Home গল্প মুন্না ও কাকের গল্প

মুন্না ও কাকের গল্প

সোলায়মান আহসান….

সকালে কাকের ডাকে একটু অবাক হয় মুন্না। অনেক দিন কাকের ডাক শোনেনি। এক সময় ঢাকাকে নাকি কাকের শহর বলা হতো। এমনিতে খুব ভোরে পাখির ডাকাডাকি বেশ শোনা যায়। মুন্নাদের বাসা মিরপুর। পল্লবীতে। মানে মিরপুরে প্রান্ত সীমায়। মিরপুর একটা বর্ধিষ্ণু জনপদ। তবে এখানে বোটানিক্যাল গার্ডেন। চিড়িয়াখানা চন্দ্রিমা উদ্যান ইত্যাদি বিশাল বিশাল সবুজের উদ্যান এবং ফাঁকা স্থান থাকায় প্রাকৃতিক পরিবেশ অনেকটা ভালো। এ ছাড়া প্যারেড স্কোয়ার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও জিয়ার মাজারকেন্দ্র্রিক উদ্যান ও সংসদ ভবনের আশপাশের ফাঁকা স্থানগুলো মিরপুরে পরিবেশকে রেখেছে এখনো সুন্দর ও সুস্থ।
মুন্নার কাছে পাখি একটা প্রিয় প্রাণী। পাখি পোষার শখও তার খুউব। কিন্তু সে শখ পূরণের জন্য তেমন কিছু করতে পারেনি। শুধুমাত্র কয়েকটা শালিক, একটা ময়না, একটা কাকাতুয়া ব্যস। পাখির দাম অনেক। এতো টাকা পাবে কোথায় সে। ইচ্ছে আছে বড় হয়ে আয় করে একটা পাখির চিড়িয়াখানা গড়ে তুলবে।
মুন্না আজ কয়েকদিন ধরে স্কুলে যাচ্ছে না। অসুস্থ। প্রথমে সাধারণ জ্বর ভেবে ডাক্তার ওষুধ দেন। তিনি-চার দিন পর ডাক্তার জ্বর না কমায় দিলেন রক্তের পরীক্ষা। পরীক্ষায় তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। অথচ জ্বর তার নামছে না। রাতে এবং দুপুরে জ্বর বাড়ে। জ্বরের চার্ট রাখতে বলছেন ডাক্তার। সেভাবে প্রতি ঘণ্টায় জ্বর মাপা হয়। লিখে রাখা হয় একটা ডায়েরিতে। এ কাজটা বেশির ভাগ আপু করে থাকে।
: কিরে মুন্না কেমন আছিস?
অর্থি মুন্নার ঘরে ঢুকতে ঢুকতে জিজ্ঞাসা করে। অর্থি মুন্নার জ্বর মাপতে এসেছে।
: ভাল না, কতো দিন হয়ে গেল স্কুলে যাই না, বাইরে বেরুতে পারছি না- আপু, আজ সকাল থেকে কাকের ডাক খুব শুনছি- তুই শুনেছিস?
: কাকের ডাকতো শোনা এমন নতুন কিছু না-
: দেখ, আমি লক্ষ করেছি ঢাকায় অনেকদিন কাকের ডাক শুনতে পাওয়া যায়নি।
: কী যে বলিস মুন্না, সেদিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে গেলাম, সেখানেও তো দেখলাম কাককে। কা-কা করছে।
: কিন্তু আমি অনেক দিন কাকের দেখা পাইনি, ডাকও শুনিনি। এক সময় ঢাকাকে কাকের শহর বলা হতো।
: তো কাকের প্রজš§ রক্ষা কমিটি করে কাক পালার কর্মসূচি নিয়ে ফেল।
: দেখ আপু কাক কিন্তু আমাদের পরিবেশের বন্ধু-
: বন্ধু! ঐ আগলি পাখিটা!
: আপু, আগলি হলেই কি ঘৃণা করতে হবে! মানুষের মধ্যে অনেক আগলি ম্যান পৃথিবীতে অনেক অবদান রেখে গেছেন এবং রাখছেন না?
