Home গল্প এক আঙুল গল্প

এক আঙুল গল্প

নয়ন রহমান…

স্কুল থেকে ফিরেই সিজান তুমুল হইচই শরু করে দেয়। প্রতিদিনই এ রকম করে। ওর চিৎকারে মাথা ধরে যায়।
ওরা মা বলেন, বাবা আস্তে আস্তে- এ ররকম চিল-চিৎকার করছিস কেন? সিজান মার কথা শুনে একেবারে চুপ হয়ে যায়। ওর মা অবশ্য এটা আশা করেননি। ছেলেকে তো চেনেন? এবার কাস সেভেনে উঠেছে। তা গায়ে পায়ে এতো বড় হয়েছে যে দেখলে মনে হয় নাইন-টেনের ছাত্র।
বাবা মার একমাত্র সন্তান সিজান, আদর আহলাদে বড় হয়েছে। ঘি মাখন খেয়ে শরীর বাড়িয়েছে। মাংস ছাড়া ওর ভাত খাওয়া ওর রোচেনা। যেদিন মাছ রান্না হয় সেদিন ওর জন্য ডিম থাকে, শাকসবজি তো আঙুল দিয়ে ছোঁয়ানো। মাছের মধ্যে ইলিশ মাছ খেতে ভালবাসে সিজান। ওকে নিয়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি গেলে ওর মা খুব অপ্রস্তুত হন।
সিজানের খালা বলেন, সিজান তুই সবজি খাস না?
না।
সে কি? কপি, বরবটি বেগুন এসব তোর পছন্দ না?
সিজান নির্দ্বিধায় উত্তর দেয়, পচা।
শাকসবজি পচা? ছি: ছি: আপা, ছেলেকে এসব কী শিখিয়েছ? আমাকে শেখাতে হয়নি। ও নিজেই শিখেছে।
সিজান, তুমি জান, লালশাক চোখের জন্য কত উপকারী?
জানি। বইয়ে আছে।
বইয়ে থাকলেই হবে? তুমি মানবে না? আপা, ওকে তুমি সবজির কাটলেট বানিয়ে দিও। আর ছোট মাছ পিষে আলু মিশিয়ে চপ করে দিও। বাচ্চারা এসব খেতে না চাইলে হাল ছেড়ে দিতে নেই। ও যেভাবে মোটা হয়ে যাচ্ছে?
প্রসঙ্গ পাল্টে দেয় সিজান।
আন্টি, আমার অনেক শক্তি। কেউ আমার সাথে কুস্তিতে পারে না।
সিজানের বলার ভঙ্গি দেখে ওর মা-খালা দু’জনেই হেসে ফেলেন।
প্রতিদিনই স্কুলে থেকে ফিরে এক রাশ প্রশ্ন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সিজান। আজ আর কোন প্রশ্ন নয়। ঠোঁটে আঙুল চেপে খুব বুদ্ধিমানের মতো প্রশ্ন করে আম্মু, তুমি কি বলেছিলে? চিল-চিৎকার, তাই না?
হ্যাঁ বলেছিলাম তো কি?
সিজান বিছানায় গড়াগড়ি দিতে দিতে বলে, আম্মু, আজ আমাদের কাসে একটা নতুন ছেলে ভর্তি হয়েছে। ওর বাড়ি কোথায় জানো? আমি জানব কী করে?
ওর বাড়ি হলো চিলমারী। চিলমারী সিজান চেঁচাতেই থাকে- চিলমারী।
সিজান, চেঁচিও না, চিলমারী একটা জায়গার নাম। তোমাদের বাড়ি মোল্লাহাট। তেমনি এ ছেলেটির বাড়ি চিলমারী।
আম্মু, তুমি বলেছিলে না চিল চিৎকার? হো হো হো- চিলমারী।
সিজান, এতে হাসির কী আছে? তাড়াতাড়ি ড্রেস বদলে ফ্রেশ হয়ে এসো। তোমাকে খেতে দেব।
আম্মু, তুমি জানো, চিলমারী কোথায়? ওখানে কি চিলরা থাকে শুধু? হো হো হি হি। আকাশে শুধু চিল ওড়ে? সিজান, এবার আমি খুব রাগ করব। কুড়িগ্রাম জেলায় চিলমারী একটা উপজেলা বুঝলে?
