Home প্রচ্ছদ রচনা চন্দ্র বিজয়ের গল্প

চন্দ্র বিজয়ের গল্প

হাসান আরিফ

প্রাচীনকাল থেকেই চাঁদ নিয়ে অনেক রহস্য, অনেক গল্পকথা, অনেক উদ্ভট চিন্তাভাবনা চালু ছিলো মানুষের সমাজে। কিন্তু চাঁদে মানুষের পা পড়ার পর এসব গল্পকথা শুধু রূপকথার বইয়েই স্থান পেলো। আর চন্দ্র জয়ের এই ঘটনা মানুষকে এই শিক্ষাও দেয়, অসম্ভব বলে কোনো শব্দ মানুষের অভিধানে থাকা উচিত নয়।

২০ জুলাই, ১৯৬৯ সাল। দিনটি মানবসভ্যতার জন্য চিরস্মরণীয় একটি দিন। সেদিন ভীষণ এক উত্তেজনা নিয়ে মানুষ অপেক্ষা করেছিলো একটা বিশেষ মুহূর্তের। অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হলো। অ্যাপোলো ১১-এর নভোচারী নীল আর্মস্ট্রং পা রাখলেন চাঁদের মাটিতে। সেই বিশেষ মুহূর্ত সম্পর্কে নীল আর্মস্ট্রং স্বয়ং বলেছিলেন, “এটা (চাঁদে পা রাখা) একজন মানুষের জন্য ছোট্ট একটা পদক্ষেপ হলেও মানবসভ্যতার জন্য অনেক বড় একটা পদক্ষেপ।”

চাঁদ পৃথিবীর প্রতিবেশী

চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ। জন্মের পর থেকেই চাঁদ পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। তাই চাঁদকে নিয়ে মানুষের আগ্রহ সেই সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই।   প্রাচীনকাল থেকেই রাতে মানুষের সঙ্গী ছিলো ওই চাঁদ। রাতের বেলা চাঁদের কাছ থেকে তারা আলো পেলেও চাঁদ সম্পর্কে সেসময়ের মানুষ তেমন কিছুই জানতো না।

তারপর মানুষ দিনে দিনে সভ্য হয়েছে। মিসরীয়, গ্রিক, রোমান, আসিরীয় আরও অন্যান্য সভ্যতায় চাঁদ বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। কারণ তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক আচার অনুষ্ঠান চাঁদের সাথে সম্পর্কিত ছিলো। এখনও অনেক ধর্মের আচার আচরণে চাঁদের গুরুত্ব আছে সেটা বোধ হয় জানো। যেমন মুসলমানরা চাঁদের হিসেবেই সব ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান যেমন রোজা, ঈদ, মহররম এসব পালন করে।

চাঁদ নিয়ে গবেষণা

চাঁদ নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার শুরু খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। ১৬০৯ সালে ইতালিয়ান বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি সে যুগের তুলনায় মোটামুটি উন্নত একটি টেলিস্কোপ আবিষ্কার করেন। তার উদ্ভাবিত এই টেলিস্কোপ দিয়ে তিনি প্রথম চাঁদের পৃষ্ঠতল দেখতে পান। এটাই আসলে চাঁদ নিয়ে সর্বজন স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক গবেষণার শুরু। গ্যালিলিওর পরবর্তীকালের বিজ্ঞানীরা চাঁদ নিয়ে আরও গবেষণা করেন।

এ দিকে পৃথিবীর সবেধন নীলমণি এই উপগ্রহকে নিয়ে কবি সাহিত্যিক বা সঙ্গীতশিল্পীদেরও আগ্রহ দেখা যায়। চাঁদ বা চাঁদে অভিযান নিয়ে কল্পকাহিনী লিখেছেন অনেক লেখক। এ প্রসঙ্গে জুলভার্নের কথা চলে আসে প্রথমেই। জুলভার্নের আগে অনেকেই চাঁদে অভিযান নিয়ে লিখেছেন। কিন্তু সাধারণ পাঠকের হৃদয় জয় করতে পেরেছিলেন তিনি। ১৮৬৫ সালে তার লেখা ‘ফ্রম দি আর্থ টু দি মুন’ নামের বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী প্রকাশিত হবার পর সাধারণ পাঠক অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেন চাঁদে যাওয়া সম্ভব। এ দিকে সত্যিকারভাবে চাঁদে প্রথম অভিযান শুরু করে আসলে রাশিয়া। শুধু তাই নয়, পৃথিবীর বাইরে প্রথম প্রাণী (লাইকা নামের একটা কুকুর), প্রথম পুরুষ নভোচারী (ইউরি গ্যাগারিন), প্রথম নারী নভোচারী (ভ্যালেন্তিনা তেরেশকোভা) পাঠানোর কৃতিত্বও তাদের।

এতসব অর্জনের পর তারা ১৯৫৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর লুনা-২ নামের একটি নভোযান পাঠায় চাঁদের উদ্দেশে। এ  নভোযান চাঁদের চারিদিকে প্রদক্ষিণ করে চাঁদের উল্টো পৃষ্ঠের ছবি তুলতে সক্ষম হয়। মূলত তারপর থেকেই চাঁদের বুকে মানুষ পাঠাতে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে। কিন্তু রাশিয়ার মহাকাশ অভিযান নিয়ে অনেক অর্জন থাকলেও চাঁদের বুকে প্রথম মানুষ পাঠানোর প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয় আমেরিকা।

প্রথম চন্দ্র বিজয়

২০ জুলাই চাঁদের বুকে নীল আর্মস্ট্রং নামলেও তারা পৃথিবী থেকে যাত্রা শুরু করেন ১৬ জুলাই ১৯৬৯ অ্যাপোলো-১১ নামের রকেটে চেপে। এই অভিযানে কমান্ডার নীল আর্মস্ট্রংয়ের সহযাত্রী ছিলেন মাইকেল কলিন্স ও এডউইন অলড্রিন।

অ্যাপোলো-১১ এর দু’টি অংশ ছিলো – একটি কমান্ড মডিউল, যার নাম রাখা হয়েছিলো কলাম্বিয়া। এই নামটি জুলভার্নের বিখ্যাত কল্পকাহিনী ‘ফ্রম দি আর্থ টু দি মুন’ থেকে নেয়া হয়েছিলো। অন্যদিকে লুনার মডিউল, যার নাম ছিলো ঈগল। কমান্ড মডিউল কলাম্বিয়ার পাইলট ছিলেন মাইকেল কলিন্স এবং লুনার মডিউল ঈগলের পাইলট ছিলেন এডউইন অলড্রিন।

১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই কমান্ডার নীল আর্মস্ট্রংয়ের নেতৃত্বে লুনার মডিউল পাইলট এডউইন অলড্রিন এবং কমান্ড মডিউল পাইলট মাইকেল কলিন্স যখন চাঁদের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন, ঠিক তখন স্থানীয় সময় সকাল ৯টা বেজে ৩২ মিনিট। অভিযানের নাম রাখা হয় অ্যাপোলো-১১। নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টারের চারপাশে তখন হাজার হাজার উৎসাহী মানুষের ভিড়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই রকেট পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছে গেল। ততক্ষণে কেটেছে মাত্র বার মিনিট। এর পরই শুরু হলো মূল অভিযান, চাঁদের অভিমুখে যাত্রা।

চারদিকে নিকষ কালো অন্ধকার ভেদ করে রকেট ছুটে চললো চাঁদের দিকে। বাইরে তখন বিশাল শূন্যতা। বেঁচে থাকার জন্য এক ফোঁটা বাতাসও নেই। রকেট ছেড়ে যেই সেখানে বেরুবে তৎক্ষণাৎ মারা যাবে সে। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, এত শূন্যতার মাঝ দিয়ে চলছে যে রকেট তার যাত্রীরা কিভাবে বাঁচলেন? আসলে রকেটের ভেতরে যাত্রীদের কক্ষটিকে মানুষের বেঁচে থাকার উপযোগী করে নির্মাণ করা হয়েছিল। পাশাপাশি তাদের সাথে ছিল পোর্টেবল লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম সংযুক্ত বিশেষ পোশাক, যা পরে বায়ুশূন্য স্থানে গেলেও কোনো সমস্যা হবার সুযোগ নেই।

দীর্ঘ যাত্রা শেষে ১৯ জুলাই অ্যাপোলো-১১ চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করলো। আগেই ঠিক করা ছিল চন্দ্রযানের প্রথম অংশ কমান্ড মডিউল চাঁদের কক্ষপথে থাকবে কিন্তু চাঁদের মাটিতে নামবে না। অপর অংশ লুনার মডিউল নামবে চাঁদের মাটিতে।

