Home উপন্যাস গুপ্তধন

গুপ্তধন

এক.


কালকিনি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠ। মাঠে খেলা করছে অনেক ছাত্র-ছাত্রী। কেউবা আবার খেলা দেখছে। মঈন ওদেরই একজন। মাঠের পূর্ব কোণে বসে খেলা দেখছে আপন মনে। ক্লাস শুরু হতে আরও বিশ মিনিটের মতো বাকি। তাই সবাই খেলছে নিশ্চিন্তে। কোন কারণে মঈন আজ খেলায় অংশ নেয়ার পরিবর্তে দর্শকের মতো খেলা দেখছে। এর অর্থ এই নয় যে সে খেলাধুলা পারে না। সেরা সাঁতারু হিসেবে বেশ সুনাম রয়েছে ওর। গত বছর আন্তঃস্কুল প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। প্রধান শিক্ষক ওকে ব্যক্তিগতভাবে পুরস্কার দিয়েছিলেন।

যাহোক, হঠাৎ পিঠে জোরে এক থাপ্পড় অনুভব করল। কাঁদতে গিয়েও কাঁদল না। কারণ কান্নাটা হবে রীতিমতো বাচ্চা ছেলের কাণ্ড। তাই বহু কষ্টে নিজেকে সামলে নিলো। পেছনে ফিরে দেখল লম্বা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সজল, ওরই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এভাবে চড়, থাপ্পড় আর ঘুষি মেরে দেখা করাই ওর নিয়মিত অভ্যাস। দু’জন দু’জনকে জড়িয়ে নিল। অনেক দিন পর দেখা হয়েছে ওদের। সজল বলল, তোর সাথে কথা আছে, টিফিন পিরিয়ডে দেখা করবি।

টিফিনের ঘণ্টা পড়ার সাথে সাথে দু’জন মিলিত হল। সজল মঈনকে ওদের বাড়ি যাওয়ার নিমন্ত্রণ জানিয়ে বিদায় নিলো।

স্কুল ছুটি শেষে মঈন বাড়িতে গিয়ে বইগুলো রেখে মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে সজলদের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হল। পথিমধ্যে ওর মামাতো ভাই কাওছারের সাথে দেখা হয়। ওর সাথে গল্প করতে করতে প্রায় সন্ধ্যা পেরিয়ে যায়। সজলদের বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় আটটা বেজে যায়। তাই এশার নামাজ পড়ে নিলো ওদের ঘরেই।

রাত ১০টার দিকে খাওয়া-দাওয়া করল ওরা। মঈন চলে যাওয়ার ব্যস্ততা নিয়ে হুমড়ে পড়ল। সজলের মা থাকার জন্য বেশ অনুরোধ করল। অবশেষে মঈন রাজি হল। কারণ, পরদিন শুক্রবার। সজল ওর আম্মুকে ফোন করে জানিয়ে দিল। ফলে, মঈন রাতটা সজলদের বাড়িতেই কাটাল।

সকালবেলা নাস্তা করে মঈন ও সজল ওদের বন্ধু ইমনদের বাড়ি রওনা হল। ওরা গ্রামের মেঠো পথ পেরিয়ে দক্ষিণ দিকের জঙ্গলের সরু পথ দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। জঙ্গল পার হলেই ইমনদের বাড়ি। তাই এই পথ দিয়ে এল ওরা। জঙ্গলটা বিভিন্ন প্রকার লতা-পাতা আর গাছপালায় পরিপূর্ণ। কোন কোন অংশ একেবারে স্যাঁতসেঁতে। বৃষ্টি হলে এ পথ দিয়ে হাঁটাই যায় না। হঠাৎ ওরা একটা গাছ ভেঙে পড়ার শব্দ শুনতে পেল। কিন্তু কোন দিকে পড়ল বোঝা গেল না। তাই দু’জন দুই দিকে হাঁটতে শুরু করল। ওরা ভাবল, বোধ হয় দুর্বৃত্তরা গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে।

হঠাৎ মঈনের চিৎকার শুনে পশ্চিম দিকে এগিয়ে গেল সজল। দেখল একটা গাছ উপড়ে পড়ে আছে। কিন্তু আশপাশে কোন লোকজন নেই এমনকি গাছটি কাটার চিহ্নও নেই। কোন ঝড়-বন্যা নেই। কিন্তু গাছটি পড়ল কেন? নানা প্রশ্ন জন্ম দিল ওদের মনে। সন্দেহ জাগল। হঠাৎ একটা মাটির ঢিবি চোখে পড়ল ওদের। একটা লাঠি দিয়ে খুঁড়তে আরম্ভ করলো। একটা আবরণ দেখল এক হাত মাটির নিচে। বিসমিল্লাহ বলে ওটাকে উপরে তুলে আনল। ভয়ে ভয়ে খুলল আবরণটা। দেখল একটা ছোট্ট বাক্স। ওরা ভাবল কোন ধনসম্পদ লুকিয়ে আছে এর ভেতরে। বাক্সটা খুলতেই দেখতে পেল সোনালি রঙের একটা চাবি। আর একটা ভাঁজ করা কাগজ। কাগজটি প্রায় নষ্ট হওয়ার উপক্রম। কিন্তু এই চাবি কাগজ এখানে এল কিভাবে? প্রশ্নের সমুদ্রে হাবুডুব খেল ওরা। দু’জনে ভাবতে লাগল।

সজল, দেখতো চাবিটার গায়ে এগুলো কী লেখা? বলল মঈন।

গঙ্গ প: প্রাসাদ। বলল সজল।

এর মানে কী?

