Home বিজ্ঞান পরিবেশবান্ধব হাইব্রিড কার

পরিবেশবান্ধব হাইব্রিড কার

সাকিব রায়হান

পরিবেশবান্ধব হাইব্রিড কার

গোটা পৃথিবীতেই গাড়ি তৈরির প্রযুক্তি এখন মনোযোগ দিচ্ছে দু’টি বিষয়ে। এক. গাড়িটি কতো কম জ্বালানি খরচ করবে এবং দুই. এ গাড়ি পরিবেশ দূষণের হুমকির প্রতি কতটা বন্ধুভাবাপন্ন হবে।

বিশ্বের দূষিত নগরীগুলোর মধ্যে ঢাকা অন্যতম। ঢাকার রাস্তায় গাড়ির কালো ধোয়া এই দূষণের অন্যতম কারণ। বিগত বছরে তাই পরিবেশবান্ধব যানবাহনের কথা বারবার বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়েছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে গাড়ির সংখ্যা। এর বেশির ভাগই ব্যক্তিগত বা সরকারি বিভিন্ন কাজে ব্যবহার হয়ে আসছে।

পরিবেশ রক্ষার বিশেষ উদ্যোগে চালু হয়েছে সিএনজি জ্বালানি, বিতাড়িত হয়েছে বহুদিনের পুরাতন, কালো ধোঁয়া উৎপন্ন করে এমন অনেক বাহন। দেশের বেশির ভাগ ব্যক্তিগত ও সরকারি পরিবহন পুলের গাড়ি এখন সিএনজি রূপান্তরিত। তার পরও ঢাকায় পরিবেশ দূষণের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে।

যানবাহনের দূষণ থেকে ঢাকাকে মুক্ত করতে প্রথমেই দরকার পরিবেশবান্ধব গাড়ি। এমন গাড়ি যা পুরোপুরি জ্বালানিবান্ধব। হাইব্রিড গাড়ি এমনই একটি গাড়ি।

হাইব্রিড প্রযুক্তি কী?
বিকল্প একাধিক পদ্ধতির সুসমন্বয়ই হচ্ছে হাইব্রিড প্রযুক্তি। গাড়ির বেলায় এই বিকল্প একাধিক প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটে জ্বালানি ব্যবহারের বেলায়। অর্থাৎ হাইব্রিড গাড়ি মানে যে গাড়ি একাধিক ধরনের জ্বালানিতে
চালানো সম্ভব।

হাইব্রিড গাড়ির বৈশিষ্ট্য
এ ধরনের গাড়িতে পেট্রোল বা ডিজেল ইঞ্জিনের সাথে এক বা একাধিক ইলেক্ট্রিক মোটর এবং ব্যাটারি বিশেষভাবে সংযুক্ত থাকে। জ্বালানি দিয়ে গাড়ি চালু করার পর স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ব্যাটারি চার্জ হয়। এবং উচ্চ টর্ক সম্পন্ন বৈদ্যুতিক মোটর ইঞ্জিনে গাড়ি চলতে থাকে। ফলে জ্বালানির অনেক সাশ্রয় সম্ভব হয়। কোন কারণে জ্বালানি ফুরিয়ে গেলেও ব্যাটারির সাহায্যে এ গাড়ি চালানো সম্ভব।

পেট্রোলচালিত গাড়ির সাথে কম বেশি আমরা সবাই পরিচিত। হাইব্রিড গাড়িতে এই পেট্রোল ইঞ্জিনের সঙ্গে থাকে একটি ইলেক্ট্রিক মোটর। উচ্চ টর্কের জন্য এ ধরনের মোটর খুবই পরিচিত। বেশি গতিতে গাড়ি চালাতে এ ধরনের মোটর কাজে লাগে। অন্যদিকে হাইওয়েতে ঘুরে বেড়ানো বা ব্রেক কষার সময় পেট্রোল ইঞ্জিন ব্যাটারি রিচার্জ করে।

হাইব্রিড কার এখন ঢাকার রাস্তায়
বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো যাত্রা শুরু করলো পরিবেশবান্ধব হাইব্রিড গাড়ি। জাপানের হোন্ডা কোম্পানি এই গাড়ির প্রস্তুতকারক। বাংলাদেশে এর পরিবেশক ডিএইচএস মোটরস। হোন্ডার বরাতে আমদানিকারক ডিএইচএস মোটরস জানিয়েছে, বাংলাদেশে আমদানি করা হোন্ডা সিভিক হাইব্রিড গাড়িতে রয়েছে ১.৩ লিটারের ৩ স্তরের আই-ভিটিইসি ইঞ্জিন। ইঞ্জিনটি হোন্ডা ইন্টিগ্রেটেড মোটর অ্যাসিস্ট (আইএমএ) সিস্টেমের সমন্বয়ে তৈরি। ফলে চালু হবার সময় বিদ্যুতের জন্য এটি এর পেট্রোল ইঞ্জিনের ওপর নির্ভর করবে, এবং গাড়ি বন্ধ করলে বা কোন কারণে ব্রেক কষলে আপনা আপনি পেট্রোল ইঞ্জিনটি বন্ধ হয়ে যাবে। এতে সাশ্রয় হবে তেল। প্রতি একশ’ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে এই গাড়িটির খরচ হবে ৪.৬ লিটার তেল।

হোন্ডা সিভিকের হাইব্রিড পাওয়ার প্ল্যান্ট
এতে রয়েছে ১.৩ লিটার পর্যায়ের চার সিলিন্ডারের ইঞ্জিন। তার সাথে রয়েছে ইন্টিগ্রেটেড মোটর অ্যাসিস্ট (আইএমএ) সিস্টেম। সিস্টেমটি প্রাথমিক শক্তির জন্য একটি পেট্রোল ইঞ্জিনকে কাজে লাগায়। এর ইলেক্ট্রিক মোটর অতিরিক্ত শক্তি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে। বৈদ্যুতিক মোটরের জন্য শক্তি ধারণ ও সঞ্চয়ের জন্য রয়েছে নিকেল-মেটাল হাইড্রাইড ব্যাটারি প্যাক যা ১৮০০ সিসি ইঞ্জিনের সমান। জ্বালানি সাশ্রয় এবং ক্ষতিকর গ্যাসের নিঃসরণ কমিয়ে এটি পরিবেশ দূষণের হার কমানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

হোন্ডা সিভিকের হাইব্রিডে রয়েছে একটি দ্বৈত স্ক্রল হাইব্রিড এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম, যা শক্তি সরবরাহ এবং ভেতরের ইলেক্ট্রিক মোটরের সমন্বয়ে দু’টি এয়ার কন্ডিশনিং কমপ্রেসার পরিচালনা করে। এর ফলে পেট্রোল ইঞ্জিনের চাপ অনেকখানি কমানো সম্ভব হয়। এ ধরনের কমপ্রেসারগুলো সিস্টেমের ঠাণ্ডা করার ক্ষমতা বাড়াতে সম্পূর্ণ এককভাবে বা যুক্তভাবে কাজ করতে পারে। স্বাভাবিক আবহাওয়ার কোনো দিনে ইঞ্জিনচালিত কমপ্রেসারটি এয়ার কন্ডিশনিং-এর কাজ করে। অন্য দিকে থেমে থাকা অবস্থায় অথবা গাড়ির ভেতরে স্থির তাপমাত্রা বজায় রাখার ক্ষেত্রে মোটরচালিত কমপ্রেসারটি চালু হয়।
খুব বেশি গরম পড়লে দ্রুত শীতল হবার প্রয়োজন হলে দু’টি কমপ্রেসারই এক সাথে চালু করা যায়। এয়ারকন্ডিশনিং-এর পেট্রোল ইঞ্জিন এবং ইলেক্ট্রিক মোটর দু’টি একসাথে ব্যবহারের দরকার পড়লে এর ইডল স্টপ ফিচারটি সাময়িকভাবে অকার্যকর থাকে।

আইএমএ ব্যাটারি রিচার্জ ও আয়ু
এর ব্যাটারি রিচার্জ সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়। গাড়ি চালানোর সময় এর ইন্টেলিজেন্ট পাওয়ার ইউনিট ব্যাটারি চার্জ করা নিশ্চিত করে। গাড়িটি ধীরগতি নেবার সময়, উঁচু থেকে নামার সময়, ব্রেক কষার সময় এর আইএমএ ব্যাটারি রিচার্জ হয়।

হোন্ডা সিভিক হাইব্রিডের আয়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে এর আইএমএ ব্যাটারি তৈরি করা হয়েছে। ফলে এর জীবনকাল প্রায় সিভিকের সমান। এটির চার্জ এবং ডিসচার্জ অনবরত স্বয়ংক্রিয় নজরদারিতে থাকায় ব্যাটারির সুস্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কোনো অবকাশ নেই।

তবে এটা চালাতে সব সময়ই পেট্রোলের দরকার হবে। তার কারণ হলো অল্প গতিতে ভ্রমণের সময়ই কেবল এটি বৈদ্যুতিক শক্তি ব্যবহার করে। দ্রুত গমনাগমনের সময় পেট্রোলের ওপরই নির্ভর করতে হয় একে। আর হোন্ডা সিভিক হাইব্রিড-এ রয়েছে দু’টি ব্যাটারি, এর একটি ১২ ভোল্টের ওয়েট সেল, অন্যটি আইএমএ ব্যাটারি। আর আইএমএ ব্যাটারিটির সাথে ইঞ্জিন চালু হওয়ার কোন সম্পর্ক নেই। তাই এটি ফ্যাট হয়ে যাবার পরও সহজেই ইঞ্জিন চলবে।

জ্বালানি সাশ্রয়ের ধরন
প্রতি লিটার জ্বালানিতে গাড়িটি ২১.৭৪ কিলোমিটার দূরত্ব যেতে পারে। বর্তমান বিশ্বে উৎপাদিত গাড়ির মধ্যে হোন্ডা সিভিক হাইব্রিড সবচাইতে কম পরিমাণ গ্যাস নিঃসরণ করে।

SHARE

Leave a Reply