Home নিয়মিত ভালো থাকার মজার খাবার

ভালো থাকার মজার খাবার

রফিক রইচ

সম্ভাবনার সুমদ্র আমার প্রাণপ্রিয় ছোট্ট বন্ধুরা আপনারা ভালো তো? আশা করছি আপনারা সকলেই ভালো আছেন। ভালো থাকতেই হবে। কারণ ভালো থাকাটা একটা আর্ট বা শিল্প। তাই ভালো থাকার জন্য যা যা দরকার তার সবটাই সাধ্যমত করার চেষ্টা করতে হবে। তবেই শিল্পীত ভালো থাকা যাবে। ভালোভাবে বেঁচে থাকা যাবে। ভালোভাবে বাঁচলে আপনারা নিজেকে ভালো করে গড়তে পারবেন, সর্বোপরি দেশ মাতার মাথায় গর্বের হারার জ্বলজ্বলে মুকুট পড়িয়ে নিজেকে আলোকিত করে তুলতে পারবেন। আলোকিত মানুষ হয়ে উঠবেন। এই ভালো থাকার জন্য প্রকৃতিতে যেসব উপাদান মহান আল্লাহ সৃষ্টি করে দিয়েছেন তার মধ্যে অন্যতম উপাদান হলো খাদ্য। এই ভালো থাকার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান “খাদ্য খাবার” নিয়ে আপনাদেরকে গল্প বলবো। ভালো থাকার মজার মজার খাদ্য খাবারের গল্প শুনলে আপনাদের ভালোই লাগবে। গল্পের শুরুতেই আমরা জেনে নেই খাদ্য কী? সহজ করে বলতে গেলে বলতে হয় বেঁচে থাকার জন্য অতি প্রয়োজনীয় গ্রহণযোগ্য রসদই খাদ্য। অন্যভাবে বলা যায়- খাদ্য তাই যা খেলে শরীরের যথার্থ বৃদ্ধি ঘটে শরীরকে কর্মক্ষম রাখে ও নানারকম রোগ ব্যাধি থেকে রক্ষা করে দেহকে সুস্থ রাখে। আমরা খাওয়ার জন্য বাঁচি না বরং বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য খাই। খাদ্য ছাড়া আমরা কেউ বাঁচতে পারি না।

খাদ্য কী কাজ করে সেটা অনেকটা খাদ্যের সংজ্ঞায় উঠে এসেছে তারপরও খাদ্যের কাজকে আলাদাভাবে বলছি- খাদ্য প্রধানত তিনটি কাজ করে থাকে, যথা-

(ক) শরীর গঠন করা এবং ক্ষয় পূরণ করা।

খ) শরীরে শক্তির জোগান দেয়া এবং কাজ করার সামর্থ্য সৃষ্টি করা।

গ) রোগকে দূরে রেখে শরীরকে সদা সুস্থ রাখা।

এই খাদ্য শুধুই খাদ্য হলে হবে না। খাদ্য হতে হবে সুষম। আর সুষম খাদ্য হলো সেই সমস্ত খাদ্য যাতে দেহের প্রয়োজনীয় পদার্থ বা উপাদান পরিমিত পরিমাপে উপস্থিত থাকে। এখন নিঃসন্দেহে আপনাদের জানতে ইচ্ছা করছে- কোন কোন পদার্থ বা উপাদান খাদ্যে থাকলে তাকে সুষম বলা যাবে, তাই না? সেটা না হয় ছড়ায় ছড়ায় বলি। সুষম খাদ্যের ছড়াটি হলো-

সুষম খাদ্যের ছয় উপাদান

নামগুলো তার শোনেন,

শর্করা আর প্রোটিন চর্বি

ভিটামিনটাও গোণেন

খনিজ লবণ আর পানি যে

এই খাদ্যেই রয়,

উল্লেখিত উপাদানে

সুষম খাদ্য হয়।

আমার আকাশের নক্ষত্র ছোট্ট বন্ধুরা এবার আমরা যে সব খাদ্যে সুষম খাদ্যের উপাদানগুলো পাই, সেগুলো নিয়ে কিছু বলি-

শর্করা বা শ্বেতসার :  শর্করা বা শ্বেতসার জাতীয় খাদ্য শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তি ও কাজ করার সামর্থ্য যুগিয়ে থাকে। এগুলোর মধ্যে আছে- চাল, গম, যব, পায়রা, গোলআলু, মিষ্টি আলু, মুখীকচু, কচু, চিনি, গুড় ইত্যাদি।

প্রোটিন বা আমিষ : প্রোটিন বা আমিষ জাতীয় খাদ্য শরীর গঠন ও এর ক্ষয় পূরণ করে। আপনারা যারা ছোট তাদের জন্য এই খাদ্য উপাদান সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়। দ্রুত বেড়ে উঠতে হলে পরিমাণ ও প্রয়োজন মত প্রোটিন বা আমিষ খেতে হবে। প্রোটিন ও আমিষ জাতীয় খাদ্যগুলো হচ্ছে- বিভিন্ন প্রকার মাছ, গোশত, হাস-মুরগির ডিম, কোয়েল পাখির ডিম, দুধ ইত্যাদি। এগুলো হলো প্রাণিজ আমিষ। কারণ এগুলো প্রাণী থেকে পাওয়া যায়। তেমনিভাবে উদ্ভিজ্জ আমিষ আছে- এগুলো উদ্ভিদ থেকে পাওয়া যায়। যেমন- হরেক পদের ডাল, শিম, বরবটি বিচি, মটরশুটি ইত্যাদি।

চর্বি বা তেল :   দেহের কর্মক্ষমতা সৃষ্টিতে সুষম খাদ্যের যে উপাদানটি সদা জাগ্রত থাকে সেটিই হলো চর্বি বা তেল। এগুলো হল-সরিষার তেল, সয়াবিনের তেল, তিলা তেলসহ অন্যান্য ভোজ্যতেল, ঘি, মাখন, তেল জড়ানো মাছ, গোশত ইত্যাদি।

খনিজলবণ      : খনিজলবণ আমাদের দেহের লৌহ ক্যালসিয়াম, আয়োডিন ও ফসফরাসের অভাব দূর করে। লৌহের অভাবে রক্ত তৈরি হয় না। ক্যালসিয়ামের অভাবে ছোট সোনামণিদের হাত-পা বেঁকে যায়, দাঁত, হাড় গঠন ও শক্ত করে। আয়োডিনের অভাব হলে গলায়, গলগণ্ড বা ঘ্যাগ রোগ হয়। ফসফরাস হাড় ও দাঁতের তন্তুকে তৈরি করে ও শক্ত করে। মাছ, গোশত, ডিম, কলিজা, কচুশাকে প্রচুর লৌহ থাকে। দুধ, দই, পনির দুধের তৈরি নানা খাবার, কাঁটাসহ ছোট মাছ, নেহারি বা নরম হাড়সহ বিভিন্ন শাকসবজিতে ক্যালসিয়াম থাকে। সামুদ্রিক মাছে প্রচুর পরিমাণে আয়োডিন থাকে। ইদানীং লবণে আয়োডিন মিশিয়ে দেয়া হচ্ছে। তাই আয়োডিনযুক্ত লবণ খেলেও আয়োডিনের অভাব দূর হবে। দুধ, পনির, ডিম, মাছ, গোশত, ভাল বাদাম ইত্যাদিতে ফসফরাস থাকে।

ভিটামিন বা খাদ্যপ্রাণ : ভিটামিন শরীরের জন্য অতিব জরুরি একটি উপাদান। যে উপাদানের পরিমিত উপস্থিতি শরীরকে নানা রোগের হাত থেকে রক্ষা করে সদা সুস্থ রাখে। বিভিন্ন ধরনের ভিটামিনের মধ্যে ভিটামিন এ, বি ও সি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোর অভাবে যথাক্রমে- রাতকানা, ঠোঁটের কোনায় ঘা, স্কার্ভি রোগ হয়। এ ছাড়া ভিটামিন ডি, ই এবং কে খুবই প্রয়োজনীয়। এসব ভিটামিন যেসব খাদ্যে পাওয়া যায়, সেগুলো নিম্নরূপ :

ডিম, কলিজা, মাছের তেল, মাখন, মলা ঢেলা মাছ, পাকা পেঁপে, পাকা আম, পাকা কাঁঠালসহ বিভিন্ন রঙিন সবজিতে ভিটামিন “এ” পাওয়া যায়। দুধ, ডিম, ভাতের মাড়, ডালিম, বড় কলা, শাকসবজিতে ভিটামিন “বি” পাওয়া যায়। সয়াবিন শিম, ব্রোকলি, ফুলকপি, পেয়ারা, আপেল, আঙুর, বরই, লেবু, আমলকী, জাম্বুরা, মিষ্টি মরিচ, কমলা, আম, জাম, আনারস, আমড়া ও টাটকা ফল ও বাঁধাকপিসহ শাকসবজিতে ভিটামিন “সি” পাওয়া যায়। যকৃতের তেল, ডিমের কুসুম, সামুদ্রিক মাছে ভিটামিন “ডি” পাওয়া যায়। সয়াবিন, ভূট্টা, বাধাকপি, বাদাম, তেল ও অলিভওয়েলে ভিটামিন “ই” পাওয়া যায়। ভিটামিন “কে” পাওয়া যায়-বাঁধাকপি, ফুলকপি, কলিজা, আলু, টমেটো ও গমে।

