Home প্রচ্ছদ রচনা রহস্যে ঘেরা সাগরতল

রহস্যে ঘেরা সাগরতল

সাকিব রায়হান
সাগরতলের রহস্য
সাগরতলের রহস্য

মহাশূন্য থেকে পৃথিবীর দিকে তাকালে দেখা যাবে এর অধিকাংশ স্থান পানি দিয়ে ঢাকা। এই বিশাল জলরাশিকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ওই পাঁচটি ভাগের প্রত্যেকটির নাম মহাসাগর। আর মহাসাগরের ছোট অংশকে বলা হয় সমুদ্র বা সাগর। মজার ব্যাপার হচ্ছে পৃথিবীর স্থল ভাগ অপেক্ষা জলভাগ বেশি। পৃথিবীর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জুড়ে রয়েছে পানি।

লক্ষ লক্ষ বছর আগে সমুদ্রে জীবনের উদ্ভব হয়েছিল। এখন এই সমুদ্রে বাস করে বহু উদ্ভিদ ও প্রাণী। ছোট্ট শৈবাল থেকে অতিকায় নীল তিমি পর্যন্ত সেখানে আছে।
আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণে সমুদ্র
সমুদ্র আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। সূর্য থেকে সমুদ্র তাপ শোষণ করে নেয়। পরে আস্তে আস্তে ছেড়েও দেয়। ভূ-খণ্ড দ্রুত উষ্ণ এবং শীতল হয়। কিন্তু সমুদ্রের পানি উষ্ণও হয় ধীরে এবং শীতলও হয় ধীরে। এ কারণেই সমুদ্র নিকটবর্তী অঞ্চলে শীতকালে শীত কম থাকে। আবার গরমকালে খুব বেশি গরমও পড়ে না।
সমুদ্র কখনও স্থির থাকেস না। বিশাল নদীর মতো স্রোত পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পানি নিয়ে যায়। কিছু স্রোত আছে সমুদ্রের উপরিতলে। আর কিছু স্রোত সমুদ্রের একেবারে তলদেশে। এই স্রোতের কারণেই বরফখণ্ড এবং সামুদ্রিক প্রাণী এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়।
সমুদ্র পানিচক্রের একটি অংশ। সূর্যের তাপ সমুদ্রের পানিকে অদৃশ্য গ্যাসে পরিণত করে। এই গ্যাসকে জলীয় বাষ্প বলে। এই জলীয় বাষ্প বাতাসে উঠে যায় এবং মেঘে পরিণত হয়। মেঘের এই পানি আবার বৃষ্টি বা বরফের আকারে সমুদ্রে ফিরে আসে। যে বৃষ্টি ভূখণ্ডে পড়ে তাও নদী খালের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত সাগরেই ফিরে যায়।
স্রোত বা ঢেউ
ঢেউ এবং জোয়ার সাগরের পানিকে চলমান রাখে। অধিকাংশ ঢেউ সৃষ্টি হয় বাতাসের কারণে। বাতাস যত শক্তিশালী হয় ঢেউ তত বড় হয়। ঝড়ের সময় প্রচণ্ড বায়ুপ্রবাহ হয়। এই সময় সমুদ্রের বুকে বয়ে যায় প্রচণ্ড ঢেউ। ফলে সৃষ্টি হয় সাদা ফেনা। সাদা ফেনাযুক্ত এই ঢেউকে বলা হয় হোয়াইট ক্যাপ।
সাগরের তলদেশ
সাগরের তলদেশ সম্পূর্ণ সমতল নয়। ভূপৃষ্ঠের মতোই এখানে আছে পর্বত, উপত্যকা প্রভৃতি। পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর উপত্যকা এবং উচ্চতম পর্বত রয়েছে সমুদ্রেরই নিচে। সেখানে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত হলে পর্বত সৃষ্টি হয়। এভাবে কোনো আগ্নেয়গিরি যদি পানির ওপর পর্যন্ত উঠে আসে তখন সৃষ্টি হয় দ্বীপ।
সাগরের তলদেশে কোনো কোনো স্থানে আছে চিমনির মতো পাথর। তার ভেতর দিয়ে উঠে আসে গরম পানির বুদ্বুদ। এমন স্থানের আশেপাশে বড় বড় কীট এবং দৃষ্টিহীন কাঁকড়া বাস করে। সাগরের তলে আছে বিভিন্ন আকৃতির ভাঁজ। এগুলোকে বলা হয় প্লেট। এই প্লেটগুলো পৃথিবীর ভেতরের উত্তপ্ত ও গলিত পাথরের উপর ভেসে থাকে। কোনো কোনো সময় দু’টি প্লেট পরস্পর থেকে দূরে সরে যায়। আবার কখনওবা কাছেও চলে আসে। প্লেটগুলো পরস্পর থেকে দূরে সরে গেলে উত্তপ্ত ও গলিত পাথরগুলো সমুদ্রের তলদেশ ভেদ করে উপরে উঠে যায়। ঠিক তখনই আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত হয়। যখন লাভা ঠাণ্ডা হয় তখন এগুলো কঠিন পাথরে পরিণত হয়। আর প্লেটগুলো পরস্পরের কাছে সরে এলে কোনো প্লেট নিচে নেমে যায়। আবার কোনো প্লেট উপরে উঠে যায়। তখন সৃষ্টি হয় উপত্যকা। এর জন্য অবশ্য সময় লাগে লক্ষ লক্ষ বছর।
সমুদ্র সম্পদের খোঁজে
সমুদ্র থেকে উত্তোলন করা হয় লবণ, তেল এবং গ্যাস। আর পানি থেকে পাওয়া যায় লবণ। তবে তলদেশ থেকে তেল ও গ্যাসই মূলত পাওয়া যায়। সেখানে গ্রিলের সাহায্যে কূপ খনন করে পাম্পিং করে তেল ও গ্যাস সংগ্রহ করা হয়।
সাগরের তলদেশ বিভিন্ন সম্পদে পরিপূর্ণ। মূল্যবান খনিজ, মুক্তা এবং সুন্দর সুন্দর শামুক-ঝিনুক সেখান থেকে পাওয়া যায়। আর ঝিনুকের ভেতর থেকেই তো আহরণ করা হয় মহামূল্যবান মুক্তা।
সাগরতলের প্রাণীরা
সাগরের সকল প্রাণীরই খাদ্যের প্রয়োজন হয়। অনেক ছোট প্রাণী ছোট উদ্ভিদ খেয়ে জীবনধারণ করে। বড় প্রাণী ছোট প্রাণীকে শিকার করে। আবার এর চেয়ে বড় প্রাণীগুলো তাদের শিকার করে। এটাই সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খল।
সাগরের গভীর তলদেশ তাই রহস্যে ঘেরা। সবচেয়ে গভীর তলদেশে আছে ঠাণ্ডা এবং অন্ধকার। এখানে বেশি প্রাণী বাস করতে পারে না। কারণ এখানে বেশি খাদ্য পাওয়া যায় না। এখানকার অধিকাংশ প্রাণীই (যেমন মাছ) ছোট। এদের খেতে হয় খুবই কম। কিছু কিছু মাছের আছে ধারালো দাঁত, বিরাট মুখ। কারও কারও আছে নিজস্ব আলো। এই আলোর সাহায্যে তারা শিকার ধরে খায়।
সাগর নিয়ে গবেষণা
যারা সমুদ্র নিয়ে গবেষণা করে তাদের বলা হয় ওশানোগ্রাফার বা সমুদ্র গবেষক। তারা ‘সোনার’ ব্যবহার করে গবেষণার কাজ চালায়। সমুদ্রের গভীরতা মাপার জন্য ‘সোনার’ প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করে। সমুদ্রের পানির নিচের বিভিন্ন জিনিসেরও খোঁজ এর সাহায্যে পাওয়া যায়। বর্তমানে সমুদ্র গবেষণায় মহাশূন্যের কৃত্রিম উপগ্রহও ব্যবহৃত হচ্ছে। উপগ্রহ থেকে বেতার তরঙ্গের সাহায্যে সাগরের নিচের জিনিস খোঁজা হয়।
সমুদ্র থেকে প্রতিফলিত হয়ে আসা আলো কৃত্রিম উপগ্রহে বিশ্লেষণ করা হয়। যদি পর্দায় নীল-সবুজ রঙ দেখা যায় তাহলে বোঝা যাবে ওই স্থানে প্লাঙ্কটন আছে। এতে এও বোঝা যায় এখানে মাছও আছে। কারণ মাছ প্লাঙ্কটন খেতে আসে।
