Home সাহসী মানুষের গল্প বয়স যখন আঠার

বয়স যখন আঠার

হযরত মুয়াজ!
মাত্র আঠার বছরেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
বয়সে যুবক। সাহসে বলীয়ান। তেজদীপ্ত!
হযরত মুয়াজের পিতা জাবাল ইবন আমর। মাতা হিন্দা বিনতু সাহল আল-জুহাইনিয়্যা।
বদরী সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনুল জাদ্দ (রা) তাঁর বৈপিত্রেয় ভাই।
মুয়াজের ছেলের নাম ছিল আবদুর রহমান। এ জন্য তাঁকে আবু আবদুর রহমান বলে ডাকা হতো।
মক্কা থেকে মদিনায় প্রেরিত রাসূলুল্লাহর (সা) দাঈই ইসলাম হযরত মুসয়াব ইবন উমাইরের (রা) হাতে নবুওয়তের দ্বাদশ বছরে হযরত মুয়াজ ইসলাম গ্রহণ করেন।
আঠার বছরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।
অর্থাৎ যুবক বয়সেই পেয়ে যান তিনি আলোর পরশ। তাঁর ইসলাম গ্রহণের পর পরবর্তী হজ মওসুমে মুসয়াব ইবন উমাইর মক্কায় চললেন। মদিনাবাসী নবদীক্ষিত মুসলমান ও মুশরিকদের একটি দলও হজের উদ্দেশ্যে তাঁর সঙ্গী হলো। হযরত মুয়াজও ছিলেন এই কাফেলার একজন সদস্য।
মক্কার আকাবায় তাঁরা গোপনে রাসূলুল্লাহর (সা) দিদার লাভ করে তাঁর হাতে বাইয়াত করেন। এটা ছিল আকাবার তৃতীয় বা শেষ বাইয়াত।
এই দলটি মক্কা থেকে ফিরে আসার পর মদিনার ঘরে ঘরে ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে পড়ে।
অল্প বয়স্ক মুয়াজ যখন মক্কা থেকে ফিরলেন, ঈমানী আবেগে তাঁর অন্তর তখন ভরপুর। কারো বাড়িতে মূর্তি থাকাটা তাঁর নিকট অসহনীয় ছিল।
মদিনায় ফিরে তিনি এবং তাঁর মত আরো কিছু যুবক সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁরা প্রকাশ্যে বা গোপনে যেভাবেই হোক মদিনাকে প্রতিমামুক্ত করবেন।
তাঁদের এই আন্দোলনের ফলে হযরত আমর ইবনুল জামুহ প্রতিমা পূজা ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করেন।
আমর ইবনুল জামুহ ছিলেন মদিনার বনু সালামা গোত্রের অতি সম্মানিত সরদার।
অন্য নেতাদের মতো তাঁরও ছিল একটি অতি প্রিয় কাঠের প্রতিমা। প্রতিমাটির নাম ছিল মানাত। এই প্রতিমাটির প্রতি ছিল আমরের অত্যধিক ভক্তি ও শ্রদ্ধা। তিনি অতি যতœসহকারে সুগন্ধি মাখিয়ে রেশমি কাপড় দিয়ে সেটি সব সময় ঢেকে রাখতেন।
মক্কা থেকে ফেরা এই তরুণরা রাতের অন্ধকারে একদিন চুপে চুপে মূর্তিটি তুলে নিয়ে বনু সালামা গোত্রের ময়লা-আবর্জনা ফেলার গর্তে ফেলে দেয়। এই উৎসাহী তরুণদের তিনজনের নামÑ
মুয়াজ ইবন জাবাল, আবদুল্লাহ ইবন উনাইস ও সালামা ইবন গানামা।
সকালে ঘুম থেকে উঠে আমর ইবন জামুহ যথাস্থানে প্রতিমাটি না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করলেন। এক সময় ময়লাÑআবর্জনার স্তূপে প্রতিমাটি মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে দেখে ব্যথিতকণ্ঠে বলেন : তোমাদের সর্বনাশ হোক! গত রাতে আমাদের ইলাহর সাথে কারা এমন আচরণ করলো?
তিনি প্রতিমাটি সেখান থেকে তুলে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে আতর-সুগন্ধি লাগিয়ে আবার যথাস্থানে রেখে দিলেন। প্রতিমাকে সম্বোধন করে বললেন : হে মানাত, আমি যদি জানতাম, কারা তোমার সাথে এমন আচরণ করেছে!
