Home গল্প মশক ও ঘোটক

মশক ও ঘোটক

মশার সাথে মশার দেখা, ঘোড়ার সাথে ঘোড়ার। এখানে তার বিপরীত হলো, মশার সাথে পিঁপড়ের নয়, মৌমাছির নয়, ডাসের নয়, দেখা হলো তাগড়া ঘোড়ার সাথে। ঘোড়া ছিলো মাঠে আর মশা উড়ে যাচ্ছিল তার দলবলের কাছে। অন্ধকারে দামিকার মতো দেখাচ্ছিল ঘোড়াকে। ঘোড়াটি দাঁড়িয়ে ছিলো, মশার জানা ছিলো না ঘোড়া দাঁড়িয়ে ঘুমায়। সে উড়ে যেতে যেতে ঘোড়ার মাথার কাছে এলো।

–  কে গো তুমি?
ঘোড়া ঘুমিয়ে থাকার দরুন কোনো উত্তর দিলো না।
মশা মনে করেছিলো মাঠের মধ্যে হয় তো ছোট্ট কোনো ঘর বা খড়ের পালা হবে, মনে হচ্ছে এটা কোনো জন্তু। যে জন্তুই হোক জবান তো আছে, উত্তর দিচ্ছে না কেন? বয়রা নাকি? কে গো তুমি?
ঘোড়া এবার ঘুম জড়ানো চোখে তাকালো মশার দিকে, এত ছোট যে দেখাই যায় না, কিন্তু আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। আমাকে কে না চিনে? গাড়ি টানি, মানুষ আমার পিঠে সওয়ার হয়, পিঠে বস্তা নিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাই, তুমি আমাকে চিন না? কিন্তু আমিতো তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না।
আমি মশা।
তাই তো বলি। কথা কয়, দেখি না কেন?
হ্যাঁ আমিও তোমাকে দেখেছি অনেক আগেই, মনে করেছিলাম অন্য কিছু, তা দেখি ঘোড়া। মশা এবার তার ছোট্ট চোখ দু’টি মেলে ঘোড়ার লেজ, পিঠ, ক্ষুর সব দেখতে চেষ্টা করলো, এরপর তার মাথা, কানও দেখলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অন্ধকারে যতটুকু দেখা যায়। তারপর গুন গুন করে বললো, তুমি তো বিরাট হে বন্ধু।
ঠিকই বলেছ, তবে আমার চেয়েও বড় ঘোড়া আছে, ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে আমাকে খুব ছোট মনে হবে।
তা কেন? আমরা মশারা তো সব একই রকম, কোনো কোনো মশা অবশ্য একটু বড় হয়, কিন্তু ওদের শক্তি, সাহস, আয়ু কোনটাই আমাদের চেয়ে বেশি নয়।
চি-হি-হি করে উঠলো ঘোড়া।
অমন করছ কেন?
আরে ওটা আমাদের স্বভাব।
আমি তো তোমার মতো চি-হি-হি করতে পারি না। শেখাবে আমাকে? ঘোড়া এবার আরো জোরে হেসে উঠলো, বলে কি এই ক্ষুদ্র মশক। আমরা যখন হাসি, দাঁতের সবগুলো তখন বেরিয়ে যায়, মশার তো দাঁতই নেই, হাসবে কী করে?
কি আমাকে চি-হি-হি শেখাবে না।
যার যা সাজে না, তা নিয়ে ভাবনা করতে নেই।
আমি ছোট বলে অবহেলা করছ?
অবহেলার কথা নয় বন্ধু, হাসতে মুখ লাগে, দাঁত থাকতে হয়, সর্বোপরি হাসার জন্য শক্তির প্রয়োজন আছে।
আমি যথেষ্ট শক্তিশালী, বললো মশা।
ঘোড়া আবার হাসলো, তবে জোরে নয়, আস্তে।
আবার হাসছ?
আরে না শুধু দাঁত বের করেছি, তোমার  বোকামি দেখে আরো জোরে হাসতে ইচ্ছে হয়েছিল।
শক্তির কথা বলছি বলে, আমি কিন্তু প্রকৃতপক্ষেই শক্তিশালী
তুমি কি মৌমাছির চেয়ে শক্তিশালী, ডাসের চেয়ে, ফড়িং বা গোবরে পোকার চেয়ে?
এবার মশার রাগ হলো, সে বললো, তোমার আর আমার সাথে কথা হচ্ছে, সেখানে অন্য জাতের পোকা-মাকড় টেনে আনছ কেন?
তা হলে বলতে চাও, তুমি ঘোড়ার চেয়ে শক্তিশালী?
আমি উড়তে পারি, তুমি পার না।
আমরাও একদিন উড়তে পারতাম। পঙ্খিরাজ ঘোড়ার কথা শুনেছ, ওদের পাখা আছেÑ
আরে ওসব আজগুবি আর ভুয়া। মশা তার বুকে সামনের ছোট্ট দু’হাত রেখে সগর্বে জানালো। দেখ তুমি সাইজে বড় আর খাও বেশি কিন্তু মশাদের মতো শক্তিশালী নও।
ঘোড়ার শক্তি সম্পর্কে তোমার জানা নেই, এ জন্য এমন কথা বলছ। তোমাকে তো চোখেই দেখা যায় না, এইটুকু দেহ নিয়ে শক্তির বড়াই কর।
করি।
না, করতে পার না।
অবশ্যই পারি।
কোন দিনই না।
এইভাবে বেশ কিছু না। পারি। পার না আওয়াজ করছে ঘোড়া আর মশা। শেষে ঘোড়া বললো,
ঠিক আছে, তোমাদের শক্তির কথা বলছ, এটা আমি মেনে নেব যদি এর প্রমাণ দেখাতে পার।
মশা বললো, এ কথা বলো না বন্ধু।
প্রমাণ দেখাতে গেলে তোমার জীবন যাবে।
ঘোড়া পেছনের দু’পা তুলে শূন্যে লাথি মেরে আবার উচ্চস্বরে হেসে উঠলো।  ক্ষুদ্র কীট তুমি জান না, অশ্বের শক্তি কত। মানুষ যন্ত্র আবিষ্কার করেছে ঠিকই, কিন্তু এর শক্তির পরিমাপ করেছে অশ্বশক্তি দিয়ে।
মশা একটু ভাবনায় পড়লো, ঠিকই তো, সে তো সব জায়গায় যায়, ছাত্রদের পড়ার টেবিলেও তার যাতায়াত  আছে, বইয়ে এ রকমই লেখা আছে, ঘোড়া এটা জানলো কিভাবে? তবে সেও শুনেছে বাদশা নমরুদকে মশাই ভবলীলা সাঙ্গ করেছিলো।
চুপ করে আছ কেন? বললো ঘোড়া। ভয় পেয়েছ?
না। তবে তোমাকে আবার বলছি, আমার সাথে বাজি লাগিও না।
লাগাবই। একশ বার লাগাব।
ঠিক আছে, তা হলে দেখ। এই বলে মশা এক ধরনের শব্দ করলো, ঝাঁকে ঝাঁকে মশার দল এসে হাজির হলো ঘোড়ার চারিদিকে। তারা ঘোড়ার কানে, চোখের চারপাশে, পিঠে, পায়ের ওপর বসে পড়লো আর হুল দাবিয়ে দিল চামড়ার নিচে। ঘোড়া লাফাতে লাগলো কিন্তু একটা মশাও ঘোড়ার দেহচ্যুত হলো না। ঘোড়া মাটিতে গড়াগড়ি দিতে থাকলো, তাতে কিছু মশা মারা গেলো ঠিকই কিন্তু ঘোড়ারও ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে গেলো। পরদিন সকালে দেখা গেলো ঘোড়াটি মাঠের মধ্যে মরে পড়ে আছে, তার পাশে কিছু মশা, সেগুলো অনেকের চোখেই পড়লো না।

SHARE

2 COMMENTS

Leave a Reply