Home উপন্যাস তাতুম ও চারপাশের লাল-সবুজ মানুষ

তাতুম ও চারপাশের লাল-সবুজ মানুষ

ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ……..
মন খারাপের ভেলা
খুব চমৎকার ঝকঝকে সকাল ছিল আজ। আকাশে মুঠো মুঠো সাদা মেঘ। আম্মু ওগুলোকে বাহারি মেঘ বলেন। শরৎকালের মেঘ তো, এ মেঘে বৃষ্টি হয় না, নীল রঙ আকাশে রাশি রাশি ছুটোছুটি করে বেড়ায়। এমন আকাশের দিকে তাকিয়ে মনটা এমনিতেই ভালো হয়ে গেছে তাতুমের।
পাউরুটি-দুধ-কলা-ডিম খেয়ে রোজ সকালে ও আম্মুর হাত ধরে স্কুলে যায়। বড় বোন তিতলী যায় একটু পরে। রোজ একঘেয়ে নাশতা খেতে ওর ভাল্লাগে না। আজ রহিমা খালা পরোটা আর সুন্দর করে ডিম ভাজি করে দিয়েছে।
খালা বলে, নেও মামলেট খাও।
তিতলী বলে, তুমি মামলেট বলো কেন খালা? ওমলেট বলতে পারো না!
– ঐ হইলো, ঘাড়ের নামই গর্দনা, টকের নামই চুহা। ময়দানে নামেন ছোট চাচু।
– এই সকালবেলাতেই তোমার কথার ফুলঝুরি শুরু হয়েছে রহিমা বু। দাও, শিগগির এক পেয়ালা চা দাও। ভোরবেলা থেকেই এ বাড়ির হুটোপুটি শুরু হয়। জাহিদ কিছু সময় পর ব্যাংকে যাবেন, ওখানেই তার কাজের জায়গা। অফিস সকাল দশটায়, তাই ধীরে-সুস্থে যাবেন তিনি। নীলোফার কলেজে পড়ান, উনি তাতুমকে স্কুলে দিয়ে কলেজে যাবেন। তিতলীকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে জাহিদ ব্যাংকের দিকে যাবেন। শুক্র-শনিবার ছাড়া পাঁচ দিন হইহই রইরই করে সকালের সময়টুকু ফুরিয়ে যায়।
রোজকার পাউরুটি-ডিম আজ নয়, অন্যরকম নাশতা। পরোটা-ওমলেট খেতে খেতে দু’চোখ বুজে আসে তাতুমের।
নীলো বলেন, হচ্ছেটা কী তাতুম? স্কুলে যেতে হবে না? -এই যে হয়ে গেছে, আর দুই মিনিট।
সকালবেলাটা এমনই ছিল। তিতলী আপু কখনও কিছু সহজে দিতে চায় না। আজ চাইতেই বলপেন আর রঙ পেনসিল ছোট ভাইকে দিয়ে দিল। কিন্তু স্কুলের ঢঙ ঢঙ ঘণ্টা পড়তেই বিপত্তি ঘটে।
কাস টেস্টের খাতা দিচ্ছেন রিনি ম্যাডাম। খাতার ওপরের দিকটাতে লাল কালি দিয়ে আঁকা ইয়া বড় গোল্লা। মন খারাপের ভেলা ভাসতে থাকে তাতুমের বুকের ভেতরে।
অনেকেই দশে দশ পেয়েছে। কেউ আট, কেউ বা ছয় কিন্তু দু-একজন ছাড়া কেউ অমন গোল্লা পায়নি। আলো ঝলমল সকালটা মুহূর্তে ফিকে হয়ে আসে তাতুমের চোখে।
এই কাসে আর ওর মন পড়ে থাকে না। দূরে কোথাও হারিয়ে যায়। এবার ও কী করবে? বাড়িতে এই খাতা সে নিয়ে যাবে কী করে? নিয়ে গেলে দেখাবেই বা কী করে? আব্বু সারাদিন ব্যস্ত থাকেন বলে ওর পড়াশোনার সবটুকু আম্মুই দেখেন, এই তো কিছুদিন আগে অঙ্কের একজন টিচার রেখে দিয়েছেন, যেদিন বাড়িতে কোনো মেহমান আসে না কিংবা রাঁধাবাড়ার ঝামেলা থাকে না সেদিন আম্মু পাশে বসে বাংলা ইংরেজি অঙ্ক সব কিছু দেখিয়ে দেন, বুঝিয়ে দেন। এত কিছুর পর যদি এমন রেজাল্ট হয়, আম্মুই বা মেনে নেবেন কী করে?
কিছ্ইু যেন পারে না তাতুম। পড়াশোনায় পেছনে, দৌড় খেলায় পেছনেÑ সামনে তাহলে সে এগিয়ে যাবে কী করে?
টিফিন আওয়ারে টিফিন বক্স খুলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে সে আকাশের দিকে। বিশাল মাঠে ছেলেরা ফুটবল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে। ক্রিকেট ব্যাট হাতে নিয়ে তানভীর, রুবাই রান করে যাচ্ছে। দু-একটা চার-ছক্কাও মারল। চারপাশে কত আনন্দধ্বনি। শুধু তাতুম মলিন মুখে বসে। টিফিন খেতেও সে ভুলে যায়।
পিঠের মাঝে জোরসে চাপড় মেরে ঋতম বলে, কী রে শাহীন- মুখের ভেতর না বাঘ-ভল্লুক- হাতি-মাছি সব ঢুকে যাবে। বিরক্ত হয়ে তাতুম বলে, শোন সব সময় ইয়ার্কি ভাল্লাগে না।
– বাব্বা : এত মেজাজ দেখাচ্ছিস কেন? আমারও তো মন খারাপ, তা আমি কি তোর মতো গালে হাত দিয়ে হাঁ করে বসে আছি?
– তুইও কি অঙ্কে গোল্লা-
ঋতম এক গাল হেসে বলে, তোকে আর বলছি কী তাহলে? আমার কাছে এটি তো স্বাভাবিক ব্যাপার।
অবাক হয়ে তাতুম জিজ্ঞেস করে, তোর ভয় লাগছে না?
– ভয়? কেন ভয় কেন? কিসের ভয় রে? তুই খুব হাবলা।
– বা: রে, আব্বু-আম্মুকে দেখাতে হবে না?
– হুঁ দেখাব। বলব দশে দশ পেয়েছি।
– মিথ্যে বলবি?
তাতুম অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে ঋতমের দিকে। মুচকি হেসে ও বলল, মিথ্যে বললাম কোথায় রে ? ঐ তো দশ।
খাতার ওপরে জ্বলজ্বল করছে দশ নম্বর।
কী করে হলো? কেমন করে হলো? গোল্লা দশ হয়ে যায় কী করে? ত্ইু ম্যাজিক জানিস নাকি?
ঋতম রাফ খাতায় শূন্য এঁকে বাঁয়ে এক বসিয়ে দেয়।
– কি দশ হলো না? শূন্যের বাঁয়ে এক বসানো এক্কেবারে সোজা।
ঢঙ ঢঙ করে ঘণ্টা পড়ে। কাস শুরু হয় নতুন করে। কিন্তু তাতুমের আর কোনো কিছুতে মন নেই। দুই কানের মাঝে বাজতে থাকে একটি শব্দÑ দশ দশ দশ।
সত্যিই কি ও বোকা? ঋতম কি সহজ সুরেই বলল, ত্ইু একদম হাবলা। মিছেমিছিই ভয় পাচ্ছিস, মিথ্যে কথা বললে যদি বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায় তো সে মিথ্যে কথায় দোষ কী?
কোথা থেকে যেন রাশি রাশি সাহস এসে তাতুমের বুকের ভেতর জমা হয়। ঋতমের সঙ্গে ওর তেমন ভাব ছিল না, আজ সে প্রিয়বন্ধু হয়ে কাছে এসেছে। কত কিছু জানে সে। ও যেন তাতুমের ফ্রেন্ড ও গাইড হয়ে গেছে।
আজ ড্রয়িং কাস ছিল বলে বলপেন আর রঙ পেন্সিলের ছড়াছড়ি। ছুটির ঘণ্টা পড়ার সাথে সাথে ঋতমের কাছে ছুটে যায় তাতুম।
বাড়ি ফেরার তাড়া সবার। কাসের এক কোণে বসে ঋতম তাতুমের খাতায় এক সংখ্যাটি বসিয়ে দেয়।
– যাহ্, এবার আর তোর কোনো ভয় নেই।
রহিমা খালা কাসে এসে বলে, তুমি অতো দেরি করো ক্যান তাতুম? ছুডি হইছে তাড়াতাড়ি বাইর হইয়া পড়বা। তা না- খালি দেরি করে।
তাতুম রিকশায় চেপে চারপাশে তাকায়, আকাশটাকে চোখে পড়ে। এখন আর ওর কোনো ভয় নেই। মনে মনে বলে, থ্যাংক ইয়ু ঋতম এই বুদ্ধিটাকে বাতলে দেবার জন্য।

স্বপ্ন দেখছে আম্মু
দুপুরবেলা বাড়িটা খুব জমজমাট থাকে। রাঁধা- খাওয়া-গোসল করা কাপড় কাচা সব কাজ এক সঙ্গে চলে। ঝুম বৃষ্টির দিনে, সুনসান গরমের দুপুরে, রাত-বিরেতে ভূতের ভয়টা দূরে কোথায় যেন পালিয়ে যায়। এ সময়টা ওর খুব প্রিয়।
খালা রোজকার মতো লেবুর শরবত বানিয়ে দেয়, প্লেটে বিস্কিট রাখে।
আদুরে গলায় বলে, খাও খাও সোনা, মুখখান শুকাইয়া এইটুকান হই গেছে, সন্দেশ খাবা? সত্যিই কি ওর মুখ শুকিয়ে গেছে? খালা এমনই এমনই অনেক কথা দিনে-রাতে বলে। তবে আজ যে ওর বুকে ঝড় বইছে সে তো সত্যি। কিন্তু এখন আর ভয় নেই। কাস টেস্টের মার্কস যোগ হবে না ফাইনাল পরীক্ষায়- সে কি আর আব্বু-আম্মু এত তীè চোখে দেখবেন?
এক সময় আম্মু-তিতলী আপু ফিরে আসে। খেতে বসে ওরা। এই সময়টুকু সবাই মন খুলে গল্প-গুজব করে।
টেবিলে মসুরডাল, কই মাছের তরকারি, ঢেঁড়স ভাজি।
– কি রে তাতুম, কাস টেস্টের খাতা কি দিয়েছে রে? বলার সাথে সাথে কাঁচালঙ্কা মুখে পড়ায় ওঁহু আহা করতে থাকেন নীলোফার।
– কতোদিন তোমাকে বলেছি বুয়া ডালে এত কাঁচামরিচ দিও না। তিতলী-তাতুম কি এত ঝাল খেতে পারে? আমিই তো পারছি না। ধেৎ, তুমি কথা এক্কেবারে শোন না।
খাতার কথা বেমালুম ভুলে যায় আম্মু। আজ সে কইমাছের কাঁটা বেছে দিব্যি খেয়ে নেয়। মাছ খাব না, ঢেঁড়স খাব না- এসব নিয়ে এতোটুকু ঝামেলা করে না, চিকেন কেন হয়নি বলে একটিও কথা নয়, একদম চুপ সে।
নীলোফার বলে, ব্যাপার কি রে তাতুম, আজ তুই চিকেন নেই, চিকেন নেই বিলে একটুও ঝামেলা করলি না তো, কী হয়েছে বলতো? শরীর খারাপ?
