Home গল্প শুভরা জানতে চায়

শুভরা জানতে চায়

জুবাইদা গুলশান আরা

আমি ছেলেটাকে দেখেছি সেই ছোট্টবেলায়। ঐ যে, যখন বড়রা খাওয়া-দাওয়া সেরে ভাত-ঘুম দেয়। আর আমার মতো উড়নচণ্ডী ছোট্ট দস্যি ছেলে-মেয়েরা ডিঙি মারতে বেরোয়, সেই সময়ে। অর্থাৎ ঠিক দুপুর বেলা। আমি তখন অঙ্ক নিয়ে হিসাব করছি কিন্তু অঙ্কটা ভারী বেয়াড়া। কিছুতেই মিলছে না। কী যে করি! দুপুর বেলার রোদ্দুরে মজা করে পায়ের বুড়ো আঙুলে ঢিল ঠেলে ঠেলে ধুলো ওড়ানো, অথবা ঠ্যাংভাঙা বিড়ালছানাকে ভয় দেখানো, কোনোটাই ভাল মতো হচ্ছে না! পেন্সিলটাকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে জানালার গ্রিলের সামনে দাঁড়াই। তখন দেখি ছেলেটা আমার জানালার বাইরে, একটা ঘুড়িকে রেলিংয়ের ভেতর থেকে টেনে বের করার চেষ্টায় ব্যস্ত। আমি জানালায় দাঁড়িয়ে বলিÑ এই তুই কেরে? ও মুখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে হাসে। বলে ঘুড়িটা ঢুইক্যা গেছে। বাইর করতে পারতাছি না। আমি বলিÑ দাঁড়া আমি এদিক থেকে আস্তে করে বের করে দিই।
বেশ খানিকটা কসরৎ করে শেষ অবধি দুই জন মিলে লাল। সাদায় মেশা ঘুড্ডিটাকে বের করে গ্রিলে বাইরে ছেড়ে দিই। মুখ ভরে হেসে ওঠে ও। তারপর ঘুড়ি লাটাই সামলে এক লাফে নেমে যায়। বলে, যাই গা।
কেমন করে যেন ছেলেটার সঙ্গে দারুণ ভাব হয়ে যায় আমার। সুযোগ পেলেই আমি যেমন বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে বাইরেটা দেখি, ও ছেলেটাও দু-একদিন পর পরই আমার কাছে নিয়ে আসে সাত রাজ্যের খবর। আমি যখন জ্বরের তাপে শুয়ে শুয়ে কাঁপি, ও তখন চুপ করে বারান্দায় বসে থাকে। কখন আমি ওর দিকে তাকাবো সেই আশায় বসে থেকে এক সময় ওর চোখ দুটো খুশিতে ভরে ওঠে। আমার বালিশের ওয়াড় আর চাদর বদলাতে গিয়ে আম্মার চোখ দুটো এত্ত বড় হয়ে গেল।

Ñ শুভ, এগুলো কী শুনি?
Ñ কী আম্মা? হাতের রঙ পেন্সিল সরিয়ে রেখে আমি জানতে চাই।
হাতের তালুতে খসখসে মোটা চামড়ায় ঢাকা লটকনগুলো আমার সামনে তুলে ধরে আম্মা।
Ñ এমনিতে ছেলে জ্বর ছাড়ে না, তার ওপরে এসব খেলে তো আমাশয় হয়ে যাবে। বুয়াকে পাকড়াও করে আম্মা।
Ñ বুয়া, এ নিশ্চয়ই তোমার কাজ। শুভর তো বুদ্ধি শুদ্ধি নেই! আবদার করেছে, আর তুমি এনে দিয়েছো। তাই না?
Ñ না আম্মা, না। ভাইয়া আমার কাছে কিছু চায় নাই, আমিও আইনা দিই নাই। আল্লাহর কসম! তাহলে এগুলো ওর বালিশের নিচে এলো কোত্থেকে শুনি? দারোয়ানকে দিয়ে আনিয়েছিস? শুভ কথা বলছিস না যে? আমি চুপ করে ভাবতে থাকি, কেমন করে দুই দিন আগে ছেলেটা হাত ভরে বড় বড় লটকন এনে রেলিংয়ের মধ্য দিয়ে আমাকে দিয়েছিলো। বলেছিলো, জ্বরের মুখ ভালা লাগবো। খাইয়া দেখেন। আসলে ফিলটা দারুণ রসওয়ালা আর খুব মিষ্টি। কষ কষ ভাব একটু আছে কিন্তু তাতে আরও মজা লাগে কিন্তু আমি কী করে জানবো যে লটকন খেলে আমার ক্ষতি হবে? শেষ পর্যন্ত ডাক্তার চাচা এসে সব শুনে বললেন, কোন ভয় নেই ভাবী বরং এতে প্রচুর সি ভিটামিন আছে। তখন আম্মা ঠাণ্ডা হলেন। কিন্তু লটকন কোথায় পেলাম, সেটা আম্মা বের করে ছাড়বে, আমি ভালো করেই জানি। আসলে আমি একটু দুর্বল বলে আম্মা সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকেন। বৃষ্টিতে ভেজা যাবে না, রোদ্দুরে বেরোনো যাবে না, ধুলোবালির মধ্যে খেলা যাবে না, এরকম হাজারটা নিষেধ। আব্বা অবশ্য বলেন, ওকে এত নরম করে মানুষ কোরো না। ওকে শক্ত হতে হবে। আব্বা আম্মার এসব তর্ক-বিতর্কের মাঝখান দিয়ে আমি ঠিক খুঁজে নিই রোদ্দুরের দুপুর, বৃষ্টির ঝরঝরনো হুল্লোড়, আর দলছুট ঘুড়ি অথবা বলের সঙ্গে মাতামাতি। আম্মা যখন ছুটির দুপুরে ঘুমোয় সেই সব সময়টাই বেছে নেয়া যায়। বেশ ক’দিন জ্বরে ভুগছি বলে বাসায় আটকা পড়েছিলাম। আর সেই সময়েই পেয়ে গেলাম লালনকে। লালন হলো ছেলেটার নাম। সবসময় একটা ফুটবলের ছবি আঁকা গেঞ্জি পরে হাফ প্যান্টটা মোটা দড়ি দিয়ে কোমরে বেঁধে রাখে লালন। বাজারের আশপাশে ঘুড়ি নিয়ে মিনতির কাজ করে সারাদিন।

আম্মার মুখটা আষাঢ়ের মেঘের মতো গম্ভীর হয়ে আছে দু’দিন ধরে। ইস্কুল থেকে ফিরে ব্যাগটা পড়ার টেবিলে রেখে আমি বারান্দায় গেছি স্যান্ডেলের খোঁজে। দেখি, একটা টিনের কৌটায় অনেক মার্বেল রাখা। আম্মা আমার পিছু পিছু এসে সেদিকে লক্ষ্য করছিলেন। ভারী গলায় বললেন,Ñ একটা রাস্তার ছোকরা এসে গ্রিল ধরে বারান্দার মধ্যে উঁকি ঝুঁকি মারছিলো। দারোয়ান দেখে ফেলেছে, তো দৌড়ে পালাচ্ছিলো। কত জিজ্ঞেস করি কেন এসেছে, তা ছোড়া কিছুতেই বলে না। শেষে দিলাম দু’ঘা বসিয়ে, বলে কি না, শুভ ভাইয়ের জন্য মার্বেল এনেছিলো।
হঠাৎ আমার মনে পড়ে লটকানের কথা, মনের মধ্যে একটা ধাক্কা লাগে। অনেক দিন ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি।
Ñ আম্মা, ছেলেটার ঘুড়িটা আমাদের গ্রিলে আটকে গিয়েছিলো। ওকে সাহায্য করে দিলাম আমি। তাই ও মাঝে মাঝে আসে। ছেলেটা খুব ভালো আম্মা।
আচ্ছা! এই কাণ্ড? শুভ, তোমার এত বন্ধুর অভাব? তাই ঐ রাস্তার ছেলেটার সঙ্গে এত ভাব হয়েছে? আম্মার রাগী গলা শুনে ভয় করে আমার। কিন্তু সাহস করে বলে ফেলি।
আম্মা ওতো কোন দোষ করেনি! ওকে আমার খুব ভালো লাগে আম্মা!
Ñ শুভ! খুব হয়েছে। ভালো লাগে? মাঝে মধ্যে ও এলে ওর সঙ্গে কথাবার্তা বলবে, তার পরে যার যার রাজ্যে ফিরে যাবে। বুঝলে? মাঝে মধ্যে দু-একটা টাকা দিয়ে ওকে সাহায্যও করতে পারো।
Ñ আম্মা ও ভিক্ষুক নয়! হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলো শুভ। আম্মা থমকে গেলেন। ছেলের কাণ্ড দেখে রাগও হলো। রাস্তায় ঘোরা একটা ছেলে! তাকে নিয়ে এত বাড়াবাড়ি সহ্য হালো না আম্মার! কাছে গিয়ে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন ছেলের গালে।
Ñ যাও মুখ হাত ধৌও, নাশতা করো। এসব চলবে না! আমি দারোয়ানকে বলে দিচ্ছি, ও যেন এ বাড়ির ত্রিসীমানায় না আসতে পারে। যত্তো সব!’

এবার শুভর রোজকার গল্প। ইস্কুল থেকে ফিরছিলো শুভ। আম্মার কড়া হুকুম মেনে দারোয়ান ভাই লালনকে গেটের ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। শুভও ঠিক করেছে, লালনের সঙ্গে আর মিশবে না। শুধু শুধু ওর কষ্ট হয়। আম্মা এমনিতে তার খুব ভালো বন্ধু। কিন্তু কতগুলো ব্যাপার সে কিছুতেই বুঝতে পারে না। লালনকে আম্মা মোটেই সইতে পারে না। একদিন ইস্কুলে যাবার সময় আব্বাকে জিজ্ঞেস করেছিলো শুভ আব্বা, রাস্তার ছেলে হওয়া কি ওর দোষ? ও কি ইচ্ছে করে রাস্তার ছেলে হয়েছে? ওর আব্বা আম্মা নেই, সে কি ওর দোষ?
ব্যস। আব্বা গম্ভীর হয়ে গেলেন একেবারে, শুভ দেখলো তার বাবার মুখটা একেবারে কালো হয়ে গেল। মনে হলো আব্বা কিছুটা চমকে গেছে শুভর কথা শুনে। তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
Ñ শুভ এটা তুই বুঝবি না। অনেক কঠিন ব্যাপার। পরে তোকে আমি বুঝিয়ে দেবো। তারপর বললো,
Ñ তোকে বড় হয়ে এসব ব্যাপার বুঝতে হবে। এখন ওসব কথা থাক না। বাবার অন্যরকম হয়ে যাওয়া মুখ দেখে শুভর মনে হলো, আব্বার খুব কষ্ট হচ্ছে। সে আস্তে আস্তে বললো,
Ñ আচ্ছা আব্বা। আর বলবো না।