এই নকশাটা কিসের?

এতো দেখছি একটা বাড়ির ছবি আঁকা। আবছা আবছা বোঝা যাচ্ছে।

দোস আমার মনে হয় কোন গুপ্তধনের সন্ধান পেয়ে যাচ্ছি।

আগের দিনের রাজা-বাদশারা মাটির নিচে ধন-সম্পদ লুকিয়ে রাখত। আমার মনে হয় আমরাও কোন গুপ্তধনের সন্ধান পাব।

কিন্তু এই চাবির গায়ে যা লেখা রয়েছে এর অর্থ তো বের করতে হবে। নকশাটা কিসের তাও বের করতে হবে।

আজ আর ইমনদের বাড়ি যাওয়ার দরকার নেই। কালকে সময় পেলে যাব।

মঈন, তুই কালকে এগুলো নিয়ে আমাদের বাগানবাড়ি চলে আসবি। দেখি কোন সমাধান বের করা যায় কি না।

পরদিন দুপুরবেলা সজলদের বাগানবাড়িতে সমবেত হল ওরা। দু’জন বেশ ভাবুক মনে বসে আছে। সজল বলল, মঈন এগুলো নিয়ে চল তারানাথ তান্ত্রিকের কাছে যাই। তান্ত্রিক খুবই জ্ঞানী এবং ধ্যানী লোক। উনি সমাধান করতেও পারে।

সজলের প্রস্তাবে রাজি হল মঈন।

তারানাথ তান্ত্রিক থাকেন বিলের ওপরের জঙ্গলের মাঝখানে। এখানে থাকার কারণ হচ্ছে ধ্যান-সাধনায় কোন সমস্যা যাতে না হয়। বেশ সুনাম আছে তারানাথ তান্ত্রিকের। কিন্তু চোর-ডাকাতরা প্রায়ই হামলা করে তার ওপর। কিন্তু কিছুই করতে পারে না। কেউ কেউ বলে থাকে তান্ত্রিক খুবই খারাপ লোক। তার অনেক লোভ আছে। সে লোভ ধন সম্পদের প্রতি। যাহোক এসবে বিশ্বাস করে না মঈন ও সজল।

সন্ধ্যা নেমে এসেছে। হাঁটছে অনবরত ওরা। একসময় বিল পেরিয়ে জঙ্গলের কাছাকাছি পৌঁছাল। মাগরিবের আজান শুনতে পেল ওরা। ভয়ে ওদের বুক দুরু দুরু করতে লাগল। তান্ত্রিকের কাছে গিয়ে বাড়ি ফিরবে কখন? বাড়ির লোকজন তো চিন্তা করবে। সজল বলল, এসেছি যখন কাজটা শেষ করেই যাই।

তান্ত্রিকের বাড়ির কাছে আসতেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল ওরা। পুরো বাড়ি অন্ধকার। তান্ত্রিকের কোন সাড়া শব্দ নেই। ভয় পেয়ে গেল ওরা। খুব জোরে জোরে ডাকতে শুরু করল। তবুও কোন সাড়াশব্দ নেই। হঠাৎ জঙ্গলের ভেতর থেকে শব্দ এল।

তান্ত্রিক আসার পর সব ঘটনা খুলে বলল ওরা। তান্ত্রিকের কাছে ওরা জিনিসগুলো দিল। তারপর জানতে চাইল চাবিটার গায়ে লেখা শব্দগুলোর অর্থ। তান্ত্রিক বলল, গঙ্গাছড়ার বনের ভেতর একটা প্রাসাদ আছে। আর এই নকশাটা দ্বারা ওই প্রাসাদের বিভিন্ন অংশ চিহ্নিত করা হয়েছে। এই চাবিটি দিয়ে প্রাসাদের প্রধান দরজা খুলতে হবে।

বোঝার আর বাকি রইল না ওদের।

তান্ত্রিক জিজ্ঞেস করল, এগুলো তোরা কোথায় পেলি? তার চোখ দিয়ে যেন আগুন বের হচ্ছে।

ওরা ভয় পেয়ে গেল। বুঝতে পারল তান্ত্রিক এগুলো ফেরত দেবে না। সজল খুব জোরে তান্ত্রিকের চোখ বরাবর ঘুষি মেরে ওগুলো নিয়ে দরজা ভেঙে মঈনকে নিয়ে পালাল। তান্ত্রিক যেন কী বিড়বিড় করে বলতে আরম্ভ করল। ওরা দেখল ওদের পেছনে অদৃশ্য কী যেন ছুটছে। লাফ দিয়ে একটা ঝোপের আড়ালে লুকালো ওরা। সে যাত্রায় কোন মতে বেঁচে গেল ওরা।

পরদিন সকালে মঈন আর সজল সব বন্ধুকে নিয়ে মিটিং করল। গঙ্গাছড়ার বনে যাওয়ার জন্য ঈমন, ফাহিম আর রুবেলকে নির্বাচিত করা হল। ওরা পাঁচজন বিশেষ আলোচনায় বসল নকশাটা নিয়ে।

সজল বলল, মূল রহস্য মূলত এই নকশার মাঝেই লুকিয়ে আছে।

ঈমন বলল, দোস, চাবিটা যখন পেয়েছি সামনের দিকে এগুতে দোষ নেই। সাসেক্স ভ্যাম্পায়ার উপন্যাসে পড়িসনি একটি মাত্র চাবির সাহায্যে কত বড় রহস্যের সন্ধান বের করেছিলেন মি: হোমস।

