Home ফিচার জীবজগতে বেঁচে থাকার কৌশল

জীবজগতে বেঁচে থাকার কৌশল

আরিফ হাসান

ecosystem-5যেমন রঙিন প্রবাল প্রাচীর তেমন রঙিন মাছ। মনে হয় এই মাত্র উভয়ের গায়ে কেউ একজন রঙের তুলি দিয়ে ছোপ ছোপ দাগ কেটে দিয়ে গেছে। রঙিন মাছগুলো লালচে গোলাপি রঙের প্রবাল প্রাচীরের চার পাশে ঘুরছে আর লুকোচুরি খেলছে। এটা-ওটা খেতে খেতে শত্র“ আসছে দেখলেই প্রবাল প্রাচীরের ভেতর নিজেদের লুকিয়ে ফেলছে ওরা। দু’জনের গায়ের রঙ একই রকম হওয়ায় শত্র“রা আর ওদের খুঁজে পায় না। সাগরের এই পরিবেশে রঙিন মাছ ও প্রবাল প্রাচীর এমনভাবে বাস করে আসছে অনেক বছর ধরে।

বনের সবচেয়ে লম্বা যে গাছটি তাকে জড়িয়ে ধরে ওপরে উঠে গেছে একদল রঙিন ক্যাকটাস। বেঁচে থাকার জন্য ওরা সব সময় বনের এমন বড় গাছগুলোকেই বেছে নেয়। বড় গাছগুলোও ওদের ফেলে দেয় না। পরম মমতায় নিজের শরীরের সাথে আঁকড়ে ধরে রাখে। যতদিন বাঁচে এভাবেই জড়াজড়ি করে থাকে ওরা।

এই মাত্র একটা খরগোশ ঘাস খেতে এসেছে। সবুজ ঘাসের বুকে বোকা খরগোশটিকে দেখা মাত্রই চোখ দুটো চকচক করে উঠল বাজপাখিটার। বাতাসে ডানা ভাসিয়েই নিচের দিকে নামতে লাগল সে। বোকা খরগোশ কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাজপাখিটার দু’পায়ের মাঝখানে ঝুলতে লাগল। একটু পরে লম্বা একটা গাছের ডালে বসে ধারালো নখের আঁচড়ে শরীরটা ফালাফালা করে ফেলল খরগোশের। দুপুরের খাওয়াটা বাজপাখির বেশ ভালোই জমল।

বেঁচে থাকার এই গল্প তিনটি কিন্তু ইকোসিস্টেম বা বাস্তুসংস্থানের গল্প। রঙিন মাছ, প্রবাল প্রাচীর, ক্যাকটাস, বড় গাছ, বাজপাখি, খরগোশ ও ঘাস হলো এই ইকোসিস্টেমের একেকটি উপাদান।

ইকোসিস্টেম কী

উপরের গল্প তিনটি শুনেও যারা ইকোসিস্টেম কী তা ভালো করে বুঝতে পারোনি তাদের জন্য বলি। কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় যত জৈব (জীবিত) বা অজৈব (মৃত) ecosystem-4বস্তু থাকে তারা সবাই ইকোসিস্টেম। এই এলাকার যত গাছপালা, প্রাণী এমনকি মাটিতে বাস করা অণুজীব আছে তারা সবাই হলো ইকোসিস্টেমের জীবিত উপাদান। আর বাতাস, পানি ও পাথর হলো ইকোসিস্টেমের মৃত উপাদান।

পৃথিবীতে যত জীবন্ত সমাজব্যবস্থা আছে ইকোসিস্টেম হলো তার একটি ছোট্ট অংশ। আর পৃথিবীর সব জীবন্ত সমাজব্যবস্থাকে এক সাথে বলা হয় প্রাণিমণ্ডল। একেকটা প্রাণিমণ্ডল তৈরি হয় বিশাল এলাকা নিয়ে। জীববিজ্ঞানের ভাষায় এই এলাকাকে বলা হয় বায়োমস।

কেন দরকার ইকোসিস্টেম

এটা তো জানো যে কোনো কিছুই একা একা বাস করতে পারে না। পারে না বলেই পৃথিবীতে সমাজব্যবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বলতে পারো ইকোসিস্টেম হলো ওই ধরনের একটা সমাজব্যবস্থা যেখানে একজন আরেকজনের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। এখানে কেউ নির্ভর করে আরেকটি জীবিত প্রাণী বা উদ্ভিদের ওপর আবার কেউ কেউ নির্ভর করে মৃত কোনো জিনিসের ওপর। যে যার ওপরই নির্ভর করুক সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো এখানে সবাই সমানভাবে কাজ করে যায়।

যেকোনো ইকোসিস্টেমে জীবিত উপাদানগুলো উৎপাদকও (যে খাদ্য উৎপাদন করে) হতে পারে আবার খাদকও হতে পারে। তবে যারা উৎপাদক তারা অন্য কোনো জীবিত উপাদানকে খাবার হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না। এরা শুধুই খাবার উৎপাদন করে। ইকোসিস্টেমের এই উৎপাদক শ্রেণীর মধ্যে পড়ে গাছপালা, ঘাস এবং অন্যান্য সবুজ উদ্ভিদ। এরা সবাই প্রাথমিক খাদ্য উৎপাদক। খাবার তৈরির জন্য এরা প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো পেয়ে থাকে প্রকৃতি থেকেই। খাবার তৈরির জন্য গাছ তার শরীরে থাকা ক্লোরোফিল তো ব্যবহার করেই পাশাপাশি মাটি থেকে নেয় পানি, সূর্য থেকে নেয় আলো এবং বাতাস থেকে নেয় কার্বন ডাই-অক্সাইড।

গাছপালা খাবার তৈরি করে নিজেদের জন্যই। এই খাবার খেয়েই তারা বড় হয়, ফুলে ফলে সুশোভিত হয়। সবুজ উদ্ভিদের মধ্যে সবাই খুব বেশি দিন বেঁচে থাকতে পারে না। অচিরেই তারা প্রাণীদের খাদ্য হয়ে যায়। যেসব প্রাণী শুধু গাছপালার লতাপাতা বা ঘাস খেয়ে জীবন ধারণ করে তাদেরকে বলা হয় তৃণভোজী। এরা হলো প্রাথমিক খাদক। প্রাথমিক খাদকদের তালিকায় পড়ে খরগোশ, ইঁদুর ও বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়। লতাপাতা আর ঘাস খেয়ে বেঁচে থাকা এই প্রাণীদের আবার অন্য প্রাণীরা খেয়ে ফেলে। যেহেতু এরা অন্য প্রাণীর মাংস খায়, তাই এদের বলা হয় মাংসাশী প্রাণী। ইকোসিস্টেমে এরা হলো গৌণ বা মাধ্যমিক খাদক। এই তালিকার প্রাণীদের মধ্যে আছে ভল্লুক, বাঘ, সিংহ, হায়েনা, বাজ, শকুন, ঈগল ইত্যাদি।

ইকোসিস্টেমে আরেক ধরনের উপাদান থাকে যাদেরকে বলা হয় ডিকম্পোজর বা পচনকারী। মৃত উদ্ভিদ, প্রাণী এবং তাদের আবর্জনাগুলোকে পচিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়াই হলো এদের প্রধান কাজ। মাটির সাথে মিশে যাওয়া এই উপাদানগুলো এক সময় রাসায়নিক পুষ্টি উপাদানে পরিণত হয়। গাছপালা যখন খাবার তৈরি করে তখন তাদের শিকড়ের সাহায্যে মাটি থেকে এই পুষ্টি উপাদানগুলো গ্রহণ করে থাকে। মৃত উদ্ভিদ, প্রাণী এবং তাদের আবর্জনাগুলোকে পচিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়ার কাজগুলো করে থাকে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক।

একটা ইকোসিস্টেম কত বড় হতে পারে

ইকোসিস্টেম হতে পারে ছোট-বড় দুই ধরনেরই। যেমন ট্রোপিক্যাল রেইন ফরেস্ট ইকোসিস্টেম হয় প্রায় কয়েক শ’ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে। আবার ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেম হয় মাত্র কয়েক মাইল এলাকা নিয়ে। একই জায়গায় একাধিক ইকোসিস্টেমও হতে পারে। একই দ্বীপে রেইন ফরেস্ট ইকোসিস্টেম যেমন থাকতে পারে তেমনি ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেমও থাকতে পারে।

ecosystem-3

কিভাবে কাজ করে ইকোসিস্টেম

আগেই জেনেছ, একটা ইকোসিস্টেমে যত উপাদান থাকে তারা সবাই একে অন্যের সাথে নিবিড় বন্ধনে জড়িয়ে থাকে। এই বন্ধনটা আসে খাবার এবং শক্তির মাধ্যমে। শক্তি আসে সূর্য থেকে। সবুজ গাছপালা এই শক্তি ব্যবহার করে খাবার তৈরিতে। সবুজ গাছপালাকে খেয়ে ফেলে প্রাণীরা। অন্য প্রাণীরা আবার গাছপালা খেয়ে বেঁচে থাকা এই প্রাণীদের খেয়ে ফেলে। উদ্ভিদের মাধ্যমে প্রাণীদের কাছে শক্তির এভাবে প্রবহমান থাকাকে বলে ফুড চেইন বা খাদ্য শৃঙ্খল। যখন এই খাদ্য শৃঙ্খল আরো বিস্তার লাভ করে তখন এটাকে বলা হয় খাদ্য জাল।

ব্যাপারটাকে এই ভাবে দেখা যেতে পারে। নদীতে যখন পানি প্রবহমান থাকে তখন তার দুই তীর ভেজা ভেজা থাকে। যে সব উদ্ভিদের বেঁচে থাকার জন্য সব সময় পানির দরকার হয় তারা এই নদী তীরেই জন্মায়। পানিতে পোকামাকড় থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। এদের মধ্যে যারা ছোট ছোট উদ্ভিদ ও ঘাসের পাতা খেয়ে বাঁচে তারা খুব সহজেই নদী তীরে জন্মানো ঘাস বা উদ্ভিদের পাতা খেতে পারে। এই পোকামাকড়গুলো আবার প্রায়ই স্যামন মাছের খাবার হয়ে যায়। নদীর কাছাকাছি বনে বাস করা ভল্লুকের খাবার হয়ে যায় স্যামনরা। একটা ভল্লুক সব সময় স্যামন মাছের পুরোটা খেতে পারে না। কাঁটা এবং মাছের মাংস প্রায়ই থেকে যায়। এগুলো নিয়ে কাজে নেমে পড়ে ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ারা। কিছু দিনের মধ্যেই এগুলো পচে মাটিতে মিশে যায়। তৈরি হয় রাসায়নিক পুষ্টি উপাদান। মাটিতে থাকা এই পুষ্টি উপাদান পরে শিকড়ের মাধ্যমে টেনে নিয়ে খাবার তৈরির কাজে লাগায় নদী তীরে জন্মানো ঘাস বা ছোট ছোট উদ্ভিদ। বিষয়টা এভাবে চক্রাকারে চলতেই থাকে।

কিভাবে  ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইকোসিস্টেম

কোনো ইকোসিস্টেমের এক পাশের জৈব বা অজৈব উপাদান বদলে গেলে অন্য পাশেরটাও বদলে যায়। সাধারণত খরা বা একটানা বৃষ্টিহীনতা, প্রচণ্ড ঝড় কিংবা হঠাৎ আগুন লাগার ঘটনা ঘটলে ইকোসিস্টেমে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কখনো কখনো এসব পরিবর্তন ইকোসিস্টেমের জন্য বিপদ বয়ে আনে। যদি একেবারেই বৃষ্টি না হয় কিংবা খুবই সামান্য বৃষ্টি হয় তাহলে বেঁচে থাকার জন্য উদ্ভিদ পর্যাপ্ত পানি পায় না। এ কারণে যদি বিশেষ ধরনের কোনো উদ্ভিদ মারা যায় তাহলে সেই উদ্ভিদ খেয়ে যে প্রাণীরা জীবন ধারণ করে তাদের বেঁচে থাকা কষ্টকর হয়ে যায়। খুব দ্রুত বিকল্প কোনো খাবারে অভ্যস্ত হতে না পারলে কখনো কখানো এসব প্রাণীর কেউ কেউ মারা যায় আবার কেউ কেউ খাবারের খোঁজে অন্য জায়গায় চলে যায়।

পরিবর্তন কোনো কোনো প্রাণী বা উদ্ভিদের জন্য যেমন খারাপ কিছু ডেকে আনে তেমনি কারো কারো জন্য ভালোটাও বয়ে আনে। যেমন বনে আগুন লাগলে যেকোনো প্রাণীর জন্যই বিপজ্জনক। কিন্তু দেবদারুর জন্য এটাই উপকারী। বনে আগুন না লাগলে দেবদারুরা যে বংশবিস্তার করতে পারে না! দেবদারু ফলের খোসা এতটাই শক্ত যে ভেতরে থাকা বীজের পক্ষে কোনো দিনই বাইরে আসা সম্ভব নয়। এই অবস্থায় বনে আগুন লাগলে দারুণ উপকার হয়। আগুনের তাপে দেবদারু ফলের শক্ত খোসাটা গলে যায় এবং এই সুযোগে বীজটা বাইরে বেরিয়ে আসে।

কেবল যে বৃষ্টিহীনতা, আগুন আর ঝড়ই ইকোসিস্টেমের ক্ষতি করে তা কিন্তু নয়। বাতাস, পানি ও মাটি দূষণের কারণেও ইকোসিস্টেমের ক্ষতি হয়। এগুলো যাতে নষ্ট না হয়, ইকোসিস্টেম যাতে টিকে থাকে, ভালো থাকে ইকোসিস্টেমের বাসিন্দারা, সে জন্য আমাদের সবারই সচেতন হবে। কারণ ইকোসিস্টেম নষ্ট হলে বিপদের মুখে পড়ে মানুষও।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply to imran Cancel reply