Ñ ঘুড্ডিটা উড়াইতে মনে কয় না। মনে মনে ভাবে লালন, দুপুর বেলা বাজারের দোকানে দু’মুঠো ভাত খেয়ে ঠেলাগাড়ির নিচে বসে ঝিমায় লালন। না, দারোয়ান ভাইয়ের ধমক খেয়ে সেই সে ইস্কাটনের বাড়িটার সামনে থেকে চলে এসেছে, আর দশ-বারো দিন ধরে যায়নি। ওর সাথী মকবুল, খালেদ, ছবুর ওকে ডেকে ডেকে পায় না। রাস্তার ধারে ফেরিওয়ালাদের বড় বড় ঝুড়ি পালা করে রাখা থাকে। ওখানেই একটুখানি জায়গা করে দিয়েছে দোকানি চাচা। রাতে ঘুমোয়া লালন। আশপাশ দোকানিদের কাজ কর্ম করে দেয় আর সারাদিন এলাকাতেই ঘোরা-ফেরা করে বেড়ায়। কখনও বা কারো কাছে দু-একটা করে শেখা অক্ষর দিয়ে জনসভার বিজ্ঞাপন পড়ার চেষ্টা করে লালন।
Ñ শুন লালন ইস্কুলে যাবি? বড় দোকানের মালিক একদিন জিজ্ঞেস করেন।
Ñ হ অ …. খুশি হয়ে যায় লালন। তারপরই বলে Ñ কিন্তু চাচা আমার তো ডেরেস নাই। ইস্কুলে ঢুকতে দিবো না।
Ñ আচ্ছা সে নিয়ে ভাবিস না। এটা সে রকম ইস্কুল না। তোদের মতো গরিব পোলাপানের জইন্য সরকার এসব স্কুল খুলছে। তোর কাজ হইলো পড়াশোনা, অঙ্ক, ইংরেজি, হিসাব কিতাব শিখনের কাম।
লেখাপড়া শিখলে তুই ভালো কাম পাইবি, বেতনও পাইনি। থাকনের জায়গাও পাবি।
Ñ আমি এই খানেই থাকমু চাচু, আমার কোন হানে যাওনের দরকার নাই।’ খুশিতে লালনের চোখ ভিজে ওঠে।

লালন এখন খুব সাফ সুতরা থাকে। ইস্কুলে মন দিয়ে পড়াও তৈরি করে। দুই ঘণ্টার ইস্কুল মাত্র। কিন্তু কত কী যে শিখতে পারে ছোটো ছেলেটা! বিরাট বিল্ডিংয়ের শুভর জন্য মনটা মাঝে মাঝে ছটফট করে তার। কিন্তু সে ভাবে, শুভ ভাইয়ার দোষ কী? সেই তো ময়লা গেঞ্জির ছেঁড়া প্যান্ট নিয়ে ঘুরতো। মনের গভীরে একটা ইচ্ছা স্বপ্নের মতো তার সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে। একদিন সে ঝকঝকে পোশাকে চমৎকার ঘুড্ডি নিয়ে যাবে, শুভদের বাড়ির দরজায়। বলবে, কি শুভ ভাই চিনতে পারেন আমারে?
পায়ের ফিতে ওয়ালা জুতোটা খুব যতœ করে পরে লালন। ডোরা কাটা শার্ট, আর কালো জিনসের হাফ প্যান্ট। বড় দোকানের মালিকের ছেলে মেয়ে নেই। লালনের ওপর তার অনেক মায়া। এতিম শিকড়ছেঁড়া একলা ছেলেটাকে মানুষ করে তোলার জন্য তিনি সবরকম সহায়তা করেছেন।

নইলে এতদিন হয়তো দুষ্টু ছেলেদের সঙ্গে মিশে নানারকম খারাপ কাজ করতো। মজা হোলো, কাছাকাছি অন্য ছেলেরাও লালনের মতো হতে চেষ্টা করে আজকাল।

শুভর কাস টেস্টের রেজাল্ট খুব ভালো হয়েছে। আম্মার মুখ ভরা হাসি। অথচ শুভর মুখটা কেন হাসিতে ভরে উঠছে না?
Ñ ঐ দ্যাখ, তোর জন্য কি এনেছি। মস্ত প্যাকেট খুলে মেকানোর সেটটা টেবিলে রাখেন আম্মা,
Ñ এবার তুই খুশি মতো বাড়ি ঘর, ব্রিজ সব বানাতে পারবি বাবা! বন্ধুদের সঙ্গে বসে বসে খেলবি, কেমন? আম্মা ছেলেকে ডাকতে এসে হঠাৎ চমকে গেলেন। শুভ গ্রিলের কাছে দাঁড়িয়ে হাসি ভরা মুখে কী একটা ধরার চেষ্টা করছে। কী ব্যাপার? ছেলের পিঠের কাছে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে যান আম্মা। শুভ চোখের সামনে ধরে আছে একটা ঘুড়ি। তাতে বড় বড় করে কী যেন লেখা।

দেখি? ওটা কোথা থেকে এলো?
Ñ আম্মা, এটা ছিঁড়ো না। প্লিজ! কী সুন্দর দেখ না।
Ñ হ্যাঁ বেশ তো। বড় বড় কাঁচা হাতে লেখাÑ আমি লেখতে পারি। আমি লালন।
একটুখানি এগিয়েও আম্মা পিছিয়ে গেল । সোনালি ঝালর দিয়ে সাজানো ঘুড়ির উজ্জ্বল শব্দগুলো দেখে একটু অবাক বুঝি। কী ভেবে আম্মা বললো আচ্ছা ওটা রেখে হাত মুখ ধুয়ে খেতে আয়।
রাস্তার ধারে ঠেলাগাড়িগুলো সারি সারি সাজানো রয়েছে। সেখানে বসে একটা আম খাচ্ছিলো লালন। এখন রাস্তা বোঝাই মানুষজন। শেষবারের মতো আঁটিতে কামড় দিয়ে হাতটা ধুয়ে নিলো লালন। সামনেই এক ঝুড়ি জামরুল নিয়ে বসেছে এক ফেরিওয়ালা ভাই। তার হাতে পাঁচটা টাকা দিয়ে কয়েকটা জামরুল নেয় লালন। কামড় দিয়ে খেতে শুরু করে সামনে এগোয়। আর তখনই তার চোখে পড়ে, চাপরাশির হাত ধরে রাস্তার ধারে এসে দাঁড়িয়েছে শুভ। লালনের মনটা চায় চিলের মতো ছোঁ দিয়ে ছুটে যায় শুভর কাছে।
Ñ জামরুল খাইবেন? হাতটা বাড়িয়ে দেয় সে, শুভও দেখেছে লালনকে। পিওনের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় শুভ। ঐ তো লালন! আরে বাবা, ওকে যে খুব ফিটফাট দেখাচ্ছে আজকে।
Ñ আমি লেখতে পারি … আমি লালন … কথা দুটো চোখের সামনে ঝিলিক দিয়ে ওঠে শুভর। ইস কত দিন পরে দেখছে দস্যি ছেলেটাকে! ওর সঙ্গে অনেক গল্প করতে হবে… ভাবে শুভ।
Ñ ভাইয়া, এত বড় রাস্তা! কই যান! আরো বিব্রত উদ্বিগ্ন গলায় চেঁচিয়ে ওঠে আব্বার চাপরাশি।
Ñ আমি, আসছি… রাশু ভাই, ওই যে, এই ছেলেটা ওর সঙ্গে একটু দেখা করে এুনি …, আম্মার রাগী চেহারাটা মনে পড়লো শুভর। কিন্তু থামলো না সে। দৌড়ে দিল রাস্তা পার হয়ে। ওদিকে লালনও অবাক হয়ে থমকে গেল। জামরুল ধরা হাত মুঠি করে সেও দৌড় দিলোÑ শুভ ভাই আপনে আইয়েন না। আমি … আই তাছি…. না, না, ভাইজান, …. না …… আ……. আ…। চিল-চিৎকার দিলো দু’জনেই। আর একই সঙ্গে মাথার পেছনে ছুটে এলো একটা হিংসুটে, মস্তবড় বাস।
রাস্তার মধ্যে প্রচণ্ড চিৎকার উঠলো। হায় হায় করে ছুটে গেল ফলওয়ালা, দোকানের লোকজন… রাুসে বাসটার দিকে।
কয়েকটা ভয়ঙ্কর মুহূর্ত। বাসটার চাকা শব্দ তুলে রাস্তার পাশে বেঁকে থেমে গেল। সবাই মিলে টেনে হিঁচড়ে দাঁড় করিয়ে দিলো দুই ছেলেকে। সারা গা ছিলে গেছে ওদের। কনুই থেকে রক্ত ঝরছে… কপালে কেটে রক্ত নেমে আসছে। দু’জনেই প্রাণপণে যখন রাস্তার পাশে গড়িয়ে গিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছিলো তখন বাকিটা করেছে রাস্তার মানুষগুলো। দু’জনেই কাঁপছে ভয়ে। কাঁদছে দু’জনেই। কেউ একজন ওদের ধরে নিয়ে রাস্তার ধারে ওষুধের দোকানে বসালো। কাচের গ্লাস পানি এনে দিল। রাশু এসে ভেউ ভেউ করে কান্না জুড়ে দিয়েছে,
Ñ আমার চাকরি যাইবো গা? ভাইয়া আপনে আমার কথা শুনলেন না। … আমি স্যারেরে কী জবাব দিমু…!
লালনও কাঁদছিলো। কিন্তু নিজের ব্যথার চেয়েও বড় আনন্দে। শুভর কিছু হয়নি, তারা দু’জনেই বেঁচে গেছে।
ঐ রাস্তা দিয়ে অফিস থেকে বাসায় ফিরছিলেন শুভর আব্বা। এত ভিড় দেখে গাড়ির ঠেলাঠেলির মধ্যে বিরক্ত হয়ে খবরের কাগজ খুলে চোখ বুলাচ্ছিলেন। হঠাৎ চমকে তাকালেন শুভর আব্বা। আরে! সামনের ওষুদের দোকানে টুলের ওপর বসে… ওই ছেলেটা কে? এ যে শুভ! প্রাণটা কেঁপে উঠলো তার। দৌড়ে গাড়ি থেকে নেমে গেলেন তিনি। ছেলের মাথায় হাত রেখে বুকের কাছে টেনে নিলেন। ধরা গলায় বলে উঠলেন, শুভ,… শুভ… রে কী হয়েছে? বল শুভ!
Ñ আব্বা!’ বিস্ময়ে আনন্দে ডেকে ওঠে শুভ। তারপরই বলে, আব্বা, ওর নাম লালন। ওই আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। আর একটু হলেই ও নিজেও বাস চাপা পড়তো।

Ñ রাস্তার ছেলেটাকে দেখে তুমি ওর কাছে দৌড়ে যাচ্ছিলে, আর ওও তোমাকে জামরুল দেবার জন্য, দুটো কথা বলার জন্য, ছুটে এ পাশে আসছিলো, আর তখন ঘটলো … বা ঘটতে যাচ্ছিলো…, শিউরে উঠে মনে মনে বললেন শুভর আব্বা। মুখে বললেন,
Ñ আল্লাহ বাঁচিয়ে দিয়েছেন বাবা! চল এবার বাড়ি চল।’ দোকানের ভদ্রলোকের হাতে কিছু টাকা দিলেন শুভর আব্বা। বললেন লালন বড় ভালো ছেলে। ওর, চিকিৎসায় কোন ত্রুটি রাখবে না। এ আমার অনুরোধ। লালনের হাত ধরে বললেন, চল তোমাকে এগিয়ে দিই লালন…।

গাড়িতে উঠতে গিয়ে অবাক হলেন শুভর আব্বা। কাঁচা-পাকা দাড়িসমেত এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। শুভর আব্বাকে দেখে এগিয়ে এলেনÑ সার আমার দোকানে এই লালন কাজ করে. ওরে আমি খুব স্নেহ করি। পড়ালেখা শিখাইতেছি। ওর বড় ইচ্ছা সে শুভ ভাইয়ের মতন হবে… যদি দু-এক সময় আপনার বাসায় যায়, যদি অনুমতি দেন, মাস কয় আগে আপনাগো দারোয়ান ওরে চড় থাপ্পড় মাইরা নিষেধ করছে যাইতে। হেই ইস্তক অয় আর যায় না… এতিম পোলাডা কোন রহম দোষ নাই স্যার, চুপে চুপে কানছে কিন্তুক আমারে কয় নাই পাছে পাড়ার মানুষ ক্ষেইপ্যা গোলমাল করে। সার মনে কিছু নেবেন না, অনেক কথা কইলাম … মাসুম পোলাপান!’
Ñ জি আর বলার দরকার নেই। আমি বুঝেছি। তাড়াতাড়ি বলে ওঠেন শুভর আব্বা।
Ñ যাও, লালন, এখন তুমি শুয়ে থাকো গিয়ে ওষুধ খেয়েছো?
Ñ জে স্যার। জে স্যার। ব্যথায় কুঁকড়ে গেলেও হাসিুমখে কথা বলে লালন। তার চোখে খুশি ঝলমল করে।
Ñ ইস্কুলে স্যার, শিখছে, অহন হগগলেরে কয় স্যার।
হেসে বলেন দোকানি চাচা। আরও অনেকেই হেসে ওঠে। শুভর আব্বা রহমান সাহেব আন্তরিকভাবে বলেনÑ আচ্ছা যাবে। লালন অবশ্যই যাবে। আমি দারোয়ানকে ধমকে দেবো। আচ্ছা, আসি তবে…
ছেলেকে কোলের কাছে নিয়ে গাড়িতে তোলেন শুভর আব্বা। রাশুমিয়া শুভর ব্যাগ হাতে ড্রাই ভারের পাশে বসে।