রুবেল বলল, আমরা কোন অপরাধ করতে যাচ্ছি না। মনে হয় দেশের জন্য কিছু করতে যাচ্ছি।

আলোচনা শেষে সবাই সিদ্ধান্ত নিল গঙ্গাছড়ার বনে শিগগিরই অভিযান চালানো হবে। কিন্তু ভয়ও পেল। গত বছর ঐ বনে কাঠ কাটতে দরিদ্র আজমল আলী লাশ হয়ে ফিরে এসেছে। কয়েকদিন আগে গফুর কাকার ছেলের লাশ পাওয়া গেছে একটা গাছের ডালে। গ্রামের সবাই বলেছে ভূত এসব কাজ করেছে। তাই এখন লোকজন বনের ভেতরের দিকে আর যায় না। বাইরে থেকেই চাহিদামত কাঠ সংগ্রহ করে সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসে।

দুই.


বার্ষিক পরীক্ষার আর মাত্র এক মাস বাকি। তাই সবাই পরবর্তী শুক্রবার যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। ইমন বলল, যাওয়ার জন্য আমাদের কিছু পূর্ব প্রস্তুতি দরকার।

খুব শিগগিরই প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো সংগ্রহ করা হবে, মঈন প্রস্তাব করল।

কী কী দরকার হবে? জানতে চাইল ফাহিম।

সজল বলল, যেহেতু নদী পার হয়ে যেতে হবে তাই নৌকা অবশ্যই দরকার হবে। তাছাড়া এখন প্রায় বর্ষাকাল। তাই নৌকাটা সবচেয়ে বেশি জরুরি।

মঈন বলল, নৌকা সংগ্রহ করা কোন সমস্যা হবে না। আমাদের পুকুরে পানিতে একটা নৌকা ডোবানো আছে। ওটা ঠিক করলেই হবে। বাবা সাধারণত এটা ব্যবহার করেন না। তাছাড়া আমি বললে বাবা কিছু বলবেন না।

ফাহিম বলল, শুনেছি বনটিতে নাকি অনেক হিংস্র প্রাণী থাকে যা আমাদের ক্ষতি করতে পারে। তাই প্রত্যেককেই একটা ধারালো ছুরি এবং একটা রড অথবা বর্শা নিয়ে আসতে হবে। ফলে আমরা ঐসব প্রাণীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারব। প্রয়োজনে কামারের কাছ থেকে সংগ্রহ করব।

প্রত্যেকের কাছেই একটা টর্চ লাইট থাকতে হবে। বলল রুবেল।

মঈন বলল, টর্চ লাইট লাগবে কেন? আমরা রাতে অভিযান করব না কি? রাতে অভিযান করা কি সম্ভব?

রুবেল বলল, রাতেই অভিযানে যেতে হবে। কারণ, দিনের বেলায় লোকজন দেখতে পারে। তাছাড়া, সক্রিয় প্রাণীরা দিনের বেলায় অবাধে বিচরণ করে। তাই আমাদের প্রতি আক্রমণটা একটু বেশি হতে পারে।

ইমন বলল, ঠিক রাতেই রওনা দেব না। আমরা রওনা দেব সন্ধ্যার একটু আগে। কারণ নদী পেরিয়ে গঙ্গাছড়ার বনে পৌঁছাতে প্রায় দুই ঘণ্টা লাগবে।

বৃহস্পতিবার সকাল দশটার মধ্যেই সবাই উপস্থিত হল মঈনদের বাগানবাড়িতে। এ যেন রীতিমতো ফুলের গন্ধে মৌমাছির আকর্ষণ। সবার মাঝে একটা উচ্ছল ভাব যেন কিছু পেয়ে যাচ্ছে শিগগিরই। অপেক্ষার পালা শেষ হয় না। যা যা আনার কথা ছিল সবই জমা পড়ল মঈনের সামনে। একটা পাটের বস্তা মুড়িয়ে সেগুলো রেখে দিল স্যাঁতসেঁতে একটা ঝোপের ভেতরে যাতে কেউ দেখতে না পায়। সবাইকে জানিয়ে দেয়া হল শুক্রবার বিকেলে জায়গামতো উপস্থিত হতে।

সকলের প্রস্থানে বাগানবাড়ি শূন্য হল। সবার মধ্যে কেমন যেন একটা ভাব। জীবনের এক বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে যাচ্ছে এই অল্প বয়সে। ভাবতেই অবাক লাগে সবার কাছে। তাছাড়া জীবনে এত বড় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ কেউ করেনি কখনো। আর মঈন, সজল তো গোয়েন্দাগিরি খুবই পছন্দ করে। নির্দিষ্ট সময়ে অর্থাৎ আসর নামাজের পর সবাই মিলিত হল। বাবাকে ম্যানেজ করতে গিয়ে বাড়িতে একটু দেরি হয়েছিল ফাহিমের।

বস্তাটা খুলে অস্ত্রগুলো হাতে নিল সবাই। টিপ টিপ পায়ে নিঃশব্দে পুকুরের উত্তর দিকের বাবলা গাছের সাথে বাঁধা নৌকাটার কাছে গেল সবাই। অস্ত্রগুলো আপাতত নৌকার মাঝখানে রাখা হল। বিশেষভাবে সংরক্ষণের প্রয়োজন মনে করল না। বিসমিল্লাহ বলে সবাই নৌকার বিভিন্ন জায়গায় চেপে বসল। সামনের দিকে একটা বৈঠা নিয়ে বসল ফাহিম। একেবারে পেছনে হাল ধরে বসে রইল সজল। মাঝখানে বসে রইল বাকি তিনজন।

পুকুর পানিতে ভরপুর। তাই খুব সহজেই নিঃশব্দে নৌকা নিয়ে বের হয়ে গেল ওরা। একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে এগুচ্ছে ওরা। পুকুর থেকে বের হয়েই মহা ঝামেলায় পড়ল ওরা। ছোট্ট খালটির সমস্ত জায়গায় বড় বড় কচুরিপানা পরিপূর্ণ। খুব কষ্টে বের হল খাল থেকে। নদীতে প্রবেশ করল নৌকা। ততক্ষণে আকাশের বুকে মেঘের আনাগোনা শুরু হয়েছে। বর্ষাকালে যেটা সাধারণ ব্যাপার। ওদিকে ততটা গুরুত্বসহকারে খেয়াল করল না ওরা। হঠাৎ বাতাস জোরে বইতে শুরু করল।

নদীতে ঢেউ উথলে উঠেছে। সফেন তরঙ্গ আঘাত হানে ওদের মনে। যাত্রা বুঝি এখানেই শেষ। জীবন সায়াহ্নে বোধ হয় পৌঁছে গেছে ওরা। কিন্তু হার মানার পাত্র নয় খুদে পাঁচ গোয়েন্দা। আল্লাহকে স্মরণ করতে করতে এগুতে লাগল ধীরে ধীরে। পানি ছিটকে পড়ছে নৌকায়। ভিজে যাচ্ছে ওদের শুকনো দেহ। তবুও এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। ওরা পাঁচজনই বৈঠা নিয়ে প্রস্তুত হল। নৌকা চলতে লাগল ঢেউয়ের ওপর দিয়ে দুলতে দুলতে। পাল লাগিয়ে দিল নৌকার এক প্রান্তে। আরও গতি বাড়ল।

অবশেষে ঘণ্টাখানেক লড়াইয়ের পর নদী পার হয়ে গঙ্গাছড়ার বনের কাছাকাছি পৌঁছল ওরা। প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। সূর্যের অস্তমিত দৃশ্যই তা প্রকাশ করছে। নৌকাটিকে একটা গাছের সাথে শিকল দিয়ে বেঁধে দিল ভালভাবে। নৌকাটি ডুবিয়ে রাখল সন্তর্পণে যাতে কেউ দেখতে না পায়। এরপর সবাই বসে বিশ্রাম নিল। এদিকে বন পেরিয়ে দূরের গ্রাম থেকে ভেসে এলো আজানের ধ্বনি। সবাই অজু করে ওখানেই নামাজ পড়ে নিল। ঘন অন্ধকার গ্রাস করল ওদেরকে। টর্চ লাইট ছাড়া কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। যেন প্রত্যেকেই এক একটা অদ্ভুতাকার কালো অশরীরী। সবার মনে ভয়ের আঁচড় লাগতে শুরু করল। সবাই যেন কী ভাবল। তারপর উপরের দিকে উঠতে আরম্ভ করল। একেবারে বক্র পথ। হাঁটা খুবই মুশকিল।

একে অন্যকে ধরে ওপরের দিকে ধীরে ধীরে উঠছে। হঠাৎ পেছন থেকে পড়ে গেল ফাহিম। ভয়ে চিৎকার দিল। ফাহিমকে শান্ত হতে বলল সজল। এরপর সবাই ওপরে উঠল এবং সজল ফাহিমকে ওপরে তুলে আনল।

বনের অন্যপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচ কিশোর। স্বস্তি নেই কারও মাঝে। চিন্তার সাগরে ডুবে আছে সবার মস্তিষ্ক। পকেট থেকে নকশাটা বের করল মঈন। টর্চ মেরে কিছু বোঝার চেষ্টা করল। কিন্তু নকশা দেখে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। তাই সিদ্ধান্ত নিল নকশা ছাড়াই খুঁজে বের করবে রাজপ্রাসাদ যেখানে আছে অমূল্য গুপ্তধন। ওরা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানেই একটা সরু পথ দেখতে পেল। তাই নতুন করে আর কোন পথের সন্ধান করার চেষ্টা করল না। ওই পথ দিয়েই হাঁটতে শুরু করল সবাই। চারপাশে শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার। চারপাশে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। চারপাশ একেবারে নিস্তব্ধ। মাঝে মাঝে শোনা যায় ডাহুক পাখির ডাক কিংবা কোন মায়াহরিণের আর্তনাদ। সব মিলিয়ে এক ভৌতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। মনে হয় যেন মিলিয়ে গেছে কোন অচেনা জগতে। মাটি স্যাঁতসেতে হওয়ায় বিভিন্ন প্রকার বিচ্ছু আর পোকামাকড় পায়ের ওপর উঠতে চেষ্টা করছে। ওসবের দিকে খেয়াল নেই কারও। হঠাৎ ওদের সামনে দিয়ে একটা খরগোশের বাচ্চা দৌড় দিল। টর্চ মারার সাথে সাথে বনের ভেতরে হারিয়ে গেল। আরও কয়েকটি বাচ্চা এভাবে ওদের সামনে দিয়ে চলে গেল। মঈন যেন কিসের মচমচ শব্দ শুনতে পেল। টর্চ মারল পাশের ঝোপে। দেখতে পেল বিশালাকৃতির এক সাপ একটা বড় ধরনের ইঁদুর লুফে নেয়ার চেষ্টা করছে। টর্চের আলো পড়ায় ইঁদুরটা প্রাণে বেঁচে গেল। সাপটাও এতগুলো মানুষ দেখে লুকিয়ে গেল আড়ালে।

হাঁটতে শুরু করল আবার। হঠাৎ মঈনের টর্চ পড়ল ফাহিমের কাঁধে। কালো রঙের কী যেন দেখতে পেল। কাছে গিয়ে বুঝতে পারল একটা জোঁক রক্ত খেয়ে ফুলে গেছে। ফাহিম ভয় পাবে বলে ব্যাপারটা বুঝতে দিল না। তাই অগোচরে আগুন দিল ওর ঘাড়ে। জোঁকটা পড়ে গেল আর ফাহিম সামান্য ব্যথা পেল। কিন্তু মেনে নিতে বাধ্য হল। এছাড়া যে কোন উপায় নেই।

অনেক পথ হাঁটল ওরা। কোন কিছুই বুঝতে পারছে না কতদূর এসেছে বা কতদূর আর যেতে হবো। একটা গাছের নিচে গোল হয়ে বসল ওরা। সবাই খুব ক্লান্ত। তাই একটু বিশ্রাম নেয়ার চেষ্টা করল। ঘড়ির দিকে তাকাল ইমন। রাত দশটা বেজে গেছে। ক্ষুধা পেয়েছে সবার। তাই হাল্কা কিছু খাবার খেয়ে নিল ওরা। হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে ওদের সামনে কী যেন আছড়ে পড়ল। ভয়ে সবাই জড়াজড়ি করে রইল। কিছুক্ষণ পর টর্চ মারল রুবেল। দেখতে পেল একটা রক্তচোষা বাদুড় পড়ে আছে মাটিতে। সমস্ত দেহে রক্তের ছাপ আর মুখ দিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে। দাঁতগুলো করাতের মতো। বাদুড়টিকে পাশেই ফেলে দিল। ওপরের দিকে টর্চ মারল সবাই। লম্বা আকৃতির একটা গাছের অস্তিত্ব ছাড়া আর কিছুই দেখা গেল না। ওরা এ নিয়ে ভাবল না। আবার সবাই পথ দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। এবার আরও সতর্কভাবে হাঁটছে। বনের গভীরে চলে এসেছে ওরা। যেকোন মুহূর্তে বিপদ আসতে পারে। যেকোনো হিংস্্র প্রাণী আক্রমণ করতে পারে অতি সহজেই। বাতাসের স্পর্শে ওদের শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেছে। শিউরে উঠেছে শরীর। কিন্তু ওরা চলমান। কেউ কারো সাথে কথাও বলছে না। সবাই যেন আনমনা হয়ে আছে। হঠাৎ থেমে গেল মঈন। কারণ জানতে চাইল ফাহিম। সামনে কোন রাস্তা নেই। কিন্তু চারপাশে অসংখ্য গাছ দানবের মত দাঁড়িয়ে আছে। এই বুঝি গোগ্রাসে গিলে নেবে সবাইকে। সামনে একটা পুকুর। টর্চের আলোয় পুকুরের ওপারে একটা ভাঙা প্রাচীর দেখতে পেল ওরা। বোঝার বাকি নেই যে ওটাই সেই রাজপ্রাসাদের দেয়াল। বহু বছরের অযতেœ এই রূপ ধারণ করেছে। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হল। একটু পর বিপদ আরও বাড়ল। পুকুর পার হবে কিভাবে? বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে আকাশে। বৃষ্টির পানিতে কাদায় পরিণত হচ্ছে মাটি। এমনিতেই স্যাঁতসেঁতে তার ওপর আবার বৃষ্টির পানি।

টর্চগুলো নিরাপদে রাখল বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। সবাই জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ চোখ পড়ল পুকুরের দিকে। চারপাশে বৃষ্টি হচ্ছে কিন্তু পুকুরের অংশটিতে কোন বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে না। ব্যাপারটা দেখে ভয় পেয়ে গেল সবাই। একটা ঝোপের আড়ালে লুকাল কিছু অনভিপ্রেত জিনিস দেখার জন্য। হঠাৎ পুকুরের মাঝখান থেকে ধোঁয়া উড়তে শুরু করল। কুণ্ডলী পাকিয়ে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। বেশ অদ্ভুত লাগছে দেখতে। ভয়ে বুক দুরু দুরু করতে লাগল সবার। হঠাৎ ধপাস করে পুকুরের মাঝখানে কী যেন আছড়ে পড়ল। এক অশরীরী কুচকুচে কালো দেহ আস্তে আস্তে জেগে উঠছে পুকুরের ভেতর থেকে। পানির ওপর স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে আছে। পুকুরে প্রচণ্ড ঢেউ শুরু হল। চারপাশের গাছপালা আছড়ে পড়ছে পুকুরের পানিতে। এসব দেখে ভয়ে চিৎকার দিল ফাহিম, ইমন ও রুবেল। ওদের মুখ চেপে ধরল সজল ও মঈন। অশরীরীটি ওদের দিকে তাকাল কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না। কিছুক্ষণের মধ্যে সেটি মিলিয়ে গেলে পুকুরের অভ্যন্তরে। পুকুরের ঢেউও থেমে গেল।

এবার মঈন প্রস্তাব করল পুকুর সাঁতরে ওপারে যাওয়ার জন্য। সজল রাজি হলেও বাকিরা রাজি হল না। কান্না শুরু করে দিল সবাই। কোনমতে থামিয়ে মঈন বলে, আমরা এখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এসেছি। হার মানা আমাদের ঠিক হবে না। তাছাড়া আমরা কাছাকাছি চলে এসেছি।

ওর কথায় সবার বোধোদয় হল। রাজি হল সাঁতার দেয়ার জন্য।

পুকুরের এপার থেকে ওপারের দূরত্ব সামান্য।

ভয়ে ভয়ে পুকুরের পারে এল সবাই। তারপর একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ল পুকুরের পানিতে। খুবই ঠাণ্ডা পানি। কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না। খুব কষ্টে ওপারে গিয়ে পৌঁছাল মঈন ও সজল। রুবেল ও ইমন কাছাকাছি চলে এসেছে। কিন্তু ফাহিমের কোন সাড়াশব্দ নেই। সবাই মিলে ডাকতে শুরু করল। অবশ্য একটু পরই তাকে দেখা গেল।

এতক্ষণে বৃষ্টি থেমে গেছে। প্রাচীরের কাছে এল সবাই। একটা ভাঙা ও স্যাঁতসেঁতে দেয়াল। ওটা টপকে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। কয়েক গজ দূরেই দানবের মতো দাঁড়িয়ে আছে বহু বছরের পুরনো, জীর্ণশীর্ণ সেই রাজপ্রাসাদ। ধীরে ধীরে এগুচ্ছে সবাই। প্রাসাদটির সামনের অংশটি কাদায় পরিপূর্ণ। তাতে বিভিন্ন প্রকার পোকামাকড়। খুব সতর্কতার সাথে বারান্দায় পৌঁছাল ওরা।

তিন.


প্রস্তুত সবাই প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে। চাবিটি বের করল সজল। গেটের তালা খুলল। ভেতরে প্রবেশ করল সবাই। টর্চ মারতেই একটা অদ্ভুত প্রাণী দৌড় দিল ওদের সামনে দিয়ে। এমন প্রাণী আগে কখনও দেখেনি কেউ। উপরের দিকে টর্চ মারতেই বিকট শব্দ করে উড়ে গেল অদ্ভুত আকারের কয়েক হাজার পাখি। বন তোলপাড় করে তুলল রীতিমতো। এভাবে রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে চলে গেল দূরদিগন্তে। ওদিকে আর তাকানোর চেষ্টা করল না খুদে গোয়েন্দারা। ভেতরের পরিবেশ যে কী ভয়ঙ্কর হবে তা বাইরে থেকেই বোঝা যাচ্ছে। যাহোক পা টিপে টিপে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা চালাল। বারান্দার কাছ থেকে বিভিন্ন দিকে অনেক পথ চলে গেছে। কোন দিকে যাবে বুঝতে পারল না। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করতে তো হবেই। তাই বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল রুবেল, ফাহিম ও ইমন আর সজল, মঈন ভেতরে প্রবেশ করল।

দেয়ালগুলোতে বিভিন্ন প্রকার প্রাণীর ছবি আঁকা। মনে হচ্ছে যেন জাদুঘরে প্রবেশ করেছে। স্যাঁতসেঁতে একটা গন্ধ আসছে চারপাশ থেকে। বিভিন্ন প্রাণীর গলিত দেহ পড়ল ওদের সামনে। সেগুলো উপেক্ষা করে এগিয়ে চলল। ভেতরে অনেক দূর পর্যন্ত প্রবেশ করল। এরপর একটা দরজা দেখতে পেল। একটা রড দিয়ে তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করল। মাকড়সার জালে ওদের হাত পা জড়িয়ে গেল। কিন্তু কোন সমস্যা হল না। টর্চ মারার সাথে সাথে কয়েকটি চামচিকা উড়ে গেল জানালা দিয়ে।

পুরো রুমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধরনের মূর্তি। এক কোণে একটা মোটা পাণ্ডুলিপি দেখতে পেল। সেটা হাতে তুলে নিল। এতে বিভিন্ন ধরনের দিকনির্দেশনা দেয়া আছে। এই নির্দেশনা অনুসারে ওরা দক্ষিণ দিকের একটা রুমে প্রবেশ করল। ঐ রুমটিতে কিছু ধাতব মূর্তি পেল। সঙ্গে করে নিল ওগুলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই গুপ্তধন পেতে যাচ্ছে ওরা। মনে আর আনন্দ ধরে না।

পশ্চিম দিকে একটা সিঁড়ি দেখতে পেল ওরা। টর্চ জ্বেলে নিচের দিকে নামল। নামতেই এক করুণ সুর ভেসে এল। কিন্তু দ্বিতীয়বার আর শুনতে পেল না। তাই ভয়ে ওই রুমে আর প্রবেশ করল না। এবার উপরে উঠে পাণ্ডুলিপিটা ভালভাবে দেখে নিল। দোতলায় উঠতে লাগল সিঁড়ি বেয়ে। উপরে উঠে পূর্ব দিকের রুমগুলো দেখতে পেল তালা মারা। এবার ওরা বুঝতে পারল এ রুমগুলোতেই বোধ হয় গুপ্তধন সঞ্চিত আছে। এই গুপ্তধন উদ্ধার করতে পারলে দেশের উপকার হবে আর ওরাও রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত হবে। ওদের বীরত্বগাঁথা ছড়িয়ে পড়বে সারা দেশে। রুমগুলো বাইরে থেকে অবলোকন করছে মঈন ও সজল। প্রচণ্ড আর্তনাদে থেমে গেল ওরা। দৌড়ে নেমে এল সিরি থেকে। দেখতে পেল এক বিশাল দানব রুবেল ও ইমনকে চেপে ধরেছে। লোহার রড ও টর্চ জ্বেলে বন্ধুদের বাঁচাল ওরা। তারপর দৌড়ে ভেতরের দিকে ঢুকে পড়ল। প্রতিজ্ঞায় রত হল দানবটিকে মারার জন্য। কারণ, গুপ্তধন উদ্ধারের ক্ষেত্রে বনের এই দানবটি ওদের বাধা দেবেই। দানবটিকে মারতে হবে তারপর গুপ্তধন বের করতে হবে। হঠাৎ দূর থেকে ভেসে এল গর্জন আর হুঙ্কার। গাছপালা ভেঙেচুরে কী যেন তেড়ে আসছে প্রাসাদের দিকে। জানালা ভেঙে পেছন দিয়ে বেরিয়ে পড়ল ওরা দু’জন। চোখ দু’টি আগুনের মত জ্বলজ্বল করছে অশরীরীর। প্রাণপণে ছুটল সামনে দিকে। এই মুহূর্তে টর্চ লাইটও জ্বালাতে পারছে না ওরা। তাই অন্ধকারেই দৌড়াতে আরম্ভ করল। পেছনের দিকে তাকানোর সময়ও নেই।

হঠাৎ মাথার ওপর আঘাত অনুভব করল।

কিছু বোঝার আগেই জ্ঞান হারাল।

চার.


যখন জ্ঞান ফিরল তখন নিজেদেরকে দেখতে পেল একটা ঝোপের ভেতর। চাপরপাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে ফিঙে পাখির দল। কিচিরমিচির শব্দ করছে বুনো হাঁসগুলো। প্রচণ্ড ব্যথায় কাতরাচ্ছে পাঁচজন। গায়ে বিভিন্ন অংশে কাঁটার চিহ্ন। মনে হয় যেন টেনেহিচড়ে ছিঁড়ে ফেলেছে দেহ। খুব সাবধানে ঝোপের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। এই মুহূর্তে ক্ষুধায়ও প্রাণ যায় যায় অবস্থা। কিন্তু খাবার তো নেই যা ছিল তাও শেষ হয়ে গেছে। নিরুপায় হয়ে হাঁটতে শুরু করল। বনের ভেতরে অনেকক্ষণ ঘুরে ফিরে কয়েকটি বাতাবি লেবু আর বেল সংগ্রহ করল। তারপর ওগুলো খেয়ে নিল। অনেক ক্লান্ত দেহটাক একটু বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ দিল। আস্তে আস্তে মনে পড়ল গত রাতের সব ঘটনা। ইতোমধ্যে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। দূর থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। পকেটে হাত দিয়ে দেখল টর্চ লাইট ঠিকই আছে। আবার রওনা দিল সেই রহস্যময় রাজ প্রাসাদের দিকে যেখানে হাতছানি আছে অমূল্য রত্ন-ভাণ্ডারের। মাইলখানেক হাঁটার পর দানবটার চিন্তা মাথায় ঢুকল। দানবটাকে ঘায়েল করতে না পারলে গুপ্তধন উদ্ধার করা যাবে না। আগের মত আর নদী সাঁতরাতে হল না। অন্য পথ দিয়ে চলে এসেছে রাজপ্রাসাদের কাছাকাছি। কিন্তু অবাক হল ওরা। রাজপ্রাসাদের সামনে যে প্রাচীর ছিল তার অস্তিত্বও নেই। সব ভেঙেচুরে গেছে। তাছাড়া প্রাসাদের দেয়ালের বিভিন্ন অংশে রয়েছে আঘাতের চিহ্ন। মনে হয় কোন জেট বিমান 1000 KMS-1 বেগে দেয়াল ভেদ করে চলে গেছে। যাহোক এসব নিয়ে ভাবার সময় নেই। দানবটাকে মারার বুদ্ধি নিয়েই এখন ভাবতে হবে।