বেসিনে হাত ধুতে ধুতে তাতুম বলে, কী আবার হবে- তুমি না আম্মু!
সময় বয়ে যেতে থাকে একটু একটু করে। কারো মন খারাপ, হাসি-আনন্দের তোয়াক্কা না করে সে নিয়ম মতো বয়ে যায়। বিকেলে জাহিদ সাহেব ফিরে এলে চা-নাশতা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন আম্মু। তাতুমের মনে হয়, সবাই যদি সারাক্ষণ ঝুট-ঝামেলায় এত ব্যস্ত থাকত। ভুল করেও যদি তাতুমের স্কুল টেস্টের খাতার খবর কেউ না নিত। চাইলেই কি সব কিছু ওর মনের মতো হবে? তা তো নয়।
সন্ধ্যায় আব্বুর কাছে দু’-তিনজন মেহমান এলেন। নীলোফার ব্যস্ত হয়ে পড়লেন নাশতা বানাতে। চেঁচিয়ে বললেন, তিতলী, ও তিতলী শুনতে পাচ্ছ না? তাতুমের দিকে খেয়াল রেখ, ও যেন হোমটাস্ক না করে টিভির সামনে গিয়ে না বসে। আজ আর টিভি দেখার একটুও ইচ্ছে নেই, নয়তো ফাঁকি দিয়ে গল্পের বই পড়া, টিভি দেখা ওসব ওর কাছে কিছুই নয়, ও তো সে হরদম করেই থাকে।
নীলোফার সব সময় বলেন, তাতুম তুমি অমন করো কেন? আগে পড়া তারপর অন্য কিছু। লেখাপড়া শিখে তো মানুষ হতে হবে, সহবত শিখতে হবে।
হাতে-পায়ে দুষ্টুমি করতে করতে তাতুম বলেছে, সহবত কী আম্মু?
নীলোফার ভুরু কুঁচকে বলেছেন, বাব্বা: এত প্রশ্ন করিস? সহবত মানে- সভ্যতা-ভব্যতা। এখন জিজ্ঞেস করবি-সভ্যতা-ভব্যতা মানে কী আম্মু? সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে। কারো সঙ্গে দেখা হলে সালাম দেবে, জিজ্ঞেস করবে- কেমন আছেন? কাউকে কটু কথা বলবে না। তুই যা দুষ্টু ছেলে এক্ষুনি জিজ্ঞেস করবি- কটু কথা কী আম্মু?
বোকার মতো মুখ বানিয়ে তাতুম বলে, সত্যিই তো- কটু কথা কী আম্মু? আমি তো শব্দটি আগে কখনও শুনিনি। চোখ পাকিয়ে নীলোফার বলেন, খুব ইয়ার্কি হচ্ছে না?
হি হি করে হেসেছে তাতুম, আম্মুও সেদিন কম হাসেননি। তিতলী বলে, এই যে আম্মু এতক্ষণ ধরে তাতুম কী পাকামোটাই না করছে- কই কিছু বলছ তুমি? বলবে না তো। আদরের ছেলে যে। আমি এতটুকু দোষ করলে চড়-থাপ্পড় তো লাগাতেই। লাগাতে না বলো!
নীলোফার বলেন, এত কথা বলতে হবে না। যে ভালো সব মায়েরা সেই ছেলে-মেয়েকে আদর করে, ভালবাসে।
মানুষের সামনে যাকে নিয়ে গর্ব করা যায় তাকেই মা-বাবা ভালবাসেন। তবে অন্যদেরও কম বাসেন না।
আম্মু বোধ হয় আংকেলদের জন্য নিমকি ভাজছেন। বাতাসে ভেসে আসছে ভাজা তেলের মনকাড়া গন্ধ। দুধ-সেমাইও হয়তো তৈরি হচ্ছে। ঘন দুধ, এলাচির মিষ্টি মিষ্টি গন্ধে ভরপুর হয়ে আছে সারাটি ঘর।
এই সুযোগ। আম্মু ব্যস্ত থাকলে তেমন কিছু খেয়াল করেন না। ওর ঠাণ্ডায় এলার্জি বলে আইসক্রিম খাওয়া একদম বারণ ওর। আম্মু যখন কোনো কথা বলেন কিংবা আন্টিদের সঙ্গে কথা বলতে থাকেন তাতুম তক্ষুনি বলে- আম্মু, প্লিজ আম্মু একটা কোন আইসক্রিম খাব। শিগগির টাকাটা দাও না।
আন্টিরা চলে গেলে কিংবা ব্যস্ততা কমলে নীলোফার জিজ্ঞেস করেন, কি রে তাতুম, কথা বলছি তোর আন্টিদের সঙ্গে তখন এমন ঝাঁপিয়ে পড়ে, অস্থিরতা করে টাকা নিলি কেন? তাও আবার তিরিশ টাকা
আম্মু যে কলেজ করে ও সাংসারিক ঝামেলার পর ছোটোখাট সব কথা মনে রাখবে
– তা কি ও বুঝতে পেরেছ? তবু আজ ওকে একটু সাহস করে বলতেই হবে।
খুব স্বাভাবিকভাবে নীলোফারের কাছে এসে তাতুম বলে, আম্মু আম্মু- এই যে দ্যাখো আজ অঙ্ক খাতা দিয়েছে, আরে বাবা দ্যাখোই না। নীলোফারের হাতে ময়দা মাখা, চুলোতে দুধ উথলে উঠেছে, বিরক্ত হয়ে বলেন, ভেরি ব্যাড তাতুম, দুপুরে খাবার সময় তোমাকে জিজ্ঞেস করলাম, তখন তো কিছু বলোনি তুমি।
– একদম ভুলে গেছি আম্মু। প্লিজ দেখে নাও না। এখন। -আহা, এখন কী করে দেখব! কত পেয়েছ বলো তো। খাতাটা খুলে ধরে তাতুম নীলোফারের চোখের সামনে। মায়ের মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সারাদিনের খাটুনির জন্য কিছুটা কান্তির ছায়া মুখে ছড়ানো। এরপরও সারা মুখে আম্মুর হাসি ছড়িয়ে পড়ে।
– দশে দশ পেয়েছ তাতুম? অঙ্ক এখন শিখে ফেলেছ, তাইতো। আম্মুর দু’চোখে স্বপ্নেরা এসে ভিড় করে।

কষ্টের রাত ও সোনালি সকাল
তাতুম বিছানায় আসার সাথে সাথেই দু’চোখ জুড়ে ঘুম নেমে আসে। আহ বুকের ভার এখন আর এতটুকুও নেই।
ভাই-বোনের সিঙ্গেল খাট কামরার দু’পাশে রাখা। তিতলী তখনও পড়ছে, ওর কাস নাইন। তাতুমের চেয়ে অনেক অনেক বেশি পড়া ওর। ও নিজে নিজেই ওর প্রয়োজন মতো পড়ে নেয়। আম্মুকে কখনো বলতে হয় না। শুধু ওর নিজের পড়া কেনÑ সব কিছু ও খেয়াল করে।
তাতুম বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে পড়তেই জিজ্ঞেস করে, কী রে – বিছানায় উঠলি যে বড়! দাঁত ব্রাশ করলি না? যাহÑ দাঁত ব্রাশ করতে যা।
– আহ আপু, একটা রাতে শোবার আগে দাঁত ব্রাশ না করলে কী হয় শুনি? এতো ডিসিপ্লিন আমার ভাল্লাগে না। সব সময় নিয়ম মেনে চলতে হবে। একদিন নিয়ম ভাঙ্গতে দাও প্লিজ।
ছোট ভাইটির দু’টি বড় বড় চোখের দিকে তাকিয়ে তিতলী হেসে ফেলে।
– ইসস্ পাকা বুড়ো একেবারে। নিয়ম মেনে চলতে ভালো লাগে না। নদী-সাগর সব কিছুই তো সারাক্ষণ বয়ে চলে। আর সময়? সে তো অবিরত চলতেই থাকে। তুমি রাগ করলে না খুশি হলে, ঝড় হলো না বৃষ্টি হলো, রোদে সব কিছু পুড়ে গেলেও সে চলতেই থাকে। কথায় বলে না-সময় ও স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না।
তিতলীর কথা কেউ শুনছে না। বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখে নিঃসাড় হয়ে ঘুমোচ্ছে তাতুম। আম্মুকে কথাটি বলার পর সারাদিন জমে থাকা বুকের ভার ওর অনেকটা কমেছে। সে তো আর কেউ জানে না।
ভীষণ মশা ঘরে। রোজই পড়া শেষ করে মশারি টাঙিয়ে দেয় ও। আজ মায়া হয় ছোট্ট ভাইটির ওপর। কী পাকা বুড়োর মতো বলল, ডিসিপ্লিন আমার ভাল্লাগে না।
সত্যিই, কোনো কোনো দিন এমন হয়- খুব মজার বই পড়ছে তিতলী। ভীষণ ইন্টারেস্টিং। ছুটির দিন। পড়ছে তো পড়ছেই। এক সময় বইয়ের ভেতরে ঢুকে যায় ও।
আম্মু এসে বারবার তাড়া দেন,- দেড়টা বাজে এখনও গোসল করনি? যাও যাও এক্ষুনি বথরুমে ঢুকো।
একদিন গোসল না করলে কী হয় শুনি? বইয়ে ডুবে থাকার মজাটা কি পড়ে আর থাকবে? একদিন যদি শুক্রবার বিকেলে নাচের কাসে না যাই- তাহলে কি একে ফাঁকিবাজি বলে? মোটেও নয়। কিন্তু বড়রা তা বুঝতেই চায় না। ছোটদের মনের কথা ওরা জানতে চায় না।
কেমন পাকা বুড়োর মতো তাতুম বলল, নিয়ম মেনে চলতে আমার ভাল্লাগে না। ভাইয়ের খাটের ওপর মশারি টাঙিয়ে দিতে দিতে ও ফিসফিস করে বলে, আমারও অনেক সময় অনেক কিছু ভালো লাগে না রে তাতুম। বড় হচ্ছি যে- তাই অনেক সময় অনেক কিছুই মেনে নিতে হয়।

ঝুপ করে ঘুম ভেঙে যায় তাতুমের। মধ্যরাত, কোথাও কারো সাড়া নেই। ওপর তলার ট্যাপের পানির ঝরঝর করে ঝরে পড়ার আওয়াজ, দু-একটা রিকশা ক্রিং ক্রিং করে ঘণ্টি বাজিয়ে যাচ্ছে, হুঁশ করে কোনোও গাড়ি ছুটছে- এমন শব্দ ছাড়া চারপাশে কোথাও কারো কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।
হালকা নীল বাতি ঘরে জ্বলছে। আপু ঘুমোচ্ছে। এবার কী করবে তাতুম? আম্মুকে খাতার কথা বলার পর পাখির পালকের মতো হালকা লেগেছিল নিজেকে। এখন আবার নতুন করে একরাশ ভয় জাপটে ধরে ওকে।
আমি কেন অঙ্কগুলো ঠিকঠাক মতো করতে পারিনি, কেন এত তাড়াহুড়ো করতে গেলাম! তা না হলে তো এমন ভয় পেতে আমার হতো না। স্কুলের টিচার ও বন্ধুদের সামনে এমন মাথা হেঁট হতো না।
একরাশ ভয়ে ওর সারা শরীর ঘামতে থাকে। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। বাতাসে গরম ভাঁপ নেই। তাও ঘামতে থাকে তাতুম। মোলায়েম কাঁথাটি সরিয়ে রাখে এক পাশে। আবার নতুন করে ঘুম না এলে সারারাত ওর কেমন করে কাটবে? কষ্টের এই রাতে কাঁদতে কাঁদতে এক সময় ও ঘুমিয়ে পড়ে।
– এই তাতুম ওঠ ওঠ- স্কুলে যাবি না, দ্যাখ তো ক’টা বাজে।
চেনা পৃথিবীতে আবার ফিরে আসে ও। নিয়মে বাঁধা জীবনে চলতে শুরু করে। দাঁত ব্রাশ করে, স্কুল ড্রেস পরে তৈরি হয়ে খাবার টেবিলে আসে।
– কংগ্র্যাচুলেশনস তাতুম।
আম্মু-আব্বু, তিতলী আপু, তুবড়ি চাচু হই হই করে ওঠে। সবাই দারুণ খুশি।
– ভাবী এবার কিন্তু সেলিব্রেট করতে হবে। জমিয়ে খাব আমরা। অঙ্কে ইমপ্রোভ করেছে ও। এটা সুসংবাদ ছাড়া আর কী! কংগ্রান্টস তাতুম।
জাহিদ সেমাইয়ের বাটিতে চামচ ডুবিয়ে বলেন, যাও তাতুম, খাতাটা নিয়ে এসো, হারি আপ।
নিজের ঘরে যেতে যেতে শিরদাঁড়া বেয়ে ওর পানি ঝরতে থাকে। আব্বু বলতে থাকেন, কাস টেস্টে ফুল মার্কস পেলে দশের ভেতরে থাকার চান্স থাকে, যোগ হয় তো মার্কস।
কী করে তাতুম খাতা নিয়ে এলো, কি করে কিছুটা সময় চলে গেল, অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটে গেল কিছুই আর মনে সেই ওর। সে যেন এক ঘোরের মাঝে রয়েছে।
জাহিদ সাহেব প্রথমে- ওয়াও বলে চেঁচিয়ে ওঠেন।
অঙ্কতে বরাবরই কাঁচা তাতুম। তাছাড়া দারুণ ভয় পায় সে এই সাবজেক্টকে।
স্কুলের টিচার, আব্বু-আম্মু-তুবড়ি চাচু সবাই বলে,
ভয় পাওয়ার কী আছে রে? ভয় পেলে তো কাছে ঘেঁষতে পারবি না, ভালো নম্বর পাবি কী করে।
নাহ- এত বলার পরও কিছুতেই না বলা এই ভয়কে কাটিয়ে উঠতে পারল না ও।
আব্বু যেন বোমা ফাটালেন।
-চারটে অঙ্কই তো ভুল রে। কী করে নম্বর দিলেন টিচার?
-আড়াই করে মার্কস নাকি?
– দশ হলো কী করে? তোর তো জিরো পাবার কথা।
আর কী! জিরো ছিল, এর বাঁ পাশেই এক জুড়ে দিয়েছে। কেমন দুষ্টুমি বুদ্ধি দ্যাখো।
জাহিদ সাহেব গম্ভীর গলায় বলেন, তাতুম তুমি এই? এই আমার সন্তান? এই আমার উত্তরাধিকার?
সন্তান বুঝল তাতুম কিন্তু উত্তরাধিকারের মতো কঠিন শব্দটি বুঝতে পারল না। হাঁ করে তাকিয়ে থাকে ও।
নীলোফার বলেন, ছি: ছি: তাতুম। তুমি মিথ্যো বলতে শিখেছ! তিতলী ওর ছোট ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আদুরে গলায় বলে, তুমি এমন করলে কেন- বলোত!
স্নেহের ছোঁয়া পেয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে ও।
– আমি করি নাই তিতলী আপু। ঋতম আমাকে বলল এমন করতে।
তুবড়ি চাচু বলে, হ্যাঁ ভালই বলছ তাতুম সাহেব। ঋতম যদি তোমাকে চুরি-ডাকাতি করতে বলে তুমি তাই করবে? নীলোফার বলেন, তোমার নিজের কোনো বুদ্ধি নেই? হয়তো তোমাকে বকতাম, না হয় কান মলে দিতাম কিন্তু তুমি এমন কাণ্ড করলে কেন? তোমাকে তো কেউ আর বিশ্বাস করবে না তাতুম। কেন এমন করলে?
জাহিদ সাহেব ওঠে দাঁড়ান। এবার তাকে অফিসের জন্য তৈরি হতে হবে।
– শোন, তাতুম আর স্কুলে যাবে না। দিজ ইজ মাই অর্ডার। সবাই চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। জানে উনি যা একবার বলেন তাই করেন। তাতুমকে এত ভালবাসেন সেই ছেলে এমন লজ্জার কাজ করল?
অফিসে যাবার জন্য তৈরি হতে জাহিদ সাহেব ঘরে গেলেন। নীরব ময়দানে এবার নামেন তুবড়ি চাচু।
– তুমি তিন তিনটে অন্যায় করেছ তাতুম।
এক, তুমি ভালো করে পড়াশোনা করো না।
দুই, মেইন সাবজেক্ট অঙ্কে তুমি ফেল করেছ। তিন, শূন্যের পাশে এক বসিয়ে দশ বানিয়েছ।
গ্রিলের ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে তাতুম। চোখ ওর শুকনো, খরখরে।

এ এক নতুন ভোর
কমলাপুর রেলস্টেশন। এ এক অদ্ভুত জায়গা। কেক-বিস্কিট-বাদম-চানাচুর-ম্যাগাজিন নিয়ে বিচিত্র সুরে ফেরিওয়ালারা হাঁক দিচ্ছে। গমগম করছে স্টেশনটি এই সন্ধ্যা রাতে।
আমাকে আব্বু একটা সামান্য ভুলের জন্য দূরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন? কী এমন করেছি আমি? ঋতম এই বুদ্ধি বাতলে না দিলে তো আমি এসব জানতেও পারতাম না। ভুল শুধরে নেয়ার সময় না দিয়ে দাদীর কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছেন আব্বু। নীলোফার কেঁদে বুক ভাসিয়েছেন।
– এইটুকুন একটা ছেলে, ওকে তুমি পাঠিয়ে দিচ্ছ দাদীর কাছে! শোন, আমিও টিচার। তুমি কিন্তু লঘু পাপে গুরুদণ্ড দিচ্ছ। অন্যায় করেছে, ওকে বুঝতে দেয়ার সময় দাও।
তুবড়ি চাচু মলিন মুখে বলেছে, এ তুমি কিন্তু ভাল কাজ করছ না বড় ভাইয়া। ছোটরা কত কিছু করে, একটুতেই তুমি এমন রিঅ্যাক্ট করছ কেন? আমি ওকে রেখে আসব আম্মার কাছে। শাস্তি কিন্তু আমারও কম হচ্ছে না ভাইয়া।
কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়েছে তিতলী।
– কী এমন করেছে তাতুম? আমি একা ঘরে কী করে থাকব আব্বু! ওকে মাফ করে দাও।
নীলোফার কাঁদো কাঁদো গলায় বলেন, তুমি বছরে একবার রাগ করো, রোজ করো না তাইতো? এর চেয়ে রোজ রাগ করা ভালো। তাহলে এমন ডিসিশন তুমি নিতে পারতে না।
রহিমা খালা মুরগির ঝোল রাঁধতে গিয়ে আদা-হলুদ মাখা আঁচল দিয়ে চোখ মুছে।
– পোলাপাইনে কতো কিছু করে। তাতুম বুইড়া মানুষনি যে বুইঝা শুইন্যা কাম করব?
জাহিদ ডিসিশন নিয়েছেন তা-ই ঠিক। অন্যায় করলে তার শাস্তি পেতেই হবে। তুমি ঢাকার নামী-দামি স্কুলে পড়ার যোগ্য নও। আব্বু- আম্মুকে ছেড়ে তোমাকে সিলেটে গিয়ে পড়াশুনা করতে হবে।
এক সময় হুইসেল দিল। জাহিদ প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে হাত নাড়লেন। তুবড়ি চাচু খুব মন খারাপ করে ট্রেনের কামরায় বসে আছে। ট্রেন এক সময় চলতে শুরু করে। ঝিকির ঝিক ঝিকির ঝিক। অচেনা পথে যাত্রা তাতুমের।
পিঠে হাত বুলিয়ে চাচু বলেন, মন খারাপ করিস না তাতুম। মনে কর পিকনিক করতে যাচ্ছিস। বড় ভাইয়ার রাগ পড়লে তোকে ঢাকায় নিয়ে যাবেন।
চাচার আদরে-ভালবাসায় দু’চোখ থেকে ঝরঝর করে পানি ঝরে। আম্মু আসার সময় রাস্তার জন্য চিকেন স্যান্ডউইচ-নুডলস করে দিয়েছেন। তাতুম কিছুই মুখে দিল না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। এক সময় ঘুমিয়ে যায়।
সবাই এক সাথে মিলে ছুটিছাটায় কতবার সিলেটের তালতলার বাড়িতে এসেছে। ভাইবোন একসাথে মিলে ছুটোছুটি করেছে। চালের গুঁড়ো-নারকেল আর ক্ষীরের পিঠে খেয়ে ভাত খেতে ভুলে গেছে। ট্রেনের ঝিকির ঝিকির আওয়াজের সুরে, পুরনো স্বপ্নগুলো ভেসে আসে। ভোরবেলা তুবড়ি চাচু ডেকে তোলেন।
– ও তাতুম ওঠ ওঠ, উপবন পৌঁছে গেছে।
ঘুমভাঙা চোখে বাইরের দিকে তাকায় ও। এ রেলস্টেশন খুব পরিচিত ওর। কতবার আম্মু আর আপুর সঙ্গে সিলেটে এসেছে। কিন্তু আজকের এই আসাটা একেবারেই অন্যরকম। বুকের ভেতর অনেক কষ্ট, চোখে অনেক পানি।
আঁধার এখনও ভালো করে কাটেনি। ভোরের আলো একটু একটু করে ফুটছে। আম্মু কতবার শিখিয়েছেন – জানো তাতুম, এ সময়টাকে ঊষা বলে।
বুকের ভেতরটা করুণ কান্নায় মোচড় দিয়ে ওঠে। তালতলার বাড়িতে আনন্দের হইচই। দাদীমা খুশিতে ডগমগ। কিন্তু তাতুমের তো একটুও আনন্দ হচ্ছে না।
হেমন্ত এসেছে, একটু একটু ঠাণ্ডা পড়েছে। বাড়ির সামনের দূর্বাঘাসে, ডলার প্লান্ট, স্থলপদ্মের পাতায় মুক্তোর মতো শিশিরবিন্দু।
তাতুমের বুকের ভেতরের বেদনা, সূক্ষ্ম অপমানবোধ কিছুটা মিইয়ে আসে দাদীমার আদরে। জুঁই ফুলের মতো ঝরঝরে কাটারিভোগ চালের ভাত, মাছের ফ্রাই, মুরগির কোরমা খেতে গিয়ে বেশ এনজয় করে তাতুম।
দুঃখগুলো কোথায় যেন পালিয়ে যায় দাদীর হাতে ঘন দুধের সেমাই, ফিরনি, হালুয়া খেতে খেতে।
চাচু জিজ্ঞেস করে, কেমন লাগছে রে?
