Home বিশেষ রচনা নবান্ন : এক সময়ের নববর্ষের স্মৃতিবাহক

নবান্ন : এক সময়ের নববর্ষের স্মৃতিবাহক

হাসান শরীফ
প্রকৃতির কিছু কিছু রহস্যের সমাধান মানুষ করতে পারায় অনেক কিছুই বদলে গেছে। বর্তমান সময়ে বিষয়টা একটু বেশিই নজর কাড়ছে। পরিণতিতে খাদ্যাভ্যাস ও ফসল ফলানোর ক্ষেত্রে বেশ পরিবর্তন এসেছে। কিছু দিন আগেও নবান্ন নিয়ে বাংলাদেশে যে হইচই দেখা যেত, এখন অনেকটাই তা অনুপস্থিত। নতুন ফসল উঠার পর কৃষকের মুখ ভরে উঠতো অনাবিল হাসিতে।
এখন বাংলা নববর্ষ শুরু হয় ১ বৈশাখ। আর নবান্ন বছরের মাঝামাঝিতে। গবেষকগণ বলছেন, এটা অনেক আগে ছিল না। এক সময় নবান্ন আর নববর্ষ ছিল কাছাকাছি সময়ে, একটা ছিল আরেকটার পরিপূরক। ১ বৈশাখ নববর্ষটা একটু লক্ষ করলেই কেমন যেন গোলমেলে লাগবে। এই সময়টা নতুন ফসলের মওসুম নয়, লাগানোরও সময় নয়। এমনকি জৈষ্ঠ্যের মতো কোনো মধুমাসও এটা নয়। তার পর থাকে প্রচণ্ড রোদ, কালবোশেখির তাণ্ডবের আশঙ্কা। তবুও সেটাই আমাদের বছরের সূচনা, আমরা আনন্দে ভাসি।
গবেষকগণ বলছেন, এক সময় অগ্রহায়ণ মাস ছিল আমাদের পঞ্জিকার প্রথম বছর। মাসটির নামের মধ্যেই আছে সূচনার ইঙ্গিত। অগ্র মানে আগা (প্রথম) আর হায়ন মানে বছর। অর্থাৎ বছরের সূচনা মাস হলো অগ্রহায়ণ।
বছর গণনা একটি মজার বিষয়। প্রথম দিকে মানুষ বছর গুনতো চাঁদের হিসাবে। কিন্তু তাতে বেশ কয়েকটি দিনের হেরফের হয়ে যেত। ফলে স্থায়ী পঞ্জিকা সৃষ্টি ছিল অসম্ভব। তাই সূর্যের দিকে নজর ফেরানো হলো। বছরের সংজ্ঞা হলো সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর একবার ঘুরে আসা। এই সময়ের মধ্যে কোনো শুরু বা শেষ নেই, পৃথিবী অবিরত ঘুরছেই এবং তা মানুষের আবির্ভাবের অনেক অনেক আগে থেকে। তা-ই যেকোনো একটা দিন থেকেই বছর গণনা শুরু করা যেতে পারে। তবে মজার ব্যাপার হলো, বছরের সব দিন সমান নয়। বছরের চারটি বিশেষ দিন অন্য দিনগুলোর চেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। এই চারটি দিনের দিকেই নজর থাকে বেশি। পৃথিবীর উত্তর-দক্ষিণের অক্ষরেখা তার সূর্যের চারদিকে যে কক্ষপথে সে ঘোরে, তার ওপর খানিকটা হেলে রয়েছে। এই হেলে থাকার জন্যই পৃথিবীতে ঋতু বদলায়। কখনো দিন খুব দীর্ঘ হয়, কখনো রাত। এই সূত্রেই পাই চারটি বিশেষ দিন : উত্তর গোলার্ধের সাপেক্ষে ভাবলে, যেদিন দিবাভাগ সবচেয়ে দীর্ঘ (২২ জুন), যেদিন রাত সবচেয়ে দীর্ঘ (২২ ডিসেম্বর), আর যে যে দিন দিবা ও রাতের দৈর্ঘ্য সমান (২১ সেপ্টেম্বর ও ২১ মার্চ)।
এই চারটি দিনের কোনো একটিকে বছরের প্রথম দিন বলে মেনে নেয়াটা অনেক দিনের রীতি। কারণ এই দিনগুলোকে সঠিকভাবে নির্ণয় করা অপেক্ষাকৃত সহজ।
উপমহাদেশে এখন যে নিয়মে বছর গোণা হয়, সেটা এসেছে সিদ্ধান্ত যুগ থেকে। সেই সময়ের পণ্ডিতদের কিছুটা ভুলের কারণে বাংলা মাসের সূচনা হয় বৈশাখে, আর আমাদের নবান্ন পড়ে বছরের মাঝামাঝিতে।

SHARE

Leave a Reply