তোমরা হয়তো অনেকেই জানো, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পাখির নাম ঈগল। চাঁদের বুকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পাখি অবতরণ করছে, অনেকটা এমন ধারণা থেকেই লুনার মডিউলের নাম ঈগল রাখা হয়। ২০ জুলাই লুনার মডিউল ঈগল কলাম্বিয়া থেকে পৃথক হয়ে নীল আর্মস্ট্রং এবং এডউইন অলড্রিনকে নিয়ে চাঁদের দিকে রওনা করে। কমান্ড মডিউল কলাম্বিয়ায় থেকে যান মাইকেল কলিন্স। ঈগলের নেভিগেশন ও গাইডেন কম্পিউটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঈগলকে চাঁদে অবতরণ করানোর দায়িত্বে ছিল। অবতরণ করার কিছুক্ষণ আগে অ্যাপোলো-১১ অধিনায়ক আর্মস্ট্রং ঈগলের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখেন কম্পিউটার তাদের এক বিশাল মৃত আগ্নেয়গিরির দিকে নিয়ে যাচ্ছে যার চারদিকে বড় বড় শিলাখণ্ড ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

অবস্থা বেগতিক দেখে আর্মস্ট্রং কম্পিউটার থেকে নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে ঈগলকে ম্যানুয়ালি মানে নিজের হাতে চালনা শুরু করেন। আমেরিকার স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৫৬ মিনিটে ঈগল থেকে প্রথমে চাঁদের বুকে পা রাখেন মিশন অধিনায়ক নীল আর্মস্ট্রং। চারদিকের সারি সারি পাথর আর বড় বড় গর্ত দেখে তিনি বুঝে ফেললেন সত্যিই চাঁদে কোনো প্রাণী নেই। অগত্যা কী আর করা, আর্মস্ট্রং রুক্ষ আর শুষ্ক চাঁদের বুকে গবেষণা শুরু করলেন। বিভিন্ন রকম শিলা সংগ্রহ করলেন, অসংখ্য ছবি তুললেন। নীল আর্মস্ট্রং চাঁদে নামার সাড়ে ছয় ঘণ্টা পর অলড্রিনও নেমে আসেন। তিনিও ছবি তোলা, শিলা সংগ্রহ ইত্যাদি করে আড়াই ঘণ্টা পার করার পর এলো ফিরে যাবার সময়। অলড্রিনই প্রথম ঈগলে প্রবেশ করেন, তাকে অনুসরণ করেন আর্মস্ট্রং। তবে ঈগলে ওঠার আগে দু’জনেই দুই ব্যাগে করে নিয়ে নেন সাড়ে একুশ কেজি ধুলো-বালি, পাথর ইত্যাদি। চাঁদের অতিথিরা চাঁদ থেকে শুধু নিয়েই আসেননি, দিয়েও এসেছেন। তার মধ্যে রয়েছে কিছু বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, আমেরিকার পতাকা, পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিম গোলার্ধের মানচিত্র, একটি সিলিকন মেসেজ ডিস্ক যার মধ্যে রেকর্ড করা আছে পৃথিবীর ৭৩টি দেশের প্রধানসহ আমেরিকার কয়েক প্রেসিডেন্টের বাণী।

২৪ জুলাই ১৯৬৯, চন্দ্র বিজয়ীরা পৃথিবীতে ফিরে আসেন। ওয়েক দ্বীপ থেকে প্রায় ২৬৬০ কিলোমিটার পূর্বে সাগরে অবতরণ করেন তারা। উদ্ধারকারী জাহাজ মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস হর্নেট তাদের অবতরণ স্থল থেকে ২৪ কিলোমিটার দূরে ছিলো। হেলিকপ্টারের সাহায্যে তাদের ইউএসএস হর্নেটে নিয়ে আসা হয়। এর মধ্য দিয়েই শেষ মানুষের প্রথম চন্দ্র অভিযান।

মহাশূন্য ভ্রমণে জটিলতা

যত সহজে তাদের চাঁদে যাওয়া আর ফিরে আসার কথা বললাম বাস্তবিক চাঁদে যাওয়া বা ফিরে আসাটা ততটা সহজ কিছু নয়। বরং পদে পদে সেখানে আছে বিপদের আশঙ্কা। তাছাড়া জানোই তো, মহাশূন্যে ওজনহীনতা আরেকটি বড় সমস্যা। এই কারণে নভোচারীরা মহাশূন্যে তাদের প্রয়োজনীয় স্বাভাবিক কাজগুলোও করতে পারেন না। এ জন্যও মহাশূন্যে যাওয়ার আগে তাদেরকে অনেক কঠিন কঠিন প্রশিক্ষণের মধ্যে থাকতে হয় অনেক দিন।

আবার মহাশূন্যে বা চাঁদে কোথাও বাতাস নেই। তাই কৃত্রিম অক্সিজেন নিয়ে যেতে হয় নভোচারীকে। এ জন্য মহাকাশচারীকে পিঠে সবসময় অক্সিজেন ট্যাংক ও বিশেষ ধরনের পোশাক পরতে হয়।