– দারুণ, ফ্যান্টাসটিক।
দু’তিন দিন পর দাদী জিজ্ঞেস করেন, কি রে তুবড়ি, তুই যে ওকে একা নিয়ে এলি? ওর বাবা-মা এল না যে। কী রে ? ব্যাপারটা কী?
চাচু সব ফাঁস না করে বলে, ঐ আর কী, তাতুম তো স্কুলে দুষ্টুমি করেছে, বড় ভাইয়া তাই রাগ করে এখানে পাঠিয়ে দিয়েছে। শাস্তি আর কী!
দাদী রেগে আগুন হয়ে যান।
– পোলাপান দুষ্টুমি করবে, এ জন্য রাগ কইরা একলা পাঠাইব? কস কি তুবড়ি? মা-বাপ ছাইড়া স্কুল বাদ দিয়া এ কেমুন শাস্তি রে। আমার বড় পোলারে তো চিনি। রাগের ধুচুনি একটা, ঐ রাগখানই আছে, বেক্কল একটা। না বুইঝাই হগল কাম করে।
আব্বুকে বকছে দাদী, মুড়ির মোয়া খেতে খেতে দারুণ হাসতে থাকে তাতুম। বড়রা কি মনে করে? ওদেরকে বকুনি দেয়ার কেউ নেই? আছে, আছে- মাথার ওপর কেউ না কেউ থাকে।
সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসছে। ইলেকট্রিক আলোর দিকে তাকিয়ে ওর দু’চোখ পানিতে ভরে যায়। না হয় অঙ্কে ও শূন্য পেয়েছে, বাড়ির ভয়ে সে না হয় শূন্যের বাঁয়ে এক বসিয়ে দিয়েছে- এটা কি সাংঘাতিক অপরাধ করে ফেলেছে সে? মনে মনে সে কত লজ্জা পেয়েছে সে খবর কি আব্বু রাখেন? সবার সামনে দিয়ে তাতুমকে নিয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে এসেছে- ওকে সিলেট পাঠিয়েছে, কত অপমান হয়েছে ওর সে কথা আব্বু একবারও ভাবল না?
রাতে গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দাদী পোলাও গোশত বেড়ে দেন। আদর করে খাওয়ান, বলেন, দাঁড়া তর বাপের সাথে কথা কই। পরশু দিন তরে লইয়া আমি ঢাকা যামু। পোলারে ক্যামনে দূরে পাঠায়- এই কথা জিগামু।
চার দিন হয়ে গেল আব্বু একবারও ফোন করেনি।
আম্মু-আপু কথা বলেছে। এখনও রেগে আছেন জাহিদ। তবে দাদী নিয়ে গেলে আর কোনো ভয় নেই ওর।
এই পাঁচটি দিন শীত বিকেলের মতো হুঁশ করে ফুরিয়ে গেল। পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে পুকুরে ডুব দেয়া, গোসল করা, লম্বা কিন ব্রিজের ওপর দিয়ে রিকশা করে চলা, আলী আমজাদের ঘড়ি দেখাÑ দারুণ কেটেছে তাতুমের। বড় শহর হলেও এখানে ঝিঁ ঝিঁ পোকা ঝোপে ঝাড়ে জ্বলে আর নিভে। বাইরে বাগানে ফড়িং-প্রজাপতি ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ায়। গাছের ডালে কত রকম পাখিরা যে শিস দেয়। আকাশটা এখানে অনেক বড়। হেমন্তের মুঠো মুঠো মেঘ এখানে আরও সুন্দর।
ঢাকায় এমন আকাশ কখনও দেখেনি তাতুম। দাদী আর তুবড়ি চাচুর সঙ্গে আবার ফিরে যাবে সে ঢাকায়- কিন্তু যেমন আনন্দ হওয়ার কথা তেমন ভালো লাগল না ফিরে যাওয়ার কথা শুনে।
বাড়ির গাছপালা, প্রজাপতি, ফড়িং. ফুল, পাখি সবাই যেন মমতায় জড়িয়ে রেখেছে তাতুমকে।
মানুষের চেয়েও ওরা বোধ হয় বেশি ভালবাসতে জানে।

প্রিয় যুলকারনাইন স্যার
ঢাকার ফ্যাটে পা দিয়ে দাদী ঘোষণা দেন, তাতুমকে কেউ বকতে পারবা না। অঙ্ক পরীক্ষায় সবাই খারাপ করে। ক্যান- জাহিদ খারাপ করে নাই? ছোট পোলাপানরে এত শাসন কিসের?
নীলোফার হাঁ হাঁ করে ওঠেন।
– আম্মা, ওর আব্বার কথা তাতুমের সামনে বলবেন না, ছেলে আশকারা পেয়ে যাবে। ও জানে আব্বু খুব ভালো ছাত্র ছিলেন।
গরম চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে পানের বাটা পাশে নিয়ে মনোয়ারা বেগম বলেন, হুনো বউমা, আমারে এত শিখায়ো না। জাদু ভালো ছাত্র ছিল না ছাই।
তাতুম যে নম্বর নিয়ে কারিকুরি করেছে তা তিনি জানেন না, জানলে হয়তো বলতেন, কী হইছে হাজার লাখ তো করে নাই, দশই করছে।
যা হোক আবার আগের জীবনের মাঝে ঢুকে গেল তাতুম। এখানে ঝিঁঝিঁ পোকার জ্বলা-নেভা নেই, ফুল পাখি নেই, মুঠো মুঠো সাদা মেঘ নেই, প্রজাপতি, ফড়িং নেই- আছে শুধু রুটিন মেনে চলার জীবন। হোমওয়ার্ক আর স্কুলের বৃত্তে ঢুকে যাওয়া।
পাঁচ দিন স্কুলে যায়নি তাতুম, আম্মু ইংরেজিতে চমৎকার এক অ্যাপ্লিকেশন লিখে দিলেন। এটি দিতে হয়, স্কুলের নিয়ম-কানুন খুব কড়া। আম্মু লিখেছেন, হাই টেম্পারেচার ছিল শাহীনের। হাই টেম্পারেচার মানে অনেক জ্বর। বা: দারুণ তো। পড়তে গিয়ে ফিক ফিক করে হাসতে থাকে তাতুম।
– তোমরাও তো মিথ্যে কথা বললে আম্মু- শুধু আমি বললেই দোষ?
আম্মু গম্ভীর গলায় বলেন, দ্যাখো তাতুম, সব কিছুতে প্রশ্ন করো না। যে মিথ্যে কথায় কারো কোনো ক্ষতি হয় না সে মিথ্যেয় কোনো দোষ নেই।
চুপ করে রইল তাতুম। জবাবটা খুব পছন্দ হলো না ওর।
নীলোফার বলেন, সত্যি কথাটা বলা যায় বলো? চাপা গলায় আম্মু বলতে থাকেন, তুমি জিরোকে দশ বানিয়েছ, এতে তোমার আব্বু রেগে যায়। বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় তোমাকে। এ জন্য তুমি অ্যাবসেন্ট করেছ। জটিল এই কথাগুলো ও বুঝতে পারে না একদম। কেমন যেন গোলমেলে ব্যাপার।
মিথ্যে কথা বলা ভাল নয়। সব সময় সত্যি কথা বলবে। আবার মিথ্যে কথা প্রয়োজনে বলতে হয়।
দাদী আসার পর আব্বু রাগ করা একদম ভুলে গেছেন। এক ফাঁকে তাতুমকে ডেকে বলেন, খবরদার, তাতুম, ঋতম- সেই স্কাউন্ডেলটার সাথে একদম মিশবে না, কথা বলবে না, ফ্রেন্ডশিপ কাট অফ করবে।
নাহ- কোনোদিনও মিশবে না। ও বড্ড খারাপ, ভীষণ খারাপ। এমন এক বুদ্ধি বাতলে দিল, এরপর কত কাণ্ডই না হলো বাড়িতে। ও তো এর বিন্দু-বিসর্গও জানে না।
ঋতম রোজই ওকে বলে, তুই সবার সঙ্গে কথা বলিস, আমার সঙ্গে কথা বলিস না কেন? কী করেছি আমি? কী অদ্ভুত এক অবস্থা ওর। সামনাসামনি বন্ধুদের কি ওভাবে পাশ কাটানো যায়?
আব্বু আর আম্মুকে রেড সিগন্যালের মতো মনে হয়। এটা করো না, ওটা করো না, ও বাজে ছেলে, ওর সঙ্গে মেলামেশা করবে না, ও ভীষণ বখাটে। কিন্তু সব ব্যাপারে মুখোমুখি হতে হয় তো তাতুমকে। ও ভীষণ বিব্রত বোধ করে। কে বাজে আর কে ভালো- ও কী করে বুঝবে?
