Home সাহসী মানুষের গল্প সত্যের সাম্পান

সত্যের সাম্পান

কায়েস মাহমুদ

রাতের পরই আসে দিন।

আঁধারের পরই আসে আলো।

যখন উদিত হয় সূর্য তখন চারদিক কী ফকফকা!

তেমনি একটি জীবন -আলোকিত জীবন।

নাম – হযরত উবাই (রা)।

হযরত উবাই বদর থেকে নিয়ে তায়িফ অভিযান পর্যন্ত রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় যত যুদ্ধ হয়েছে তার প্রত্যেকটিতে যোগদান করেন সাহসের সাথে।

কুরাইশরা বদরে পরাজিত হয়ে মক্কায় ফিরে প্রতিশোধ নেওয়ার তোড়জোড় শুরু করে দেয়।

উহুদ যুদ্ধের প্রাক্কালে মক্কায় অবস্থানকারী রাসূলুল্লাহর (সা) চাচা হযরত আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তাবিল গোপনে বনী গিফার গোত্রের এক লোকের মাধ্যমে একটি পত্র রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট পাঠান। সেই পত্রে তিনি কুরাইশদের সকল গতিবিধি রাসূলকে (সা) অবহিত করেন।

লোকটি মদীনার উপকণ্ঠে কুবায় পত্রখানি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট হস্তান্তর করেন।

রাসূল (সা) পত্রখানা সেখানে উবাই ইবন কাবের দ্বারা পাঠ করিয়ে শোনেন এবং পত্রের বিষয় গোপন রাখার নির্দেশ দেন।

এই উহুদ যুদ্ধে শত্র“ পক্ষের নিক্ষিপ্ত তীরের আঘাতে তিনি আহত হন।

হযরত রাসূল (সা) তাঁর চিকিৎসার জন্য একজন চিকিৎসক পাঠান।

চিকিৎসক তাঁর রগ কেটে স্থানে সেঁক দেয়।

উহুদ যুদ্ধের শেষে হযরত রাসূলে কারীম (সা) আহত-নিহতদের খোঁজ-খবর নেওয়ার নির্দেশ দিলেন। এক পর্যায়ে তিনি বললেন : তোমাদের কেউ একজন সাদ ইবন রাবীর খোঁজ নাও তো।

একজন আনসারী সাহাবী তাঁকে মুমূর্ষু অবস্থায় শহীদদের লাশের স্তূপ থেকে খুঁজে বের করেন তাকে। এই আনসারী সাহাবী হলেন উবাই ইবন কাব।

খন্দকযুদ্ধের প্রাক্কালে মক্কার কুরাইশ নেতা আবু সুফাইয়ান, আবু উসামা আল-জাশামীর মারফত একটি চিঠি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট পাঠান। সেই চিঠিও রাসূল (সা) উবাইয়ের দ্বারা পাঠ করান।

তেমনিভাবে হিজরী ২য় সনের রজব মাসে রাসূল (সা) আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ আল-আসাদীর নেতৃত্বে একটি বাহিনী নাখলা অভিমুখে পাঠান।

যাত্রাকালে তিনি আবদুল্লাহর হাতে একটি সিলকৃত চিঠি দিয়ে বলেন : দুই রাত একাধারে চলার পর চিঠিটি খুলে পাঠ করবে এবং এর নির্দেশ মত কাজ করবে।

রাসূল (সা) এই চিঠিটি উবাইয়েরর দ্বারা লেখান।

হিজরি ৯ম সনে যাকাত ফরজ হলে রাসূল (সা) আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে যাকাত আদায়কারী নিয়োগ করেন।

তিনি উবাইকে বালী, আজরা এবং বনী সাদ গোত্রে যাকাত আদায়কারী হিসাবে পাঠান।

তিনি অত্যন্ত দ্বীনদারী ও সততার সাথে এই দায়িত্ব পালন করেন।

একবার এক জনবসতিতে গেলেন যাকাত আদায় করতে। নিয়ম অনুযায়ী এক ব্যক্তি তার সকল গবাদিপশু উবাইয়ের সামনে হাজির করে, যাতে তিনি যেটা ইচ্ছা গ্রহণ করতে পারেন।

উবাই উটের পাল থেকে দুই বছরের একটি বাচ্চা গ্রহণ করেন।

জাকাত দানকারী বললেন :

এতটুকু বাচ্চা নিয়ে কী হবে? এতো দুধও দেয় না, আরোহণেরও উপযোগী নয়। আপনি যদি নিতে চান এই মোটা তাজা উটনীটি নিন।

উবাই বললেন : আমার দ্বারা সম্ভব নয়। রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশের বিপরীত আমি কিছুই করতে পারি না। মদীনা তো এখান থেকে খুব বেশি দূর না, তুমি আমার সাথে চলো, বিষয়টি আমরা রাসূলকে (সা) জানাই। তিনি যা বলবেন, আমরা সেই অনুযায়ী কাজ করবো।

