Home Featured শিক্ষাপাতা সবচেয়ে বড় জ্ঞান -ড. আহসান হাবীব ইমরোজ

সবচেয়ে বড় জ্ঞান -ড. আহসান হাবীব ইমরোজ

কিশোরকণ্ঠের সুপ্রিয় কিশোর বন্ধুরা, তোমরা কেমন আছ? নিশ্চয়ই এই তালপাকা গরম আর লোডশেডিংয়ের রুটিনে সবার নাভিশ্বাস অবস্থা! তোমাদের সবার সুস্থ, সুন্দর ও আলোকিত জীবনের প্রত্যাশায় হৃদয়ের গহিন থেকে জানাই রাসূল সা.-এর শেখানো বিশ্বের সর্বোত্তম সম্ভাষণ- আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
অনেকেই হোঁচট খেয়ে বলতে পারো; এ আবার কে রে? নতুন পাগলে ভাত পায় না, আবার পুরনো পাগলের আমদানি। তবে হ্যাঁ, ঠিকই বুঝেছো আমি এক পুরনো পাগল। তোমাদের বড় ভাই-আপু কিংবা আঙ্কেল-আন্টি যারা কিশোরকণ্ঠের সাথে পরিচিত তাদের কাছে জানতে চাইলে নিশ্চয়ই তারা আমার নামটি চিনবে। কিংবা বলবে, ও আচ্ছা সেতো ‘মোরা বড় হতে চাই’-এর লেখক। আজ এটুকুই থাক, চলো এবার মূল আলোচনায় যাওয়া যাক।
সবচেয়ে বড় জ্ঞান : ‘আলহামদুলিল্লাহ’-এর অনুধাবন