আম্মু কুড়িটা গ্রাম নিয়ে কি কুড়িগ্রাম? গ্রাম আবার জেলা হয় কী করে?
সিজান, তুমি কি উল্টা সিধা প্রশ্ন করছ? আমি তোমার এসব প্রশ্নে উত্তর দেবো না। বাইরে কি তাতানো রোদ দেখেছ? আমার গোসল বাকি, নামাজ বাকি। তোমাকে খাওয়াতেও তো সময় কেটে যাবে।
আম্মু, প্লিজ, আর একটা কথা বলব। তুমি চিল-চিৎকার বলেছিলে না? চিল-চিৎকার কী আম্মু?
চিল দেখেছ তো?
না তো দেখিনি? বইতে ছবি দেখেছি।
তা ঢাকা শহরের আকাশে চিল দেখবে কী করে? শহরের আকাশে চিল তো মনের সুখে ডানা মেলে উড়ে বেড়াতে পারে না।
গ্রামের আকাশে আমরা চিলের ওড়াওড়ি দেখেছি।
চিলের কণ্ঠস্বর খুব কর্কশ। চিৎকার শুনলে কানে আঙুল দিতে হয়। যখনই কোনো মরা জীব-জন্তু দেখতে পায় তখন কর্কশ কণ্ঠে স্বজাতিদের ডেকে ঐ সব জীবজন্তুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যখন কেউ চিৎকার করে, ঝসড়া-ঝাটি করে তখন আমরা বলি চিল- চিৎকার। এবার হলো?
না আম্মু, আর একটু আছে, চিলমারীর ছেলেটা খুব শান্ত, এতটুকু চিৎকার চেঁচামেচি করে না। আমরা টিফিন পিরিয়ডে কত চেঁচামেচি করি।
তা বুঝতে পারছি। চিৎকার করে কথা বলা খুবই খারাপ  সিজান। অভদ্রতা। তা ছেলটির বাড়ি চিলমারী বলে কি ছেলেটি চিৎকার করে কথা বলবে? কী উদ্ভট ধারণা তোমার। ওঠো সিজান, আর কথা নয়। তোমার আব্বাও এসে খাবেন। তাড়াতাড়ি করো।
আম্মু, আব্বু আসবেন আবার চলেও যাবেন, তাই না?
হ্যাঁ তাই। তাতে কী?
আব্বু চলে গেলে তুমি আমাকে গল্প বলবে?
সিজান, এতক্ষণ তো গল্প বলেই কাটালাম। ওঠ, এখন আমি যা বলছি তা-ই শোন।
মায়ের মুখে গল্প শোনা তো সিজানের নিত্যদিনের রুটিন। সিজান শুধু গল্প শোনে, গল্পের বই পড়তেও ওস্তাদ, এ অভ্যাসটি অবশ্য ওর মা-ই গড়ে তুলেছেন। বাইরের খাবারে দিকে সিজানের আগ্রহ ওর মা কমাতে পারেননি। পারেননি বদলাতে আরো কিছু অভ্যাস। এই যেমন স্কুল থেকে ফিরেই সিজান ফ্রিজ খুলে কোন্ড ড্রিংকস খোঁজে। না পেলে চেঁচামেচি করে। ওর জন্য কোল্ড ড্রিংকস রাখতেই হয়। নইলে এক ছুটে লিফটে চড়ে আটতলা থেকে হুস করে নিচে নেমে যায়। এ্যাপার্টমেন্টের লাগোয়া একটা শপিংমল আছ। সেখানকার কয়েকটা দোকানে রকমারি খাবার সাজানো থাকে। আজ নিচে নামার উপায় নেই। লিফট বন্ধ। মিস্ত্রিরা কাজ করছে। সিজান বিছানায় গড়াগড়ি দিয়ে আগডুম বাগডুম কথাবলে বাথরুমে ঢোকে, মাকে বলে যায়, আমি আজ তোমাকে গল্প শোনাব। তুমি আমাকে গল্প শোনাবে?
হ্যাঁ, এ গল্প, আমাদের বাংলা স্যার শুনিয়েছেন। আমি তোমাকে তাই শোনাব।
***
গল্পের তো হাত-পা থাকে। গল্প হেঁটে চলে। গড়িয়ে চলে। হাঁটতে হাঁটতে যোজন পথ পাড়ি দেয়। সিজান ওর খাতায় খানিক চোখ বুলায়, আবার গল্প বলে। এই অলস দুপুরে গল্পের শ্রোতা ওর মা। আট তলার ফ্যাটের একটা সুবিধা রাস্তার যানবাহনের শব্দ তেমন শোনা যায় না। আর খোলা জানালা দিয়ে হু হু বাতাস আসে।
আম্মু, আমাদের স্যারের বাড়িও কুড়িগ্রাম। তাঁর দেশের ছেলে ওসমান। স্যার নিজের দেশের ছেলেকে পেয়ে খুব খুশি।
আম্মু, ওসমান হল ঐ নতুন ছেলেটি।
হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি। তুমি যা বলার বলে যাও।
আম্মু, স্যার বললেন, বাংলাদেশের সব জেলারই একটা ইতিহাস আছে। সব জেলাতেই বিখ্যাত বিখ্যাত মানুষ আর বিখ্যাত বিখ্যাত জিনি আছেন। আর এসব জানা দরকার। আম্মু, মনে থাকবে না বলে আমি কিছু কথা লিখে এনেছি। স্যারও বলেছেন লিখে নিতে। আমাদের নতুন ছেলেটির পুরো নাম ওসমান গনি।
ওর নাম শুনেই স্যার বললেন, তুমি বলতে পারো ওসমান গনি কে ছিলেন? ছেলেটা মাথা নিচু করে বসে থাকে।
স্যার বললেন, নিজ জেলার বিখ্যাত লোকের নাম জান না? সবারই নিজের জেলার বিখ্যাত লোকদের নাম জানা উচিত।
শেরে বাংলা ফজলুল হক এক নামে তাঁকে সবাই জানে। তাঁর বাড়ি বরিশাল জেলায়। চিলমারী তোমার বাড়ি। চিলমারীর একজন বিখ্যাত ব্যক্তির নাম ওসমান গনি। তোমার নাম সেই বিখ্যাত ওসমান গনির নাম শুনে হয়ত রাখা হয়নি। তবে ওসমান গনি একটা অদ্ভুত কাজের জন্য ইতিহাসের পাতায় বিখ্যাত হয়ে আছেন, ওসমান গনি বিখ্যাত কবি সাহিত্যিক বা রাজনীতিবিদ ছিলেন না, শিক্ষায় দীক্ষায় তার তেমন নাম ছিল না। ওসমান গনি চিলমারীর একজন সাধারণ মানুষ। এই সাধারণ মানুষটির নাম ইতিহাসের পাতায় উঠে এসেছে। তোমাদের একদিন বিশ্ববিখ্যাত সাঁতারু ব্রজেনদাশের গল্প বলেছিলাম। সাঁতারে বিশ্ব রেকর্ড করে ব্রজেনদাশ বিখ্যাত হয়েছেন। আমাদের ওসমান গনিও একটা বিখ্যাত কাজ করেছেন। ওসমান গনি অল্প শিক্ষিত ছিলেন। কিন্তু তাঁর মাথায় একটা অদ্ভুত চিন্তা জাগে। তার শখ হয় পৃথিবী ভ্রমণ করার। খুব অদ্ভুত শখÑ তাই না? এই শখ মেটানোর জন্য তিনি বেরিয়ে পড়েন। কোনো যানবাহনে চড়ে নয়। পায়ে হেঁটে ওসমান গনি যাত্রা শুরু করেন। হাঁটছেন তো হাঁটছেন। হাঁটতে হাঁটতে এক এক করে তিনি পৃথিবীর বাইশটি দেশ ভ্রমণ করেছিলেন। এটা ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। চিলমারীর ওসমান গনি এ কাজটি করে চিলমারীর গৌরব বাড়িয়ে দিয়েছেন।
আম্মু, খুব অবাক কথা, তাই না?
হ্যাঁ বাবা, পৃথিবীতে আরো অনেক অনেক অবাক জিনিস আছে, ঘটনা আছে। আমরা তার কতটুকু জানি?
আম্মু, খাতা দেখে একটা নাম দেখে নিই, স্যার বলেছেন নিজের জেলার ইতিহাস জানা দরকার। চিলমারীতে মজিদের পাড় গ্রামে একটা বিখ্যাত তিনগম্বুজ মসজিদ আছে। মোগল আমলে এই মসজিদ তৈরি হয়েছিল। স্যার মুক্তিযুদ্ধের কথাও বলেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পর চিলমারীতে একটা বাধ্যভূমি খুঁজে পাওয়া গেছে। স্যার আমাদের বধ্যভূমি কাকে বলে তাও বলেছেন, আম্মু, স্যার এতো কিছু জানেন?
হ্যাঁ বাবা, এটা তো ভালো কথা। তোমার স্যার অনেক কিছু জানেন। নিজ নিজ জেলার বিখ্যাত বিখ্যাত মানুষ এবং উল্লেখযোগ্য সব কিছু জানা প্রয়োজন।
এখন একটু ঘুমাও বাবা। তোমার গল্প শুনতে শুনতে আমার চোখ জড়িয়ে আসছে।
আম্মু, আমি আর একটা কথা জানতে চাই। আমাদের স্যার একদিন কাসে ঢুকেই বললেন, তোমরা চিল-চিৎকার বন্ধ কর তো? আম্মু, তুমিও আজ বললে চিল-চিৎকার করো না। আমাকে বল না, চিল-চিৎকার কী।
মা সিজানের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, আমি তোমার এ প্রশ্নের জবাব দেব। তবে এখন নয় বাবা। সন্ধ্যার পর। সন্ধ্যার পর আম্মু নতুন গল্প বলবে।
মাকে কড়ার করে সিজান হোম ওয়ার্ক সারে। ওর মানটা সব সময়ই গল্প খোঁজে। ওর মা ওকে কত গল্পের বই কিনে  দেন। শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত শিশু পত্রিকার গ্রাহক করে দিয়েছেন। ওর বাবা বলেন, সিজান যদি গল্পের মধ্যে ডুবে থাকে তাহলে কাসের পড়া শেষ করবে কখন। মা হেসে বলেন, সেটা আমি দেখব। কাসের পড়ার বাইরেও অনেক কিছু জানার আছে। মনটাকে বিকশিত করার জন্য নানা বিষয়ের বই পড়ার দরকার আছে। বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠলে অন্য কোনো কাজে অভ্যোসের দিকে মন যাবে না। তা তো বুঝলাম সিজানের আম্মু। কিন্তু ও দিনে দিনে বয়সের তুলনায় বেড়ে উঠেছে তাতে তো আমার ভয় হয়।
আমারও যে চিন্তা হয় না তা নয়, ফ্যাটের জীবনে তো খেলা ধুলার ব্যবস্থাই নেই। ওকে সুইমিং শেখানো দরকার। জিমে ভর্তি করে দেয়াও দরকার।
সে তো ভর্তি করিয়ে দেয়াই যায়, তা কে আনা-নেয়া করবে শুনি?
কেন আমি আছি না? আমারও একটা আউটিং হবে। জিসানের বাবা হেসে বলেন, তোমার আউটিং হলে তো কথাই নেই। না হয় ছেলের সাথে তুমিও জিমে ভর্তি হয়ে যাবে? চাই কি সাঁতারেও।
মন্দ হয় না।
সেদিন এ পর্যন্তই কথা থেমে রইলো। জিসানের কানে কথাটা পৌঁছালে সিজান তো আনন্দে আত্মহারা হয়ে ডিগবাজি খায়।
পড়া টড়া শেষ করে সিজান বাবু হযে বসে গল্প শোনার জন্য।
সিজানের মা সব কাজ শেষ করে এসে বলেন, বাবা সিজান আজ আমি এক আঙুল গল্প বলব।
এক আঙুল গল্প? আজ আমি খুব টায়ার্ড। শুরু করি?
শুরু করলেই তো শেষ হয়ে যাবে আম্মু?
সব জিনিসই তো শুরুর পর শেষ হয়। তুমি পড়া শুরু করো তারপর শেষ হয়ে যায় না? আমি রান্না শুরু করি এক সময় রান্না শেষ হয়ে যায়।
আম্মু, আসল গল্প শুরু করো।
হ্যাঁ বাবা, সেদিন তোমাকে নিয়ে পুরনো ঢাকায় তোমার খালার বাসায় গিয়েছিলাম না? তখন তুমি রাস্তায় কি দেখে চেঁচিয়ে উঠেছিলে, মনে আছে?
সিজান কিছুক্ষণ ভাবে।
হ্যাঁ আম্মু, আমি ঘোড়ার গাড়ি দেখে চেঁচিয়ে উঠেছিলাম। বলেছিলাম আমি ঘোড়ার গাড়িতে চড়ব।
হ্যাঁ আজ তোমাকে আমি ঘোড়ার গাড়ির গল্প শোনাব।
শোন তাহলেÑ গাড়িটা ঘোড়ায় টানে তাই এ গাড়ির নাম ঘোড়ার গাড়ি। এ গাড়িকে টমটমও বলে অনেকে। একটি দু’টি অথবা তার বেশি ঘোড়ায় টানা গাড়িতে চাপলে খুব আনন্দ পাওয়া যায়। একদিন তোমায় আমি ঘোড়ার গাড়িতে চড়াব।
সত্যি? সিজানের চোখ দুটো আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
সত্যি। তবে এ গাড়ি যখন একটা ঘোড়ায় টানে তখন একেবারে টাঙা।
ইংরেজরা আমাদের দেশটা যখন শাসন করেছিল তখন ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন শুরু হয়েছিল। ইংরেজরা প্রায় দু’ শ’ বছর আমাদের দেশ শাসন করেছিল। সে এক লম্বা ইতিহাস, তোমাকে অন্যদিন বলব। ব্রিটিশরাই প্রথম কলকাতা থেকে ঢাকায় এই গাড়ি নিয়ে এসেছিল। ইংরেজরা যেমন ঘোড়ার গাড়িতে চলাচল করত, তেমনি আমাদের দেশের জমিদাররাও ঘোড়ার গাড়িতে চলতে শুরু করে। এই ঢাকা শহর থেকে অন্য সব শহরেও ঘোড়ার গাড়ি চলা শুরু হয়। এই সব গাড়ি যারা চালায় তাদের বলা হয় কোচম্যান বা সহিস। বিয়ে শাদি বা আনন্দ উৎসবে ঘোড়ার গাড়ির খুব কদর ছিল। এখন ঘোড়ার গাড়ি তেমন একটা নেই বললেই চলে। মোটর গাড়ি আসার পর ঘোড়ার গাড়ির কদর কমে গেছে। পুরান ঢাকায় দু’চারটে ঘোড়ার গাড়ি দেখা যায়। মালপত্র বহনের জন্যও এ গাড়ি ব্যবহার করা হয়। ঘোড়াকে সুন্দর করে সাজিয়ে গলায় ঘুঙুর পরিয়ে ঘোড়ার গাড়ি যখন রাস্তায় নামানো হয়, ঘোড়া চলতে শুরু করে তখন ঘুঙুরের শব্দে ছেলে বুড়ো সবাই আনন্দ পায়। বরযাত্রীরা ঘোড়ার গাড়িতে বিয়ে বাড়ি যায়। বর রাজপুত্রের মত আচকান-শেরোয়ানি পরে, নাগড়া পায়ে, নাকে রুমাল চেপে বসে থাকে। সৌখিন কোচোয়ানরাও সখ করে বরের মতো পোশাক পরে ঘোড়া হাঁকিয়ে চলে। পুরো গাড়ি টুনি বাল্ব আর রঙিন কাগজের শিকরি দিয়ে সাজানো হয়। রাত্রিবেলা এ গাড়ি দেখলে মনে হয় যেন আলোর গাড়ি চলছে।  পেছনে ঢোলবাদ্যও বাজে। রাস্তার লোকজন থমকে দাঁড়িয়ে অবাক বিস্ময়ে এ দৃশ্য দেখে। পুরান ঢাকায় এখনো মহররমের সময় তাজিয়া মিছিল নামে। অনেক লোক মিছিলে হায় হোসেন! হায় হোসেন! বলে বুক চাপড়ে মাতন করে।
আম্মু, তুমি দেখেছ?
দেখিনি আবার? মহররম মাসের দশ তারিখে এই শোক মিছিল বের করা হয়। তারও একটা ইতিহাসে আছে। তোমাকে সে ইতিহাস অন্য একদিন শোনাব। অবশ্য এ মিছিল শিয়ারা বের করে। আম্মু, শিয়া কী? উহ! গল্পের মধ্যে প্রশ্ন করলে গল্পের সুতো ছিঁড়ে যায়, আম্মু, প্লিজ বল না শিয়া কী?
সিজান, আমরা তো মুসলমানÑ তাই না? আমরা হজরত মোহাম্মদ (সা)-কে শেষ নবী বলে মানি, আমরা তাই সুন্নি। আর যারা রাসূল (সা)কে শেষ নবী মানে না হজরত আলীকে শেষ নবী বলে মানে তাদের বলা হয় শিয়া। এরও একটা লম্বা ইতিহাস আছে। আমি অন্য দিন বলব। আজ এক আঙুল গল্প বলব, বলেছি না সিজান, তুমি কি ঘুমুলে?
না আম্মু, ঘুমাইনি।
শোন, আমার নানুমাও ঘোড়ান গাড়ি চেপে স্কুলে যেতেন। তাও গাড়ি চারপাশ কাপড় দিয়ে ঢেকে। তখন মেয়েদের খুব পর্দা মানতে হতো। পুরান ঢাকার লোকেরা যাদের কুট্টি বলা হয় তারাই অনেকে ঘোড়ার গাড়ির কোচম্যান হতো। এরা যাত্রীদের সাথে খুবই মজার মজার রসিকতা করত।
আম্মু, আমি ঘোড়ার গাড়িতে স্কুলে যাব। যেও বাবা যেও। এখন রিকশা, মোটরগাড়ি বাদ দিয়ে তোমার জন্য আমাকে ঘোড়ার গাড়ির ব্যবস্থা করতে হবে দেখছি। গল্প শুনে শুনে গল্পের রথে চড়তে তোমার সখ হয়েছে- তাই না?
এই বাবা সিজান, আমার এক আঙুল গল্প তো এখনো শেষ হয়নি। তুমি কি ঘুমিয়ে পড়লে? ব্যাস। আমিও তাহলে গল্পের ঝাঁপি বন্ধ করে দিই। ঐ দেখ আকাশে কত বড় চাঁদ উঠেছে। আটতলা থেকে চাঁদটাকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। চাঁদের আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। আমাদের আটতলা বিল্ডিংয়েও পড়ছে। আবার ঐ রাস্তার পাশের ঝুপড়িতেও পড়ছে। শোন সিজান, একেই বলে সমতা। সবাইকে সমান চোখে দেখা। ওমা! এ যে ঘুমে কাদা একেবারে।
সিজানকে ওর মা ঠিকঠাক মতো বিছানায় শুইেয়ে দিয়ে মশারি ভালো করে গুঁজে মশারির ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে গিয়ে সিজানের চাঁদমুখে আদর ছড়িয়ে মনে মনে বলেন, আল্লাহ আমার ছেলেটিকে হেফাজত করো। সিজান ঘুমের ঘোরে কী বলে? ঘোড়ার গাড়ি-ঘোড়ার গাড়িতে চড়ব। ঘোড়ার গাড়িতে।

SHARE

Leave a Reply