: অস্বীকার করছি না, কিন্তু কাক শুধু আগলিই নয় স্বভাবও আগলি।
: যেমন-
: যেমন কাকের ডাকাডাকি কর্কশ, কাকের নোংরা-আবর্জনা খাওয়া স্বভাব, মোটকথা কাক মোটেই পাত্তা পেতে পারে না মনুষ্য সমাজে।
: শেষের কথাটা আপত্তিকর তোর। মনুষ্য সমাজে কাকের চেয়ে নিকৃষ্ট মানুষের স্থান হতে পারে, আর মনুষ্য সমাজকে বসবাসের জন্য উপকারী পাখির স্থান হবে না?
: কাক উপকারী পাখি।
: অবশ্যই। আগে আমাদের জেলা বর্জ্য অকেনটাই কাকেরা সাবাড় করতো। তাতে পরিবেশ রক্ষায় সহায়তা হতো। এখন কাকেরা তেমন নেই, তাই আমাদের পরিবেশও নোংরা।
: তোর কথা একদম মানলাম না। আমাদের পরিবেশ নোংরা এ জন্য আমরা যেখানে সেখানে ময়লা ফেলি। ময়লা সাফ করার জন্য যাদের দায়িত্ব তারা সে কাজ করছে না।
: কাক অনেক পোকা-মাকড় খেয়ে থাকে, তাতেও আমাদের পরিবেশের উপকার হয়, কিন্তু সেই কাক না থাকায়-
: বুঝেছি অনেক অসুবিধা, এবার লক্ষ্মী ছেলের মতো মুখটা বন্ধ কর-
অর্থি থার্মোমিটারটা ঝাড়া দিয়ে মুন্নার মুখে পুরে দিলো। টেবিলে ছিল একটা ঘড়ি, সেদিকে দৃষ্টি দিলো সে।
নিনিমেষ তাকিয়ে রইলো ঘড়ির দিকে। সেকেন্ডের কাঁটা টিক টিক টিক করে ঘুরে এলো একবার। মুন্নার মুখ থেকে বের করে আনলো থার্মোমিটারটা। দেখলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে থর্মোমিটারটা।
: কত আপু?
: একশ এক। জ্বর যাবে কিভাবে, জানালা খুলে ঠাণ্ডা বাতাস লাগাও বেশি করে।
: জানালা খুলে আমি আকাশ দেখছিলাম, পাখি দেখছিলাম, ঘরবন্দী হয়ে থাকতে ভাল লাগে? আর যেদিন ডাক্তার আংকেল বললেন, ‘বাইরের বায়ু বাড়ায় আয়ু’-
: তাই বলে তোর মতো জ্বরো শরীরের জন্য ঠাণ্ডা বায়ু কমায় আয়ু হি–হি–হি।–
অর্থি মুন্নার কথার মোক্ষম জবাব দিতে পেরে খুশি।
অর্থি কাস এইটে পড়ে। মুন্না ফাইভে। কিন্তু জ্ঞানের দিক দিয়ে মুন্না কখনো তাকে ছাড়িয়ে যায়। পড়াশোনা করে।
আউট বইয়ের প্রতি ঝোঁক। বিশেষ করে পাখি, প্রকৃতিবিষয়ক বই, সাধারণ জ্ঞানের বই পড়ে থাকে। টিভিতে বিজ্ঞান, আবিষ্কার, ওয়াইল্ড লাইফের ওপর ডকুমেন্টস প্রোগ্রাম সে মনোযোগ দিয়ে দেখে।
: মুন্না ভাইজান আপনার দুধ।
কাজের বুয়া আকলিমা এক মগ দুধ খাটের সাইড টেবিলে রেখে গেল। সকালে নাস্তার পর এক ঘণ্টা বাদ এই দুধ তার জন্য বাধ্যতামূলক। দুধ তার মুখে বিস্বাদ লাগে। জ্বরো মুখে সব কিছুই বিস্বাদ লাগে। কিন্তু উপায় নেই খেতেই হবে।
: আব্বু কেমন আছো?
সকালে স্কুলে গিয়েছিল আম্মু। স্থানীয় একটা নামী-দামি স্কুলের টিচার আর আম্মু মিসেস নাসরিন চৌধুরী। সম্ভবত ছুটি নিয়ে চলে এসেছে। ছেলে গায়ে হাত রেখে দেখল। ভ্রু কুঁচকে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলো। মানে জ্বর আছে।
: দুধটা খাওনি কেন আব্বু?
: মাত্র দিয়েছে।
: নাও, আমি খাইয়ে দিই।
মা নাসরিন মগটা হাতে নিয়ে মুন্নাকে খাইয়ে দেন। আজ তোমাকে আরেক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো। তোমার বড় মামার বন্ধু। কিছুদিন আগে গ্লাসগো থেকে ফিরেছেন। মস্ত ডিগ্রি নিয়ে।
: কখন যাবো আম্মু ?