চাঁদে অভিযান নিয়ে কল্পকাহিনী

চাঁদ যদি তুমি পৃথিবী থেকে ধরতে চাও, তাহলে তোমার হাতের দৈর্ঘ্য হতে হবে তিন লক্ষ চুরাশি হাজার চারশ তিন কিলোমিটার। অর্থাৎ পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব ৩,৮৪,৪০৩ কিলোমিটার। তবে যেহেতু এত দীর্ঘ হাত সম্ভব নয়, তবুও তা না হলেও অনেকেই চাঁদে গিয়েছিলেন, মহাকাশযানে করে। এ জন্য দরকার অনেক অর্থের আর অনেক কঠিন সব ট্রেনিংয়ের। তাই বলে হতাশ হবার কোনো কারণ নেই। অনেকেই তাদের লেখার মাধ্যমে চাঁদকে নিয়ে এসেছেন বইয়ের পাতায়। কেউ এঁকেছেন কমিকস, কেউ লিখেছেন গল্প-উপন্যাস আর কেউ বানিয়েছেন চলচ্চিত্র।

চাঁদকে নিয়ে গল্প লেখা শুরু হয়েছে ১৯৬৯ সালে চাঁদে মানুষের অবতরণের অনেক আগে থেকেই। ১৮৬৫ সালে জুলভার্ন লেখেন ‘ফ্রম আর্থ টু দি মুন’। তার এই কল্পকাহিনীতে একটি মহাকাশযান আমেরিকার ফ্লোরিডা থেকে যাত্রা শুরু করে চাঁদে অ্যাডভেঞ্চার করে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে, অনেকটা অ্যাপোলোর মতই। ১৯০১ সালে প্রকাশিত হয় এইচজি ওয়েলস-এর ‘দি ফার্স্ট ম্যান অন দ্য মুন’। এই গল্পে মানুষেরা এক ধরনের পদার্থ ব্যবহার করে, যা নাকি নিজে থেকেই বাতাসে ভাসতে পারে।

আইজাক আসিমভ একটি কল্পকাহিনী লেখেন ১৯৩৯ সালে। আর কাহিনী অনুযায়ী ঘটনা ঘটে ১৯৭০ সালে। আর্থার সি ক্লার্কও লিখেছিলেন ১৯৫১ সালে। নাম ‘প্রিলিউড টু স্পেস’। এ ছাড়াও আরও অনেকেই চাঁদে অভিযান নিয়ে গল্প-উপন্যাস লিখেছেন।

এসব কল্পকাহিনী লেখকদের অনেকের লেখা বই থেকে তৈরি হয় চলচ্চিত্র। তেমনি একটি হচ্ছে ‘এ ট্রিপ টু দি মুন’, যা ছিলো নির্বাক চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটির মূল কাহিনীর শুরু হয় জুলভার্নের ‘ফ্রম আর্থ টু দি মুন’ থেকে। চলচ্চিত্রটি ১৯০২ সালে মুক্তি পায় আর মানুষ স্বাদ পায় চন্দ্রজয়ের। বাস্তবে তখনও চাঁদে যাবার অনেক দেরি, কিন্তু মানুষ বুঝতে পারে এটি কোনো অসম্ভব কাজ নয় আর কাজটা নিঃসন্দেহে রোমাঞ্চকর।

কুরআনে মহাকাশ জয়ের কথা

মহাগ্রন্থ আল কুরআন জ্ঞানবিজ্ঞানের অনুপম বিশ্বকোষ। চাই তা পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব বিজ্ঞান হোক আর মহাকাশ বিজ্ঞানই হোক। নীল আর্মস্ট্রংসহ অসংখ্য বিজ্ঞানীদের কণ্ঠ থেকে আজ এ কথাই ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। মহাকাশ বিজ্ঞানীদের মহাকাশ অভিযান শুরু হয় ১৯৫৭ সালে। এ অভিযানে প্রথম সফলতা আসে ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই, চন্দ্রজয়ের মাধ্যমে। অথচ আজ থেকে প্রায় ১৪০০ বছর আগেই রাসূল পাক (সা)-এর মিরাজ বা মহাকাশ বিজয়ের কথা আল কুরআনে ঘোষিত হয়েছে।

