Home সায়েন্স ফিকশন ছায়াহীন আগন্তুক

ছায়াহীন আগন্তুক

কারো সাথে কথাও বলে না তেমন। প্রয়োজনে হ্যাঁ-না। কিছু দিন হলো তার এ অবস্থা। আনমনা হয়ে থাকে সারাক্ষণ। কী ভাবছে সে? নাকি কোন অসুখ বিসুখ? তাহলে তো খুবই বিপদ। একটি মাত্র ছেলে, ক্লাস এইটে পড়ে, এখনই মানসিক সমস্যা! ভেবে আঁতকে ওঠেন মঈনের বাবা রওশন।

মানসিক বিশেষজ্ঞ, ঝাড়-ফুঁক সবই করালেন মঈনের বাবা। কোন পরিবর্তন নেই ছেলের। ব্যর্থ হয়ে সব চেষ্টা ছেড়ে দিলেন বাবা। কিন্তু বুঝতে পারছেন না তার পরীক্ষায় রেজাল্ট, আগের চেয়েও ভালো হচ্ছে কিভাবে। মঈন জানে পড়ালেখা আগের চেয়ে বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েক গুণ। ছেড়ে দিয়েছে অতিরিক্ত খেলাধুলা, টিভি দেখা, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়াসহ অনেক অপ্রয়োজনীয় কাজ।
দেখতে দেখতে কেটে গেলো বেশ কিছু বছর। সবার কাছে সহনীয় হয়ে গেছে মঈনের এ অবস্থা। কিন্তু কেউ জানে না মঈন ভাবছে পৃথিবী ও মানুষকে নিয়ে। সুন্দর এ পৃথিবীকে আরো সুন্দর করার জন্য, মানুষ আরো সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য বিজ্ঞানের কল্যাণে বহু কিছু আবিষ্কৃত হয়েছে। আবিষ্কৃত হয়েছে আণবিক, পারমাণবিক, রাসায়নিক বহু মিল, কারখানা, যানবাহন ও যন্ত্রপাতি। কিন্তু মানুষের কল্যাণেই যদি হয় তাহলে এসবের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মানুষের বিভিন্ন ভয়াবহ ক্ষতি কেন হচ্ছে? এ প্রশ্ন মঈনের। আবার অস্বীকার করারও উপাই নেই বিজ্ঞানের এ আবিষ্কার। এ আবিষ্কারকে ব্যবহার করতে হবে এবং মানুষকেও বাঁচাতে হবে এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে, কিন্তু কিভাবে?

মঈন ঘুমিয়ে আছে তার রুমে। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় জানালা খোলার শব্দে। সে অনুভব করে এক দমকা বাতাস। লাফিয়ে উঠে শোয়া থেকে। ভয়ে শিহরণ খেলে গেলো তার সারা শরীর। আস্তে করে নামল খাট থেকে। বাতিটা অন করল। চারদিকে তাকাল এক পলক। টেবিলে ছোট্ট একটি বই, বাতাসে নড়াচড়া করছে এখনো। বইটি হাতে তুলে নিল মঈন।

৪৭ নম্বর পৃষ্ঠা খোলা বইটির। ওপরে ছোট করে লেখা ‘নতুন কিশোরকণ্ঠ’। এ নামটি তার কোন বন্ধুর কাছে শুনেছে মনে হলো, তবে পড়ে দেখেনি কোনদিন। কিন্তু পৃষ্ঠা খোলা কেন? কী আছে তাতে? দেখল একটি সায়েন্স ফিকশন। মনোযোগ সহকারে পড়ল লেখাটি। ভালো লাগল মঈনের। কিন্তু কে দিয়ে গেল এত রাতে এ বইটি?
প্রায় রাতেই এরকম আওয়াজ হয় এবং দিয়ে যায় একটি করে কিশোরকণ্ঠ। প্রতিটির সায়েন্স ফিকশন লেখার পৃষ্ঠা খোলা।

সায়েন্স ফিকশনগুলো পড়ে, প্রথম খুশি হলেও মনটা ভালো নেই এখন। যেসব বিষয়ে কিছু একটা করবে ভেবেছিল তার সবই আবিষ্কৃত হয়ে গেছে কিশোরকণ্ঠের সায়েন্স ফিকশনে। তবে এগুলো পড়ে একটা পথ পেল মঈন। এতেই সে খুশি। সম্ভবত এ পথটা দেখানোর জন্যই তাকে কিশোরকণ্ঠ দিয়ে এ সহায়তা।

কিন্তু কে করছে এ সহায়তা? আমাকে দেখা দিচ্ছে না কেন? আমাকে দেখতেই হবে এগুলো দিয়ে যায় কে? মনে মনে ভাবে মঈন। আগন্তুকের দেখা পেল না এক মাস রাত জেগেও। কেন বন্ধ করল আসা? নাকি বুঝতে পেরেছে আমি পাহারা দিচ্ছি। কি করে বুঝল? আমার সাথে দেখা দিতে সমস্যাই বা কোথায়? হাজারো প্রশ্ন ঘুর পাক খাচ্ছে মঈনের মনে। উত্তর নেই একটিরও।
রাত বাজে তিনটা। জেগে আছে মঈন। হঠাৎ শব্দ হলো জানালায়। সেই সাথে দমকা বাতাসও। ভয়ে লাফিয়ে উঠল মঈন। সুইচ অন করতে যাবে সে, বাতি জ্বালিও না মঈন একটা আদেশের সুর ভেসে এলো মঈনের কানে। কে, কে ওখানে? কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল মঈন। উত্তর না দিয়েই মঈনের কাছে এসে দাঁড়ালো আগন্তুক। বলল, ভয় পেয়ো না আমাকে, আমি তোমাকে সুসংবাদ দিতে এসেছি। জানি তুমি কোন বিষয়ে গবেষণা করছ, আমি তোমাকে সাহায্য করব। কিন্তু কে আপনি? কিভাবে জানলেন আমি কোন বিষয়ে গবেষণা করছি? আরেক দিন কথা হবে তোমার সাথে, আজ আসি, মুচকি হেসে উত্তর দিয়ে হাওয়ার সাথে মিলিয়ে গেলো আগন্তুক।

কিন্তু আগন্তুকের হাসি, কথা, চেহারা মনে হচ্ছে খুবই পরিচিত। দেখেছে কোথায় যেন হুবহু তারই মতো কাউকে। হ্যাঁ মনে পড়ছে, সেই ছোট্টবেলা চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ার সময় বরইগাছ থেকে পড়ে হাত ভেঙে ফেলে মঈন। রাত দু’টায় দ্বারস্থ হয় হাসপাতালের এক ডাক্তারের। সব আন্তরিকতা দিয়ে সুস্থ করেছিল সেই ডাক্তার। ডাক্তার অনেক আদর করতেন মঈনকে। সেও খুব ভালোবাসত ডাক্তারকে।

কিন্তু সে ডাক্তারকে তো হারিয়েছে বহু বছর আগে। তার কথা মনেও ছিল না এতদিন। আর তার শরীর এত উজ্জ্বলও ছিল না। সে কিভাবে আসবে মঈনের এখানে? তাও আবার জানালা দিয়ে!
প্রায় এক সপ্তাহ পর কোন কোমল হাতের পরশে জেগে উঠল মঈন। রুমে বাতি জ্বালানো, মাথার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ছায়াহীন আগন্তুক। কেমন আছো মঈন? হাত বাড়িয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল আগন্তুক। আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি, উত্তর দিল মঈন।

অবাক হলো সে আগন্তুককে দেখে। আজ দেখাচ্ছে না আগের মতো তাড়াহুড়ো। পাশে বসে আছে শান্তভাবে, মনে হয় অনেক দিনের পরিচয়। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর নীরবতা ভাঙলো আগন্তুক, কী ভাবছ?

নড়েচড়ে জবাব দিল মঈন, কিছুই না। তবে আপনি কথা শেষ না হতেই, হ্যাঁ আমি ডা. নাফিজ, তোমাকে খুব প্রয়োজন আমার, এক শ’ বছর গবেষণা করে যে বিষয়ে এগোতে পারিনি আমি, তোমার মাধ্যমে আশা করছি সে সফলতা, বলল আগন্তুক ডাক্তার।
কিভাবে সহায়তা করতে পারি আমি? জানতে চাইল মঈন।
তুমি না বরং আমি তোমাকে সহায়তা করব, তুমি শুধু চেষ্টা করবে। এ মুহূর্তে একটি রুম দরকার, গবেষণাগার করব, যেখানে নীরবে গবেষণা করতে পারি।
আমার রুমের দক্ষিণ পাশের রুমটি লাইব্রেরি, কেউ তেমন প্রবেশ করে না রুমটিতে, কিন্তু রুমটি বেশি বড় নয়।
আমি তো ভাবছি পৃথিবীর মানুষ নিয়ে, যেখানে বিজ্ঞানের সকল অবদান অগ্রগতি ব্যবহৃত হবে এবং মানুষও সুস্থভাবে বেঁচে থাকবে দীর্ঘদিন।

আমিও তাই ভাবছি। ধর, মিল-কারখানা, যানবাহন, আণবিক-পারমাণবিক চুল্লি ইত্যাদি থেকে অসংখ্য বিষাক্ত পদার্থসহ পরিবেশ থেকে বিভিন্ন রোগ জীবাণু নিঃশ্বাসের সাথে অথবা খাবারের সাথে অথবা ত্বকের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে রক্তে প্রবাহিত হয়। রক্তের মাধ্যমে সমগ্র শরীরে ছড়িয়ে পড়ে সেগুলো এবং ধ্বংস করে দেয় শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity)। এখন যদি Immunity ধ্বংসকারী কোন অমবহঃ পাওয়ার সাথে সাথে দূষিত রক্তের পরিবর্তে বিশুদ্ধ রক্ত সঞ্চালন করতে পারি তাহলে এসব জীবাণু বা বিষাক্ত পদার্থ দ্বারা মানুষের ন্যূনতম ক্ষতি করাও অসম্ভব।

কিন্তু স্যার, প্রয়োজনে এক ব্যাগ ইষড়ড়ফ জোগাড় করতেই রোগী মারা যায়, কোথায় পাব এত রক্ত?
এখানেই থেমে গেছি আমি। একজন মানুষের পাঁচ-ছয় লিটার রক্ত থাকে, পরিবর্তন করতে হবে সব রক্ত। যখনই প্রয়োজন তখন, এক কথায় সহজলভ্য। গাড়ির যেমন তেল প্রয়োজন হলে ফিলিং স্টেশনে যায়, মানুষের প্রয়োজনেও দোকানে দোকানে ড্রামভর্তি ইষড়ড়ফ থাকবে, যখন লাগবে ৫-৬ লিটার রক্ত ক্রয় করে সঞ্চালন করবে।

প্রায় ছয় মাস লাগল গবেষণাগার সাজাতে। বসে আছে দু’জন গবেষণাগারে, ভাবছে দু’জনই কিন্তু সমাধান পাচ্ছেন না কেউ। হঠাৎ লাফিয়ে উঠল মঈন। চিৎকার দিয়ে বলল, পেয়ে গেছি, পেয়ে গেছি। কী পেয়ে গেছ? জানতে চাইলেন ডা. নাফিজ।
সমাধান স্যার।
সমাধান! কিভাবে?

আমাদের শরীরে রক্তের ৪৫ ভাগই রক্তকণিকা। এর মধ্যে রয়েছে লোহিত রক্তকণিকা (RBC), শ্বেত রক্তকণিকা (WBC এবং অণুচক্রিকা (Platelet)। বাকি ৫৫ ভাগের ৯২ শতাংশই পানি এবং ৮ শতাংশই রয়েছে প্রয়োজনীয় কিছু কোষ (Cell। লোহিত রক্তকণিকা কোষে O2 (অক্সিজেন) বহন করে। শ্বেত রক্তকণিকা জীবাণু ধ্বংস করে দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং কেটে গেলে রক্ত জমাট বাঁধিয়ে রক্ত পড়া বন্ধ করে অণুচক্রিকা। এখন যদি প্রত্যেক প্রকার কণিকা থেকে ক্ষুদ্র কোন একক নিয়ে ক্লোন করতে পারি তাহলে সহজেই অসংখ্য কণিকা বৃদ্ধি হবে এবং তা সম্ভব। এতে সফল হলে দোকানে পানির বোতলের ন্যায় রক্ত বোতলও পাওয়া যাবে।

আলহামদুলিল্লাহ, সাবাশ ইয়ং ম্যান! তুমি সফল হবে আমি আগেই ভেবেছিলাম। এত বছর গবেষণা করেও তা মাথায় আসেনি আমার।
স্যার, শুধু রক্তই নয় হার্ট (হৃৎপিণ্ড)ও তৈরি করা সম্ভব এবং করতে হবে। কারণ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মানুষের হার্টে প্রবলেম। হার্ট অ্যাটাক সকল রোগকে ছাড়িয়ে গেছে সমগ্র বিশ্বে। তাই যত বিশুদ্ধ Blood হোক না কেন, দুর্বল হার্ট দিয়ে পাম্প করে রক্ত সারা দেহে ছড়িয়ে দিলে বেশি দিন স্থায়ী হবে না। সুতরাং মানুষের গড় আয়ু যা আছে তারচেয়ে বেশি একটা বাড়বে না।
ধন্যবাদ তোমাকে তোমার আবিষ্কারের জন্য। আমরা সামনে অগ্রসর হবো এবং খুবই দ্রুত।

প্রায় এক সপ্তাহ লেগে গেল ১০টি ক্লোন সেন্টার, নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার Incubator যন্ত্রসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি সাজাতে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এগুলো জোগাড় করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে ডা. নাফিজের। কয়েক লিটার Fresh হিউম্যান  Blood এবং কয়েকটি হিউম্যান হার্টও নিয়ে আসা হলো গবেষণাগারে।
কাজ করে যাচ্ছে মঈন, চেয়ারে বসে তদারকি করছেন ডা. নাফিজ। ইতোমধ্যে খুদে বিজ্ঞানী হিসেবে মঈনের নাম ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশে।
সবাই জানে কারো সহযোগিতা নিচ্ছে সে। কিন্তু কে সে? তা কেউ জানে না।

প্রতিটি রক্তকণিকা আলাদাভাবে ক্লোন সেন্টারে রাখল। ক্লোন সেন্টারের সুপ্ত তাপমাত্রা নিয়ে আসা হলো, মানুষের দেহের তাপমাত্রার সমান। হার্টের জন্য MEP-১০০ অর্থাৎ মায়োকার্ডিয়াম ৩৫ (M-৩৫) এন্ডোকার্ডিয়াম-৫০ (E-৫০), পেরিকার্ডিয়াম ১৫ (P-১৫) এবং শিরা-উপশিরা (Vessels)-এর জন্য ভি-১ (V-১)। এ চার ধরনের কোষ অন্য একটি ক্লোন সেন্টারে একই তাপমাত্রায় রাখা হলো। ক্লোন সেন্টারগুলোতে তৈরি করা হলো উপযুক্ত মিডিয়া এবং পরিবেশ। ৭ থেকে ১২০ দিন সময় নিল কণিকাগুলো পরিপক্ব হতে। পরিপক্ব কণিকাগুলো বিভাজন পদ্ধতিতে সংখ্যা বৃদ্ধি হচ্ছে। এত দ্রুত বৃদ্ধি হচ্ছে যে দু-এক দিনেই মিডিয়া ক্লোন সেন্টারে ধারণক্ষমতা হারিয়ে ফেলল। অপর দিকে হার্টও ধারণ করছে তার নিজস্ব আকৃতি। হার্ট ও RBC-তে কোন সমস্যা নেই, কিন্তু Platelet ও WBC নিয়ে বেশ মুশকিলে পড়ছে মঈন ও ডা. নাফিজ।

রক্ত জমাট বাঁধতে যে পরিমাণ কাজ করত তারচেয়ে কয়েক গুণ বেশি কাজ করছে ক্লোনকৃত Platelet-গুলো। এতে পরিবেশের সামান্য তারতম্যে জমাট বেঁধে যেতে পারে দেহের সমস্ত রক্ত। অপর দিকে WBC-তে রয়েছে লিমফোসাইট, মনোসাইট, নিউট্রিফিল ইত্যাদি সৈন্যবাহিনী বা অস্ত্র। একেকটা অস্ত্রের আকৃতি জেট বিমান, রকেট, ট্যাঙ্কার বা সাবমেরিনের মতো। কোন জীবাণু দেহে প্রবেশ করলে ধ্বংস করে দেয় সাথে সাথে। কিন্তু ক্লোনকৃত WBC-গুলো এতই শক্তিশালী, তারা শুধু  Antigenবা জীবাণু ধ্বংস করছে না, RBC, Platelet রক্তের অন্যান্য কোষগুলোও ধ্বংসের ক্ষমতা রাখে।

চিন্তার রাজ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে মঈন, ডা. নাফিজও চিন্তিত। সমাধানের পথ কি কেউ জানে না। কিভাবে এমন হলো, কেন হলো তাও জানে না।
নতুন চিন্তা খেলে গোলো মঈনের মাথায়। সে ডা. নাফিজকে লক্ষ করে বলল, ধরুন অতিরিক্ত শক্তিশালী চষধঃব ষবঃগুলোর সাথে এন্টি প্লাটিলেট এজেন্ট (Anti-platelet agent) যেমন হোপারিন, স্টেপটুকাইনেস ইত্যাদি সমানুপাতে সহাবস্থানে ক্লোন করে শক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। WBC ক্ষেত্রে Mother কণিকার ১/৩ নিয়ে একে ব্যালেন্স করার জন্য অন্য Immunity এজেন্ট যেমন ইমিউনিগ্লবিউলিন এম (IG-M) একই নিয়মে ক্লোন করতে পারি।

চমৎকার আইডিয়া, কিন্তু WBC-কে ভগ্নাংশে পরিণত করলে এর বৈশিষ্ট্য নষ্ট হতে পারে, এমনকি কার্যক্ষমতাও হারাতে পারে, বলল ডা. নাফিজ।
নষ্ট হবে না দুই কারণে। এক. কণিকার সব সত্তা জুড়ে কার্যক্ষমতা সমানুপাতে থাকে। দুই. একে ব্যালেন্স করার জন্য IG-M সাথে থাকছে। জবাব দিল মঈন। প্রত্যাশিত রেজাল্ট পেয়ে গেল ১ সপ্তাহের মধ্যে। কিন্তু পরীক্ষামূলক প্রমাণের জন্য মানুষ প্রয়োজন। কোথায় পাবে এমন মানুষ যার দেহে রক্ত সঞ্চালন এবং হার্ট প্রতিস্থাপন করা যাবেÑ ভাবছিল মঈন। মঈনের ভাবনায় ছেদ কাটল ডা. নাফিজ, বলল, পরীক্ষামূলক প্রমাণের জন্য ইন্টারন্যাশনাল হার্ট অ্যান্ড ব্লাড রিসার্চ ফাউন্ডেশনে আমরা আগামীকালই রওনা হচ্ছি।

রাত ১২টায় হাজির হলো ডা. নাফিজ। পূর্ব থেকেই প্রস্তুত ছিল মঈন। মঈনের মাথায় হাত রাখল ডা. নাফিজ। চোখে ঝাপসা দেখছে মঈন, মুহূর্তেই কেটে গেল আলো-আঁধার। অপরিচিত মনে হলো তার নিজ রুম, চারপাশের এলাকা। নতুন এক অনভূতি সারা দেহে শিহরিত হচ্ছে। ভালো করে তাকালো চার পাশে, অত্যাধুনিক এক রুমে দাঁড়ানো সে।
একদল লোক এসে স্বাগত জানাল মঈনকে। হালকা বিশ্রাম দিয়ে তাকে নিয়ে এলো অপারেশন থিয়েটারে। দেখল দু’জন লোক দুই সিটে শোয়া। একজন OPEN হার্ট সার্জারির মাধ্যম হার্ট প্রতিস্থাপনের জন্য অন্যটি রক্ত সঞ্চালনের জন্য।

হার্ট প্রতিস্থাপন শেষ, ১২ ঘণ্টা হলো এখনো জ্ঞান ফেরেনি রোগীর। হার্ট বিট বেড়েই চলেছে সবার। রোগী বাঁচে না মরে, বাঁচলেও হার্ট ঠিকমতো কাজ করবে কি না ইত্যাদি টেনশন। সবাই দাঁড়িয়ে আছে রোগীকে ঘিরে। কেউ কারো দিকে তাকানোর সময় নেই। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে এভাবে কারো খেয়াল নেই। ঘাম ঝরছে কপাল দিয়ে, অস্থিরতা বেড়েই চলেছে প্রতি মুহূর্তে। শেষ হলো অপেক্ষা, নড়ে উঠল রোগী, আস্তে করে তাকালো চার দিকে, কথাও বলছে সবার সাথে, জড়তাহীন অবলীলায়। লাফিয়ে উঠল মঈনসহ সবাই। সফল মঈন, সফল তার গবেষণা। সিজদায় লুটিয়ে পড়ল সাথে সাথে। কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা নেমে এলো পুরো রুমে। নীরবতা ভাঙলো ডা. নাফিজ, জিজ্ঞেস করল রোগীকে, কেমন লাগছে এখন?
ভালো অনুভব করছি, বলল রোগী।

৭ দিনে সুস্থ হয়ে উঠল হার্ট প্রতিস্থাপনের রোগী। সম্পূর্ণ সুস্থ। রক্ত সঞ্চালনও সফল। নেই কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, নেই কোনো অভিযোগ।
মানবতার জন্য মঈনের মহান সাফল্য মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল পৃথিবী জুড়ে। পৃথিবীর বিখ্যাত গবেষণা সংস্থাগুলো বিশাল বিশাল অফার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মঈনের জন্য। কোটি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হলো খুদে বিজ্ঞানী মঈন। এটা মঈনের জন্য বিরাট পাওনা, বিরাট পাওনা পৃথিবীর মানুষের জন্যও। এখন রক্ত পাবে প্রতিটি দোকানে দোকানে, যখন ইচ্ছা সঞ্চালন করে নেবে। পৃথিবী এগিয়ে চলবে, নতুন নতুন আণবিক, পারমাণবিক মিল-কারখানা আবিষ্কার হবে অথচ মানুষের কোন ক্ষতি হবে না, বেঁচে থাকবে যতদিন তার আয়ু আছে, অকালে প্রাণ হারাবে না কেউ।

ডা. নাফিজ উঠে দাঁড়ালেন, বিদায় নিচ্ছেন চলে যাওয়ার। পরিবারের অন্য কেউ জানত না আজকের আগে তিনি এখানেই গবেষণা করেছেন। শেষ সময়ের পরিচয়ে কষ্ট পেল সবাই। মঈন ভাবতেই পারছে না চলে যাবে প্রিয় মানুষটি। গবেষণার সময়গুলো ভোলা যায় না, কষ্টের প্রচণ্ডতায় ধরে রাখতে পারেনি চোখের পানি। হাউ-মাউ করে কেঁদে দিল মঈন, জড়িয়ে ধরল ডা. নাফিজকে। সান্ত্বনা দিচ্ছে ডা. নাফিজ, আবারো দেখা হবে কোন এক বিশেষ মুহূর্তে।
খোদা হাফেজ বলে বিদায় নিল ডা. নাফিজ। বাকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল সবাই, মিলিয়ে গেল হাওয়ার সাথে ছায়াহীন আগন্তুক।

লিখেছেন: আমিনুল ইসলাম আকন্দ

Immunity

SHARE

3 COMMENTS

Leave a Reply