তুবড়ি চাচু আগে যখন তখন বকুনি দিত। বলত, কী রে মি. পড়–য়া, সারাদিন বই গুঁজে রাখলে কি চলে? রেজাল্ট চাই, রেজাল্ট। জানিস তো- যো জিতা ওই সিকান্দার।
দাদী আসার পর থেকে সেই চাচুও যেন সবুজ মানুষ হয়ে গেছেন।
আম্মু যখন মন খারাপ করে বলেন, আমি ভাবতেই পারছি না তাতুম আমাকে এনে এমন মিথ্যে কথা বলল! -তখন ভীষণ খারাপ লাগে ওর।
এই তো সেদিন চাচু জবাব দিল, ভাবী কথাটি শুনলে খারাপ লাগবে। কিন্তু তোমার ভয়ে তো ও এমন করল। সাহস করে বলতে পারল না- আমি ফেল করেছি। কারণ ও জানে, তাতুমকে সাহস দিয়ে তুমি বলবে না- ট্রাই ট্রাই ট্রাই অ্যাগেন। কিংবা একবার না পারিলে দেখ শতবার। সবাই পারে তুমি পারো না কেন? তোমার কাসমেটরা আশি, নব্বই একশ পায় তুমি তো ওদের ধারে কাছেও যেতে পারো না- এ কথাগুলোই তুমি বলো। বড় ভাইকে তো এ জন্য বাঘের মতো ভয় পায়। ভাবী জানো- এ সমস্ত তুলনা, এই যে তুমি কম্পেয়ার করো খুব খারাপ এসব।
চাচুর কথাগুলো শুনে বুকের ভেতর ওর অভিমানের পাহাড় গলে যেতে থাকে। সত্যি তুবড়ি চাচু সবুজ মানুষ। এ জন্য বাথরুমে দাঁড়িয়ে গোসলের সময় সে কাঁদে। কুঁকড়ে যায়। যেন চেনা জানা সবাই জিজ্ঞেস করার জন্য মুখিয়ে আছে- ও তাতুম, ও শহীন- তুমি নাকি বন্ধুদের সঙ্গে কম্পিটিশনে পেরে উঠছ না। অঙ্কে নাকি তুমি একদম কম নম্বর পাচ্ছ।
আসলে কোনো ব্যাপার নয় এটি। সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত। বাড়ির সবাই যে অন্যের সঙ্গে তুলনা করে করে ওর মনটাকেই ছোট করে দিয়েছে।- সে কথা একবারও ভাবে না কেউ।
আজকাল অবশ্য তাতুম ভীষণ আনন্দে রয়েছে, আম্মু বাড়িতে অঙ্ক শেখানোর জন্য একজন টিচার রেখে দিয়েছন, ভীষণ পছন্দ তাতুমের। ভার্সিটির ছাত্র, নামটা দারুণ- যুলকারনাইন। তাতুমের যুলকারনাইন স্যার।
স্যার আসার সময় হলে ব্যালকনির গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। নীলোফারকে বলে, আম্মু তুমি যে আমের পুডিং করো স্যারকে কিন্তু তাই দিয়ো- প্লিজ।
স্যার পড়াতে আসছেন- তাতুম দারুণ খুশি, এ যেন এক অদ্ভুত ব্যাপার। এর আগে দু’জন টিচার পড়াতে আসতেন, দু’দণ্ড সে চুপচাপ বসত না।
স্যার, ওয়াশরুম থেকে আসি, স্যার পানি খেতে যাই? কলমের কালি ফুরিয়ে গেছে- এভাবেই টিচারের কাছে যাওয়া-আসা করত। আম্মুকে বলত, তাড়াতাড়ি চা-নাশতা দিয়ে দাও স্যারকে। চলে যাক স্যার।
যুলকারনাইন স্যারের খুব প্রিয় হয়ে উঠেছে ও। চমৎকার সব কথা বলেন স্যার। একটুও বকুনি দেন না। কিছু ভুল করলে বকুনি না দিয়ে শুধরে দেন। বুঝিয়ে দেন, কেন ভুল হলো। সব সময় বলেন, চুপচপ বসে মাথা ঠাণ্ডা করে সংখ্যা লেখার কাজ হলো অঙ্ক। তুমি যদি ছটফট করো, রেস্টলেস হও তাতুম- তাহলে কিন্তু আর যাই হোক অঙ্ক হবে না। গুন গুন করে গান গাইতে পারবে, হেঁটে হেঁটে কবিতা আবৃত্তি করতে পারবে কিন্তু অঙ্ক হলো একঠায় বসে করার কাজ। মাথা ঠাণ্ডা করে চুপচাপ বসে মনোযোগ দিয়ে ভেবে ভেবে অঙ্ক কষতে হয়। স্যারের এ কথাতে ভীষণ প্রভাব পড়ছে তাতুমের ওপর। টেবিলে অঙ্ক খাতা আর বই রেখে- স্কুল খেলা সব কিছু ভুলে গিয়ে সে অঙ্ক কষে। এখন ভুল হয় ওর অনেক কম। ইমপ্রোভ করেছে খুব।
কী চমৎকার গল্প বলেন যুলকারনাইন স্যার।
– জানো কোনো এক দেশের রাজপুত্রের নাম ছিল টলেমি। রাজপুত্রদের জানো তো সব শিক্ষায় ওদের শিক্ষিত হতে হয়।
অস্ত্রবিদ্যা শিখতে হয়, যুদ্ধের কলাকৌশল শিখতে হয়।
– তারপর স্যার?
– সব কিছুতেই ওর উৎসাহ কিন্তু পড়ালেখাতে ওর কোনো উৎসাহ নেই। রাজার ছেলে, ও ভালো করে পড়াশোনা না করলে রাজ্য চালাবে কী করে? কিন্তু লেখাপড়া করতেই হবে। এসব ভেবে টলেমি গুরুকে জিজ্ঞেস করে, গুরুজী- পড়াশোনা করার কি সহজ উপায় আছে? সহজ উপায় মানে ইজি রাস্তা।
– সে তো বুঝলাম স্যার কিন্তু গুরু মানে?
গুরু মানে হলো টিচার, স্যার- বুঝতে পেরেছ?
তাতুম কৌতূহলে ফেটে পড়ে।
– পড়ালেখার কোনো সহজ উপায় আছে স্যার? গুরুজী টলেমিকে কী জবাব দিলেন? তাড়াতাড়ি বলুন স্যার।
মিটিমিটি হাসেন যুলকারনাইন স্যার।
– গুরুজী বলেন, নো প্রিন্স, সব কিছুর সহজ পথ আছে কিন্তু বিদ্যা অর্জনের কোনো সহজ উপায় নেই।
মাথা নাড়ায় তাতুম। সত্যিই তাই। এমনই ছোট্ট ছোট্ট গল্প বলে স্যার তার খুদে ছাত্রের মন কেড়ে নিয়েছেন।
তাতুমের এখন সবচেয়ে প্রিয় মানুষ যুলকারনাইন স্যার।

গল্প গল্প শুধু প্রিয় গল্প
ক’দিন থেকেই দাদী বলছেন সিলেট চলে যাবেন। আসলে বেশ কিছু দিন হলো তো। সেই যে তাতুমকে নিয়ে হেমন্তের এক সকালে ঢাকা এসেছিলেন আজও রয়ে গেছেন।
তিতলী-তাতুম তর্জনী তুলে শাসায়- খবরদার দাদী- যাবার কথা তুমি কক্ষনো বলবে না।
তিনিও মনের আনন্দে চালের গুঁড়োর মালপো ভাজেন, পাটিসাপটা ফিরনি তৈরি করেন। খিচুড়ি-ডিম ভুনা রাঁধেন আর বিরক্তিতে গজগজ করেন,- না না বউমা এইবার বাড়ি যামুগা। এ্যাই তুবড়ি আমারে সিলহট পৌঁছায়ে দে। কই রে জাদু (জাহিদের ডাক নাম) আমার যাইবার কথা হুনলেই তরা কিছু কস না। বোবায় ধরে নাকি তোগোরে। ঠা ঠা করে হেসে ওঠেন জাহিদ, যা তার স্বভাবে নেই। আম্মা, তুমি গেলে মজার খাবার রেঁধে কে আমাদের খেতে দেবে?
– ক্যান, বউমা আছে, রহিমা আছে।
– আম্মাগো- অফিসে গেলে মনে হয় কখন বাড়ি ফিরব। জানি তো আম্মা তুমি সারা টেবিলে কত পদ রেঁধে সাজিয়ে বসে থাকো। দ্যাখো না অফিস থেকে তাড়াতাড়ি চলে আসি।
তিতলী বলে, রোজ বিকেলে নতুন নতুন নাশতা, না হলে তো দাদীমা, পাউরুটি-ডিম-মাখন-জেলি রোজ খাই, তুমি এসেছ বলেই না কত রকমের পিঠে-ফিরনি হালুয়া খেতে পাচ্ছি। তুমি চামচ দিয়ে কী প্যাঁচ কষো গো দাদীমা- সব কিছুই মজাদার হয়ে যায়।
জাহিদ বলেন, আম্মা তোমার প্রিয় নাতিকে ডাকো, ও যদি তোমাকে যেতে দেয়, আমি বাধা দেবো না। সত্যিই তো সিলেটের বাসা খালি পড়ে আছে। রতন যা উড়নচণ্ডী, ও কি ভালো করে দেখাশোনা করবে। তিতলী তাতুম যাওয়ার পারমিশন দিলেই হলো।
দাদী চলে যাবে, দাদী বলে যাবে? বলতে বলতে হোমওয়ার্ক ফেলে ছুটে আসে তাতুম।
– দাদী তুমি চলে যাবে? তাহলে সকালবেলা কে আমাকে পরোটা করে দেবে? কে আমাকে রাজা-রানী আর ব্যাঙমা ব্যাঙমীর গল্প শোনাবে?
পানিতে ভেসে যায় মনোয়ারা বেগমের চোখ। নাতিকে বুকে জড়িয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠেন।
– ও আমার সোনারে, ও আমার পাইখ্যা রে। এমুন মায়া করলে আমি ক্যামনে যাই ক।
চোখ মুছে নীলোফার বলেন, ঠিক আছে আম্মা, বাড়িতে তো আপনার যেতেই হবে। আমরা আপনাকে ধরে রাখতে পারব না। তবে নাতির জন্মদিনে আপনাকে থাকতে হবে। না না বলতে পারবেন না। এই তো আর ক’টা দিন পর।
মনোয়ারা বেগম বলেন, ও তাতুম মিয়া, থাকুম তো কইলাম। এখন ছাড়। আর কান্দিস না, অনেক হইছে।
পারিবারিক আনন্দে সন্ধ্যার চায়ের আসরটি মনোরম হয়ে ওঠে। জাহিদ বলেন, ও বুয়া- আর এক রাউন্ড চা হয়ে যাক। আম্মা আরও কিছুদিন থাকবেন- সেলিব্রেট করব না?
মনোয়ারা বলেন, ও রহিমা চায়ের সাথে পাপড় ভাইজ্যা দিস। খালি চা খাওয়ন যায় না।
এ সময় আসেন যুলকারনাইন স্যার। প্রথম দিকে খুব মন খারাপ করত তাতুম। এখন বরং ভালোই লাগে। অঙ্কতে বেশ মন বসেছে। নতুন নতুন গল্প বলে স্যার পড়ান তো তাই দারুণ লাগে। আজকাল ভাবতে অবাক লাগে- একটি বাঁশের ২/১ অংশ সবুজ, ১/৫ অংশ হলুদ রঙ করা হয়েছে। ৩ মিটার বাঁশ রঙ করা হয়নি। সম্পূর্ণ বাঁশটির দৈর্ঘ্য কত?
খুব তো কঠিন নয় অঙ্কটি, এখন এক পলকেই সে করে নিতে পারে। অঙ্কের মজাটা বুঝিয়ে দিয়েছেন স্যার। পড়ার কামরায় বই-খাতা নিয়ে এসে তাতুম কাঁচুমাচু হয়ে বলে, একটি অঙ্ক করতে পারিনি স্যার। বড্ড কঠিন, কিছুতেই সলভ করতে পারিনি।
– ভেরি ব্যাড, বেরি ব্যাড। আমি তোমাকে শেখাইনি কবিতাটি- পারিব না এ কথাটি বলিও না আর। কেন পারিব না তাহা ভাব একবার।
জিভ কেটে তাতুম বলে, আই অ্যাম ভেরি স্যরি স্যার।
স্যার বলেন, কেউ যদি বলে তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না- তা কি ঠিক? তাতুম বলে, ইউসুফ স্যার আজ তাইতো বললেন আমাকে।
– বলেছেন বুঝি? তাহলে আজ অন্য একটি গল্প শোন। যুলকারনাইন গুছিয়ে বসে বলেন, গ্রেন ম্যাকগ্রাথের নাম শুনেছ তো?
– জি স্যার, খুব শুনেছি। ক্রিকেটার তো।
তার ছোটবেলায় ক্রিকেট দলের ক্যাপ্টেন কী বলেছিলেন তা জানো?
নীলোফার চা নাশতা নিয়ে এসেছেন।
– ছাত্রের সঙ্গে কথা বলে বলে গলা শুকিয়ে যা তোমার- তাই না যুলকারনাইন?
– না না, ভীষণ ভালো লাগে আমার তাতুমকে পড়াতে। ও ভীষণ ইনকুইজিটিভ। সব ব্যাপার ও জানতে চায়। খুব কৌতূহলী ছেলে।
স্যারের মুখের দিকে চোখের পলক না ফেলে তাকিয়ে থাকে সে। ম্যাকগ্রাথকে কী বলেছিলেন তার ক্যাপ্টেন? নীলোফার চলে গেছেন। মুখোমুখি টিচার আর ছাত্র।
চায়ে চুমুক দিয়ে যুলকারনাইন বলেন, ক্যাপ্টেন বলেছিলেন, তোমাকে দিয়ে সব হতে পারে কিন্তু বোলিং হবে না। তোমার যা টিঙটিঙে শরীর ম্যাকগ্রাথ তুমি সুইমিং করগে যাও।
সুইমিংয়ে কিছু করতে পারলেও পারো- ক্রিকেটে নয়।
অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে তাতুম। ক্রিকেটে উনি তো রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়েছেন।
স্যার বলেন, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে সবচেয়ে সফল বোলার বলে ডেনিস লিলিকে। গ্রেন ম্যাকগ্রাথ কিন্তু তাকেও ছাড়িয়ে গেছেন। ক্যাপ্টেনের কথা কি সত্যি হলো তাতুম?
না স্যার। বুকের ভেতর একরাশ জেদ খেলা করতে থাকে গল্পটি শুনে।
কেউ কিছু বললে আমি মেনে নেবো কেন? ইউসুফ স্যার তো লাল মানুষ। ট্রাফিক সিগন্যালের মতো লালবাতি জ্বালিয়ে শুধু বাধা দেন। আগে এসব কথা শুনলে খুব মনমরা হয়ে থেকেছি। খুব কষ্ট পেয়েছি। স্যার আসার পর বুঝতে পেরেছি- তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না। তুমি এক্কেবারে ডাল- এসব কথার কোনো মানে নেই।
যুরকারনাইন স্যার ওর চোখ খুলে দিয়েছন। স্কুলে শুধু ইউসুফ স্যার কেন, হুমায়ুন স্যারও তো বলেন, তোরা স্রেফ পেতল, কাঁসা নয়। কাঁসা হলো রাজীব, তানভীর, দিদার ওরা।
আর পিলুমামা? লন্ডন থেকে এসেছিলেন এই তো কয় মাস আগে। আম্মুর ছোটভাই। কী চমৎকার কথা বলেছিলেন উনি।
– শোন তাতুম, যারা শুধু আশি-নব্বই পারসেন্ট পরীক্ষার মার্কস দিয়ে ভাল-মন্দ বিচার করে ওদের কাছ থেকে দূরে দূরে থাকবে। পৃথিবীতে কত কিছু করার আছে। যার যা ভালো লাগে সে তাই করবে। যে যা করে আনন্দ পায়- সে তা করবে না? তবে হ্যাঁ- বেসিক পড়াশোনার প্রয়োজন।
-আমি, তাই পড়ি তো মামু।
– দ্যাটস ওকে ভাগ্নে।
যুলকারনাইন স্যার পিলুমামুর মতোই সবুজ এক মানুষ। গ্রিন সিগন্যাল দেন। সবুজ বাতি জ্বালিয়ে দেন। যেন বলেন, এগিয়ে যাও, সামনের দিকে এগিয়ে যাও। যাত্রা শুরু করাটাই বড় কথা।
যুলকারনাইন স্যার সন্ধ্যাবেলা পড়াতে এসে যখন বলেন, ফুটবলার ম্যারাডোনা, মেসি, কাকা আর ক্রিকেটের রিকি পন্টিংকে কেউ জিজ্ঞেস করবে নাকিÑ অঙ্কে জিরো না একশ পেয়েছ? টিচার আর ছাত্র একসঙ্গে ঠা ঠা করে হাসতে থাকে।

লাল মানুষ, বরফ মানুষ
দারুণ ঠাণ্ডা পড়েছে আজ। শৈত্যপ্রবাহ বইছে। হিল হিল করে হিমেল হাওয়া কাঁপিয়ে দিয়ে যায় তিতলী আর তাতুমকে। পৌষ মাস শুরু হয়েছে, এ সময় তো শীত পড়বেই। তবে শৈত্যপ্রবাহের জন্য এবারের শীত অনেক বেশি। চারদিকে পিঠে উৎসব হচ্ছে- খুব আনন্দ। কিন্তু এসব নিয়ে তিতলী-তাতুমের চলে না। সেই ভোরবেলা লেপের নিচ থেকে হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে ওঠে ওরা। তৈরি হয় স্কুলে যাবার জন্য।
জাহিদ সাহেব বলেন, সোয়েটারে এই শীত আটকাবে নাকি? ওর মামু যে ভারী জ্যাকেটটা দিয়েছেন সেটা পরিয়ে দাও। নীলোফার দোনামোনা করেন, ওদের স্কুল ড্রেস তো নীল রঙের সোয়েটার। অ্যাশ কালারের জ্যাকেটটা পরলে যদি টিচার মারধর করেন। যা ডিসিপ্লিন ওদের স্কুলে। এদিক-ওদিক হবার জো নেই।
তুবড়ি বলেন, এখন একটা অন্যরকম সময় ভাবী, দারুণ শীত। স্বাভাবিক সময় নয়। শীতের জন্য ভারী জ্যাকেট পরবে এর মাঝে ডিসিপ্লিনের কথা আসে কোত্থেকে?
সত্যি শীতের হাওয়া শরীরে যেন আলপিন ফুটিয়ে যাচ্ছে। নীলোফার নিজে ফুলহাতা কার্ডিগান পরেন। জড়িয়ে নেন মোটা শাল।
অন্য দিনের মতো তিতলী-তাতুম স্কুল থেকে ফিরে এল। নীলোফার ফিরে এসে সবাইকে খেতে ডাকলেন। বিকেলে ফিরে এলেন জাহিদ। মনোয়ারা বলেন, ও বউমা ছেলেকে একটু জিজ্ঞেস কইরো তো, সেই যে স্কুল থেইকা ফিইরা আইল মুখে আর রা নেই, বইনের সাথে ও কাইজ্যা করল না, কিছু কি হইছে?
বারবার জিজ্ঞেস করার পরও কিছুতেই তাতুম কথা বলে না। দাদী-তিতলী-আম্মু-তুবড়ি চাচু অনেকক্ষণ বলার পর বলল, স্কুলে আজ ইউসুফ স্যার খুব মেরেছে বেত দিয়ে।
– বলিস কী?
নীলোফার আঁতকে ওঠেন। বেশ মেরেছে কিন্তু কী জন্য? কী করেছ তুমি? মনোয়ারা বেগম ঝর ঝর করে চোখের পানি ফেলতে থাকেন।
– গায়ে হাত দেয়, এ ক্যামুন মাস্টার? পড়াইতে আইছে না মাইর করবার আইছে?
তুবড়ি চাচু বলেন, আহা কান্নাকাটি থামাও তো আম্মা। মারল কেন? নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে। তাতুম তুমি করেছটা কী বলো তো।
– মামুর দেয়া জ্যাকেটটা পরেছি তাই।
শীতের মাঝে জ্যাকেট পরে গেছ- শুধু এর জন্য? বাড়ির সবাই থ। ইউসুফ স্যার কী বরফ মানুষ? তার ঠাণ্ডা লাগে না?
স্কুলের সোয়েটারের রঙ নীল- এটার রঙ ছাই। তুমি ডিসিপ্লিন ভঙ্গ করেছ- তোমাকে শাস্তি পেতেই হবে।
সব শুনে জাহিদ সাহেব বলেন, পড়াশুনায় বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের আকর্ষণ এর জন্যই কমে যায়, বুঝলে আম্মা।
– তয় তরা স্কুলে যাবি না। জিগাইবি না?
– গিয়ে আর কী করব আম্মা। এত নামী স্কুল, কিছু বলতে গেলে টিচার যেকোনো ছুতোয় ওকে ধরে পেটাবে। এই হয়।
মনোয়ারা বেগম উঠে দাঁড়ান, যেন এই সন্ধ্যারাতেই স্কুল টিচারকে এক্ষুনি ধরে ফেলবেন।
– তরা না গেলে আমি যামু। টিচার ব্যাডায় দোষ করল আমরা কিছু বলুম না? এই জাদু, তুই চিরডাকালের ডরাইন্যা মানুষই রইয়া গেলি। অন্যায়ের সামনাসামনি হইতে ভয় পাস।
মিটিমিটি হাসে নীলোফার। আম্মা সত্যিই বলেছেন, তিতলীর আব্বু কিছুটা ভীরু। কোনো ঝুটঝামেলায় না গিয়ে সব কিছু মিটমাট করে ফেলতে চান।
– ক্যান, অন্যায় করলে রুইখ্যা খাড়াবি না? কোনো কথা বলবি না? মাইন্যা নিবি সব? তুই আমার পোলা না?
তিতলী খুব মজা করে বলে, তুমি ফুলন দেবী- তাই না দাদীমা? সবাই হেসে ওঠে।
জাহিদ বলেন, এবার থামো আম্মা। কালকে তোমার অনারেই যাব। নীলো, তুমি আমার সঙ্গে যেতে পারো।
তিতলী ফোঁড়ন কাটে,- ইয়ে হুয়ি না বাত।
টিভি দেখে দেখে ও হিন্দিটা বেশ রপ্ত করে ফেলেছে। সময় বুঝে বলে ওঠে। সবাই উপভোগ করে ওর কথা।
বিছানায় শুয়ে নীলোফার বুকের ভেতরটা টনটন করে ওঠে। তিন চার দিন পর ওর জন্মদিন। কত কিছু ভেবে রেখেছে সে। সবাই মিলে দারুণভাবে উপভোগ করবে ওর জন্মদিন। ঘুম থেকে উঠেই ছুটোছুটি। ভাল করে গুছিয়ে বসে একসঙ্গে সবাই মিলে আনন্দ হয় না কতদিন। তার মাঝে এই?
