Home স্মরণ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ

আমিন আল আসাদ

Dewan Mohammad Azrof
Dewan Mohammad Azrof

আমরা স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেই যোগ্য ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে চেষ্ট করি। সেই সাথে বিভিন্ন পেশায় যোগ্যতা অর্জন করে আমাদের সমাজে নানা কাজে নিয়োজিত হই। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আমাদেরকে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দিয়ে থাকেন। তবে তারা একটা নির্দিষ্ট ক্লাসের বা নির্দিষ্ট বিষয়ের শিক্ষক। কোন নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। তারা একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষের শিক্ষক। কিন্তু আমাদের সমাজে কোন কোন মহান মানুষ জন্মান যারা হয়ে ওঠেন গোটা জাতির শিক্ষক। গোটা জাতির সকল ধরনের মানুষের শিক্ষক। তারা জাতিকে দেখান আলোর পথ। আহবান করেন সত্যের পথে। প্রদান করেন সদুপদেশ। শুধু উপদেশ দিয়ে ক্ষান্ত হন না, নিজের স্বদেশ ও স্বজাতির কল্যাণ কাজে নিয়োজিত হন। এমন একজন মহান মানুষ ছিলেন অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতা করেছিলেন। সে হিসেবে তাঁর যেমন সারা দেশে রয়েছে অনেক ছাত্রছাত্রী, অপর দিকে সেমিনার সিম্পোজিয়াম, আলোচনা সভায় বক্তৃতা ও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি এবং রেডিও ও টেলিভিশনে ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের সকল মানুষকে জ্ঞান দান করতেন। সে হিসেবে তিনি গোটা জাতির শিক্ষক। জীবনের প্রথম ধাপে তিনি রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেও তিনি মূলত একজন দার্শনিক হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হন। তিনি শুধু বাংলাদেশেরই নন, এ উপমহাদেশে একজন বড় মাপের দার্শনিক ছিলেন। তিনি বিভিন্ন বিষয়ের ওপর পড়াশোনা করেছেন। তিনি প্রধানত জ্ঞানার্জন করেন কুরআন ও হাদিস থেকে। তিনি সুফী মতবাদের ওপর গবেষণা করেন। তোমরা মরমি কবি হাসন রাজার নাম শুনে থাকবে। দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ছিলেন হাসান রাজার নাতি।
১৯০৬ সালের ২৫ অক্টোবর সুনামগঞ্জের তেঘরিয়া গ্রামে দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের জন্ম। তাঁর পিতার নাম দেওয়ান মোহাম্মদ আসফ। মাতার নাম রওশন হুসেইন বানু। যিনি ছিলেন মরমি কবি হাসন রাজার জ্যেষ্ঠ কন্যা। দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের দাদা এবং পিতা যেমন ছিলেন জমিদার, তাঁর নানাও ছিলেন জমিদার। জমিদার হয়েও দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের নানা একজন মরমি কবি ও সুফী আদর্শের আলোকে একজন নিরহঙ্কারী মানুষ ছিলেন। দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফও তেমনি জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করার পরও ছিলেন জমিদারি প্রথার বিরোধী। প্রজাদের ওপর জমিদারদের জুলুম, নিপীড়ন ও শোষণের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিলেন। জালিম জমিদারদের বিরুদ্ধে তিনি ‘নানকার’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন। তাঁর এই নীতির কারণে স্বয়ং তাঁর পিতাও তাঁর বিরোধী হয়ে ওঠেন। একটি ঘটনায় দেখা যায় তিনি তাঁর পিতার বিরুদ্ধে সত্যের পক্ষে দাঁড়ান। আদালতে মামলাও পরিচালনা করেন। তিনি এ বিষয়ে বলেছেন, ‘আমি সত্যের পক্ষে ছিলাম এবং সত্য প্রতিষ্ঠা করেছি।’
পূর্বেই বলেছি দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ জ্ঞান লাভ করেছেন কুরআন ও হাদিসের আলোকে এবং এ আলোকে তিনি পৃথিবীর নানা বিষয়ে এমনকি বিভিন্ন ধর্ম, জাতি, আচার-আচরণ, ইতিহাস ঐতিহ্য, জ্ঞান-বিজ্ঞানের ওপর দৃষ্টিপাত করেছেন। আর এরূপ দৃষ্টিপাতের কারণেই তিনি দার্শনিক। তিনি ছিলেন একজন ইসলামী চিন্তাবিদ, গবেষক ও সাহিত্যিক। ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ইতিহাস, ধর্ম ইত্যাদি বিষয়ে অনেক প্রবন্ধ-নিবন্ধ তিনি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লিখে গেছেন।
১৯৪০ সালে একটি গল্প লেখার মাধ্যমে তাঁর লেখালেখি শুরু হয়। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ-নিবন্ধসহ তাঁর বইয়ের সংখ্যা ৬৫টি। এ ছাড়াও অগণিত লেখা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। অনেক লেখা অপ্রকাশিতও রয়ে গেছে। তিনি কয়েকটি পত্রিকাও সম্পাদনা করেন।
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সে ঘটনা আজ সারা বিশ্বে স্মরণ করা হচ্ছে গৌরবের সাথে। সত্যি আমরা গর্বিত। দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ছিলেন একজন ভাষাসৈনিক। ভাষা আন্দোলন সর্বপ্রথম শুরু করে সে সংগঠন তার নাম ‘তমদ্দুন মজলিশ’। তিনি ছিলেন তমদ্দুন মজলিশের সভাপতি। এ ছাড়া সিলেট থেকে প্রকাশিত ‘নওবেলাল’ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ছিলেন তিনি। ‘নওবেলাল’ পত্রিকা ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাঁর অনেক প্রবন্ধ ফেরদৌসী, শেখ সাদী, হাফিজ, ওমর খৈয়াম, রুম, জামী, গালিব, আল্লামা ইকবাল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল প্রমুখের কবিতা ও দর্শনের আলোক রচিত হয়েছে এবং তিনি যখন বক্তৃতা করতেন তখন কুরআন, হাদিস, পৃথিবীর বিভিন্ন মনীষীর বাণী, খ্যাতনামা কবি সাহিত্যিকদের উক্তি ও কবিতা থেকে উদাহরণ দিতেন। তিনি বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফার্সি, উর্দু ও সংস্কৃত ভাষার বহু কবিতা অনর্গল মুখস্থ বলতে পারতেন ও তা থেকে উদ্ধৃতি দিতে পারতেন। তাঁর স্মরণশক্তি ছিলো প্রখর।
তাঁর অনেক মানবীয় গুণ ছিলো। তিনি মহৎ হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন, ছিলেন মানবতাবাদী। দল-মত, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে ধনী-নির্ধন সবাই তাঁর কাছে ভিড়তো ও ঠাঁই পেতো। তিনি ছিলেন নিরহঙ্কারী। তাঁদের জমিদারির আওতাভুক্ত অনেক লোককে তিনি জমাজমি একেবারে দান করে দেন এমনকি পারিবারিক চিড়িয়াখানার পশুপাখিগুলোও মুক্ত করে দেন। শেষ জীবনে সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করেন। তিনি বলতেন, ‘আমি মানবতা প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করেছি। আমি ইসলামের অনুসারী লোক। কেবল ইসলাম মানলেই মানুষ মানবতাবাদী হতে পারে।’ তাঁর ভাষায়Ñ ‘ইনসানে কামেল বা পরিপূর্ণ মানুষ হতে পারে। সে জন্য প্রয়োজন আধ্যাত্মিক সাধনা।’
সহজ সরল জীবন যাপন করলেও নীতির প্রশ্নে তিনি ছিলেন অটল। তিনি অন্যায় ও মিথ্যার বিরুদ্ধে কথা বলতেন। তিনি ছিলেন আজীবন একজন পড়–য়া মানুষ। পড়া ব্যতীত তিনি যেনো এক মুহূর্তও কাটাতে পারতেন না। তাঁর রুমের চারপাশে থাকতো অজস্র বই। বৃদ্ধ বয়সেও তিনি পড়ে যেতেন পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। তিনি বিভিন্ন সামাজিক কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। আবুজর গিফারী কলেজ ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান রয়েছে।
১৯৯৯ সালের পহেলা নভেম্বর ঢাকার হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ৯৪ বছর বয়সে এই মনীষী ইন্তেকাল করেন। এই মহান ব্যক্তি তাঁর মহৎ কাজের স্বীকৃতস্বরূপ লাভ করন স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৭৭), একুশে পদক (১৯৯২), ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার, অতীশ দীপঙ্কর পুরস্কার, ভাসানী পুরস্কার, নাসিরউদ্দিন ¯¦র্ণপদক, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ পুরস্কার, বাংলা সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার, বাংলাদেশ মুসলিম মিশন পুরস্কার। মৃত্যুর কয়েক মাস পূর্বে তমদ্দুন মজলিশ তাঁকে জাতীয় সংবর্ধনা প্রদান করে।
SHARE

Leave a Reply