথপানে চেয়ে থাকে কখন তার বাবা আসবে। ঈদের আগের দিন ঢাকা থেকে গ্রামের অনেক লোক চলে আসে। কিন্তু মন্তুর বাবা আর আসে না। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়, দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয় তবুও করিম শেখ বাড়ি আসে না। মন্তুর মন খারাপ হয়ে যায়। সে এক বুক যন্ত্রণা নিয়ে রাতে ঘুমাতে যায়। তার আশা থাকে রাতের বাসে করে তার বাবা সকালেই তার জন্য নতুন জামা কাপড় নিয়ে বাড়ি আসবে। ঈদের দিন খুব ভোরে সে ঘুম থেকে উঠে পড়ে। চোখ কচলিয়ে দেখে মা ঘরের এককোণে শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ চেপে দাঁড়িয়ে আছে।
মন্তু তার মার কাছে জানতে চায় বাবা আসছে কি না। মা কোনো কথা বলে না। মন্তু দেখে মায়ের চোখে পানি, মা মন্তুকে নিয়ে ঘরের পেছনে বাঁশাবাগানে চলে যায়। মন্তু দেখে গ্রামের লোকেরা কবর খুঁড়ছে। সে দেখে খাটিয়ার ওপর একজনের লাশ সাদা কাফনের কাপড় দিয়ে ঢাকা। মন্তু উদ্বিগ্ন হয় হারু চাচা কাপড়টা লাশের ওপর থেকে মাথার দিকের অংশটা তুলে দেয়। মন্তু চিৎকার করে ওঠে। লাশটা আর কারও নয়, তার বাবা করিম শেখের। সে বাবা বলে চিৎকার দিয়ে কান্নাকাটি করতে থাকে। হারু মিয়া, মকবুল আলী সবাই তাকে সান্ত্বনা দেয়। কিন্তু কোনো কিছুতেই মন্তুর কান্না থামে না। তার চোখ থেকে অঝোরে কান্না বেরিয়ে আসে। সে সবার কাছ থেকে শোনে তার বাবা বাড়ি আসার সময় একটি ট্রাকের সাথে তার বাবার বহনকৃত বাসের সংঘর্ষ হয়। এতে করিম শেখ ঘটনাস্থলে মারা যায়। গ্রামে রিকশাচালকেরা করিম শেখের লাশ গ্রামে নিয়ে আসে। করিম শেখকে কবর দেয়া হয়ে যায়। সবাই মন্তুকে সান্ত্বনা দিয়ে একে এক চলে যায়। শুধু থাকে মন্তু আর তার মা। মা মন্তুর পিঠের ওপর হাত রাখে। মন্তু মাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদে। মা তার মাথায়-পিঠে হাত বুলিয়ে দেন। তাকে কোলে করে বাড়ি নিয়ে যান। মন্তু বারবার তার বাবার কবরের দিকে তাকায় আর তার চোখ দিয়ে বেরিয়ে আসে দুঃখের অশ্রু। ঈদের দিনটা চোখের পানিতে কেটে যায় মন্তুর।

SHARE

1 COMMENT

  1. গল্পটা প্রায় চার বছর আগের ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত গল্প “চোখের পানিতে ঈদের খুশি”গল্পের হুবহ সংস্করন ।তবে এবারের গল্পটাকে আগের গল্পের উল্টো করে সাজানো হয়েছে ।

Leave a Reply