Home সাহসী মানুষের গল্প স্বপ্ন শুধু স্বপ্ন নয়

স্বপ্ন শুধু স্বপ্ন নয়

দয়ার নবী রাসূল [সা]।
সূর্যের চেয়েও দীপ্তিমান।
আর তাঁর চারপাশে কেবল জোছনা-তারার মেলা!
সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য!
সেইসব জ্বলজ্বলে তারা অর্থাৎ সাহাবীদের সাথে তিনি সময় কাটাতেন, দিনের পুরোটা সময়। কখনোবা রাত গড়িয়ে ফজর নামতো। কখনোবা দিন পেরিয়ে সপ্তাহও কেটে যেত। কখনোবা মাসও।
সে কেবল দীনের জন্য।
ইসলামের জন্য।
আল্লাহর হুকুম আহকাম ও নির্দেশ পালনের জন্য।
শত ব্যস্ততার মধ্যেও রাসূল [সা] তাঁর প্রিয় সাথীদের সাথে কথা বলতেন নানা বিষয়ে। নানা প্রসঙ্গে। ব্যক্তিগত বিষয়েও।
রাসূল [সা] বসে আছেন সাহাবীদের সাথে। কথা বলছেন বিভিন্ন প্রসঙ্গে। হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন আনন্দচিত্তে, আচ্ছা তোমাদের কেউ কি কোন স্বপ্ন দেখেছ?
যাকে আল্লাহ তওফিক দিতেন, তিনি তাঁর কাছে তার স্বপ্নের কথা বর্ণনা করতেন।
একদিন সকালে তিনি সাহাবীদের বললেন:
আজ রাতে, স্বপ্নে আমার কাছে দুইজন আগন্তুক এসেছিল। তারা আমাকে বলল :
আমাদের সাথে চলুন।
আমি তাদের সাথে গেলাম। আমরা এমন এক লোকের কাছে গিয়ে পৌঁছলাম, যে চিত হয়ে শুয়ে আছে। অপর এক ব্যক্তি পাথর নিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে পাথর দিয়ে শুয়ে থাকা ব্যক্তির মাথায় আঘাত করছে এবং তা থেতলে দিচ্ছে।
যখন সে পাথর নিক্ষেপ করছে তখন তা গড়িয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে।
লোকটি গিয়ে পাথরটি পুনরায় তুলে নিচ্ছে এবং তা নিয়ে ফিরে আসার সাথে সাথেই সেই আহত লোকটির মাথা পুনরায় পূর্বের ন্যায় ভাল হয়ে যাচ্ছে।
সে আবার লোকটির কাছে ফিরে আসছে এবং তাকে আগের মত শাস্তি দিচ্ছে।
শাস্তির এই ধারা এভাবেই অবিরত চলছে।
রাসূল [সা] বলেন, আমি আমার সঙ্গী দু’জনকে জিজ্ঞেস করলাম :
সুবহানাল্লাহ! এরা কারা?
তারা আমাকে বলল, সামনে চলুন! আরও সামনে!
আমরা সামনে অগ্রসর হলাম।
এরপর আমরা এক ব্যক্তির কাছে গিয়ে পৌঁছলাম। সে ঘাড় বাঁকা করে শুয়ে আছে।
অপর ব্যক্তি তার কাছে লোহার আঁকড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে তার চেহারার এক দিক থেকে তার মাথা, নাক ও চোখকে ঘাড় পর্যন্ত চিরে ফেলছে।
পুনরায় তার মুখমণ্ডলের অপর দিক দিয়েও প্রথম দিকের মত মাথা, নাক ও চোখ ঘাড় পর্যন্ত চিরছে। চেহারার দ্বিতীয় পাশের চেরা শেষ হওয়ার সাথে সাথে প্রথম পাশ আগের মত ঠিক হয়ে যাচ্ছে।
পুনরায় লোকটি এপাশে এসে আবার আগের মত চিরছে। শাস্তির ধারা এভাবেই অবিরত চলছে।
রাসূল [সা] বলেন : সুবহানাল্লাহ! এরা কারা?
তারা উভয়ে আমাকে বলল, সামনে চলুন, সামনে চলুন!
আমরা সামনে অগ্রসর হলাম এবং চুলার মত একটা গর্তের কাছে গিয়ে পৌঁছলাম।
গর্তের ভেতর জোরে চিৎকার ও শোরগোল হচ্ছিল।
আমরা উঁকি দিয়ে দেখলাম, অনেক উলঙ্গ নারী-পুরুষ সেখানে রয়েছে।
তাদের নিচ থেকে আগুনের লেলিহান শিখা উঠছে।
যখন সেই আগুনের লেলিহান তাদেরকে বেষ্টন করে ধরছে তখন তারা জোরে চিৎকার করছে।
আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা?
তারা আমাকে বলল, সামনে চলুন, আরও সামনে!
আমরা সামনে অগ্রসর হয়ে একটি ঝর্ণার ধারে পৌঁছলাম।
ঝর্ণার পানির রঙ ছিল রক্তের মত লাল!
ঝর্ণার মধ্যে এক ব্যক্তি সাঁতার কাটছে।
অন্য ব্যক্তি ঝর্ণার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
সে তার কাছে অনেক পাথর স্তূপ করে রেখেছে।
যে সাঁতার কাটছে সে যখন সাঁতার কাটতে কাটতে কিনারের ব্যক্তির কাছে আসছে, তখনই তার মুখের ওপর এমন এক পাথর নিক্ষেপ করছে যাতে তার মুখ চুরমার হয়ে যাচ্ছে!
সে আবার সাঁতরাতে শুরু করছে।
এভাবে সাঁতরাতে সাঁতরাতে যখনই সে ঝর্ণার কিনারায় পৌঁছে, তখনই ঐ ব্যক্তি পাথর নিক্ষেপ করে তার মুখ গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।
আমি সাথীদ্বয়কে জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা?
তারা আমাকে বলল, সামনে চলুন! সামনে চলুন!
আমরা সামনে অগ্রসর হয়ে এক কুৎসিত ব্যক্তির কাছে এসে পৌঁছলাম।
তার মত কদাকার চেহারার লোক খুব একটা দেখা যায় না।
তার সামনে রয়েছে জ্বলন্ত আগুন!
সে তার চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে।
আমি সঙ্গীদের জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা?
তারা বলল : সামনে চলুন, আরও সামনে!
আমরা সেখান থেকে সামনে এগিয়ে একটা সবুজ শ্যামল বাগানে পৌঁছলাম।
সব প্রকারের বসন্তকালীন ফলে বাগানটি সুসজ্জিত।
বাগানের মাঝখানে একজন দীর্ঘকায় লোক দেখতে পেলাম।
দেহের উচ্চতার জন্য তার মাথা যেন আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না।
মনে হচ্ছিল তার মাথা আসমানের সাথে ঠেকে গেছে।
তার চারপাশে অনেক ছোট ছোট শিশু- যাদেরকে আমি কখনও দেখিনি।
আমি সাথীদ্বয়কে জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে এবং এই শিশুরা কারা?
সাথীদ্বয় আমাকে বলল : সামনে চলুন, সামনে চলুন!
আমরা সেখান থেকে এগিয়ে গিয়ে একটা বিরাট বৃক্ষের কাছে পৌঁছলাম।
এর চেয়ে বড় এবং সুন্দর গাছ আগে আমি কখনও দেখিনি।
তারা আমাকে গাছে উঠতে বলল।
গাছ বেয়ে আমরা সবাই এমন একটি শহরে পৌঁছলাম যা সোনা ও রূপার ইট দিয়ে তৈরি।
আমরা নগরীর দরজায় পৌঁছে দরজা খুলতে বললে আমাদের জন্য তা খুলে দেয় হলো।
আমরা প্রবেশ করলে সেখানে এমন কতগুলো লোক আমাদের সাথে দেখা করলো যাদের শরীরের অর্ধেক সুন্দর এবং অর্ধেক কুৎসিত।
এরকম মানুষ প্রায় দেখাই যায় না!
আমার সঙ্গীদ্বয় তাদেরকে বলল, যাও, এই ঝর্ণার মধ্যে নাম।
এখানে বাগানের মাঝ দিয়ে একটি ঝর্ণা ছিল। তার পানি ছিল খুবই স্বচ্ছ।
তারা গিয়ে ঐ ঝর্ণায় নামল। তারপর উঠে আমাদের কাছে এলো।