: তোমার আব্বু ফিরলেই। তোমার আব্বু দুটোর মধ্যে ফিরবেন। আমরা তিনটের মধ্যে রেডি হয়ে বের হবো।
: অর্থি-অর্থি-
নাসরিন ডাকতেই অর্থি এসে হাজির। অর্থি জানে কি জন্য তাকে ডাকা হয়েছে। জ্বরের চার্টটা এগিয়ে দেয় আম্মুর দিকে।
নাসির গভীর মনোযোগ দিয়ে জ্বরের চার্টটা দেখতে থাকেন। চিন্তিত মুখে বলে- হুম! জ্বর তো নামছে না। একই ধারায় আছে।
নাসরিন চলে গেলে অর্থি মুন্নার বিছানায় বসে।
: আপু, কাকেরা না খুব বুদ্ধিমান পাখি। আমার তা মনে হয় না।
অর্থি সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁট উল্টিয়ে মুন্নার কথার জবাব দেয়।
: আপু, তাহলে শুনবি একট গল্প? আমাদের দেশের একজন পাখি বিশারদ লিখেছেন। গল্পটা সুন্দরবনের। একজন বাওয়ালি বাঘের খপ্পরে পড়েছে। বাঘের খপ্পরে পড়া মানে তো বুঝিসÑ জীবন শেষ। কিন্তু ঐ বাওয়ালির ছেলে বালক বাওয়ালি তার বাবার লাশ চায়। বাস সাধারণত মানুষকে শিকার বানালেও পুরোটা খায় না। তাই দশজন বাওয়ালি এগিয়ে চলেছে হুদোবন ঠেলে। লাশের খোঁজে। সবাই সতর্ক। কারো হাতে গোলপাতা কাটা দা। কেউ নিয়েছে সুন্দরী ডালের লাঠি। কেউবা নৌকার বৈঠা। রক্তের চিহ্ন নেই। বাঘের পায়ের ছাপও ফোটেনি। আন্দাজে এগুচ্ছে ওরা। জঙ্গল এমনই ঘন যে রোদ পড়তে পারে না। হুদোবনের চারপাশ ঘিরে বড় বড় সুন্দরী গাছের ঠাস বুনুনি।
: হয়েছে এতো বর্ণনা দিতে হবে না কাকেরা কী করল সেটা বল?
: বলছি আপু, গল্পটা কোন পরিবেশের তা না বললে বুঝবি কেমন করে। আর মজাও পাবি না। সেই বাওয়ালি দলটি বনের ভেতর বহুদূর গিয়েও যখন লাশের হদিস পেলো না তখন ফেরার পালা। অথচ বালক বাওয়ালি বারবার কেঁদে কেটে বাবার লাশ চায়। কিন্তু এই গহিন অরণ্যে চিহ্ন ছাড়া কি লাশ খুঁজে পাওয়া যায়? কিন্তু বালক বাওয়ালি আকাশ ফাটানো কান্না জুড়ে দিলো। বাবার হাত ধরে সে সুন্দরবনে এসেছিল। দা হাতে সেও ছিল এই দলে। কাঁদছে তো কাঁদছেই। হাড় গোড় পেলেও সে বাড়ি নিয়ে গিয়ে কবর দিতে পারবে।
: আহহা! মুন্না কাকের গল্পটা বল!
: বলছি আপু, ফেরার পথেই একটা দাঁড় কাকের ডাক : কা.. কা.. কা..। চমকে তাকাল সবাই। বেশ দূরে ডাকছে কাক। এগিয়ে গেল সবাই। কাক বসে আছে কেওড়া গাছের ডালে। পাখা কাঁপিয়ে ডাকছে সে খুশিতে। জোড়েরটিও এলো। দু’টি কাক নামল মাটিতে। বাওয়ালিরা দ্রুত এগিয়ে গেল। দেখল পড়ে আছে আধখানা খাওয়া নিহত বাওয়ালির লাশ। এই হচ্ছে দাঁড়কাকের বুদ্ধি। সে দেখিয়ে দিয়েছে লাশ। লাশের ওপরে নেমে বুঝিয়ে দিয়েছে আশপাশে বাঘ নেই। থাকলে কাক লাশের ওপরে নামতে সাহস পেতো না।
: তোর গল্পটা বেশ মজার, কিন্তু আমরা ঢাকায় যে কাক দেখি এগুলো পাতি কাক,  এদের মোটেই বুদ্ধি আছে বলে মনে হয় না।
: ভুল ভুল একদম ভুল বললে আপু, কাকের চিকন বুদ্ধি-
: মানে শয়তানি বুদ্ধি?
: হ্যাঁ, দাঁড়কাক সাধারণত গ্রামে বসবাস করতে পছন্দ করে। তাদের মনে একটা গ্রাম্য সরলভাব কাছে। আর পাতিকাকের বাস শহরে। শহুরের মানুষের মতো এরাও হয় খুব হিংসুটে এবং ঝগড়াটে। অহঙ্কারীও বটে। গ্রাম থেকে শহরে যখন দাঁড়কাক বেড়াতে আসে তখন পাতিকাক এমন আচরণ করে এদের সঙ্গে যাতে শহর ছেড়ে চলে যায়। ভাবটা এরকম : এই গেঁয়ো কালো ভূতেরা শহরে কেন, রাজধানী হচ্ছে আমাদের দখলে- আমরা থাকবো। যা যা গ্রামে চলে যা। এ নিয়ে দাঁড়কাক এবং পাতিকাকের সঙ্গে চলে বেশ লড়াই।
: তুই দেখেছিস সেই লড়াই?
অর্থি বিরক্ত হয়ে বলল,
: আপু, অবশ্যই দেখেছি- পাখি নিয়ে আমার কারবার পাখিদের আচরণ আমার চোখে পড়বে না? শোন আমাদের ছোট দাদীর বাসা পুরান ঢাকায় গেছি। সেখানে দাঁড়কাক ও পাতিকাকের ঝগড়া লড়াই কতোবার দেখেছি। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে। পাতিকাক বলে যা যা আমাদের শহর ছেড়ে। দাঁড়কাক বলেÑ ইস বললেই চলে যাবো। রাজধানী কী শুধু তোদের, সবার। গ্রামে খাবার না পেয়ে এসেছি কিছু ভাল-মন্দ খাবোÑ চলে যেতে বললেই হলো!
: শোন মুন্না, এসব তোর বানানো গল্প। ফাজিল কোথাকার, কাকের মনের ভাষা তুই বুঝিস?
: আপু, বোঝার চেষ্টা করলে সব প্রাণীর ভাষাই বোঝা যায়। জগদীশ চন্দ্র বসু গাছের সঙ্গে নাকি কথা বলতেন। গাছের যে প্রাণ আছে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন।
জানিস আপু, পাতিকাকেরা দলবেঁধে বেড়াতে যায়। খুব দূরে যায় না। যেমন ধর, ঢাকার কাক নারায়ণগঞ্জ গেল। মানিকগঞ্জ গেল। ডেমরায় গেল। আবার ডেমরার কাক ঢাকায় এলো। নারায়ণগঞ্জের কাক ঢাকায় এলো। ওরা যখন ঠিক করবে ডেমরায় যাবে তখন ঢাকার আকাশে উড়ে উড়ে এমন উচ্চতায় উঠবে যাতে ডেমরা নজরে পড়ে।
গন্তব্যস্থল কিংবা তার চিহ্ন বা যতক্ষণ নজরে না পড়বে ততক্ষণ কাক ওপরে উঠতে থাকবে। তারপর রওয়ানা হবে। ফিরবেও একইভাবে। তবে প্রয়োজনে যাত্রাবিরতি করবে। দুই একদিন মাঝপথে বেড়াতে পারে।
দাঁড়কাকেরও রয়েছে ভ্রমণের বাতিক। তবে পাতিকাকের চেয়ে কম। পাতিকাকের চেয়ে দাঁড়কাক অলস।
: আচ্ছা অনেক হয়েছে, কাকম্য রচনা, এবার আমি চলি।
দেখতে দেখতে আরো দিন সাতেক চলে গেল। মুন্নার জ্বর ছেড়ে যায়নি। মাঝে এক বা দু’দিন জ্বর ছিল না। সবাই ভেবেছিল মুন্না সুস্থ। কিন্তু আবার গত পরশু থেকে আগের মতো জ্বর ওঠানামা করছে। এদিকে মুন্নার পরীক্ষা দ্বারপ্রান্তে। স্কুলের নিয়মকানুন এমন কড়া, পরীক্ষা না দিলে প্রমোশন দেবে না। যদিও তিনটে পরীক্ষা হয়। মিলিত নম্বরের ওপর রেজাল্ট। দুটো পরীক্ষায় মিলিত নম্বরে পাস করলেও প্রমোশন দেবে না।
: মুন্না, মুন্না আব্বু দেখি তোমার জ্বরটা? মুন্নার আব্বু জুলফিকার হায়দার প্রতিদিন অফিসে যাবার আগে ছেলের শারীরিক খোঁজ নেন। আজও সেভাবে নিচ্ছেন। মুন্না জানালা দিয়ে আকাশ দেখছিল। আকাশে বেশ মেঘ। বৃষ্টি হবার ভাব।
: আব্বু, তোমাকে বলেছি না আমার জন্য পাখির ওপর বই আনবে?
: মনেই থাকে নাÑ তাছাড়া আমি যে পথে আসি বই কিনতে হলে যেতে হবে অন্য পথে, রাস্তার যা অবস্থা, দেখি আজ যাবো।
জুলফিকার ছেলের গায়ে হাত দিয়ে দেখলেন। হাত দিয়ে খুব একটা আঁচ করা যায় না। হাড়ের ভেতর জ্বর। এমন সময় মুন্নার মাও এসে উপস্থিত হলেন। তিনিও স্কুলে যাওয়ার পথে। আর এমন সময় বাবা-মা দু’জনই চলে যান কর্মস্থলে। যাবার আগে উভয়ে আসে মুন্নার খোঁজ নিতে। কাজের বুয়াকে বলে যান মুন্নার প্রতি খেয়াল রাখতে। সময় মতো দুধ দিতে। অর্থিকে বলে যান জ্বর মাপতে।
: এই শোন, মুন্নার বড় মামার বন্ধুর ঔষধেও তো কাজ হলো না- ওতো বড় ডিগ্রি।
: হুম! আমাদের ছোটবেলায় পাড়ার বড় ডিগ্রি ছাড়া ডাক্তার ওষুধ দিলে রোগ পালাতে দিশা পেতো না। এখন বড় বড় ডিগ্রিধারী ডাক্তার আছে, রোগও আছে।
: এসব বললে তো চলবে না, আমি বলি কী রোগটা মানসিকও হতে পারে তো?
: সাইকিয়েট্রিক। এতটুকুন বাচ্চার!
: তুমি জান না আজকাল হচ্ছে।
: তাহলে?
: তাহলে আর কী আমার এক কলিগের হাজব্যান্ড ডাক্তার, মিরপুর ১০ নম্বরে বসেন, তাকে একটু দেখিয়ে আনি।
: ঠিক আছে আপত্তি নেই।
জুলফিকার সাহেব বের হয়ে গেলেন। অফিসের সময় গড়িয়ে যায়। একটু পর মিসেস নাসরিনও বের হয়ে গেলেন।
আব্বু-আম্মু ঘর থেকে বের হবার পর মুন্না শুয়ে পড়ে।
চোখ তার জানালার দিকে। দূরে একটা ছয়তলা বিল্ডিংয়ের পানির ট্যাংকের পাশে একটা পাইপের মাথায় দাঁড়কাক দেখল। মুন্না খুশি হয়ে উঠল। বাহ! দাঁড়কাক এলো কোত্থাকে। কাকই দেখা যায় না। যদিও আজ কাকের ডাকাডাকি শুনেছে। মুন্না শোওয়া থেকে উঠে পড়ল।
: কিরে মুন্না কী করছিস?
অর্থি ঢুকল।
: কী সৌভাগ্য আজকে একটা দাঁড়কাক দেখলাম!
মুন্না হাসি মুখে আপুকে জানালো।
: কোথায় দাঁড়কাক?
: ঐ যে হলুদ রঙের ছয়তলা বিল্ডিংয়ের পানির ট্যাংকের পাশে পাইপটার ওপর।
: হ্যাঁ, তাইতো দেখছিÑ সৌভাগ্য কেন?
: মানে আজকাল ঢাকায় পাতিকাকদেরই দেখা যায় না। দাঁড়কাক তো মেলা ভার।
: আচ্ছা হয়েছে, এবার তোর জ্বরটা দেখি।
অর্থি থার্মোমিটারটা মুন্নার মুখে পুরে দেয়। চোখ রাখে টেবিল ঘড়িটার ওপর। সেকেন্ডের কাঁটা টিক টিক করে একটি বার ঘুরে এলো। অর্থি মুখ হতে থার্মোমিটার বের করে আনে। চোখের সামনে থার্মোমিটার ধরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে অর্থি।
: নাহ্ জ্বর দেখি ছাড়ছে না-
: কত আপু?