ইউসুফ স্যার খুব পিটিয়েছেন; কিন্তু সত্যিই তো তাতুমের কোনো দোষ ছিল না। হিল হিল করে শীতের হিমেল বাতাস বয়ে যাচ্ছে ক’দিন থেকে। জ্যাকেটটা না হয় ছাইরঙা ছিল। তাতে তো এমন কিছু অপরাধ হয়নি। কী করে অবুঝ-অবোধ ছেলের গায়ে হাত তুলতে পারলেন স্যার?
এই তো মাস দু-এক আগে কাস টেস্ট পরীক্ষায় শূন্যের পাশে এক বসানোর ফলে রেগেমেগে কী কাণ্ডটাই না করলেন ওর আব্বু। ছোট বাচ্চাটার মনের ওপর কম চাপ তো পড়েনি।
রাতের অন্ধকারে দুষ্টু ছেলেটার জন্য অনেকক্ষণ ধরে কাঁদতে থাকেন নীলোফার।
নীলোফার তাতুমের স্কুলে এলেন। অনেক মায়েরা বসে থাকেন স্কুলে। কলেজে চাকরির দরুন সেটা তো আর হয় না। আজ অনেকদিন পর স্কুলে এসে বড় অসহায় লাগে। জাহিদ তেমন কথাবার্তায় পটু নন, তাছাড়া এমন ঘটনায় নিজেও খুব বিব্রত। একটু পরেই আরও গার্জিয়ান এসে শামিল হলেন ওদের সারিতে।
যারা রোজ ছেলেদের সাথে আসেন ওরা দেখেছেন, সবসময় গায়ে হাত তোলেন ইউসুফ স্যার। শৈত্যপ্রবাহের জন্য ছেলেরা যদি লাল-সবুজ-হলুদ জ্যাকেট পরে আসে- তাতে কি স্কুলের ডিসিপ্লিন সব ভঙ্গ হয়ে গেল? টিচারের নামে হেডমাস্টারের কাছে কমপ্লেন করব ভেবে এতদিন করিনি। কিন্তু দিন দিন উনার মারপিট বেড়েইে চলেছে।
নীলোফার অন্যদের সঙ্গে হেডমাস্টারের কেবিনে গিয়ে বললেন, স্যার- আপনারা তো ছাত্রদের দ্বিতীয় প্যারেন্ট। স্কুলে আপনারই আব্বু-আম্মু। শাসন করুন, বকুনি দেন ঠিক আছে- প্লিজ গায়ে হাত দেবেন না।
হেডমাস্টার স্যার সুন্দর গলায় বলেন, আপনারা সন্তানদের পাঠান পড়াশুনা করতে, মার খেতে নয়। আই অ্যাম ভেরি স্যরি। আই অ্যাম অ্যাপোলাইজেজ টু অল। আপনাদের সকলের কাছে ক্ষমা চাইছি। ইউসুফ সাহেব আপনি যা করেন তা কি ঠিক?
গার্জিয়ানরা অভিভূত হয়ে গেলেন হেডমাস্টার স্যারের চমৎকার এই ব্যবহারে। আসল মানুষ ইউসুফ স্যার মাথা নিচু করে মৃদু স্বরে বলেন, আমি দুঃখিত। এমনটা আর হবে না। বেরিয়ে আসার মুখে নীলোফার ইউসুফ স্যারের কাছে আসেন।
– স্যার, একটা রিকোয়েস্ট আছে।
– রিকোয়েস্ট? কী বলছেন অনুরোধ? আমার কাছে?
অপরাধীর মতো মলিন মুখে দাঁড়িয়ে থাকেন ইউসুফ স্যার।
– স্যার পরশু আমার ছেলের জন্মদিন। শাহীন আহমেদ। তাতুম বলেই সবাই জানে। সন্ধ্যায় যদি আপনি আসেন স্যার, দোয়া করে যাবেন ছেলেকে। এ সেকশনে পড়ে ও, নিশ্চয়ই চেনেন আপনি।
অভিভূত ইউসুফ স্যারের হাতে জাহিদ নিজের ভিজিটিং কার্ড দিলেন। বাড়ির লোকেশনটা ঠিকমতো বুঝিয়ে দেন।
– ঠিকানা লেখা আছে। কোনো অসুবিধা হবে না আপনার।
বুকের ভার অনেকখানি নেমে গেল দু’জনের। নীলোফার কলেজে চলে যান। জাহিদ অফিসে।
সন্ধ্যায় ফিরে জাহিদ বলেন, আম্মা তোমার জন্যই শুধু তাতুমের স্কুলে আজ গেছি। কক্ষনো যাইনি আমি।
– ক্যান- যাবা না ক্যান? নিজের পোলারে মাইনষে ধইরা ঠাঙ্গাইবো। তুমি প্রতিবাদ করবা না? অন্যায়ের কোনদিনও প্রশ্রয় দেবা না, অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করবা।
তিতলী বলে, আব্বু তোমার আম্মা কতো স্মার্ট, কিছুতেই ভয় পায় না। অন্যায় দেখলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তুমি এতো ভয় পাও কেন আব্বু? মায়ের কোনো গুণ তুমি পাওনি বুঝি!
তুবড়ি চাচু বলে, এটা হলো যার যার নেচার। তোর আম্মুতো সব কিছু সামলে নেয়। তাই তোর আব্বু এমন।
নীলোফার বলেন, বাজে কথা ছেড়ে এবার তাতুমের জন্মদিনের মেন্যু ঠিক করো। আম্মা- এবার আপনি বলে কী কী আইটেম হবে সেদিন। আমি ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে একসঙ্গে কেনাকাটা করে নিয়ে আসব। তিতলী আর তুবড়ি চাচু ঘর সাজাবে। কেকের অর্ডার দেবেন জাহিদ।
বুয়া বলল, রান্ধন-বাড়ন এইবার আম্মায় করব।
জাহিদ মৃদু ধমক দিয়ে বলেন, রাঁধবে কি রে আম্মু হলো হেড কুক। কিভাবে কী করতে হবে আম্মা বলে দেবেন আর তুমি, নীলো, নওশীন সবাই কাজ করবে। আম্মা দেবেন ইনস্ট্রাকশন। তাতুম দারুণ খুশি।
– ইসস্ নওশীন খালা আসবে? ফ্যানটাসটিক ব্যাপার! তাতুমের জন্মদিনের আনন্দে সবাই বিভোর হয়ে যায়। সব কিছুই এখন ভালো লাগছে ওর। সত্যি- পিলু মামু ঠিক কথাই বলেন- জীবনে উৎসবের প্রয়োজন রয়েছে।

জন্মদিন ও উপচে পড়া আনন্দ
শীতের সন্ধ্যে ভীষণ ঝলমল করছে। তাতুমের জন্মদিন মুঠো মুঠো আনন্দ বয়ে নিয়ে এসেছে। বাইরের কাউকে বলা হয়নি। ঘরোয়া উৎসব। সবাই মিলে পারিবারিকভাবে আনন্দে কিছুটা সময় কাটানো।
জাহিদের দু’চারজন কলিগ এসেছেন। নীলোফারের দু’জন ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। রুবি আন্টি আর চৈতী আন্টি, নওশীন খালা, তাতুমের কাসের বন্ধু ক’জন।
হঠাৎ করে ওর সেই আঁধার কালো দিনটির কথা মনে পড়ে। কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে তুবড়ি চাচুর সঙ্গে গাড়িতে চড়ে বসা। সত্যি, কখনও জেনে শুনে অন্যায় করতে নেই, মিথ্যে বলতে নেই- এ শিক্ষাই পেয়েছে সেদিন।
রঙিন কাগজের শিকলে অন্যরকম হয়ে উঠেছে চেনা ড্রয়িংরুমটি। মেঝেতে নানা রঙের বেলুন। ওগুলো ডিঙিয়ে হাঁটছে বন্ধুরা।
নকশা করা পেয়ালায় গরম কফি নিয়ে এসেছে একজন। ওমা, ও আমাদের বুয়া নাকি? রহিমা খালা, কী চমৎকার পাটভাঙা শাড়ি পরেছে ও। মাথায় তেল দিয়ে পরিপাটি খোঁপা বেঁধেছে। মুখভরা পান। চমকবাহারের মিষ্টি গন্ধে ভুরভুর করে ঘর। সত্যিই, দারুণ আজকের সন্ধ্যা।
তাতুম বন্ধুদের সাথে সাপলুডো খেলতে বসেছে। কেক-এর চারপাশে মোমবাতি সাজানো। কেককাটার ছুরিতে ভেলভেটের ফিতে বাঁধা। সব কিছু রেডি করা।
মনোয়ারা বেগম বলেন, ও বউমা- কেকটা কেটে ফেলুক না। মোমবাতিগুলো জ্বালিয়ে দাও।
নীলোফার স্নিগ্ধ সুরে বলেন, একজন আসবে আম্মা। চিফ গেস্ট- প্রধান অতিথি।
তিতলী বলে, কে আম্মু? বলো না প্লিজ।
নীলোফার মুচকি হেসে বলেন, আহ তিতলী, এখন বলা যাবে না।
সারপ্রাইজ তো। তাতুম আর ওর বন্ধুরা অবাক হয়ে যাবে। এত আনন্দ হাসি গানের মাঝেও উৎসুক হয়ে রইল তিতলী আর তাতুম। যুলকারনাইন স্যার এলেন। উনি তো পরিবারের একজন হয়ে গেছেন। আলাদা কেউ নন, অবাক হবারও কেউ নয়। তাহলে মানুষটা কে?
রাংতায় মোড়ানো বড়-ছোট অনেক গিফট টেবিলে জমেছে। তুবড়ি চাচু ক্যাডবেরি-কিটক্যাট আর সিনেকার এনেছেন এক গাদা। আজ ওসব খেতে কোনো মানা নেই।
– দাঁতে পোকা ধরবে, এত মিষ্টি খাস না- জন্মদিনে এমন কথা কেউ বলবে না।
এই স্বাধীনতা পেয়েছে বলেই যা ইচ্ছে তা করতে নেই। তাতুম থমকে যায়। কিছু বন্ধুদের দেব, কিছু তিতলী আপুকে আর কিছু জমিয়ে রাখব, আম্মু-আব্বু কিছু বলবে না বলে সব কিছু শেষ করবে না। ড্রয়ারে জমিয়ে রাখব আমি- মনে মনে বলে ও।
নীলোফারকে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে- আম্মু আমার প্রিয় গানটি বাজাব আজ? বন্ধুরা শুনবে।
চোখে ফিনকি দিয়ে পানি ছড়িয়ে যেতে চায়। সত্যি মা হয়েছি বলেই কি ছোটদের মনের অলিগলি আমরা বুঝি? ওদের কী করতে ভালো লাগে, কী চায় ওরা কিছুই আমরা ভাবি না। মায়েদের আরও ভালো করে বুঝতে হবে সন্তানদের। ঝমঝম করে ব্যান্ডের গান বেজে ওঠে-
‘চাইতে পারো জোছনা কুয়াশা ঢাকা
চাইতে পারো ঘরের সিলিং-এ সন্ধ্যাতারা-
ওদের নাচ-গানের মাঝে মনোয়ারা বেগম এসে বলেন,
ওই বেক্কল, ঘরের সিলিং-এ কি সন্ধ্যাতারা ওঠে?