লোকটি রাজি হলো। সে তার উটনী নিয়ে উবাইয়ের সাথে মদীনায় উপস্থিত হলো।

তাদের কথা শুনে রাসূল (সা) বললেন : এই যদি তোমার ইচ্ছা হয় তাহলে উটনী দাও, গ্রহণ করা হবে। আল্লাহ তোমাকে এর প্রতিদান দেবেন।

লোকটি সন্তুষ্টচিত্তে উটনীটি দান করে বাড়ি ফিরে গেল।

হযরত রাসূলে কারীমের (সা) ইনতিকালের পর হযরত আবুবকর (রা) খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সময় পবিত্র কুরআনের সংগ্রহ ও সংকলনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু হয়।

সাহাবা-ই-কিরামের যে দলটির ওপর এই দায়িত্ব অর্পিত হয়, উবাই ছিলেন তাঁদের নেতা। তিনি কুরআনের শব্দাবলি উচ্চারণ করতেন, আর অন্যরা লিখতেন।

এই দলটির সকলেই ছিলেন উঁচু স্তরের আলিম। এই কারণে মাঝে মধ্যে কোন কোন আয়াত সম্পর্কে তাঁদের মধ্যে আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক হতো।

যখন সূরা আত-তাওবার ১২৭ নম্বর আয়াতটি লেখা হয় তখন দলের অন্য সদস্যরা বললেন, এই আয়াতটি সর্বশেষ নাযিল হয়েছে।

হযরত উবাই বললেন : না। রাসূল (সা) এর পরে আরও দু’টি আয়াত আমাকে শিখিয়েছিলেন। সূরা আত-তাওবার ১২৮ নম্বর আয়াতটি সর্বশেষ নাযিল হয়েছে।

হযরত আবুবকরের (রা) ইনতিকালের পর হযরত উমার (রা) তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন।

তিনি তাঁর খিলাফতকালে অসংখ্য জনকল্যাণ ও সংস্কারমূলক কাজের প্রবর্তন করেন।

মজলিসে সূরা তার মধ্যে একটি।

বিশিষ্ট মুহাজির ও আনসার ব্যক্তিবৃন্দের সমন্বয়ে এই মজলিস গঠিত হয়। খাযরাজ গোত্রের প্রতিনিধি হিসাবে উবাই এই মজলিসে সদস্য ছিলেন।

হযরত উমারের খিলাফতকালের গোটা সময়টা তিনি মদীনায় স্থায়ীভাবে বসবাস করে কাটান। বেশির ভাগ সময় অধ্যয়ন ও শিক্ষাদানে ব্যয় করেন।

যখন মুজলিসে শূরার অধিবেশন বসতো বা কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপস্থিত হতো খলিফা উমার (রা) তাঁর যুক্তি ও পরামর্শ গ্রহণ করতেন।

হযরত উমারের (রা) খিলাফতকালের পুরো সময়টা তিনি ইফতার পদে আসীন ছিলেন। এছাড়া অন্য কোন পদ তিনি লাভ করেননি।

একবার উমারকে (রা) জিজ্ঞেস করলেন, আপনি আমাকে কোন এক স্থানের ওয়ালি নিযুক্ত করেন না কেন?

উমার (রা) বললেন : আমি আপনার দ্বীনকে দুনিয়ার দ্বারা কলুষিত হতে দেখতে চাই না।

হযরত উমার (রা) যখন তারাবিহর নামাজ জামায়াতের সাথে আদায়ের প্রচলন করেন তখন উবাইকে ইমাম মনোনীত করেন।

উমার যেমন তাঁকে সম্মান করতেন তেমনি ভয়ও করতেন। তাঁর কাছে ফাতওয়া চাইতেন।

খলিফা উমারের (রা) বাইতুল মাকদাস সফরে উবাই তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন।

খলিফার ঐতিহাসিক জাবিয়া ভাষণের সময় উপস্থিত ছিলেন।

বাইতুল মাকদাসের অধিবাসীদের সাথে হযরত উমার (রা) যে সন্ধি চুক্তি সম্পাদন করেন তার লেখক ছিলেন হযরত উবাই।

উমারের পর হযরত উসমানের (রা) সময় খিলাফতের বিভিন্ন অঞ্চলে কুরআন মজিদের তিলাওয়াত ও উচ্চারণে বিভিন্নতা ছড়িয়ে পড়ে। খলিফা উসমান (রা) শঙ্কিত হয়ে পড়লেন।

তিনি এই বিভিন্নতা দূর করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন।

তিনি শ্রেষ্ঠ ক্বারীদের ডেকে পৃথকভাবে তাঁদের তিলাওয়াত শুনলেন।

উবাই ইবন কাব আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস এবং মুয়াজ ইবন জাবাল-প্রত্যেকেরই উচ্চারণে কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করলেন। অতঃপর তিনি বললেন, সকল মুসলমানকে একই উচ্চারণের কুরআনের ওপর ঐক্যবদ্ধ করতে চাই।

সেই সময় কুরাইশ ও আনসারদের মধ্যে ১২ ব্যক্তি সম্পূর্ণ কুরআনে দক্ষ ছিলেন। খলিফা উসমান এই ১২ জনের ওপর এই গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেন। আর এই পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব্ দান করেন উবাই ইবন কাবকে।

তিনি শব্দাবলি উচ্চারণ করতেন, যায়িদ ইবন সাবিত লিখতেন।

আজ পৃথিবীতে যে কুরআন বিদ্যমান তা মূলত হযরত উবাইয়ের পাঠের অনুলিপি।

হযরত উবাইয়ের মৃত্যু সন নিয়ে বিস্তর মতভেদ আছে। সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতে হযরত উসমানের (রা) খিলাফতকালে হিজরি ৩৯ সনের এক জুমার দিনে ইনতিকাল করেন।

হযরত উসমান তাঁর জানাযার নামাজ পড়ান এবং মদীনায় মারা যান।

আর ওয়াকিদী, মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ প্রমুখের মতে তাঁর মৃত্যু হয় হিজরী ৩৯ সনে।

তার সন্তানদের সঠিক সংখ্যা জানা যায় না। তবে যে সকল সন্তানদের নাম জানা যায় তারা হলেন : ১. তুফাইল, ২. মুহাম্মাদ, ৩. রাবী, ৪. উম্মু উমার।

প্রথমোক্ত দুইজন হযরত রাসূলে কারীমের (সা) জীবদ্দশায় জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর স্ত্রীর ডাকনাম উম্মু তুফাইল। তিনি সাহাবিয়্যা ছিলেন। হাদিস বর্ণনাকারী মহিলা সাহাবীদের নামের তালিকায় তাঁর নামটিও দেখা যায়।

হযরত উবাইয়ের দৈহিক গঠন ছিল মধ্যম আকৃতির হালকা -পাতলা ধরনের। গায়ের রং ছিল উজ্জ্বল গৌর বর্ণের।

বার্দ্ধক্যে মাথার চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল কিন্তু খিযাব লাগাতেন না।

স্বভাব ছিল একটু সৌখিন প্রকৃতির।

বাড়িতে গদির ওপর বসতেন।

ঘরের দেয়ালে আয়না লাগিয়েছিলেন এবং সেইদিকে মুখ করে নিয়মিত চিরুনি করতেন।

সাধারণত স্বভাববিরোধী কোন কথা শুনলেই রেগে যেতেন।

হযরত উবাই ছিলেন একটু স্বাধীনচেতা ও আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন।

একবার হযরত ইবন আব্বাস (রা) মদীনার একটি গলি দিয়ে কুরআনের একটি আয়াত তিলাওয়াত করতে করতে যাচ্ছেন। এমন সময় তিনি শুনতে পেলেন, পিছন থেকে কেউ যেন তাঁকে ডাকছে। ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখেন, উমার।

কাছে এসে ইবন আব্বাসকে বললেন : তুমি আমার দাসকে সংগে নিয়ে উবাই ইবন কাবের নিকট যাবে এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করবে যে, তিনি কি অমুক আয়াতটি এভাবে পড়েছেন?

ইবন আব্বাস উবাইয়ের গৃহে পৌঁছুলেন এবং পরপরই উমারও সেখানে হাজির হলেন। অনুমতি নিয়ে তাঁরা ভিতরে প্রবেশ করলেন।

উবাই তখন দেওয়ালের দিকে মুখ করে মাথার চুল ঠিক করছিলেন।

উমারকে গদীর ওপর বসানো হলো।

উবাইয়ের পিঠ ছিল উমারের দিকে এবং সেই অবস্থায়ই বসে থাকলেন, পিছনে তাকালেন না। কিছুক্ষণ পর বললেন : আমীরুল মুমিনীন, স্বাগত! আমার সংগে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে না অন্য কোন প্রয়োজনে এসেছেন?

উমার বললেন : একটি কাজে এসেছি।

অতঃপর একটি আয়াত তিলাওয়াত করে বলেন -এর উচ্চারণ তো খুব কঠিন।

উবাই বললেন : আমি কুরআন তাঁর নিকট থেকেই শিখেছি, যিনি জিবরীলের নিকট থেকে শিখেছিলেন। এ তো খুব সহজ ও কোমল।

হযরত উবাই ইবন কাবের পবিত্র জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত জ্ঞান চর্চার জন্য নিবেদিত ছিল।

মদীনার আনসার-মুহাজিরগণ যখন ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিকাজ নিয়ে দারুণ ব্যস্ত থাকতো, হযরত উবাই তখন মসজিদে নববীতে কুরআন-হাদিসের জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার পঠন-পাঠনে সময় অতিবাহিত করতেন।

আনসারদের মধ্যে তাঁর চেয়ে বড় কোন আলিম কেউ ছিলেন না। আর কুরআন বুঝার দক্ষতা এবং হিফজ ও কিরআতে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ছিল সর্বজন স্বীকৃত।

খোদ রাসূলে কারীম (সা) মাঝে মাঝে তাঁর নিকট থেকে কুরআন তিলওয়াত শুনতেন।

হযরত উবাই (রা)! তিনি ছিলেন সত্যের ধারক। ছিলেন সত্য পথের অবিরাম যাত্রী। তার ছিল অনুকরণীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। যা অনুকরণ করলে আমরাও স্পর্শ করতে পারি সত্যের সাম্পান।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply