Home গল্প বাবু স্যার

বাবু স্যার

আফজাল আনসারী

স্কুলে প্রথম দিন এসেই অবাক হলাম। একজন গুণী স্যার, চেহারা সুরত চমৎকার। মুখে দাড়ি। হালকা পাতলা গড়ন, চোখে চশমা। পাঞ্জাবি ও ধুতি পরেন। নাম অনিথ বাবু। ইংরেজি শিক্ষক, বড় কড়া। ছেলেরা তাকে দেখলে থর থর কাঁপে। স্যারের চলা-ফেরার মধ্যে একটা কৌলিন্য ভাব। মাঝে মধ্যে দেখি স্যারের ধুতির লম্বা অংশ পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকিয়ে রাখেন।

স্কুলে গুণী শিক্ষক ঐ একজনই। তবে অফিস দফতরি হিন্দু। এ দু’জন ছাড়া হিন্দু আর কেউ নেই। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অনেক হিন্দু আছে। এরা ঠিক আমাদের বন্ধুর মত। আমরা ওদের সাথে খুবই অন্তরঙ্গভাবে মিশি। আমার এক ক্লাস উপরে পড়েন আব্বাস মামা, আব্বাস মামাও অনিথ স্যারকে মারাত্মক ভয় করেন। আব্বাস মামাই স্কুলে স্যার সম্পর্কে আমাকে প্রথম ভয় দেখালেন। সেই থেকে অজ্ঞাত ভয় আমাকে পিছু তাড়া করে।

ছাত্রদেরকে ইংরেজি বানান ভুলের জন্য যেভাবে স্যার পেটাতেন তাতে সত্যিই আমাদের পিলে চমকে যেত। একদিন মার খেল আমার পাশের এক ছেলে। মারার পূর্বে স্যার ছেলেটার হাত টিপে দেখলেন। আমাকে দেখিয়ে বললেন, দেখ তো কেমন মুটে মজুরি মার্কা শক্ত হাত। এ হাতে কলম চলবে না, লাঙল চষগে। এরপরই সেই পিলে চমকানো মার। ভাবছি ঐ বেতের এক ঘা কোনমতে আমার শরীরে এসে পড়লেই আমার হাড় মাংস এক হয়ে যাবে।

পড়া না পারলে ক্লাস মিস করারও জো নেই। তাহলে স্কুল পলায়নজনিত কারণে প্রহারের মাত্রা দ্বিগুণ-তিনগুণ-চতুর্গুণ হতো।

স্যার হিন্দু হলেও মুসলমান ছাত্রদের যথেষ্ট স্নেহ করতেন। আমরা স্যারকে দেখলেই হাত উঁচু করে বলি আদাব স্যার। স্যারও মহা খুশি। মুসলমানদের সালাম পদ্ধতির খুব প্রশংসা করতেন।

মসজিদের নিকট দিয়ে গেলে কোন কাগজ, ময়লাপাতা দেখলে তা দূরে ফেলে দিতেন। মুসলমান সমাজের সামাজিক নানা আচার অনুষ্ঠান স্যার পছন্দ করতেন। মাঝে মধ্যেই বলতেন, দেখ তো সকাল বেলা উঠলেই তাদের দাঁতন করে খুব ভোরে অজু করে নামাজ পড়তে হয়। কাউকে দেখা হলে সুন্দর সালাম দেয়। কত সুন্দর নিয়ম এগুলো!

ক্লাসে সবসময় রোল নম্বর ১ হতো। তাই স্যারও আমাকে যথেষ্ট স্নেহ করতেন। একদিন কী কারণে অনিথ স্যারের পা ছুঁয়ে সালাম করলাম। স্যার আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, আফজাল আমার গৌরব। আমিও স্যারকে দেখলেই অন্তত দশ হাত দূর দিয়ে চলি। কোন সময় দেখা হলেই থমকে দাঁড়িয়ে যাই। স্যার অনুমতি দিলেই তবে হাঁটি। মাথায় ছাতা থাকলে সাথে সাথে তা বন্ধ করে ফেলি। যদি কখনও সাইকেলে চড়তে গিয়ে স্যারকে দূরে দেখে ফেলি, আর কথা নেই সেখানেই নেমে পড়ি। আমাকে সাইকেলে চড়ার অনুমতি দিলেই সাইকেলে চড়ি।

স্যারের মেজাজটা বরাবরই খিটখিটে। তবে আমার আব্বার সাথে উনার সখ্য অনেক। সেই সময় দেখতাম বেশ রসিক। একদিন রাজশাহী টিটি কলেজে গিয়েছি। ওখানে আব্বার সাথে ঐ স্যারও থাকেন একই রুমে। জন্মের পর বুদ্ধি হয়ে ঐ প্রথম আব্বাকে সেখানে দেখা করতে গেলাম। তখন হয়তো বয়স হবে পাঁচ কি ছয়। সেই সময় আমি দু-এক বছরের সন্তান। বাবু স্যার আমাকে কোলে করে আদর করলেন। আব্বা আমার মাথায় একটু পানি দিয়ে মাথা ভিজিয়ে চিরুনি করলেন। এরপর আব্বার সাথে দশ বছর সাক্ষাৎ নেই। বেশ বড় হয়ে গেছি।

বাবু স্যারের স্নেহ পেলেই কেবল পিতার কথা মনে হয়। সেই রাজশাহী টিটি কলেজের কথা মনে পড়ে। স্যারকে নিঃসঙ্কোচে আমি অনেক কথা বলার সাহস দেখাতাম, যা অন্য কেউ পারতো না। স্যার একদিন একটা নতুন ফতুয়া গায়ে স্কুলে এলেন। পায়জামা-পাঞ্জাবির বদলে প্যান্ট আর সেই ফতুয়া গায়ে ক্লাসে এলেন। শিক্ষকগণ সবাই হাসাহাসি করতে লাগলেন। ছাত্ররাও মিটি মিটি হাসছে, তবে আড়ালে।

এরপর স্যার আমাদের ক্লাসে এলে আমি আর আমার সহপাঠী নিজাম উদ্দীন যথেষ্ট প্রশংসা করলাম। স্যার বললেন, এটা নাকি তিনি নিজেই বানিয়েছেন। আগে এক সময় স্যার খুব নামকরা দর্জির কাজ জানতেন তাও বললেন।

খুব সকালে দেখতাম স্কুলের এক রুমে তিনি ছেলেদের ইংরেজি শেখাচ্ছেন। স্যারের খাবার এনে দিত সকাল আটটার পর, তাও বাড়ি থেকে। আমাদের ক্লাসে স্যার কেবল ব্যাকরণের নাম্বার, জেন্ডার, ভয়েস পড়িয়েই বছর পার করতেন। কাজেই ওগুলোতে ভুল করতাম না। এখনও মনে হচ্ছে স্যার কেবল বোর্ডে Voice লিখে যাচ্ছেন আমরা তা খাতায় তুলছি। ডাস্টার রেখে তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে আমার দিকে তাকাচ্ছেন।

SHARE

2 COMMENTS

Leave a Reply