মহান আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, “পবিত্র ও মহিমাময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে (মুহাম্মদকে) রজনীযোগে ভ্রমণ করিয়েছেন আল মসজিদুল হারাম থেকে আল মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার পরিবেশ আমি করেছিলাম বরকতময়, তাকে আমার নিদর্শন দেখার জন্য। তিনিই সর্বশ্রোতা; সর্বদ্রষ্টা।” (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত ১) “এভাবে আমি ইব্রাহিমকে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর পরিচালন ব্যবস্থা দেখাই, যাতে সে (ইব্রাহিম) নিশ্চিত বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়।” (সূরা আনআম, আয়াত ৭৫) এখানে সূরা বনি ইসরাইলে রাসূল (সা)-এর মক্কা (মসজিদুল হারাম) থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস (মসজিদুল আকসা) পর্যন্ত এবং সূরা নাজমে ঊর্ধ্বাকাশে উত্তোলন ও ভ্রমণের অর্থাৎ মহাকাশ ভ্রমণের কথা উল্লেখ রয়েছে। সূরা আনআমেও হযরত ইব্রাহিম (আ)-এর ক্ষেত্রে অনুরূপ মহাকাশ ভ্রমণের বিষয় ঘোষিত হয়েছে। নীল আর্মস্ট্রংদের চন্দ্র বিজয় সেদিনের কথা, তারও ১৪০০ বছর আগে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা) এবং তারও আগে হযরত ইব্রাহিম (আ)-এর মিরাজ মহাকাশ বিজ্ঞানীদের জ্ঞানের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। বিজ্ঞান আজ যে জ্ঞানের কাছে মাথা নত করেছে অবশ্যই তা মানবীয় জ্ঞান নয় বরং ওহির জ্ঞান এবং মহাবিজ্ঞানী আল্লাহ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান।

রাব্বুল আলামিন ইচ্ছে করলে কোনোরূপ অবলম্বন ছাড়াই মুহূর্তের মধ্যে তাঁর প্রিয় বন্ধুকে সপ্ত আকাশ পরিভ্রমণ করাতে পারতেন, তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছুই ছিল না। তবুও ‘বোরাক’ ও ‘রফরফ’যোগে তাঁকে ভ্রমণ করিয়েছেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ‘বোরাক’ ও ‘রফরফ’ কী জাতীয় বাহন? ‘বোরাক’ আরবি ‘বরকুন’ ধাতু হতে নির্গত, যার অর্থ বিদ্যুৎ (Electricity)। এটা নূরের তৈরি জান্নাতি বাহন। অনেকটা অশ্বের মতো রূপ। বিদ্যুতের চেয়েও ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন। আলোর গতি অপেক্ষাও এর গতি অনেক বেশি। ‘রফরফ’-এর আভিধানিক অর্থ বিছানা, নরম তুলতুলে, সবুজ। সূর্যরশ্মির চেয়েও ক্ষিপ্র তার গতিবেগ। এ বাহন দু’টির গতি আলোর গতির চেয়েও কল্পনাতীত দ্রুত হওয়ার কারণে অতি অল্প সময়ের মধ্যে রাসূল (সা)-এর সপ্তাকাশ ভ্রমণ সম্ভব হয়েছে। উল্লেখ্য, আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে ১ লাখ ৮৬ হাজার মাইল।

মূলত রাসূল (সা)-এর মহাকাশ ভ্রমণের পথ ধরেই পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা নভোযান আবিষ্কার করেন এবং বিভিন্ন অভিযানের পর অবশেষে চন্দ্রপৃষ্ঠে পৌঁছতে সক্ষম হন।

রহস্যের শেষ নেই

চাঁদ নিয়ে বা চাঁদে অভিযান নিয়ে এখনো শেষ কথা বলার সময় আসেনি। পৃথিবীর একদম কাছের উপগ্রহ হলেও চাঁদের রহস্য জাল ছিঁড়তে শুরু করছে গত শতাব্দী থেকে। যার অধিকাংশই এখনো রহস্যাবৃত। মানুষের অনেক আগে থেকেই ইচ্ছা চাঁদে বসতি গড়ার। সেই সম্ভবনাও খতিয়ে দেখছেন গবেষকরা। তাদের বিরামহীন গবেষণা চলছে চাঁদকে নিয়ে। তারা যেসব সম্ভাবনার কথা বলেন সেগুলো কল্পকাহিনীকেও হার মানায়।

এ দিকে সম্প্রতি চীন, জাপান, ভারতসহ আরও ক’টি দেশ নতুন করে চাঁদে অভিযান ও চাঁদ নিয়ে গবেষণা শুরু করেছে। এর সাথে যোগ দিয়েছে পূর্বেকার মহাকাশ বিজয়ী দেশ রাশিয়া ও আমেরিকা। তাই নিশ্চিতভাবেই বলা যায় চাঁদ নিয়ে আরও অনেক কথা অপেক্ষা করছে আমাদের সামনের দিনগুলোতে।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply to sagor Cancel reply