Home প্রচ্ছদ রচনা ভাষা নিয়ে যত কথা

ভাষা নিয়ে যত কথা

আবু জাফর মুহাম্মদ ওবায়েদুল্লাহ

ফেব্রুয়ারি এলেই আমাদের মনে পড়ে
ভাষা আন্দোলনের কথা।

শহীদ মিনার

ফাগুন এলেই পলাশের ডালে, কৃষ্ণচূড়ার শাখায় ফোটে লাল-লাল ফুল। আর আমরা যারা বাংলা ভাষায় কথা বলি আমাদের চোখে ভাসে- রক্তাক্ত রাজপথ, শহীদ সালাম, বরকত আর জব্বারের নাম। মনের অজান্তে আমরা গেয়ে উঠি “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কী ভুলিতে পারি?”

ভাষা আন্দোলন নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে, আরো হবে- যতদিন থাকবে এই বাংলা।
আজ আমরা তোমাদের জন্য লিখছি অন্য বিষয়।

তার আগে বলে নিচ্ছি আমাদের প্রিয় ভাষা বাংলা কিন্তু পৃথিবীর একটি অন্যতম সুন্দর ভাষা। বর্তমানে বিশ্বের দেশে দেশে ২৫ কোটির বেশি মানুষ বাংলায় কথা বলে। সবচেয়ে আনন্দের কথা বাংলা, আফ্রিকার একটি দেশ সিয়েরালিওয়নের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা। একদিন যে ভাষার অধিকার পাওয়ার জন্য জীবন দিতে হয়েছিল অনেক তাজা প্রাণের- আজ সে ভাষা আন্দোলনের স্মরণে ‘ভাষা দিবস’ ২১ ফেব্র“য়ারি বিশ্বের ১৮৮টি দেশে সগৌরবে উদ্যাপিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখছেন বাংলায়।

শিমুল-পলাশ আর হিজল-তমালের দেশ বাংলাদেশে ফেব্র“য়ারি এলেই পাখির কলকাকলির মতো সবখানে ভাষা দিবসের স্মরণে কলরোল মুখর হয় শহর-নগর গ্রাম ও গঞ্জ। এ আমার, তোমার, আমাদের সকলের এক দীপ্ত অহঙ্কার।

লক্ষ বছর আগে
ছোট্ট পিপীলিকা, ক্ষুদ্র মৌমাছি, বিশাল তিমি, দুষ্ট বানরসহ পৃথিবীর তাবৎ প্রাণীই একে অন্যের সাথে নানা ইশারায় যোগাযোগ রক্ষা করে। আর মানুষ একমাত্র প্রাণী যে ভাষায় বাক্সময় হয়। কথা বলে মনের ভাব প্রকাশ করে। কেবল ইশারা-ইঙ্গিতে তার যোগাযোগ শেষ হয় না। মজার কথা হলো- অন্য প্রাণীর চেয়ে আমাদের কথা বলার শারীরিক ধরনও ভিন্ন। আপনা-আপনি বাগ-যন্ত্রের মধ্য থেকে কথা বেরিয়ে আসে না। কথাগুলোকে সাজিয়ে-গুছিয়ে সুবিন্যস্ত ও সাজুস্যপূর্ণ করে বের করতে হয়। মানব-মস্তিষ্কের এই ভাগটি একটি অসাধারণ অংশ।

কখন কিভাবে কথা বা ভাষার এই বিশেষ প্রতিভা মানুষ অর্জন করলো তার ইতিহাস খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। তবে ধরে নেয়া যায়- ভাষা নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের অবস্থায় এসেছে। সম্ভবত লক্ষ-লক্ষ বছর আগ থেকে আমাদের পূর্বপুরুষরা বলতে শিখেছে। তবে তাদের ভাষা ছিলো ধীর, শব্দ ভাণ্ডার ছিল সীমিত আর ব্যাকরণ ছিলো অনেক সহজ। ভাষা মহান আল্লাহর এক বিরাট নিয়ামত।