– ওঠে ওঠে দাদীমা, তুমি দেখতে পাও না।
গানটা তো বেশ মজার, অদ্ভুত কল্পনার গান। জাহিদ আর নীলোফার একদিন বাইরে গিয়েছিলেন, ভাইবোন মিলে গানটি বাজিয়েছিল, ডোর বেল বাজতেই,
– আব্বু-আম্মু এসেছে, বলেই অন্য গানের সিডি চালিয়েছে ওরা। মা-বাবা ঘরে ফিরে শুনলেন – আমরা সবাই রাজা, মেঘের কোলে রোদ হেসেছে বাদল গেছে টুটি-
কেন ওরা আমরা এসেছি বলে গান পাল্টে নিল? মনোয়ারা বেগম সেদিন বলেছেন, বউমা ওরা তোমাদের ভয় পায়, ওরা মা-বাবাকে ভালোবাসবে না! তোমরা খালি শাসন করো, এইডা করিস না, ওইডা করিস না। আরে বাবা- এর জন্যই তোমাগো কাছ থাইকা সব লুকায়।
ওরা তোমাগো ভয় পায়। ভালবাসে কম, ভয় পায় বেশি। সত্যি তাই। আম্মা পুরনো দিনের মানুষ, অথচ কত বোঝেন উনি।
গান বাজছে-
চাইতে পারো আমার লেখা সবগুলো গান
চাইতে পারো ওয়ান-ডে ম্যাচে সাড়ে চারশ রান।
জাহিদ বলেন, কী চমৎকার গান, দারুণ লিখেছে তো।
যুলকারনাইন স্যার র‌্যাপিং করে বই নিয়ে এসেছেন। একটা একটা করে সবগুলো পড়ব- এ কথা ভেবে আনন্দের সাগরে ভাসতে থাকে তাতুম, উফ কী আনন্দ আজ।
– এই যে এসে পড়েছেন তোমাদের প্রধান অতিথি তাতুম।
ওমা- এ যে ইউসুফ স্যার! কাস ফাইভ থেকে টেন পর্যন্ত ছাত্ররা যাকে বাঘের মতো ভয় পায়। এসেই ঘোষণা দেন দরাজ গলায়- কী করছ তোমরা? কেক কাটার পর স্নেক লুডো খেলবে?
দারুণ তো। আমিও খেলব তোমাদের সঙ্গে।
তাতুম ভাবে, আমার চারপাশের মানুষরা অদ্ভুত তো! ও মনে মনে ওদের ভাগ করেছিল দু’ভাগে। কেউ সবুজের দলে- যারা ভালো। যাদেরকে তাতুম ভয় পায় না, শুধুই ভালবাসে। যাদেরকে ভয় পায়, যারা শুধু শাসন করেন, যাদের কাছে সব কিছু লুকাতে হয়- তারা লাল মানুষ। আজ এই সন্ধ্যায় দু’দলের সব মানুষ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
অনেক হাততালির মাঝে মোমবাতির স্নিগ্ধ আলোয় তাতুম অনুভব করে সবাই বদলে যাচ্ছে। সবুজ হয়ে যাচ্ছে- কেউ আর লাল নেই।
স্যারের সাথে এককোণে বসে সাপলুডো খেলতে খেলতে তাতুমরা মেতে ওঠে। এক সময় তানভীর বলে ওঠে, না স্যার আপনি চিটিং করতে পারবেন না, সাপের মুখে পড়েছেন, স্ট্রেইট লেজের কাছে নেমে আসতে হবে। নো ছাড়।
ইউসুফ স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে জিভ কাটে সবাই। তানভীরের মুখ একেবারে ফ্যাকাসে।
স্যার ছেলেদের পিঠে আদুরে হাত বুলিয়ে বলেন, খেলায় সব চলে মাই ডিয়ার স্টুডেন্টস।
এবার খাবার পালা, ডিনারে বসতে হবে। জাহিদ বলেন, শীতের রাত ন’টা কম নয়। যা ঠাণ্ডা তাড়াতাড়ি খাবার সার্ভ করো।
দাদীমা ঝটপট সব গুছিয়ে দিচ্ছেন, নওশীন খালা, নীলোফার, বুয়া, তিতলী আপু টেবিলে গুছিয়ে রাখছে। খাবারের সুগন্ধ একেবারেই অন্যরকম জিভে পানি এসে যায়।
তিন-চার দিন থেকে দাদীমা বুয়াকে নিয়ে কত রকমের মসলা বানিয়েছেন। ইসস্ আজকের এই সন্ধ্যায় ঋতমটা এলে বেশ হতো।
এই মুহূর্তে হঠাৎ করে রাজপুত্র টলেমির কথা মনে পড়ে। তাতুমের গুরুজী বলেছিলেন, লেখাপড়ার কোনো সহজ পথ নেই প্রিন্স। ওর মনে হয়, রান্নারও বোধ হয় কোনো সহজ পথ নেই। যে কোনো কাজ ভালো করে করতে হলে পরিশ্রম করতে হয়।
নীলোফার বারবার আনমনা হয়ে যান। বলেন, আর দশ মিনিট অপেক্ষা করলে হয় না?
মোবাইলে কাকে যেন ফোন করেন নীলোফার।
– কেউ আসবে নাকি আন্টি?
তিতলী বলে, – কাউকে বলেছ নাকি আম্মু? ন’টা বেজে গেছে, আর হয়তো আসবে না।
– আসবে, আসবে।
ঠিক সে সময় অসুস্থ মায়ের হাত ধরে রিকশা থেকে নামে ঋতম।
– ঋতম, মাই ফ্রেন্ড- ওয়েলকাম, ওয়েলকাম।
এবার যেন নীলোফার ও তাতুমের আনন্দ পূর্ণ হলো।
ঋতমের আম্মার প্লেটে দাদীমা যত্ন করে চপ তুলে দেন। বুয়াকে ডেকে বলেন, রহিমা, ছোট ডেকচিতে বাসমতি চাইলের সাদা ভাত পাক কইরা থুইছি- নিয়া আস, উনি অসুস্থ মানুষ, পোলাও দেওয়ন চলব না।
খেতে খেতেই ছুটে আসে তাতুম।
– আম্মু, ঋতমকে তুমি আসতে বলেছ। থ্যাংক ইয়ু আম্মু। সহজ গলায় নীলোফার বলেন, হ্যাঁ আসতে বলেছি। ওর আম্মা অসুস্থ, ছেলের দেখাশোনা করতে পারেন না। আব্বু তো ট্যুরেই থাকেন। এমনিতে ও খারাপ ছেলে নয়। সে তো গুড বয়, ব্যাড বয় নয় তাতুম। একটা দোষ করলেই মানুষ খারাপ হয়ে যায় না।
– আব্বু তো ঋতমকে বলতে মানা করেছিল আম্মু।
স্নিগ্ধ সুরে নীলো বলেন, ভালো কাজ করতে গেলে সব সময় সবার কথা মেনে চলতে হয় না। তা না হলে তুমি ভালো কাজ করবে কেমন করে? যাও, খেতে যাও বন্ধুদের সঙ্গে।
ছেলেবেলার দিনগুলো একটুও নষ্ট করবে না, এনজয় করো। দিনগুলো আর ফিরে আসবে না। এনজয় ইয়োরসেলফ।
আম্মুর গলা কি ছলোছলো হয়ে এল? তার মেয়েবেলার জন্য বুকের ভেতরটা আম্মুর কাঁদে?
এক সময় নীলোফার ডেকে বলেন,
চাইতে পারো ওয়ান-ডে ম্যাচে সাড়ে চারশ রান- গানটি জোরে দাও তো, সবাই শুনি।
খাওয়া শেষ করে যাবার বেলা সবাই দাদীমাকে ঘিরে ধরে। এ যেন তাতুমের সাথে দাদীমারও জন্মদিন- বার্থডে পার্টি।
– কী চমৎকার খেলাম আন্টি। খাবারের রেসিপিটা বলবেন!
– এমন রান্না খালাম্মা অনেকদিন খাইনি।
– কী যত্ন করে ভালোবাসা মিশিয়ে রেঁধেছেন। তাইতো এমন অপূর্ব হয়েছে। আমরা তো ছুটোছুটির মাঝে থাকি। দায়সারা কাজ করি। খালাম্মার মতো এমন যতœ করে তো রাঁধি না।
মধুর এই জন্মদিনের উৎসব শেষ হয় এক সময়।
বাড়িটি ফাঁকা হয়ে যায়। মেঝের বেলুনগুলো পায়ের ছোঁয়া লেগে হাওয়ায় ওড়ে। রঙিন কাগজের শিকলগুলো দোল খেয়ে যায়। কেক- পোলাও-বাদাম-ঘি-কোরমার সুগন্ধে ভরপুর হয়ে আছে গোটা বাড়ি। দারুণ একটা শীতের রাত।
নিজের ঘরে এসে শুয়ে থাকে তিতলী ও তাতুম। আপু ঘুমোয় কিন্তু তাতুম চেয়ে থাকে কাচের জানালা দিয়ে দূরের আকাশের দিকে। কত তারার মেলা। যুলকারনাইন স্যার বলেছেন, পাইন জাতীয় এক ধরনের গাছ আছে, জিমনোস্পার্ম ওর নাম। মাটি থেকে একশ-দেড়শ ফুট ওপরে ওঠে যায় এক মুঠো আলোর জন্য।
তাতুমও জিমানোস্পার্মের মতো অনেক দূরে যাবে। বহু দূরের ঐ তারার দেশে। অকারণেই চোখ ওর পানিতে ভিজে যায়।

মুখোমুখি মনোয়ারা বেগম ও তাতুম
– তুমি ওসব কী করছ দাদীমা?
ডাইনিং স্পেসের ফাঁকা জায়গায় বসে মনোয়ারা বেগম সাদা কাপড়গুলো গুছাতে বসেছেন।
গম্ভীর গলায় দাদী বলেন, আজ দুপুরের ট্রেনে যে সিলেট যাব দাদু।
– তুমি চলে যাবে দাদীমা? হাহাকার ঝরে পড়ে তাতুমের কথায়।
আজ শুক্রবার সবাই বাসাতেই আছে।
জাহিদ বলেন, আম্মা আবার আসবেন। প্রমিস করেছেন।
তুবড়ি চাচু বলেন, এতে কান্নার কী আছে বোকা ছেলে!
নীলোফার ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, তোমার দাদীমার যাওয়া তো আবার ফিরে আসার জন্যই। না গেলে ফিরে আসবেন কী করে? তাই না আম্মা?
– গেলে আবার ফিরে আসবেন দাদীমা, আবার আসবেন। ফাইভে পড়–য়া তাতুম দাদীমার গলা জড়িয়ে ধরে।
– তুমি আবার এসো দাদীমা!

SHARE

Leave a Reply