Home গল্প বন্ধু হলো হুলো

বন্ধু হলো হুলো

জুবাইদা গুলশান আরা

ঘটনাটা ঘটেছিলো আমাদের কাছাকাছি। একদিন বিকেল বেলায়। গাড়ি রাখার গ্যারাজে মস্ত বড় টিনের ছাদ। ছাদের ওপর কিছু ফুলের টব সাজানো রয়েছে। রোদ্দুরের নিচে ফুলগুলো হেলে দুলে নাচতে থাকে। বাতাস এসে ফুলগুলোকে আদর করে যায়। আর ঐ সব টবের ছায়ায় হাত-পা ছড়িয়ে ঘুম লাগায় কে জানো? আমাদের প্রতিবেশী হুলো বিড়ালটা। ছাদটা ওর প্রিয় জায়গা। সারা পাড়ায় ঘোরাফেরা করে চড়ুই পাখিদের তাড়া করে ভয় দেখিয়ে এখানে ওখানে বিনা দাওয়াতে নিমন্ত্রণ খেয়ে সে দুপুর বেলায় এখানে হাত-পা ছড়িয়ে আরাম করে। সঙ্গে মাঝে মাঝে সাদা রঙের আর একটা বন্ধু থাকে। অন্য কেউ এলে গায়ের লোম ফুলিয়ে, ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে হোঁয়াও হোঁয়াও করে যুদ্ধ ঘোষণা করে সে। মাঝে মধ্যে আবার কী যে তর্ক জুড়ে দেয় নিজেদের মধ্যে, তা বলার নয়। দুপুর বেলাটা সরগরম হয়ে ওঠে ওদের ঝগড়াটে কথার ধাক্কায়। তবুও ওদের আমি বন্ধু বলেই মনে করি। কেন জানো তোমরা? আমার পড়ার টেবিলের কাছে একটা জানালা আছে। ঐ জানালায় তাকালে নীল আকাশ, ছাই রঙের মেঘেরা, সাদা সাদা শুঁড় তোলা মেঘ, সব দেখতে পাই। পাড়ার ছোটরা নিচের ফাঁকা জায়গায় হুল্লোড় করে খেলে। ওখানে একটা নিমগাছ দাঁড়িয়ে বাতাসে ডালপালা দোলায়। নিমগাছটার পাতাগুলো ভারী সুন্দর। চড়–ই পাখির কিচিরমিচির, বুলবুলির শীষ, সবই শোনা যায় ওখানে। তবে দুষ্টু কাকগুলো যখন কা কা করে শোর তোলে, তখন আমাদের হুলো বেড়াল যায় ক্ষেপে। বারবার তাড়া করে কাকগুলোকে ভাগায়। সত্যি বলতে কী এত বেশি তাড়া খেলে কি আর কাকের আরাম থাকে? বাধ্য হয়ে অন্য কোথাও গিয়ে হাঁকডাক জুড়ে দেয় ওরা। ওদের ভাবখানা যেন ইস কী একজন মানুষ বসে বসে লেখালেখি করছে। তার জন্য এখানে হইচই করা নিষেধ। পড়–য়া বন্ধুরা, ভেবে দেখ, পড়ার সময় কানের কাছে কাকের ডাক কি ভালো লাগে? সেই জন্য আমি আমার প্রতিবেশী হুলো বিড়ালকে ধন্যবাদ জানিয়ে দিই। ও বেশ মনোযোগী শ্রোতা। মাঝে মধ্যে আমি যদি কবিতা পড়তে থাকি, ও কান খাড়া করে শোনে। এপাশ-ওপাশ কাত হয়ে, চিৎ হয়ে, আরামে গালে হাত রেখে মনোযোগ দিয়েই শোনে। মাঝে মধ্যে ওর পিঠে হাত দিতে ইচ্ছে করলেও ওর কাছে যাওয়ার উপায় নেই। অনেকটা ঘুরে যেতে হয় ওর ছাদের আস্তানায়। তবে যতক্ষণ বন্ধুত্ব আছে এটা কোন ব্যাপার নয়। কারণ ও দেখি প্রায়ই আমার পড়ার ঘরের জানালার সঙ্গে পাকা জায়গায় শুয়ে দিব্যি ঘুম লাগায়।

আম্মা, বিড়ালটা পুষি? পুষতে দাও না? খুব আবদার ধরেছিলো আমাদের ছোটো বোন ঝুমুর।

আম্মা বললেন, না, না ওকে ওর মতো থাকতে দাও। বাড়ির মধ্যে নয়। ও স্বাধীনভাবে থাকুক।

একদিন বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে দেখি, ঝুমুর জানালার কাছে বসে হুলোটার সামনে বাটিতে দুধ দিয়েছে, রুটি দিয়েছে। আর আপন মনে কথা বলে যাচ্ছে কলকল করে। বুঝুক না বুঝুক, চোখ বুজে শুনে যাচ্ছে হুলো। মাঝে মাঝে ম্যাঁও ম্যাঁও করে সমঝদারের মতো সায় দিচ্ছে। ভাবখানা যেন, সব কথাই সে মন দিয়ে শুনছে।

বিড়ালদের সঙ্গে খেলা, তাও আবার জানালার মধ্য দিয়ে। বেশ জমে উঠেছিলো আমাদের বন্ধুত্ব। কিন্তু বিড়ালদের ঝগড়া, তাদের খেলা, প্রজাপতির পেছনে দৌড়োনো এসব নিয়ে যতই মেতে উঠি না কেন, পরীক্ষা তো ভালো করে দিতে হবে! এক বিকেলে আম্মা মুখ কালো করে জানতে চাইলেন,

সৌরভ, দু’দুটো দুধের বাটি জানালার সিলের ওপরে, তাও তোমার পড়ার টেবিলের সামনে রাখা। কার কাণ্ড বলোতো? দু’ভাই বোনে এসব নিয়ে খুব ব্যস্ত বুঝি? তাই তো আমি দেখি হাঁড়িতে দুধ কম লাগে কেন? কোথাকার রাস্তা ঘোরা বিড়াল, তার জন্য এত কাণ্ড?

না আম্মু, আমরা তো বেশি দুধ দিই না, অল্প একটু …, ঝুমুরের কথার মাঝখানে ভীষণ রেগে গেলেন আম্মা।

ঝুমুর চুপ করো। আমাকে লুকিয়ে দু’দুটো বিড়ালকে দুধের হাঁড়ি খালি করে খাওয়ানো হচ্ছে, আবার মুখে মুখে কথা! এবার ঐ হতচ্ছাড়া বিড়ালদের দেখাচ্ছি মজা। ঢিল মেরে যদি না তাড়াই। লেখাপড়া ছেড়ে বিড়াল নিয়ে মাতামাতি। রেগে আম্মা দুম দুম করে ঝাঁটার খোঁজেই গেলেন বোধ হয়।

স্কুল থেকে ফিরে বইয়ের ব্যাগ টেবিলে রেখে অভ্যাস মতো জানালার বাইরে তাকিয়ে ডাক দিলামÑ কোথায় রে হুলো? অন্য দিন ডাক শুনে আরামের ঘুম ছেড়ে পা টান করে উঠে বসে তাকায় হুলো। কিন্তু আজ সে কোথাও নেই। হায় হায় গেল কোথায়? সাদা হুলোই বা কোথায়? গ্যারাজের ছাদে ফুলের টবে প্রজাপতিরা উড়ছে নির্ভয়ে। কাকদের রাগী গলা শুনে অবাক হয়ে দেখি, কেউ ওদের তাড়া করে যাচ্ছে না। চারদিকে কেমন থমথমে, সুনসান ভাব। হঠাৎ যে কেন আমার কান্না পেয়ে গেল কে জানে? বুয়ার কাছে জিজ্ঞেস করলাম, বুয়া, বিড়াল … মানে আমাদের ঐ দিকের ছাদে যে বিড়াল থাকে … সেগুলো কোথায়?

অগো আম্মায় তাড়াইয়া দিছে। কইছে ঝুমুর আপু খালি হাত দিয়ে ধরতে চায়! অসুখ বিসুখ হইতে পারে। রাস্তার বিড়াল না? তাই ঢিল মাইরা তাড়াইয়া দিছে।

ওদের তো কোন দোষ নেই বুয়া! ওরা তো চুরি করেনি। আমরাই দুধ খেতে দিয়েছিলাম।

হ হ বুঝছি। বিড়াল দুইডা মাইর খাইয়া কী কান্দন! যাইতে চায় নাই…। কিন্তু আম্মায় থাকতে দেন নাই। আমারও খুব মায়া লাগছে ভাইজান। কাইন্দেন না। বুয়া চোখ মুছে বলে।

কাকদের চিৎকারে লিখতে পড়তে পারি না।

ওদের যেন কত ফুর্তি!

ঝুমুরের খুব মন খারাপ।

বেশ কিছুদিন চলে গেছে। গ্যারাজের ছাদটা খাঁখাঁ করে। চড়ুইরা লুকোচুরি খেলে। কিন্তু আমি ভেবে পাই না, বড়রা কেন ছোটদের মনের কথা বুঝতে পারেন না। শেষ অবধি আব্বা বললেন, দুটো খরগোশ এনে দেবো। পুষবে? খুব সুন্দর দেখতে।

আমি খরগোশ চাই না। বলে উঠি আমি। তারপর উঠে চলে যাই পড়ার টেবিলে।

বিকেল বেলায় পাড়ার ছোটরা আমাদের বাসার পাশে এক টুকরো সবুজ জায়গায়  ছোটাছুটি করে খেলে। ঝুমুর ওর প্রিয় নরম ডল পুতুলটা কোলে নিয়ে খেলা দেখছিলো। হঠাৎ কোথা থেকে ছুটে এলো একটা রাগী কুকুর। আর পুতুলটাকে কামড়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই একটা অবাক কাণ্ড ঘটে গেল। কোথা থেকে ছুটে এলো আমাদের হুলো আর সাদা বিড়াল। কুকুরটার সামনে দু’জনেই যুদ্ধের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে সে কী ভীষণ গোঁ গোঁ শব্দ করে এমন চেঁচামেচি জুড়ালো যে, কুকুরটা ভড়কে গেল। যে পুতুলটা সে ছিনতাই করতে চেষ্টা করেছিলো, সেটা ফেলে দিয়ে সে পিছু হটলো, আর দৌড়ে পালালো রাস্তার ওপারে। হুলোটা তখন, বিড়ালরা যেমন করে নিজেদের ছানা নিয়ে যায়, তেমনি দাঁত দিয়ে কামড়ে পুতুলটা এনে ফেলে দিলো ঝুমুরের সামনে। ঝুমুর এক লাফে পুতুলটা কোলে তুলে নিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বাসায় ফিরলো।

হুলো আর তার বন্ধু এখন আগের মতোই ছাদের আস্তানায় জায়গা পেয়েছে। আম্মা এখন ওদের ওপর রাগ করবেন কি, নিজেই ওদের খাবার বাটি এনে দিয়েছেন। মজার কথা কি জানো? ওদেরকে ঘরের ভেতরে নিয়ে আসতে চাইলেও ওরা আসেনি। ওরা আসলেই স্বাধীন থাকতে ভালোবাসে। আমার জানালার সামনে বসে বসে ঘুম তো আছেই। তাছাড়া মস্ত ছাদটা জুড়ে ফুলের টবের চারপাশে প্রজাপতি আর চড়–ই পাখির সঙ্গে দারুণ খেলোয়াড়ি চলে হুলো আর তার বন্ধুর। দুপুর বেলায়, অথবা সকালের নরম রোদে ওদের হাত-পা ছড়িয়ে শোয়ার যে আরাম, তা দেখে আমার হিংসেই হয়।

এই যে আমি ওদের কথা লিখছি না? কানে আসছে ওদের মহা তর্ক-বিতর্ক। একজন যদি বলে, হোঁয়াও! অন্যজন বাধা দিয়ে থাবা উঁচু করে বলে হিঁয়াও।

এরকম দেখলে বোঝা যায়, ওরা খুব জরুরি কোন বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলছে। কখনও বা দুই থাবা উঁচু করে দাঁড়িয়ে যখন শব্দ করে, এক্কেবারে মানুষের মতই দেখতে লাগে। আসলেই, পশু-পাখির জন্য মনের মধ্যে আদর থাকলে তাদের মনের কথাও বোঝা যায়। যেমনটি ঘটেছে আমাদের বিড়াল বন্ধুদের বেলায়। একটু চেষ্টা করলেই তোমরাও বুঝতে পারবে।

SHARE

Leave a Reply