প্রস্তুতি নিতে শুরু করল ওরা। বনের ভেতর থেকে বর্শা দিয়ে দু’টি বানর সংগ্রহ করল। এরপর এদেরকে জবাই করে রক্ত সংগ্রহ করে একটা গাছের নিচে রাখল। গাছের বিশ হাত উপরে একটা বড় কাঠের বাক্স বেঁধে রাখল রশি দিয়ে। মঈন রশি ধরে রাখল আর সজল গেল দানবটির খোঁজে। কিন্তু তাকে আর বেশি দূর যেতে হল না। দানবটি চলে এসেছে কাছাকাছি। মঈন প্রস্তুত হল। রক্তের কাছে আসতেই রশি ছেড়ে দিল। ঠিক দানবটির মাথা বরাবর পড়ল। ক্ষণিকের জন্য মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। ওরা ভাবল মারা গেছে। কিন্তু ঝড়গতিতে সবকিছু ভেঙেচুরে এগিয়ে এল ওদের দিকে। দৌড়ে পালাল পাঁচ কিশোর। দানবটি ছুটল ওদের পিছু। ওরা চোরাবালির কাছাকাছি চলে এসেছে। বিপদ বুঝতে পেরেছে দানবটি। তাই সরে পড়ল ওখান থেকে। বেঁচে গেল পাঁচ কিশোর। বেশ চিন্তায় পড়ল ওরা। কিভাবে এটাকে মারা য়ায়। ভাবতে ভাবতে প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করল। হঠাৎ দেয়ালের সাথে একটা বাক্স দেখতে পেল। ওটা খুলেই একটা পাণ্ডুলিপি দেখতে পেল। তালপাতার একটা পাণ্ডুলিপি। কিছু লেখা রয়েছে ওটিতে। পড়তে আরম্ভ করল মঈন। লেখা রয়েছে, সামনের পুকুরের পশ্চিম দিকে একটা গাছের নিচে লোহার খাঁচায় রয়েছে একটা পাখি। ঐটা মারতে পারলেই আমার শত্রু ধ্বংস হবে। আগামাথা কিছুই বুঝতে পারল না ওরা।

মঈন বলল, আমার শত্রু মানে কী বোঝানো হয়েছে?

সজল বলল, মনে হয় এখানকার রাজার সাথে এই দানবটার শত্রুতা ছিল।

মঈন বলল, আমারও তাই মনে হয়।

সজল বলল, চল আমরা পাখিটির খোঁজে বের হই।

পুকুর সাঁতরে ওরা পশ্চিম কোণে পৌঁছল। খাঁচাটার কাছে পৌঁছাতেই পাখিটা মায়াবী সুরে ডাকতে শুরু করল। এদিকে দানবটাও আসতে শুরু করেছে। খাঁচাটা নিয়ে দৌড়াতে শুরু করল ওরা। পাখিটার চেঁচামেচিও বেড়ে গেছে ততক্ষণে। ওরা একটা ঝোপের মধ্যে চলে গেল। বর্শা দিয়ে আঘাত করল পাখিটির গায়ে। তারপর খাঁচাসহ পানিতে ফেলে দিল পাখিটাকে। এদিকে দানবটা প্রচণ্ড আর্তনাদ করতে শুরু করল। আর্তচিৎকারে সমস্ত বনের পশুপাখি কেঁপে উঠেছে। তারপর হাওয়ার সাথে মিশে গেল দানবটি। এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল পাঁচ বন্ধু। এবার নিশ্চিন্তে গুপ্তধন সংগ্রহ করা যাবে। দ্রুত চলে গেল রাজপ্রাসাদের সিঁড়ি বেয়ে, তড়িঘড়ি করে উঠে গেল দোতলায়। নির্দিষ্ট রুমগুলোর কাছে চলে গেল ওরা। রড দিয়ে প্রথম রুমটার তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করল। রুমে প্রবেশ করতেই ওদের চক্ষু ছানাবড়া। অনেক বাক্স সজ্জিত রয়েছে রুমের ভেতরে। প্রতিটি বাক্সই পরিপূর্ণ রয়েছে স্বর্ণ, হীরা আরও নানা প্রকার রত্ন দ্বারা। সেগুলো সব নিয়ে বের হল। এরপর অন্যান্য রুম থেকে সংগ্রহ করল অমূল্য ধন-সম্পদ। সবগুলো একত্র করে নিচে নামল। এগুলো নিয়ে বিপদে পড়ল ওরা। সব নিয়ে তো আর বাড়ি যাওয়া যাবে না। লোকজন সন্দেহ করবে, চোর ভাববে। যাহোক দ্রুত রাজপ্রাসাদ থেকে পালালো ওরা। এগুলো নিয়ে নদীর কাছে চলে এল। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ হাসছে। তাই সবকিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কিন্তু রীতিমতো অবাক হবার পালা। নৌকাটি নেই। কেউ মনে হয় চুরি করে নিয়ে গেছে। এখন উপায় কী? প্রায় সকাল হবার উপক্রম। লোকজন চলে আসতে পারে। তার আগেই ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত নিল ওরা।

মইন বলল, আমরা এখানে এগুলো নিয়ে থাকি। সজল আর ফাহিম থানায় গিয়ে পুলিশ নিয়ে আয়।

ফাহিম বলল, পুলিশ যদি আমাদের সন্দেহ করে।

ইমন বলল, ভালভাবে বুঝিয়ে বলবি।

কথামত কাজ করতে চলল ফাহিম ও সজল। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকল। একটা নৌকা দেখতে পেল দূরে। হাত ইশারা করল মাঝিকে। তারপর ঐ নৌকার সাহায্যে সরাসরি থানায় গিয়ে পোঁছল। সমস্ত ঘটনা খুলে বলল পুলিশ ইন্সপেক্টরকে। জরুরি ফোর্সসহ স্পিড বোট নিয়ে পৌঁছাল মঈনদের কাছে। ওগুলো নিয়ে থানায় চলে এল।

SHARE

3 COMMENTS

  1. একটি স্থানে “বক্র” লেখা হয়েছে ।পুরো উপন্যাসটা চলিত কিন্তু এটা সাধু ভাষা কেন ?এটা হওয়া উচিত ছিল বাঁকা ।তাছাড়া উপন্যাসটা ভাল লাগল ।

  2. খুবই ভাল লেগেছে এটা পরে,যদি কম্পিউটারে pdf আকারে download করা যেত তাহলে ভাল হয়।

Leave a Reply