অগভীর সমুদ্র তলদেশে স্কুবা ব্যবহার করে ডুবুরিরা গবেষণার কাজ চালায়। স্কুবা হচ্ছে পানির নিচে শ্বাসকার্য চালাবার বিশেষ ধরনের যন্ত্র। পানির নিচে বাতাস নেই বলে ডুবুরিরা পিঠের উপর এই স্কুবা বা ট্যাঙ্কটি বেধে নেয়। এটি একটি নলের মাধ্যমে ডুবুরির শ্বাসযন্ত্রে যুক্ত থাকে। তবে একটু গভীরে ডুব দেয়ার জন্য শক্ত ধাতব পদার্থ ব্যবহার করে ডাইভিং স্যুট প্রস্তুত করা হয়। পানির ওপরে ভ্রাম্যমান নৌকা থেকে পাম্প করে নলের সাহায্যে নিচে ডুবুরির কাছে বাতাস পাঠানো হয়। এছাড়া আছে এক প্রকার সোনার যন্ত্র, যাকে বলা হয় গ্লোরিয়া। এই যন্ত্র শব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করে সাগরতলের ছবি তোলে।
সমুদ্রের নিচে গবেষণায় তো এখন বেশ জোরই দেয়া হচ্ছে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে পৃথিবীর সমুদ্র এবং মহাসমুদ্রগুলো বিজ্ঞানীদের ধারণার চেয়েও বেশি সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যময়। দশ বছর ধরে সামুদ্রিক জীবদের উপর চালানো গবেষণার পর এমনটাই মত বিজ্ঞানীদের।
সম্প্রতি সামুদ্রিক জীবদের নিয়ে দশ বছরের আদমশুমারি শেষ হয়ে গেল। ৮০টি দেশের ২,৭০০ বিজ্ঞানী অংশ নেন এই কাজে। খরচ হয় ৬৫ কোটি মার্কিন ডলার। এই গবেষণার প্রয়োজনে অত্যন্ত ঠাণ্ডা পানি থেকে শুরু করে উষ্ণ হ্রদ পর্যন্ত সব জায়গায় বিচরণ করেছেন বিজ্ঞানীরা। শুধু তাই নয়, জাপানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের গভীরতম মহাসমুদ্রের ৬ মাইল গভীরেও জীবের সন্ধান করেছেন গবেষকরা। ফলে প্রাণীগণনায় জায়গা করে নিয়েছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুজীব থেকে শুরু করে বৃহত্তম তিমি পর্যন্ত।
ওসেন বায়োজিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম : বিজ্ঞানীরা সামুদ্রিক জীবদের ভ্রমণশীল আচরণ নিয়ে গবেষণা করেছেন। কোন এলাকায় কোন জীবের বিচরণ বেশি, সংখ্যায় তারা কেমন- সব তথ্যই যোগাড় করা হয়েছে। এসব জীবের বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়া এবং খাদ্যাভ্যাসকেও কম্পিউটারের তথ্যভাণ্ডারে যোগ করা হয়েছে। এই তথ্যভাণ্ডারের নাম ‘ওসেন বায়োজিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম’। প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার প্রজাতি সম্পর্কে দুই কোটি আশি লাখ প্রতিবেদন পাওয়া যাবে এই বিপুল তথ্যভাণ্ডারে। প্রতিনিয়তই নিত্য নতুন তথ্য  যোগ হচ্ছে সেখানে। গণনার কাজে অংশ নেওয়া বিজ্ঞানী পেট্রিকা মিলোস্লাভিচ এই সম্পর্কে জানান, এই প্রথম সাধারণ মানুষের জন্য সব তথ্য এক জায়গায় জমা করা হয়েছে। ফলে যে কেউ চাইলে যেকোনো তথ্য, উদাহরণস্বরূপ ক্যারিবিয়ান সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে তথ্য চাইলে এক ক্লিকেই বিস্তারিত পাবেন। আনুষঙ্গিক তথ্য হিসেবে সংশ্লিষ্ট এলাকার বিভিন্ন প্রজাতির তথ্য এমনকি বিভিন্ন গবেষণা গ্রুপের বিস্তারিতও জানা যাবে।
সাদা হাঙ্গরের ক্যাফে : বিশাল গণনায় বিজ্ঞানীরা সামুদ্রিক জীবের কিছু অস্বাভাবিক স্বভাব-চরিত্রও আবিষ্কার করেছেন। যেমন প্যাসিফিক সমুদ্রে তারা খুঁজে পেয়েছেন সাদা হাঙ্গরের ক্যাফে আর মার্সিন মাছের খেলারমাঠ। দেখা মিলেছে অস্বাভাবিক বড় ব্যাকটিরিয়া এবং কম্বোজের।
underwater worldকাঁকড়াজাতীয় প্রাণী বেশি : গবেষণারত বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন, সামুদ্রিক জীবদের বসবাসের সবচেয়ে ভালো জায়গা হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানের সমুদ্রকূল। সাগর-মহাসাগরে কাঁকড়াজাতীয় প্রাণীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সহজ করে বললে, মোট সামুদ্রিক জীবের এক-পঞ্চমাংশই হল কাঁকড়াজাতীয় প্রাণী।
নথিপত্রে আড়াই লাখ প্রজাতি : বিজ্ঞানীরা হিসেব করে দেখেছেন, এই বিশ্বে সামুদ্রিক প্রজাতির সংখ্যা এক মিলিয়নের বেশি কিন্তু বিজ্ঞান বিষয়ক নথিপত্রে মাত্র আড়াই লাখ প্রজাতির তথ্য এ পর্যন্ত যোগ করা হয়েছে। এই তালিকায় অবশ্য অণুজীবগুলোকে বাদ দেয়া হয়েছে, কেননা শুধু এদেরই ধরণ এক বিলিয়নের বেশি।
এই বৃহৎ গণনায় অংশ নেওয়া বিজ্ঞানীদের কমিটির সহ-সভাপতি মিরিয়াম সিবুত জানান, এটি আমাদের জানা বিশ্বের পরিধি বাড়িয়েছে। আমরা গভীর সমুদ্রের বিরূপ পরিবেশেও সুবিস্তৃত জীববৈচিত্র্যের সন্ধান পেয়েছি।
জানার বাকি অনেক
underwater worldবিজ্ঞানীরা গণনায় ১৬,৭৬৪ প্রজাতির মাছের বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। কিন্তু এখনো নাকি আরো ৫ হাজার প্রজাতির মাছ ঠিকঠাকভাবে আবিষ্কারই করা হয়নি। তাছাড়া ইউরোপীয় সমুদ্রগুলোর প্রাণিকুলের মাত্র ১০ শতাংশ তথ্য  জোগাড় বাকি থাকলেও ভূমধ্যসাগরের গভীর জলের ৭৫ শতাংশ জীবের তথ্য এখনো নথিভুক্ত হয়নি। অস্ট্রেলিয়ার আশেপাশের সমুদ্রগুলোর ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ৮০ শতাংশ।
সমুদ্রকে বাঁচাতে হবে
সমুদ্র সুন্দর এবং মূল্যবান। একে তাই রক্ষা করা একান্তই প্রয়োজন। এজন্য প্রত্যেকেরই যথাসাধ্য চেষ্টা করা উচিত। বহু মানুষ সমুদ্রের ক্ষতি কমানোর জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কারণ পৃথিবীর মানুষ বুঝতে শুরু করেছে সমুদ্র মানুষের জন্য কতটা জরুরি। অনেকে তো বলেও দিয়েছেন যে, আগামী দিনে খাদ্যের জন্য সমুদ্রের দিকেই মানুষের দৃষ্টি ফেরাতে হবে। তবে এখনও অনেক কাজ বাকি আছে।
SHARE

2 COMMENTS

Leave a Reply