কি বন্ধুরা শুনলেন তো সুষমখাদ্যের উপাদান ও তাদের নাম। এসব খাদ্য উপাদান নিয়মিত খেতে হবে এবং শরীরকে পুষ্টিতে ভরে তুলতে হবে। তবেই সুস্থ থাকতে পারবেন ও ভালো থাকতে পারবেন। কিন্তু সুপ্রিয় বন্ধুরা বড়ই উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার বিষয় হলো- পৃথিবীতে অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের তিন-ভাগের দুই-ভাগের বসবাস মাত্র সাতটি দেশে। আর এই তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশের নাম। যা মোটেও ভালো কথা নয়। বাংলাদেশে প্রতি এক হাজার শিশু-কিশোরের মধ্যে ৫৪ জন অপুষ্টিতে মারা যায়। হাজারে ৪৩ জন শিশু বয়স অনুযায়ী বড় হয় না। এ খবর দিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্বখাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। ভিটামিন “এ” এর অভাবে প্রতিবছর ৩০-৪০ হাজার শিশু অন্ধ হয়ে যায়। আমাদের দেশে সুষমখাদ্যের অভাবে কী পরিমাণ পুষ্টি ঘাটতি রয়েছে তা একটি ছকের মাধ্যমে আপনারা সহজেই বুঝতে পারবেন, তাহলে অপর পৃষ্ঠার ছকটি দেখুনÑ

এই ছক থেকে সহজেই বোঝা যাবে- ডাল, সবজি, গোশত, দুধ ও ডিম যে পরিমাণে খাওয়া উচিত তার চার ভাগের-একভাগও আমরা খেতে পারি না। পুষ্টি ঘাটতির এমন ছক চোখে পড়লে কার ভালো লাগে বলুন। তদুপরি এই পুষ্টি ঘাটতির যারা সবচেয়ে বেশি শিকার তারা হল মা ও শিশু কিশোররা। শুনেতো আপনাদের মন আরো খারাপ হয়ে গেল, না? মন খারাপ করা যাবে না, বুদ্ধি করে এ পুষ্টি ঘাটতি আপনাদের মিটিয়ে ফেলতে হবে। তা না হলে হাড্ডিসার রোগ, রক্তস্বল্পতা, স্কার্ভি, রাতকানা, মুখে বা ঠোঁটের কোনায় ঘা, গলগণ্ড বা ঘ্যাগ বা গলাফুলা ইত্যাদি রোগ হতে পারে। যা আপনাদের ভাল থাকতে বাধা দিতে পারে। সেই জন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারগুলো সম্পর্কে জানতে হবে এবং হাতের নাগালে যেগুলো পাওয়া যায়, সেগুলো দিয়ে পুষ্টি চাহিদা মিটিয়ে ফেলতে হবে।

যেমন ধরুন- বেশি দামি আপেলে ভিটামিন “সি” থাকে ৪ মিলিগ্রাম আর দেশীয় ফল পেয়ারায় ভিটামিন “সি” থাকে ২১০ মিলিগ্রাম। সুতরাং আপেল বাদ দিয়ে বেশি বেশি পেয়ারা খেতে হবে। তেমনিভাবে আঙুরে ভিটামিন “সি” থাকে ২৯ মিলিগ্রাম আর বরইয়ে আছে ৫১ মিলিগ্রাম। তাই আঙুর বাদ দিয়ে বরই খাবেন। আঙুর আপেল খেতে না করছি না, তবে পুষ্টি জেনে বুঝে খেলে পুষ্টি ঘাটতি বাংলাদেশে থাকবে না। আপনারাও নিজেদেরকে রোগ ব্যাধি থেকে দূরে রেখে সদা ভালো থাকতে পারবেন। পড়ালেখায় মন দিয়ে নিজেকে গড়তে পারবেন। আলোকিত মানুষ হয়ে দেশ ও দশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারবেন।

ভোরের সূর্য আমার সুপ্রিয় বন্ধুরা ভালো থাকার মজার মজার খাদ্য খাবার নিয়ে অনেক গল্প হলো এবার পুষ্টিবিষয়ক একটি ছড়া বলেই শেষ করবো। ছড়াটির জন্য আপনাদের মগজে জায়গা রাখবেন এবং সেখানে ভালো করে সাজিয়ে রাখবেন। এটা আপনাদের কাছে আমার দাবি। ছড়াটি হলো –

দেশী ফলে পুষ্টি বেশি হাত বাড়ালেই পাও

পেয়ারা ও বরই, কলা, আমড়া,

কামরা খাও।

জাম্বুরা ও আমলকীটা বাদ দিও না খাওয়া

আম, লেবু আর আনারসে ভিটামিনে ছাওয়া।

পাকা পেঁপে, পাকা কাঁঠাল, পাকা জামে ভরাও মুখ

পাকা বেল ও ডালিম খেয়ে দেহ থেকে তাড়াও দুখ।

পাতে নেবে সবজি বেশি কাঁচা সালাদ চোল ভরে

ছোট মাছ কাঁটাসহ খেতে হবে ঝোল করে।

দুধ, ডিম খাবে দই, খাবে ভালো গোশত

নুনে, মাছে আয়োডিন খেলে পাবে জোশত।

জেনে বুঝে খেলে পরে মিটবেই পুষ্টি

আজ থেকে হয় যেন পুষ্টির হুঁশটি।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply