Home প্রবন্ধ আর নয় শিশুশ্রম

আর নয় শিশুশ্রম

একজন মোবারকের কথা
ঈদ এলেই আনন্দে ভরে ওঠে মোবারকের মন। কারণটা অবশ্য অন্য সবার থেকে একটু ব্যতিক্রম। সবার যখন আনন্দ নতুন পোশাক কেনার, পোলাও-মিষ্টি খাওয়ার, ঈদগাহে নামাজে যাওয়ার, কুরবানি দেয়ার কিংবা একসাথে ঘুরে বেড়ানোর সেখানে মোবারকের আনন্দ কেবলই ‘ঈদ মুবারক’ লেখা পোস্টার, বিলবোর্ড আর রেডিও-টিভি ও সবার মুখে মুখে তার নাম শুনতে পাওয়ার আনন্দ। যদিও নতুন জামা পরা কিংবা ঈদগাহে নামাজ পড়তে যাওয়া তার হয়ে ওঠে না।

নদীভাঙনে ঘর-বাড়ি হারিয়ে মোবারক ঢাকায় এসে কাজ নেয় একটি হোটেলে। সকালবেলা ঝাড়– দেয়া, হোটেল পরিষ্কার করা, আর সারাদিন টেবিল পরিষ্কার করা, টেবিলে পানি দেয়া এবং কখনো কখনো খাবার পরিবেশন করা তার কাজ। বছরের প্রতিটি দিনই তার একই রকম। নেই কোনো সাপ্তাহিক ছুটি। ঈদের মতো এত বড় আনন্দের দিনেও তাকে করতে হয় রুটিনমাফিক কাজ, নিশ্চিত করতে হয় বেঁচে থাকা।

স্বপ্নার স্কুলে যাবার স্বপ্ন
বাবা মারা যাবার পর থেকেই স্বপ্নগুলো ছোট হয়ে আসতে থাকে স্বপ্নার। পড়াশোনা আর স্কুলের জন্য মন টানলেও তাকে এখন থাকতে হয় অন্যের বাসায় আর করতে হয় ওই পড়াশোনা ছাড়া বাসার সব কাজ। ভাগ্যের এই নির্মম পরিহাসকে মেনে নিয়েছে স্বপ্না। মেনে না নিয়ে কোনো উপায়ও তো নেই। তারপরও বাসার সাহেবের ছেলেমেয়েদের স্কুলের ব্যাগ, ড্রেস, বই-খাতা আর স্কুলে যাওয়া দেখে তার মনেও স্বপ্ন জাগে স্কুলে যাবার। কিন্তু সে জানে না তা আদৌ পূরণ হবে কি-না।

আসাদের ঢাকা বেড়ানোর সাধ
‘ঢাকার শহর আইসা আমার আশা ফুরাইলো, লাল লাল নীল নীল বাতি দেইখা পরান জুড়াইলো…’ গান শোনে আর আসাদের মনে সাধ জাগে ঢাকা যাবার।
মফস্বল শহরের এক মোটর গ্যারেজে কাজ করে ১২ বছর বয়সের আসাদ। অনেকের কাছেই সে গল্প শুনেছে রাজধানী ঢাকা শহরের। পেপারেও খবর ওঠে ওই শহরের কিন্তু মা-বাবা হারানো আসাদ জানে না তার সাধ পূরণ হবে কি-না।

ভয়ে বুক কেঁপে ওঠে মিঠুনের
ঠক্ ঠক্ ঠক্… সারাদিন হাতুড়ি দ্বারা বাড়ি দিয়ে জ্বলন্ত লোহা পিটিয়ে বানায় নানা ধরনের সামগ্রী যার বেশিরভাগই ধারালো অস্ত্র। চাকু, দা, কুড়াল থেকে শুরু করে মাঝে মাঝে সুরকি, চাপাতিও তৈরি হয় এখানে। সারাদিন লোহা গরম করা আর হাতুড়ি দিয়ে লোহা পেটাতে পেটাতে তার ছোট্ট বুকটাও কেঁপে ওঠে, ভয়ে। কখন না জানি হাতুড়ির বাড়ি পড়ে তার হাতের উপরেই। কখনো মনে প্রশ্ন জাগে, এসব অস্ত্র কি সব সময় ভালো কাজেই ব্যবহৃত হয়?

মামুন চায় শুধু তার মায়ের সেবা করতে
বাবা মারা যাবার পর থেকেই মা-ছেলের সংসার। মায়ের ইচ্ছা ছিল ছেলেকে পড়াশোনা করাবেন। কিন্তু মায়ের সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয় না। মানুষের বাড়িতে কাজ করে যা পান তা দিয়ে দিন চালানো অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার। আর মাঝে মধ্যেই অসুস্থ মা যেতে পারেন না কাজে, তাই মামুন কাজ নেয় দোকানে। সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করার কথা থাকলেও রাত অবধি দোকানে থাকে একটু বেশি অর্থ পাবার আশায়, যা দিয়ে মায়ের ঔষধ কেনা আর সেবা করা যায়।
মামুনের সব ভাবনা এখন অসুস্থ মাকে ঘিরে।

বাংলাদেশের শিশুশ্রম আইন
আমাদের দেশের লক্ষ লক্ষ মোবারক, স্বপ্না, আসাদ, মিঠুন কিংবা মামুনের মতো শিশুরা বেড়ে উঠছে অবহেলায়। তাদের জন্য নেই কোনো পরিকল্পনা। তাদেরকে শিক্ষিত করার, অধিকার প্রতিষ্ঠা করার বা শিশুশ্রম থেকে নিবৃত্ত করার জন্য নেই কোনো আইন। যদিও বাংলাদেশ ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষর করে। ১৯৯০ সালে এই সনদটি আন্তর্জাতিক আইনে পরিণত হলেও আমাদের দেশের সরকারসমূহের পর্যাপ্ত পদক্ষেপের অভাব ও গুরুত্বহীন মানসিকতা আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং ব্যক্তি পর্যায়ে অধিক জনসংখ্যা, দারিদ্র্যতা ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় আমাদের শিশুদের ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারের দিকে। যদিও এর ফলে বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা। অথচ এই অবহেলিত শিশুদেরকে সঠিক অধিকার প্রদান করে তাদেরকেও দেশ গড়ার কাজে নিয়োগ করা সম্ভব। কারণ এ দেশটা সবার আর তাকে সবুজে-শ্যামলে, সুন্দরে সাজিয়ে তোলার দায়িত্বও সবার।
আমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে

এই শিশুদের রক্ষা করা, তাদের সুস্থ ও সুন্দরভাবে গড়ে তোলা শুধু তাদের পরিবারের স্বার্থ বা কর্তব্য নয়। একদিকে এটি সকল শিশুর অধিকার অন্যদিকে আমরা যদি আমাদের সমাজ, পরিবেশ ও দেশকে সুস্থ ও সুন্দর দেখতে চাই তবে এটি অপরিহার্য। তাই সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে আমাদেরই। সরকারকে হতে হবে দায়িত্বশীল, নিতে হবে যথাযথ পদক্ষেপ, প্রণয়ন করতে হবে শিশুনীতি ও শিশুশ্রম আইন। আর ব্যক্তি পর্যায়ে আমাদেরকেও হতে হবে তাদের অধিকারের প্রতি সচেতন। দিতে হবে সহায়তার হাত বাড়িয়ে। তবেই পূরণ হবে এসব শিশুদের বেড়ে উঠার স্বপ্ন। ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশকে গড়ে তুলতে হবে, এসব শিশুদের লেখাপড়া ও সুন্দরভাবে বেড়ে উঠা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশটা সত্যিকারের স্বপ্নের দেশে পরিণত হবে এবং আমরা পাবো একটি সমৃদ্ধ ও নানাদিক দিয়ে উত্তরোত্তর উন্নতির পানে ধাবমান একটি জনপদ, যে জনপদটি নিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে গর্বও করতে পারবো।

লিখেছেন: জাকারিয়া হাবিব পাইলট

SHARE

Leave a Reply