আল্লাহ বলছেন- “পরম দয়াবান আল্লাহ। তিনি শিখালেন আল কুরআন। তিনি মানুষ সৃষ্টি করলেন। আর তাকে শিখালেন বর্ণনা করতে।”

সুতরাং, যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন তিনিই আমাদেরকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন নানা ভাষাভাষী করে।

ভাষার গোড়ার কথা
সম্ভবত ভাষার গোড়ার কথাটি চিরকালই রহস্যাবৃত হয়ে থাকবে। ভিন্ন ভিন্ন ভাষার উৎপত্তি নিয়ে মানুষের মাতামাতি বেশি দিনের নয়। মাত্র দুই শ’ বছর ধরে এ নিয়ে চলছে নানা চিন্তাভাবনা ও গবেষণা। বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় পাঁচ হাজার ভাষায় মানুষ কথা বলে। আর তার এক-তৃতীয়াংশই হলো আফ্রিকায়। পণ্ডিতগণ এসব ভাষাকে ২০টিরও কম ‘ভাষা পরিবারে’ বিভক্ত করেছেন। ভাষাগুলো কিন্তু শব্দ, উচ্চারণ ও ব্যাকরণগত নির্মাণের দিক থেকে একে অন্যের সাথে সম্পর্কিত।

খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ বছর আগে

ভাষার পরিবারসমূহ
ভাষার সবচেয়ে বড় পরিবার হচ্ছে- ‘ইন্দো-ইউরোপীয়’ পরিবার। পৃথিবীর অর্ধেকের চেয়েও বেশি মানুষ এ পরিবারভুক্ত ভাষায় কথা বলে থাকেন। এই দলে রয়েছে বাংলা, হিন্দি, ফারসি থেকে নরওয়েজিয়ান এবং ইংরেজি। বলা হয়ে থাকে এসব ভাষা এসেছে পূর্ব ইউরোপ এবং পশ্চিম এশীয় অঞ্চলের সমভূমিতে ঘুরে বেড়ানো যাযাবর উপজাতির কাছ থেকে। আধুনিককালের ইউক্রেন হচ্ছে সে এলাকা। এ অঞ্চলকে এক সময় ‘গোবি’ও বলা হতো। এটি খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ সালের কথা।

খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ সাল থেকে ইন্দো-ইউরোপীয় পরিবারের ভাষাভাষী লোকেরা যখন ইউরোপ ছাড়িয়ে আটলান্টিকের উপকূল এবং ভূমধ্যসাগরের উত্তর কূলে উপনীত হলো- তখনই এর ব্যাপক ব্যাপ্তি হলো। পারস্য ও ভারত জয়ের মধ্য দিয়ে তারা ছড়িয়ে গেলো এশিয়ার দূর এলাকাসমূহে।

এ ধরনের আরেকটি ভাষা-পরিবার হচ্ছে ‘সেমেটিক’ ভাষা পরিবার। এশিয়ার পশ্চিম অঞ্চলের লোকেরা এসব ভাষায় কথা বলে। বিশ্বাস করা হয়, এসব ভাষার উৎপত্তি হয় আরবের দক্ষিণাঞ্চলে ঘুরে বেড়ানো একটি উপজাতির ভাষা থেকে।

খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ সাল থেকে সেমেটিক ভাষা দক্ষিণ আরবের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় বিকাশে সেমেটিক জনগোষ্ঠীর বিরাট অবদান ছিলো। মধ্যপ্রাচ্যে একসময় আরামিয়া নামক সেমেটিক ভাষা ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’ বা জাতিসমূহের সাধারণ ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

ভাষার বড়াই

এক সময় পৃথিবীতে ভাষা নিয়ে বড়-ছোটর লড়াই ছিলো। যেমন ইন্দো-ইউরোপীয় পরিবারভুক্ত কয়েকটি ভাষা মিলে ছিলো ছোট্ট ইন্দো-ইরানি ভাষাগুচ্ছ। এটাকে আর্য ভাষাও বলা হয়। ঊনিশ শতকে এটিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে আর্যভাষী, জাতি বা বর্ণ। এদেরই পথ ধরে নাজিরা দাবি করে নিজেদেরকে ‘ব্লন্ড-প্রভু জাতি’ বলে।

একই অবস্থা ছিলো দু’টি প্রধান সেমেটিক দল যারা মানব ইতিহাসে বড় বড় ভূমিকা রেখেছে- ইহুদি ও আরব জাতির।
ইংরেজি-ফ্রান্স কে বড়? নাকি জার্মান ভাষা বড়?

এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক ছিলো এক সময়। এখন কিন্তু এসব লড়াইয়ের বিষয় নয়। তবে শক্তিশালী মিডিয়া যাদের তাদের ভাষাই- এখন শক্তিশালী। ওদের ভাষা শিখতে প্রতিযোগিতা করে অন্যরা। আমাদের দেশে যেমন প্রতিযোগিতা হচ্ছে- ইংরেজি, আরবি, ফ্রেঞ্চ, জাপানি, কোরিয়ান আর জার্মান ভাষা শেখার। হিন্দি তো শেখা লাগে না। সব সময় শুনতে শুনতে শেখা হয়ে যায়।
পুরনো ভাষা থেকে নতুন ভাষা

বিবর্তনের ধারায় পথ চলতে চলতে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ইংরেজি ভাষারও কয়েকটি রূপ দেখা যায়। মনে কর, নিউগিনির লোকেরা যে ইংরেজি ব্যবহার করে তা একজন বাইরের লোকের কাছে হাস্যকর মনে হবে। ওখানকার লোকেরা ব্যবসা বাণিজ্য চালানোর জন্য ভাষার সহজতম উপাদানগুলো নিয়ে একটা সাধারণের ভাষা তৈরি করে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের লোকেরা নিজেদের সুবিধার জন্য ইংরেজিতে যোগ করে নিয়েছে কতগুলো স্থানীয় শব্দ, বাগধারা ও বাক্য-রীতি, এর ফলে সেটি হয়ে উঠেছে উপভোগ্য ও বর্ণিল। এভাবে ভাষা বদলাতে থাকে।

ইংরেজি : বর্তমান জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যেসব জার্মানরা ইংল্যান্ডে দখলদার হিসেবে আসে তাদের মাধ্যমে গড়ে ওঠে ইংরেজি ভাষা। পুরনো ইংরেজি ছিল ইংল্যান্ডের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার সংমিশ্রণ। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশসমূহের মানুষের সাথে সহাবস্থান করতে করতে এই ভাষার ব্যাকরণ ও শব্দাবলি সহজতর রূপ লাভ করে। জার্মানি অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে আর নরওয়ে ১১ শতাব্দীতে ইংল্যান্ড অধিকার করে। ফলে ইংরেজি ভাষায় আমরা প্রচুর রোমান, ল্যাটিন, জার্মান ও গ্রিক শব্দ পাই। বিশেষ করে পুরনো দিনের ইংরেজিতে। মধ্যযুগের ইংরেজিতে দেখা যায় নরওয়েজিয়ান ভাষার প্রভাব। আধুনিক ইংরেজির সূচনা হয় ১৫ শতাব্দীতে। ষোড়শ শতাব্দীতে উইলিয়াম শেকসপিয়রের রচনার মধ্য দিয়ে আধুনিক ইংরেজি একটি স্বীকৃত পর্যায়ে আসে এবং এ সময়ে ১৬০৪ সালে প্রথম ইংরেজি অভিধান প্রকাশিত হয় যার নাম ছিলো- ‘উরপঃড়হধৎু ড়ভ ঊহমষরংয খধহমঁধমব’. প্রথম দিকের আধুনিক ও শেষের আধুনিক ইংরেজি ভাষার মূল পার্থক্য শব্দভাণ্ডার। শিল্প বিপ্লবের ফলে যুক্ত হয় বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত শব্দসমূহ আর বিশাল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যবহারোপযোগী সাধারণ শব্দসমূহ তৈরি হতে থাকে।
ফ্রেঞ্চ : ‘ফ্রেঞ্চ’ ভাষাটি ইন্দো-ইউরোপীয় পরিবারের একটি ভাষা ল্যাটিন ভাষা থেকে উদ্ভূত। রোমান ফ্যাশনে বলা হয় বলে- এ গ্রুপের অন্য ভাষার মতো এটিকেও বলা হয় রোমাঞ্চ ভাষা। ফ্রেঞ্চ- ভাষা হিসেবে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, কানাডা, আফ্রিকা, ইতালি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ৯ কোটি ৮০ লাখ মানুষ এ ভাষায় কথা বলে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। রোমাঞ্চ ভাষা পরিবারের অন্য ভাষাসমূহ- ইতালিয়ান যা ইতালি, সুইজারল্যান্ড ও আফ্রিকার অংশবিশেষে ৬ কোটি ৫০ লাখ মানুষের ভাষা। অপরদিকে ১৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ পর্তুগাল, ব্রাজিল, এশিয়া ও আফ্রিকার বিশেষ অংশে পর্তুগিজ ভাষায় কথা বলেন। স্পেন, ল্যাটিন আমেরিকা, ক্যারিবীয় দেশের বিভিন্ন অংশে ২৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ স্প্যানিশ ভাষা ব্যবহার করে। রোমানিয়া ও বলকান অঞ্চলের ২ কোটি ৫০ লাখ লোক কথা বলেন রোমান ভাষায়।

যা হোক, এসব ভাষার ব্যবহার চলতে চলতে, আঞ্চলিক ভাষাসমূহের মাঝে প্যারিসের ভাষা জাতীয় ভাষায় পরিণত হয়। এর অন্যতম কারণ, প্যারিস রাজধানী এবং তার রাজনৈতিক প্রভাব ছিল বিরাট। এই হলো আজকের দিনের ‘ফ্রেঞ্চ ভাষা’।

স্প্যানিশ : আধুনিক স্প্যানিশ বা স্পেনীয় ভাষার গোড়াপত্তন হয় রানি ইসাবেলা ও ফার্ডিনান্ড কর্তৃক মুসলিম শাসিত স্পেন পুনর্দখলের মধ্য দিয়ে। বিশ্বের ৩৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ এ ভাষায় কথা বলেন। আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, চিলি, কলাম্বিয়া, কোস্টারিকা, কিউবা, জেমিনিকান প্রজাতন্ত্র, ইকুয়েডর, এল সালভেদর, গিনি, গুয়েতেমালা, হন্ডুরাস, মেক্সিকো, নিকারাগুয়া, পানামা, প্যারাগুয়ে ও ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রভাষা। এ ছাড়াও কানাডা, মরক্কো, ফিলিপিন ও যুক্তরাষ্ট্রে এর চর্চা হয়।

খ্রিষ্টপূর্ব ১৯ সালে রোমান শাসনের অধীন থাকতে এ অঞ্চলকে বলা হতো হিসপানিয়া। খ্রিষ্টানগণ স্পেন পুনর্দখল করার পর ভাষা, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সামরিক দিক থেকে আমূল পরিবর্তন আনেন। এভাবেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে স্পেনীয় ভাষা। এরা ল্যাটিন, গ্রিক ও আরবি ভাষা হতে অসংখ্য পুস্তক অনুবাদ করেন। ১৪০০ শতকের বিজয়ী স্পেনীয়গণ জয় করতে থাকেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। তাদের উপনিবেশ বি¯তৃত হতে থাকে। এভাবে স্প্যানিশ ভাষা ছড়িয়ে পড়ে মধ্য-আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এবং উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন স্থানে। ১৮০০ শতকে স্পেন আমেরিকান উপনিবেশ হারালেও এখনও পর্যন্ত স্প্যানিশ ভাষা ল্যাটিন আমেরিকার প্রায় সব জাতির রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

ফিলিপাইন এক সময় স্পেনের অধীনস্থ রাজ্য ছিল। রাজন্যবর্গের আদালত ও প্রশাসনের ভাষা হিসেবে স্প্যানিশ ব্যবহৃত হতো। স্পেন-আমেরিকার যুদ্ধের পর ফিলিপাইন আমেরিকার হাতে চলে যায়। দীর্ঘদিন ইংরেজি ও তাগালোগ ভাষার পাশাপাশি স্প্যানিশ ব্যবহৃত হতো।

আরবি : আধুনিক আরবি সেমেটিক ভাষা পরিবারের সদস্য। সেমেটিক ভাষাগুলো হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে। মানব ইতিহাসের অন্যতম পুরনো সংগ্রহশালা এ ভাষায়। আরবি সেমেটিক ভাষা পরিবারভুক্ত, প্রোটো সেমেটিক ভাষা যার অতীত মুখের ভাষা হিসেবে লিখিত নয়। আরবি আফ্রো-এশীয় ভাষা উপ গ্রূপের সদস্য। আরবি ছাড়াও সেমেটিক ভাষা পরিবারের সদস্য হিব্রূ, আরামিক, আমহারিক, টিগরিনিয়া, টিগর, গুরেজ, গিজ, সিরিকা, আক্কাদিয়ান, পুনিক, নাবাটিয়ান, অ্যামেরাইট, মোয়াবাইট। এসব ভাষার অনেকই এখন ‘মৃত ভাষা’ কিংবা অপ্রচলিত অথবা কেবল ধর্মীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত। কিন্তু আরবি দিন দিন বিকশিত হয়েছে এবং হচ্ছে। এর প্রধান কারণ ইসলামের উত্থান। বিশেষ করে ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ আল কুরআন।

আরবি ভাষার তিনটি বিশেষ রূপ রয়েছে। কুরআনের আরবি, আধুনিক প্রমিত আরবি এবং কথ্য বা আঞ্চলিক আরবি, ক্লাসিক্যাল আরবি মূলত কুরআনে ব্যবহৃত আরবি। কুরআন-হাদিস বুঝতে হলে এই ক্লাসিক্যাল আরবি বুঝতে হয়। অপরদিকে, রেডিও, টিভি, চলচ্চিত্র, নাটক, কবিতা ও কথোপকথনে ব্যবহৃত হয় আধুনিক প্রমিত আরবি। সমগ্র আরব ভাষা-ভাষী এলাকায় ব্যবহৃত আধুনিক-প্রমিত আরবি একই রকম। বিশ্বের দেশে দেশে প্রায় সবখানেই ব্যবহৃত ভাষা আরবি। যেহেতু একসময় জানা পৃথিবীর অধিকটাই ছিল মুসলিম শাসনের অধীন, সেহেতু সেসব দেশের প্রশাসনের ও আদালতের ভাষা ছিল আরবি।

গ্রিক ভাষা : জানা মতে খ্রিষ্টপূর্ব ১৩০০ বছর আগে গ্রিক ভাষার প্রচলন হয়। সেটি ছিল মায়া সভ্যতার যুগ। খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ সালে মায়া সভ্যতার ধ্বংস হলে গ্রিক ভাষায় লেখালেখি লুপ্ত হয়। খ্রিষ্টপূর্ব আট শতাব্দীর শেষ দিকে এর বর্ণমালাকেন্দ্রিক ভাষা লিখিত হয়। ক্লাসিক্যাল বা হোলনীয় যুগে গ্রিক ভাষায় অনেক আঞ্চলিক ভাষা থাকলেও সবচেয়ে প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে অ্যাথেন্সে ব্যবহৃত কথ্য ভাষা যাকে বলা হতো- অ্যাল্টিক। এর আরেকটি আঞ্চলিক ভাষার নাম- আয়োনিক। বক্তৃতা, দর্শনকেন্দ্রিক কবিতার ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হতো অ্যাট্টিক আয়োনিক ভাষা। আলেকজান্ডার দিগি¦জয়ী বীর হিসেবে যেসব দেশে গেছেন সেসব দেশেই বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ও নিকট প্রাচ্যের দেশসমূহে।

সাধারণ গ্রিক ভাষা বিজয়ী বীর আলেকজান্ডারের সময়ে গড়ে ওঠে। অ্যাট্টিক-আয়োনিক ভাষাদ্বয়ের সম্মিলনে গড়ে ওঠে হেলেনীয় গ্রিক ভাষা। এটি গ্রিক ভাষায় ব্যাপক শব্দ ভাণ্ডারগত, উচ্চারণগত ও ব্যাকরণের পার্থক্য সূচনা করে। এভাবেই জন্ম নেয় আধুনিক গ্রিক ভাষা।

আজকের আধুনিক প্রমিত গ্রিক ভাষা গড়ে ওঠে ১৮৩০ সালে গ্রিসের স্বাধীনতা লাভের মধ্য দিয়ে। অ্যাথেন্স ও পেলেপোন্সেবাসীগণ এই ভাষার প্রধান ব্যবহারকারী। পরিবর্তনবিমুখ অ্যাট্টিক, আয়োনিক এবং হেলেনীয়গণের বাধার পরও কিন্তু এগিয়ে চলছে আধুনিক গ্রিক ভাষার অগ্রযাত্রা।

জার্মান : জার্মানি ও অস্ট্রিয়ায় জার্মান ভাষা ব্যবহার হতে দেখা যায়। ঐতিহাসিকভাবে জার্মান ভাষার তিন কাল, প্রাচীন জার্মান (৭৫০-১০৫০ খ্রিষ্টাব্দ), মধ্যযুগের জার্মান (১০৫০-১৫০০ খ্রিষ্টাব্দ) এবং আধুনিক জার্মান (১৫০০- বর্তমান সময়)। ১৮ শতাব্দীর জার্মান পণ্ডিত ও লেখকগণ এ ভাষাটিকে আজকের আধুনিক ও প্রমিত রূপ দিয়েছেন। এখন এ ভাষায় নতুন বানানরীতি প্রবর্তিত হয়। সরকারি এ উদ্যোগ কার্যকর করতে ২ বছর সময় লেগেছে। বর্তমানে গতানুগতিক ও সংস্কারকৃত দুই জার্মান ভাষাই ব্যবহৃত হয়।

চীনা ভাষা : চীনা ভাষায় দক্ষ হতে হলে প্রায় ৭০ হাজার চিহ্ন ও শব্দের সাথে পরিচিত হতে হয়। মাধ্যমিক স্কুলেই ছাত্রছাত্রীদের শেখানো হয় ৫ হাজার চিহ্ন। ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ চীনা ভাষায় কথা বলে। প্রধানত চীন ও তাইওয়ানে এ ভাষা প্রচলিত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং হাওয়াইয়ান দীপপুঞ্জে বহু লোক চীন থেকে এসে অভিবাসী হয়। ফলে তারা চীনা ভাষায়ও কথা বলে।

ভাষাভাষী লোকদের বিচারে চীনা ভাষায় সর্বাধিক মানুষ কথা বলে। এরপরই স্থান ইংরেজির, স্প্যানিশরা তৃতীয়। এশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা হিসেবে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের ভাষার ওপর চীনা ভাষার প্রভাব রয়েছে। যেমন জাপানি, কোরিয়ান ও ভিয়েতনামি ভাষায় চীনা লিপি ব্যবহৃত হয়। আঠার শতক পর্যন্ত পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি ছাপানো বই ছিল চীনা ভাষায়।

ভাষা নিয়ে অনেক কথা হলো।
সব কথার শেষ কথা হলো- ও আমার বাংলা ভাষা খোদার সেরা দান! পৃথিবীতে বাংলাভাষী মানুষের সংখ্যা বিচারে আমাদের স্থান অষ্টম। চলো আমরা এ ভাষাটিকে ভালো করে শিখি। এ ভাষাতেই হাসতে-কাঁদতে এবং বাঁচতে শিখি।

SHARE

2 COMMENTS

Leave a Reply