: একশ এক পয়েন্ট দুই-
: আপু, রাখ তোর জ্বর। আজ থেকে তো স্কুল ছুটি। বস একটা গল্প বলি।
: কাকের গল্প?
: শোন আপু, কাক শুধু কালোই হয় না, সাদাও হয় কিন্তু।
: সাদা হয়!
অর্থি বিশ্বাস করতে পারে না এমন ভাব দেখলো।
: হ্যাঁ, সাদা কাকও আছে। পশ্চিম আফ্রিকার সাগর পারের দেশ সিয়েরা লিওনে এদের বসবাস। ঐ দেশের মানুষ কালো হলেও ওদের কাক সাদা।
: বাহ্ মজার ব্যাপার তো! সাদা কাকগুলো কী আমাদের দেশের কাকের মতো নোংরা স্বভাবের?
: কাক তো নোংরা স্বভাবের নয়। কাকও একটা পাখি।
অন্যান্য পাখিরা যা যা করে কাকও তাই করে। পৃথিবীর সব দেশে এ পাখির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। শুধু প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু দ্বীপ দেশ আর নিউজিল্যান্ড ছাড়া।
: যাই বলিস কাকের স্বভাব-চরিত্র আমার একদম পছন্দ নয়।  ছোট বাচ্চাদের হাত থেকে খাবার ছোঁ মেরে নিয়ে যায়।
: নেবে না, তোমরা এতো মজাদার খাবার খাও, কাক আশপাশে ঘুরে ফিরে দেখে, তোমরা দাও না, তাই ঐ চুরির স্বভাব। আমাদের ঐ পাশের বাসায় বিড়ালটা কী করে ?
: মুন্না, আমার পড়া আছে উঠি। বুয়াকে বলি তোর দুধটা দিতে।
* * *
বিকেলে মুন্নাকে নিয়ে মা মিসেস নাসরিন এলেন ডাক্তারের কাছে। নাসরিনের কলিগ মমতার হাজব্যান্ড হওয়ায় ভিড়ের মধ্যে পড়ে থাকতে হলো না। মমতাও সঙ্গে ছিলেন।
তাই এসেই সোজা ডাক্তারের চেম্বারে।
: দেখি বাবা তোমার কী হয়েছে। শুয়ে পড়।
মুন্না উঁচু সাদা চাদরে ঢাকা বিছানায় শুয়ে পড়ল। মুন্নার সমস্ত শরীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন ডাক্তার।
: এ যে দেখছি অনেক পরীক্ষা, অনেক ডাক্তার করেছেন।
আমি কোনো পরীক্ষা করবো না। কোনো ঔষধও দেবো না। শুধু বলব বাচ্চাকে নিয়ে একটা চেঞ্জে যান। দূরে কোথাও বেড়াতে যান। দিন সাতেকের জন্য। বেড়িয়ে এসে আমাকে জানাবেন। ব্যস। : আম্মু চল গ্রামের বাড়ি যাই দাদা-দাদীকে কত দিন দেখি না। মুন্না ডাক্তারের সামনে বলে ফেলল।
: ঐ যে বলল গ্রামের বাড়ি। যান দিন সাতেকের জন্য। দাদা-দাদীর সঙ্গে, চাচা-চাচীর, ফুফু-ফুফা এদের সঙ্গে বাচ্চাদের সম্পর্ক গড়ে দিতে হয়। এতো আবদ্ধ জীবন আমরা যাপন করি, যা মনের ওপর চাপ পড়ে। ছোটদের মনে বেশি পড়ে। আমরা বুঝতে পারি না।
ডাক্তারের চেম্বার হতে বের হয়ে আসার পর নাসরিনের মনটা বেশ প্রফুল্ল হয়ে ওঠে। হিম বাতাসও ছেড়েছে। বোধ হয় বৃষ্টি হবে। ভালই হলো, গ্রীেেষ্মর ছুটি চলছে। তার নিজের মনটাও ছটফট করছিল।
: কী মুন্না, খুশিতো?
মমতা ম্যাডাম বললেন।
মুন্না এক গাল হাসি দিয়ে জবাব দিলো।

SHARE

Leave a Reply