পরদিন রাতে আবার একই ঘটনা ঘটলো।
সকালে আমর খুঁজতে খুঁজতে অন্য একটি গর্ত থেকে প্রতিমাটি উদ্ধার করে ধুয়ে মুছে আগের মত রেখে দেন।
পরের রাতে একই ঘটনা ঘটলো। তিনিও আগের মত সেটি কুড়িয়ে এনে একই স্থানে রেখে দিলেন। এ দিন তিনি প্রতিমাটির কাঁধে একটি তরবারি ঝুলিয়ে দিয়ে বলেন :
“আল্লাহর কসম!
তোমার সাথে কে বা কারা এমন আচরণ করছে, আমি জানি না। তবে তুমি তাদের দেখেছো। হে মানাত, তোমার মধ্যে যদি কোন ক্ষমতা থাকে তুমি তাদের থেকে আত্মরক্ষা কর। এই থাকলো তোমার সাথে তরবারি।”
রাত হলো। তরুণরা আজও এলো।
তারা প্রতিমার কাঁধ থেকে তরবারি তুলে নিয়ে একটি মৃত কুকুরের সাথে সেটি বাঁধলো। তারপর প্রতিমাসহ কুকুরটি একটি নোংরা গর্তে ফেলে চলে গেল।
আমর সকালে খুঁজতে বেরিয়ে মূর্তিটির এমন দশা দেখে তাকে লক্ষ্য করে একটি কবিতা আবৃত্তি করেন। তার প্রথম লাইনটি এমন :
‘আল্লাহর কসম!
তুমি যদি সত্যিই ইলাহ হতে তাহলে এমনভাবে কুকুর ও তুমি এক সাথে গর্তে পড়ে থাকতে না।’
এভাবে আমর ইবন জামুহ মূর্তিপূজার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেন।
হযরত মুয়াজের ইসলাম গ্রহণের অল্পকাল পরে হযরত রাসূলে কারীম (সা) মদিনায় হিজরত করেন।
রাসূলে কারীম (সা) মুয়াজ ও আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের মধ্যে ভ্রাতৃ-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন।
মুয়াজ বিশ অথবা একুশ বছর বয়সে বদর যুদ্ধে যোগদান করেন। এরপর উহুদ, খন্দকসহ সকল যুদ্ধে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে যোগ দেন।
হযরত মুয়াজ রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় কুরআন মজিদ হিফজ করেন। রাসূলে কারীমের (সা) জীবনকালে যে ছয় ব্যক্তি কুরআন সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেন তিনি তাঁদের অন্যতম।
রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় বনু সালামার মহল্লায় একটি মসজিদ নির্মিত হলে হযরত মুয়াজ এই মসজিদের ইমাম নিযুক্ত হন।
একদিন তিনি ঈশার নামাযে সূরা বাকারাহ পাঠ করেন। পেছনে মুকতাদিদের মধ্যে ছিলেন কর্মক্লান্ত এক ক্ষেতমজুর। হযরত মুয়াজের নামাজ শেষ করার আগেই তিনি নামাজ ছেড়ে চলে যান।
নামাজ শেষে মুয়াজ বিষয়টি জানতে পেরে মন্তব্য করেন : সে একজন মুনাফিক।
লোকটি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট মুয়াজের বিরুদ্ধে নালিশ জানালো।
রাসূলুল্লাহ (সা) মুয়াজকে ডেকে বললেন : মুয়াজ! তুমি কি মানুষকে ফিতনায় ফেলতে চাও? তারপর তিনি বলেন : ছোট ছোট সূরা পাঠ করবে। কারণ, তোমার পেছনে বৃদ্ধ, দুর্বল ও ব্যস্ত লোকও থাকে। তাদের সবার কথা তোমার স্মরণে থাকা উচিত।
রাসূলুল্লাহ (সা) মুয়াজকে ইয়ামেনে পাঠালেন।
একদিকে তিনি ইয়ামেনের গভর্নর, অন্য দিকে সেখানকার তাবলিগ ও দ্বীনী তালিমের দায়িত্বশীলও। বিচারের দায়িত্ব ছাড়াও দ্বীনী দায়িত্বও পালন করতেন।
তিনি লোকদের কুরআন শিক্ষা দিতেন, ইসলামী বিধি-বিধানের প্রশিক্ষণ দিতেন।
তিনি ইয়ামেনে থাকাকালীন একবার হাওলান গোত্রের এক মহিলা তাঁর নিকট এলো। তার ছিল বারোটি ছেলে। তবে সবচেয়ে ছোট ছেলেটিও তখন শ্মশ্র“মণ্ডিত। এর দ্বারাই অনুমান করা যায় মহিলার বয়স কত হতে পারে।
স্বামীকে একা বাড়িতে রেখে বারোটি ছেলের সকলকে সঙ্গে করে সে এসেছে।
দুই ছেলে তার দু’টি বাহু ধরে চলতে সাহায্য করেছে।
মহিলা মুয়াজকে প্রশ্ন করলেন : আপনাকে কে পাঠিয়েছে?
রাসূলুল্লাহ (সা)।
আপনি তাহলে রাসূলুল্লাহর নির্বাচিত প্রতিনিধি? আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে চাই।
করুন।
স্ত্রীর ওপর স্বামীর হক বা অধিকার কতটুকু?
যথাসম্ভব আল্লাহকে ভয় করে তার আনুগত্য করবে।
আল্লাহর কসম, আপনি একটু ঠিক ঠিক বলবেন।
আপনি এতটুকুতে সন্তুষ্ট নন?
ছেলেদের বাবা বৃদ্ধ হয়েছে, আমি তাঁর হক কিভাবে আদায় করবো?
আপনি তার দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারেন না। যদি কুষ্ঠ রোগে তার দেহ পচে ফেটে যায়, রক্ত ও পুঁজ ঝরতে থাকে, আর আপনি তাতে মুখ লাগিয়ে চুষে নেন, তবুও তার হক পুরোপুরি আদায় হবে না।
হযরত রাসূলে কারীম (সা) গোটা ইয়ামেনকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করেন;
সানয়া, কিন্দাহ, হাদারামাউত, জানাদ, খুবাইদ।
ইয়েমেনের রাজধানী ছিল জানাদ, আর এখানেই থাকতেন হযরত মুয়াজ। তিনিই জানাদের জামে মসজিদটির নির্মাতা।
অবশিষ্ট চারটি স্থানে নিম্নলিখিত ব্যক্তিবর্গ শাসক নিযুক্ত হন :
সানয়াÑহযরত খালিদ ইবন সাঈদ, কিন্দাহÑহযরত মুহাজির ইবন আবি উমাইয়্যা, হাদারামাউতÑহযরত যিয়াদ ইবন লাবিদ এবং খুবাইদ ও উপকূলীয় এলাকায়Ñহযরত আবু মূসা আলÑআশয়ারী (রা)।
উপরোক্ত ব্যক্তিবর্গ নিজ নিজ এলাকায় সাদাকা, জিযিরা ইত্যাদি আদায় করে হযরত মুয়াজের নিকট পাঠিয়ে দিতেন।
রাজকোষের পূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন হযরত মুয়াজ।
হযরত মুয়াজ বিভিন্ন সময়ে তাঁর অধীনস্থ শাসকদের এলাকাসমূহ ঘুরে ঘুরে তাঁদের বিচার ও সিদ্ধান্তসমূহ দেখাশোনা করতেন। প্রয়োজনবোধে তিনি নিজেও মুকদ্দমার শুনানি করতেন।
একবার হযরত আবু মুসার অঞ্চলে গিয়ে  মুকদ্দমার শুনানি করতেন। আর একবার হযরত আবু মুসার অঞ্চলে গিয়ে মুকদ্দমার ফায়সালা করেন।
এসব সফরে তিনি তাঁবুতে অবস্থান করতেন।
আবু মুসার এখানেও তাঁর জন্য একটি তাঁবু নির্মাণ করা হয়। তিনি ও আবু মুসা দুই জনই পাশাপাশি তাঁবুতে অবস্থান করেন।
হযরত রাসূলে কারীম (সা) যখন মুয়াজকে ইয়েমেনে পাঠান তখন তাঁকে একটি লিখিত নির্দেশনামা দান করেন।
তাতে গনিমত, খুমুস, সাদাকাত, জিযিয়াসহ বিভিন্ন বিধানের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। হযরত মুয়াজ সব সময় তারই আলোকে কাজ করতেন।
একবার এক ব্যক্তি একপাল গরু নিয়ে এলো। গরুর সংখ্যা ছিল তিরিশটি।
রাসূল (সা) তাঁকে তিরিশটি গরু থেকে একটি বাছুর নেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এ কারণে হযরত মুয়াজ বললেন : আমি রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে না জেনে কিছুই গ্রহণ করবো না। কারণ এ ব্যাপারে রাসূল (সা) আমাকে কিছুই বলেননি।