কীট শব্দটা লোমহর্ষক! শুনলেই আজকালকার ছেলে-মেয়েদের হার্টবিট বেড়ে যায়। দাঁত কিড়মিড় করে তাকায়। বিশেষ করে আরশোলা।… যার বৈজ্ঞানিক নাম American cockroach (Periplaneta americana)
আমি নিজেই এমনসব বীর কিশোরদের দেখেছি, যারা হাইজাম্পে ব্রোঞ্জপদক পাওয়াতো দূরের কথা কদাপি নামও লেখায়নি, সেই তারাই আরশোলা দেখে কীভাবে লাফিয়ে ডাইনিং টেবিলে উঠে যায়।
কিন্তু গ্রন্থকীট (বই-পাগলা আরকি) শব্দযুগল শুনলে প্রগাঢ় শ্রদ্ধায় মন ভরে যায়। মনোজগতে ভেসে ওঠে এক একজন জ্ঞান-সাগরের অনুপম রূপ। এইতো দু’বছর আগেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের (যদিওবা বাংলা গদ্যেই তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান) জন্মের দুইশত বছর চলে গেল।
আমরা কি জানি, এই আধুনিক বিশ্বে পাঠকদের পড়ার জন্য কী পরিমাণ বই প্রকাশিত হয়ে সঞ্চিত রয়েছে?
আধুনিক টেন্ড হচ্ছে কোনো কিছু জানার জন্য গুগোল মামার (অপরিচিত জনদের মামা ডাকা এটাও একটি আধুনিক টেন্ড; কিন্তু কারণ কী? আপন করে নেওয়া; নাকি ত্বরা-প্রবণতা) হেল্প নেওয়া। আমিও তার হেল্প নিলাম।
আরে ফলাফলতো ভয়াবহ! According to Google’s advanced algorithms, the answer is nearly 130 million books, or 129,864,880, to be exact. তার মানে প্রায় ১৩ কোটি।
তুমি যদি ১০০ বছরও বাঁচো আর প্রতিদিন একটি করে বই পড়ে শেষ করো; তবে পড়ার পরিমাণ হবে মাত্র ৩৬,৫০০টি বই। যা মোট বইয়ের ৩,৫৫৮ ভাগের একভাগ মাত্র। কিন্তু এটাওতো ‘যদি’র ভেল্কিতে আটকা (যদি ১০০ বছর বাঁচি, যদি ০ থেকে ১০০ বছর পর্যন্ত পড়ার সামর্থ্য থাকে, যদি প্রতিদিন একটি করে বই পড়া হয়; তবেই)। কিন্তু বাস্তবে কি সম্ভব?
কয়েকজন এই যদি’র বেড়া টপকানোর চেষ্টা করেছিলেন। আমেরিকার অন্যতম জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট প্রতিদিন প্রায় তিনটি করে বই পড়ে সমগ্র জীবনে প্রায় ৩০,০০০ বই পড়েছিলেন।
হালজামানার বিলগেটস প্রতি বছর ৫০টি আর তাকে টপকে বর্তমান বিশ্বের প্রথম ধনী হলেন এলেন মাস্ক যিনি প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা পড়ায় কাটান। কিন্তু সমগ্র জীবনে ৩৬,৫০০টির ধারে কাছে কেউ নন। তাহলে ১৩ কোটির কী হবে?
মাইকেল এইচ হার্ট প্রণীত, দ্যা হান্ড্রেড বইটির প্রথম ৬ জনের ভেতর ২ জন ছিলেন আল্লাহ প্রেরিত নবী ও রাসূল। যেমন রাসূল মুহাম্মাদ সা. ও হযরত ঈসা আ.। তাঁরা আল্লাহর মনোনীত দীন- ইসলামকে প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন এবং ৩ জন ছিলেন নিজ নিজ ধর্মপ্রণেতা। যেমন- গৌতম বুদ্ধ, কনফুসিয়াস এবং সেন্ট পল। তাদের প্রচারিত ধর্মগ্রন্থগুলোও পৃথিবীর সর্বাধিক প্রচারিত ও পঠিত গ্রন্থ।
বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর তাবৎ জ্ঞান লুক্কায়িত আছে ধর্মগ্রন্থাবলিতে। আর সকল ধর্মগ্রন্থের সারনির্যাস সঞ্চিত আছে আল কুরআনে। ১১৪টি সূরা সংবলিত হচ্ছে এই মহাগ্রন্থ- আল কুরআন।
কুরআনের সর্বাগ্রে সূরা আল ফাতিহা; যার অপর নাম উম্মুল কুরআন বা কুরআনের জননী। অর্থাৎ সমগ্র কুরআনের শিক্ষার সংক্ষিপ্তসার আছে এর ভেতর। আর তাইতো এটি পাঠ করা সকল মুমিনের জন্য বাধ্যতামূলক। ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ নামাজে সব মিলে কমপক্ষে ৩০ থেকে ৩২ বার প্রতিদিন এটি পড়তে হয়। তার মানে গড়ে প্রতি ৪৫-৪৮ মিনিট পরপর।
এ সূরার আরেক নাম আলকাঞ্জ বা ধনভান্ডার। আশশিফা বা মহৌষধ। আমরা কী পরিমাণ নির্বোধ যে হাতের কাছে ধনভান্ডার রেখে আজ গরিব দ্য গ্রেট! আর আশশিফার বরকত রেখে রোগে-শোকে মুহ্যমান হয়ে আছি।
তর্ক হতেই পারে, কই সারা দিনমানই তো পড়ছি কোনো ফল পাচ্ছি না। আরে ভাইয়া-আপু, এসো না একটু পর্যালোচনা করি; কেমনভাবে পড়ছি!
আজকে এসো একটু গভীরভাবে চিন্তা ও বিশ্লেষণ করি এর প্রথম আয়াত। যেখানে বলা হয়েছে সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি রাব্বুল আলামিন বা বিশ্বজগতের প্রতিপালক। প্রশ্ন হতেই পারে, কেন এই রাব্বুল আলামিনের প্রশংসা করবো?
এসো ধীমান বন্ধুরা, এবার আমাদের যুক্তির খাতা খুলি।

এক.
মহান আল্লাহপাকের সর্বাগ্রে প্রশংসার কারণ হচ্ছে, তিনি এই বিপুল বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, যার ফলে আমরা অস্তিত্বমান।
যার পরিধি এখন পর্যন্ত পৃথিবীর তাবৎ বিজ্ঞানীরা মিলেও কল্পনা করতে পারেননি; কেবল মাত্র যা সর্বাধিক শক্তিশালী দূরবীক্ষণযন্ত্র The james webb space telescope দিয়ে দেখা যাচ্ছে তার ব্যাস হচ্ছে ৯৩ শত কোটি আলোকবর্ষ বা ৯৩ বিলিয়ন লাইটইয়ার্স।
আর আলোকবর্ষ মানেতো আমরা জানি, সেকেন্ডে ১,৮৬,০০০ মাইল গতিতে আলো বছরে যত দূরত্বে যায়। আমরা কি এই দানবীয় সংখ্যাটা কল্পনা করতে পারি? ৫,৮৬,৫৭০,০০০০০০০। মানে ৫ লক্ষ ৮৭ হাজার কোটি মাইল। আর ৯৩ শত কোটি আলোকবর্ষ মানে ৫৪৫,৫১০০০০০,০০০০০০০ মাইল মাত্র।
সহজ বাংলায়, পৃথিবী থেকে সূর্যমামার যে দূরত্ব (৯,৩০,০০০০০ মাইল) তার থেকে মাত্র ৬০ কোটি গুণ বেশি। আর অনাবিষ্কৃত মহাবিশ্ব এর থেকে কত হাজার বা কোটি গুণ সেটা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কে জানে? আর এ সবই তুমি, আমি সব মানুষের জন্য। তবুও কি আমাদের অন্তর কৃতজ্ঞতায় বিগলিত হবে না?

দুই.
এই মহাবিশ্বে গ্যালাক্সির সংখ্যা কতো? ধারণা করা হয়, দশ হাজার থেকে বিশ হাজার কোটি প্রায়। প্রতিটি গ্যালাক্সিতে তারার সংখ্যাও প্রায় অনুরূপ করে। তাহলে এই মহাবিশ্বে তারার সংখ্যা কত? ২ এর পরে ২২ শূন্য দিলে যা হয়। ০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০। সহজ হিসাব হলো পৃথিবীর ৭৮০ কোটি মানুষের ভেতর ভাগ করে দিলে প্রত্যেকে পাবে ২৫ হাজার কোটি করে তারা।
যেমন, আমাদের গ্যালাক্সির নাম মিল্কিওয়ে; তাতে তারার পরিমাণ প্রায় দশ থেকে বিশ হাজার কোটি। কিন্তু তাতে প্ল্যানেটারি বা সোলার সিস্টেম আছে মাত্র ২৫০০টি। অর্থাৎ প্রতি ৮ কোটি তারার একটিতে এই সৌরজগতের সিস্টেম আছে। আর সোলার সিস্টেম আছে বলেই আমরা জীবিত। তার মানে আমি তুমি সেই ৮ কোটির ভেতর বাছাই করা একজন। সারাজীবন সিজদায় পড়ে থাকলেও কি এর হক আদায় হবে?

তিন.
নাসার (The National Aeronautics and Space Administration) গবেষণায় বলা হয়েছে, সমগ্র মহাজগতে প্রায় ১০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০টি গ্রহ আছে ।
কিন্তু মনুষ্য বসতির পরিবেশ আছে মাত্র ২০ থেকে ৫০টি গ্রহে। তার মানে আমাদের বাছাই করা হয়েছে ২০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ এর ভেতর থেকে একটি। মহান প্রভুর এই সুমহান বাছাইয়ের জন্য কি আমরা কৃতজ্ঞ হবো না?

চার.
বিপুলা এই পৃথিবীতে উদ্ভিত, প্রাণী, কিটপতঙ্গ মিলে প্রায় ৮৭ লক্ষ প্রজাতি আছে। তার ভেতর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ আশরাফুল মাখলুকাত বা মানুষ হিসেবে আমাকে, তোমাকে তৈরি করা হয়েছে। তবুও কি আমাদের হৃদয় কৃতজ্ঞতায় বিগলিত হবে না?

পাঁচ.
মানব সন্তান সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় প্রায় ৫ থেকে ১০ কোটি শুক্রাণুর ভেতর একটি সফল হয়। বাকিরা মারা যায়। তুমি, আমি সেই সফলদের একজন। কীভাবে মহান প্রভুর এই প্রশংসা আদায় করবে?

ছয়.
এই পৃথিবীতে বর্তমানে ৭৮০ কোটি মানুষ; যার ভেতর ১৯% মানুষ শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী। হয়তোবা আল্লাহ আপনাকে আমাকে এই সমস্যা থেকে মুক্ত রেখেছেন। আর যাদেরওবা এই সমস্যা আছে তাদেরকেও এটি মোকাবেলার অন্যবিধ শক্তি দিয়েছেন। তবুও কি আমরা কৃতজ্ঞ হবো না?

সাত.
এই পৃথিবীতে বর্তমানে ৭৯৬ কোটি মানুষ; এর ভেতর ১৮০ কোটি মুসলিম; সেই ‘কুনতুম খাইরা উম্মাত’ হিসেবে আমাদের জন্ম দিয়েছেন। সবচেয়ে দামি নেয়ামত, ঈমানের কি মূল্য দিতে পারবো আমরা?

আট.
১৮০ কোটি মুসলিমের কতজন দীন বোঝে? কতজন নামাজ পড়ে? ১০% বা ২০%। আল্লাহপাক আমাদেরকে এর ভেতর বাছাই করেছেন। এই সত্যিকার বুঝ বা হিদায়াতের কি মূল্য দেবো?
এটাই কি শেষ?
এরপর আছে অন্ন, বস্ত্র বাসস্থান এই পৃথিবীর সুন্দর সামগ্রিক পরিবেশ। পিতা-মাতা, স্ত্রী-সন্তান, ভাই-বোন ও স্বজনদের কলিজাভরা ভালোবাসা কে দিয়েছেন?
ভাবোতো একবার মাত্র একটি চাল কিংবা একফোঁটা পানি কি তৈরি করতে পারবে পৃথিবীর সকল বৈজ্ঞানিক মিলে? অনেকে লাফ দিয়ে উঠবেন, কী বলেন হাজার টন পানিও তৈরি সম্ভব!
আমি বলছি ভাইয়া মাত্র একটা ছোট্ট শর্ত, তা হলো কোন অক্সিজেন বা হাইড্রোজেনের সাহায্য নিতে পারবে না, কেননা সেগুলোও তো আল্লাহর তৈরি নিয়ামত। একেবারে শূন্য থেকে চেষ্টা করে দেখোনা?। দেখা যাক, কত্তো মুরোদ মানুষের!
এই হিসাব শেষ হবে কি কোনো দিন?
আমার ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র জ্ঞানের অভিজ্ঞতা বলে, সূরা ফাতিহার মূল শিক্ষার সম্ভার আছে এর প্রথম আয়াতের ভেতরই। ‘আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আ’লামিন’ অর্থাৎ সমস্ত প্রশংসা এই মহাবিশ্বের মহান প্রতিপালকের। আর এই আলহামদুলিল্লাহ বা ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ’র এটিই হলো দুনিয়ার সমগ্র জ্ঞানের সারনির্যাস।

একটি গ্রন্থ আল কুরআন পড়ে যদি কেউ পরম প্রভুর এই প্রশংসার মর্ম বুঝতে পারে সে সফল; ‘উলাইকা হুমুল মুফলিহুন’। আর যদি ১৩ কোটি বই পড়েও কেউ না বোঝে তাহলে সে হবে একবিংশ শতাব্দীর আবু জেহেলের ক্ষুদ্র চেলা ।
তাহলে কি আমরা বই পড়া ছেড়ে দেবো? নিশ্চয়ই না। তবে এ ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের বিখ্যাত দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকনের একটি বিখ্যাত মন্তব্য মনে রাখতে হবে;
‘কিছু বইয়ের শুধু স্বাদ গ্রহণ করতে হবে, অন্যগুলো গিলে ফেলতে হবে এবং কয়েকটিকে চিবানো এবং হজম করতে হবে; অর্থাৎ কিছু বই কেবল কিছু অংশ পড়তে হবে;’

সমগ্র আলোচনায় কোনো ভুল হলে গাফুরুর রাহিমের কাছে ক্ষমা চাই। আর এসো সমগ্র আলোচনার সঠিক যা বিশ্লেষণ ও আবেগ তা উজাড় করে হৃদয়ের গহিন থেকে আবারো বলি-
আলহামদুলিল্লাহ।
সুম্মা আলহামদুলিল্লাহ।

SHARE

Leave a Reply