তখন তাদের দেহের কদাকার অংশ আর অবশিষ্ট ছিল না।
তাদের সম্পূর্ণ দেহ সুন্দর ও আকর্ষণীয় হয়ে গেলো।
সাথীদ্বয় রাসূল [সা] বলল,
এটা ‘আদন’ নামক জান্নাত। আর এটাই আপনার বাসস্থান।
আমি ওপরের দিকে দৃষ্টিপাত করে সাদা মেঘের মত ধবধবে একটি বালাখানা দেখতে পেলাম।
সাথীদ্বয় বলল, এটা আপনার বাসভবন।
আমি বললাম, আল্লাহ তোমাদের অফুরন্ত কল্যাণ দান করুন।
আমাকে একটু ভেতরে গিয়ে দেখতে দাও।
তারা বলল, এখন আপনি প্রবেশ করতে পারবেন না।
তবে হ্যাঁ, ওখানে আপনিই প্রবেশ করবেন।
আমি তাদেরকে বললাম : আমি আজ রাতে অনেক আশ্চর্যজনক বিষয় দেখলাম। এগুলো কী দেখলাম?
তারা বলল, আমরা এগুলো সম্পর্কে আপনাকে অবশ্যই অবহিত করব।
প্রথমে যে ব্যক্তির কাছ দিয়ে আপনি এসেছেন, যার মাথা পাথরের আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হচ্ছে, সে এমন এক ব্যক্তি যে কুরআন মুখস্থ করে তা পরিত্যাগ করে এবং ফরজ নামাজ না পড়েই ঘুমিয়ে পড়ে।
দ্বিতীয় যে ব্যক্তির কাছ দিয়ে আপনি এসেছেনÑ যার মাথা, নাক ও চোখ ঘাড় পর্যন্ত লোহার আঁকড়া দিয়ে চিরে দেয়া হচ্ছে, সে সকালবেলা ঘর থেকে বের হয়েই এমন সব মিথ্যা কথা বলত যা সবার মাঝে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ত।
তৃতীয়, যেসব উলঙ্গ নারী-পুরুষকে আগুনের গর্তের মধ্যে দেখেছেন, তারা ছিল চরিত্রহীন  নারী-পুরুষ।
চতুর্থ, যে ব্যক্তিকে ঝর্ণার মধ্যে সাঁতার কাটতে দেখেছেন এবং যার মুখে প্রস্তরাঘাত করা হচ্ছে, সে ছিল সুদখোর।
পঞ্চম, যে কদাকার ব্যক্তিকে আগুন জ্বালাতে এবং তার চারপাশে ঘূর্ণায়মান অবস্থায় দেখেছেন; সে হলো দোজখের দারোগা মালেক।
ষষ্ঠ, বাগানের মধ্যকার দীর্ঘাঙ্গী ব্যক্তি হলেন ইবরাহিম [আ]। আর তার চারপাশের শিশুরা হলো যারা ফিতরাত বা সত্য দীনের ওপর জন্মেছে এবং মৃত্যুবরণ করেছে।
সপ্তম, অর্ধেক কুৎসিত ও অর্ধেক সুশ্রী দেহের যে লোকগুলোকে দেখেছেন, তারা ভালো-মন্দ উভয় ধরনের কাজের সংমিশ্রণ করে ফেলেছিল। আল্লাহ তাদের এ অপরাধ ক্ষমা করে দিলেন।
রাসূল [সা]এর স্বপ্নের কথা শেষ না হতেই তাঁর সাথীরা বলে উঠলেন, আশ্চর্য! এতো শুধু স্বপ্ন নয় হে রাসূল [সা]!
রাসূল [সা] তাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।
তারা অবাক হয়ে রাসূলের [সা] দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
এর অর্থ যেন এটাই ছিল যে, দুনিয়ায় যারা যেমন কর্ম করবে, পরকালে তাদের ঠিক তেমনি পুরস্কার কিংবা শাস্তি নির্ধারিত হবে।
অর্থাৎ যেমন কর্ম তেমন ফল!
আমরা যদি আমাদের চরিত্রকে সুন্দর করতে পারি, যদি আমরা রাসূলের [সা] নির্দেশিত পথে চলতে পারি, যদি পারি আল কুরআনের শিক্ষায় নিজেদের জীবনকে আলোকিত করতে- তাহলে ইনশাআল্লাহ আখিরাতেও আমরা পুরস্কারের প্রত্যাশা করতে পারবো।
মূলত আমাদের প্রত্যাশা তো সেটাই!

কায়েস মাহমুদ

SHARE

Leave a Reply