Home স্মরণ মুসলিম সংস্কৃতির উত্তরাধিকার

মুসলিম সংস্কৃতির উত্তরাধিকার

মুস্তাফা জামান আব্বাসী….

মুসলমানদের ভয় নেই। পৃথিবীর প্রতি চারজনের মধ্যে একজন মুসলমান। ২০৫০ সালের মধ্যে মুসলমানেরাই হবে পৃথিবীতে পয়লা নম্বর জাতি সংখ্যার দিক দিয়ে। যার দিকে আমার এই প্রবন্ধের হাওয়া তা হলো আমাদের সংস্কৃতিতে কতখানি প্রতিফলন হবে কুরআন ও হাদিসের। যদি তা না হয়, তা হলে শুধু প্রথম হয়ে লাভ নেই। এই অভিজ্ঞানটি লাভ করেছি আমাদের প্রিয় নবী (সা)-এর কাছ থেকে। তিনি বলেছেন, যদি কুরআন ও হাদিস আঁকড়ে থাক তোমাদের ভয় নেই। যদি রাজ্য সংখ্যা ও সম্পদের দিকে ধাবিত হও, তা হলে তোমাদের অধঃপতন কেউ রুখতে পারবে না।
পৃথিবীতে বাস করতে হলে সবাই মিলেমিশে থাকতে হবে। এটাই ছিল নবী (সা)-এর ইচ্ছা। মদিনা চার্টারে এরই উদ্বোধন। এটি ছিল মুসলমান অমুসলমান সবার জন্য একটি কার্যকরী রাষ্ট্রব্যবস্থা। সংস্কৃতির ব্যাপারে আদান প্রদান হবেই। বাংলাদেশে যখন হিন্দুরা উলুধ্বনি দেয় তখন ব্যাপারটা অনেকের কাছে মনে হয় হিন্দুয়ানি, আরব দেশে গিয়ে দেখি তারাও উলুধ্বনি দেয়, নবীর সময়েও দিত। এটি একটি ইসলাম-পূর্ব সংস্কৃতির উপাদান। এর সঙ্গে ধর্মের সাযুজ্য খুঁজতে যাওয়া অমূলক। তেমনি বিয়ের সময় মেঝেতে আলপনা দেয়া অনেকের অপছন্দ। আবার আফ্রিকান ল্যাটিন আমেরিকান বহু দেশে এ ধরনের আলপনা চলে আসছে হাজার হাজার বছর থেকে। এর সঙ্গে বিরোধিতা করার কিছু নেই। তবে বড় বড় মুখোশ, বিশেষ করে পেঁচা রাস খোস নিয়ে যখন আমাদের ছেলেমেয়েরা পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন করে তখন একটু অবাক হই। কারণ এগুলো আমাদের লোকসংস্কৃতির কোথাও নেই।
মুসলমানেরা পূজা করবে না। কিছুতেই না, প্রাণ গেলেও না। কারণ ওটি আমাদের বিশ্বাসের বিপরীত। কিন্তু কোন হিন্দু পূজা করলে তাকে তার সুব্যবস্থা করে দেয় মুসলমানেরাই। এটা মুসলমানদের শিষ্টাচার। সরস্বতী দেবীকে মুসলমানেরা পূজা করে না, কিন্তু তার বিদ্যাপাতা বইতে রেখে দেয়। এইটুকু। মুসলমানেরা দুর্গাপূজার সময় হিন্দুদের ভালোবাসা জানায়। সেটা তাদের হিন্দুদের প্রতি প্রতিবেশীর প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন।
মুসলমানেরা প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করে না। কারণ এইটি শিরকের বিধান লঙ্ঘন করে। এই কারণে যখন পশ্চিমবাংলায় আব্বাসউদ্দিন জন্মশতবার্ষিকী হয় তখন সেখানে বুদ্ধিজীবীরা একের পর এক আমার আব্বার প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করেন। শুধু আমি বিরত থাকি। আমি কি তাদের চেয়ে আমার পিতার প্রতি কম শ্রদ্ধাশীল? তা হতেই পারে না। কারণ হলো মুসলমানেরা প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করবে না, এটাই আমার আকিদা, এটাই আমার বিশ্বাস। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে মাল্যদানে আমার একই অনুভূতি। কোন মুসলমান তা করবে না। করা উচিত হবে না। ভালোবাসা আছে অন্তরে। আমি তার জন্য ঐ সময়ে এক হাজার দরূদ পড়েছি। কোনটা ভাল হলো?
মুসলমানেরা পূজার অনুষঙ্গে জড়িয়ে না পড়লেই ভালো। তা হলে আপনি রাধাকৃষ্ণের গান কেন? আপনার বাবাও গেয়েছেন, আপনার ভ্রাতুস্পুত্রী ও কন্যারাও গেয়ে থাকেন, কেন? উত্তর হলো রাধাকৃষ্ণ আমার দেবতা নয়, ওটি হল আমার সংস্কৃতির রূপকথা। সেই রূপকথায় প্রেম আছে, বিচ্ছেদ আছে, আবার মিলন আছে। বাংলা লোকসঙ্গীতের প্রাণ হলো রাধাকৃষ্ণের রূপকথা। কারও কাছে এটি অপছন্দনীয় মনে হতে পারে। কিন্তু এটি পরিত্যাজ্য হওয়ার কথা নয়, কারণ আমাদের গ্রন্থেও রূপকথার কিছু উপাদান পাওয়া যায়। তবে জোর করে কাউকে রাধাকৃষ্ণের বিচ্ছেদী শোনাতে যাইনি।
এমনিভাবে আরও অনেক পূজার অনুষঙ্গ আমাদের জীবন ঘিরে আছে। তবে ভালো হয় এগুলো নিয়ে সময় নষ্ট না করে জীবনের আরও গভীরে চলে যাওয়া। কিভাবে?
১. সারাদিন যত কথা বলি, কতগুলো কথা মিথ্যে বললাম, ২. যে ব্যবসা করলাম, তার মধ্যে কতগুলো হালাল, কতগুলো হারাম, ৩. সারাদিনে কত লোকের মনে দুঃখ দিয়েছি, ৪. বাবা মা, ভাই-বোন, আত্মীয় পরিজন, পাড়া-প্রতিবেশী তাদের হক সারাদিনে কতটুকু উসুল করেছি, ৫. দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য কতটুকু ত্যাগ স্বীকার করেছি সারাদিনে।
প্রশ্নগুলোর উত্তর খাতায় লিখুন এবং নিজকে যাচাই করুন। তা হলে হয়ত মুসলমানদের জীবনঘনিষ্ঠ সংস্কৃতির উচ্চতর মূল্যায়ন হবে। মুসলমান সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। মাঝামাঝি কিছু নেই। অর্ধেক বিশ্বাস বলে কিছু নেই। সামাজিকভাবে মূল্যায়িত মুসলমান বলে কিছু নেই।

সাহিত্য-সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply