Home স্মরণ সেই দিনগুলো

সেই দিনগুলো

আল মাহমুদ

মানুষের জীবনের ঘটনাপ্রবাহ যেমন আল মাহমুদের কবিতায় এসেছে তেমনি এসেছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বেদনা। ছড়া ও কিশোর-কবিতার ভুবনে একটি উঁচু অবস্থানে উঠে গেছেন তিনি। আল মাহমুদের প্রায় সব কাব্যগ্রন্থের সাথেই রয়েছে দু’চারটি শিশু-কিশোর কবিতা যা পাঠকদের বিমোহিত করে। তার এসব কবিতায় পাঠক উচ্ছ্বসিত হন। কল্পনার রঙধনু চোখের সামনে তুলে ধরে ক্লান্তিহীন এক চমৎকার বাংলাদেশ। শব্দের সুরে অন্য অর্থ, বক্তব্যের আড়ালে অন্য মাধুর্য, রূপকল্প, বর্ণনার সৌকর্য, পরিশীলিত প্রকাশের চমৎকারিত্ব আল মাহমুদের শিশু-কিশোর কবিতাকে করে তুলেছে অনন্য। এ সংখ্যায় প্রকাশিত হলো আল মাহমুদের কৈশোরস্মৃতির

দশম কিস্তি

মানুষের জীবন খুবই বৈচিত্র্যময়। প্রতিনিয়ত মানুষের জীবনে আসে পরিবর্তন। মানুষ অবশ্য পরিবর্তনের পক্ষপাতী। একটু আগে যেখানে সুখের নহর বইছিল একটু পর সেখানেই দুঃখের সাগর বয়ে যায়। কোন একটি জিনিস পাওয়ার জন্য মানুষের আকাক্সক্ষা সীমাহীন। সে মনে করে কাক্সিক্ষত জিনিসটি পেলে সে খুবই লাভবান হবে। কিন্তু সবাই কাক্সিক্ষত বস্তুটি পায় না। যারা পায় তারা খুশি হয় আর যারা পায় না তারা আশায় বুক বেঁধে থাকে। এই যে আশা, এটিই মানুষের জীবনের বাহক। এই আশা না থাকলে মানুষের জীবনধারা অচল হয়ে যেত। পৃথিবী আজ এরকম সুন্দর হতো না।

যাইহোক, মানুষের জীবন চিরবৈচিত্র্যময় ও গতিশীল। মানুষ চাক আর না চাক জীবন সদাবেগবান। এ জীবন কখনো থেমে থাকে না। কিন্তু মানুষ সেটা বুঝতে পারে না। আমি নিজের কথাই বলি। এই তো ক’দিন আগেও স্কুলে যেতাম। পাড়ার সহপাঠীদের সাথে কত না মজা করে ঘুরতাম। মাঝে মাঝে মনে হতো পাখিদের সাথে উড়ে বেড়াই। কত না সুখেই কেটেছিল দিনগুলো। কিন্তু আজ একি! চারপাশে সবকিছু আছে। না চাইতে অনেক কিছু পাই। কোন কিছুরই অভাব নেই। কিন্তু তবু কোথায় যেন শূন্য শূন্য বোধ হয়। মনে হয় কিছুই নেই। এর মূল কারণ মনের বল। আগে মনে বল ছিল, আকাশের চাঁদকে মনে হতো হাতের মুঠোয়। আর এখন মনে বল নেই। টেবিলে কলমটিকে মনে হয় সাত সমুদ্র তের নদী দূরে।

প্রকৃতপক্ষে মানুষের জীবন মানুষের সাথে থাকলেও সবসময় তা মানুষের ইচ্ছার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর একজন নিয়ন্ত্রণকারী আছেন। মানুষের চেয়ে নিয়ন্ত্রকের নির্দেশ তার কাছে অধিক শিরোধার্য। ভাষা মানুষের সেই নিয়ন্ত্রকের সেরা দান। ভাষা আছে বলেই আমরা মাকে ‘মা’ বলে ডাকতে পারি। ছোট্ট বোনটিকে ‘এই বুড়ি’ অথবা ‘আপু’ বলে সম্বোধন করি। কখনো ভালো না লাগলে মনের সুখে গান গাই, গান শুনি কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে আমাদের যেমন ভাষা আছে, পৃথিবীর প্রত্যেকটি প্রাণীর নিজস্ব ভাষা আছে। তারা তাদের ভাষায় মানুষের মতোই সবকিছু করে।

আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি। এটা আমাদের রাষ্ট্রভাষা, মাতৃভাষা। এই ভাষা আমাদের নিজস্ব ভাষা। আমরা জাতি হিসেবে বাংলাদেশী আর আমাদের ভাষা বাংলা। পৃথিবীতে এমন অনেক জাতি আছে যাদের নিজস্ব কোনো ভাষা নেই। তারা অন্য জাতি বা দেশের ভাষায় কথা বলে। এ ক্ষেত্রে আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং স্বতন্ত্র।

আমাদের এই ভাষা, যাদের একই সাথে নিজস্ব ভাষা ও দেশ আছে তাদের থেকেও স্বতন্ত্র। কারণ আমাদের ভাষার একটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আছে। যা অন্য কোন ভাষার নেই। এই ভাষার জন্য আমাদের পূর্বপুরুষরা তাদের জীবন দিয়েছেন। সে এক অমর ইতিহাস।

১৯৫২ সাল। ফেব্রুয়ারি মাস, আমি বয়সে নবীন। সারা দেশে তুমুল উত্তেজনা। চারদিকে যুদ্ধংদেহি মনোভাব। সবার মুখে এক কথা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। এক মুখ থেকে অন্য মুখে। এক কথা এক সুর। ক্রমে ক্রমে ভাষার ভালোবাসা গণআন্দোলনে রূপ নেয়। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী এ আন্দোলন ঠেকাতে জারি করে কারফিউ। কিন্তু কে শুনে কার কথা! ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি জীবনের মায়া ত্যাগ করে কারফিউ উপেক্ষা করে ঢাকায় বের হয় মিছিল। পুলিশ মিছিলে গুলি চালালে রফিক, বরকত ও সালামরা শহীদ হন। এ খবর শোনার পর সারা দেশ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। শুরু হয় তুমুল আন্দোলন। আমরা সে আন্দোলনে অর্থ সাহায্য দেয়ার জন্য ট্রেনে চড়ে ক্যানভাস করে টাকা জোগাড় করতাম। জনগণ আমাদের সাহায্য করেছিল। তাদের সমর্থন ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করতে সহায়তা করেছে।

পরবর্তীতে তারা সফলও হয়েছিলেন। আর তাদের রক্ত, জীবন ও আন্দোলনের ফসল আজকের এই বাংলাভাষা।

আমাদের উচিত যারা এই ভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছেন তাদের প্রতি সম্মান জানানো ও দোয়া করা। সেই সাথে মাতৃভাষা ভালোভাবে লিখতে, পড়তে, বলতে ও এই ভাষাতে কবিতা আবৃত্তি করতে শেখা। বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞা করে ইংরেজিতে কথা বলে ও লেখাপড়া করে ভাষা দিবসে শুধু ভাষা শহীদদের কবরে ফুল দিলে ভাষার মর্যাদা রক্ষা করা হয় না। আর এটা ভাষা শহীদদের উদ্দেশ্যও ছিল না। বরং তাদের উদ্দেশ্য ছিল মায়ের মুখে, স্কুলের পাঠ্যবইয়ে, অফিস আদালতে বাংলাভাষার প্রসার। তাদের জীবনদান সেদিন সার্থক হবে যেদিন আমরা বাংলাভাষাকে ভালোবাসবো, বাংলাভাষার চর্চা করবো এবং বিশ্বের বুকে বাংলা ভাষাকে ছড়িয়ে দেবো। আমি তোমাদের সেই আহ্বানই জানাচ্ছি।

SHARE

Leave a Reply