বাসায় ফিরে এক মুহূর্ত দাঁড়াতে পারে না শুভ। এক ছুটে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে।
Ñ এই শুভ, … কী হলো? হাত মুখ ধো উঠে আয়…। আম্মার ব্যস্ততাকে থামিয়ে দেন শুভর আব্বা। বলেন ওকে ঘুমোত দাও।
Ñ কী যে বলো, সারাদিনের ময়লা ড্রেস .. শুভর আব্বা মুখে আঙুল দিয়ে বলেনÑ চুপ করো,
Ñ দেখে যাও। এসো। বলেন শুভর আব্বা। দরজায় দাঁড়িয়ে ছেলেকে দেখেন নিঃশব্দে। আম্মাও হঠাৎ তাঁর হুঁশ ফেরে। কিছু একটা ঘটেছে, তা বুঝতে পেরে তার চোখ ভিজে ওঠে। শুভর কনুইয়ে ব্যান্ডেজ হাঁটুতে পট্টি .. মা গো! কী হয়েছিলো শুভর?
কাঁদতে গিয়েও চুপ করে যান তিনি। দেখেন, শুভ আরামে ঘুমোচ্ছে। তার হাতটা একটু খোলা। আঙুলে মুঠিতে ধরা দুটো জামরুল!
শুভদের বাড়িটা এখন সরগরম। শুভর কাসের বন্ধুরাতো আছেই। তাদের সঙ্গে থাকে লালন। রোজ কাজকর্ম সেরে বিকেলে ধোপ দুরস্ত হয়ে সে এসে হাজির হয়। সবাই মিলে বানাতে থাকে ব্রিজ, বিল্ডিং, টানেল.. আরও কত কী! মাঝে মাঝে শুভ হাঁক ডাক লাগায়,
Ñ এই লালন, তোকে না বলেছি, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আইসক্রিম খাবি না!
Ñ হ হ, নিষেধ করছেন তো কিন্তুক ভুইলা যাই!
Ñ আবার  ভুল বাংলা বলে! কতবার বলেছি না, নিষদ বলবি না! বলবি নিষেধ। বুঝলি?
Ñ হ শুভ ভাই, আমি লেখতে পারি, বলতে পারি না।
Ñ আবার ভুল বলে! শোন আমি লেখতে পারি, এটা ভুল। ঠিক হলো, লিখতে পারি। লিখতে পারি। মনে থাকবে তো? সবাই হাসতে থাকে। লালনও হাসে। গ্রিলের গায়ে যতœ করে আটকে রাখা ঘুড্ডিটা বাতাসে খস খস শব্দ তোলে যেন খুশির ঘোষণা দেয়।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামতে থাকে।
শুভর আম্মা ঘুমঘুম চোখে বিশ্রাম নিতে নিতে ছেলেদের হল্লা আর হাসির শব্দ শোনেন। ভাবেন, ওরা খেলুক, শিখুক, জেগে থাকুক। এই তো ওদের শেখার দিন। এখন আর কোন ভয় নেই।

SHARE

Leave a Reply