এ দ্বারা বোঝা যায় রাসূলুল্লাহর (সা) ওয়ালিগণ দুনিয়ার অন্যান্য শাসকদের মত অত্যাচারী ছিলেন না। রক্ষক ও রক্ষিতের মাঝে যে সম্পর্ক ইসলাম ঘোষণা করেছিল, তারা সব সময় তা স্মরণে রাখতেন। আর রক্ষকের ওপর শরিয়ত যেসব দায়িত্ব অর্পণ করেছে তারা তা কঠোরভাবে অনুসরণ করতেন। বিচার ও সিদ্ধান্তের সময়ও জনগণের অধিকার যাতে খর্ব না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। তাদের আদালতসমূহে সর্বদা সত্য ও সততার বিজয় ছিল।
এক ইয়াহুদি মারা গেল। একমাত্র ভাই রেখে গেল উত্তরাধিকারী। সেও ইসলাম গ্রহণ করেছিল।
বিষয়টি হযরত মুয়াজের আদালতে উত্থাপিত হলো। তিনি ভাইকে উত্তরাধিকার দান করেন।
হযরত মুয়াজ ছিলেন জীবনের প্রথম থেকে অতি বুদ্ধিমান। রাসূল (সা) মদিনায় আগমনের পর তিনি তাঁর সঙ্গ অবলম্বন করেন।
অল্প কিছু দিনের মধ্যে তিনি ইসলামী শিক্ষার সর্বোচ্চ মডেলের রূপ লাভ করেন এবং বিশিষ্ট সাহাবীদের মধ্যে পরিগণিত হন।
হযরত রাসূলে কারীম (সা) তাঁকে এত মুহব্বত করতেন যে, অধিকাংশ সময় তাঁকে নিজের বাহনের পেছনে বসার সুযোগ দিয়ে নানা রকম ইলম ও মারেফাত শিক্ষা দিতেন।
একবার তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) বাহনের পেছনে বসেছিলেন।
রাসূল (সা) ডাকলেন : মুয়াজ।
তিনি আবার ডাকলেন : মুয়াজ।
তিনিও অত্যন্ত আদব ও শ্রদ্ধার সাথে জবাব দিলেন।
এভাবে রাসূল (সা) তিনবার ডাকলেন, আর মুয়াজও প্রতিবার সাড়া দিলেন।
তারপর রাসূল (সা) বললেন : যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে কালিমা-ই-তাওহিদ পাঠ করে আল্লাহ তার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম করে দেন।
মুয়াজ আরজ করলেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ!
আমি মানুষের কাছে এই সুসংবাদ কি পৌঁছে দেব?
তিনি বললেন : না। কারণ, মানুষ আমল ছেড়ে দেবে।
হযরত মুয়াজের প্রতি রাসূলুল্লাহর (সা) স্নেহের এত আধিক্য ছিল যে, তিনি নিজে কোনো প্রশ্ন না করলে রাসূল (সা) বলতেন, তুমি একাকী পেয়েও আমার কাছে কিছু জিজ্ঞেস করছো না কেন?
মুয়াজ (রা) মাত্র আঠার বছরে ইসলাম গ্রহণ করে সত্যের পতাকাতলে আশ্রয় নিয়েছিলেন আর সারাটি জীবনই কাটিয়ে দিয়েছিলেন সেই সত্যের আশ্রয়ে।
মিথ্যা তাকে কখনো গ্রাস করতে পারেনি।
পারেনি তাকে কোনো প্রকার অন্ধকার ছুঁতে।
সত্যের সৈনিকরাতো এমনই হয়! তাদের জীবন হয় আলোঝলমল তারার মেলা। যে জীবন দুনিয়া ও আখিরাতে বয়ে আনে সফলতার ঢল।
আমরাও প্রত্যাশা করি তেমনই জীবন!
চেষ্টা করি যেন সর্বদা সত্যের সাহসী সৈনিক হওয়ার জন্য।

SHARE

Leave a Reply