Home নিবন্ধ কবিতায় নদী বয়ে যায় -সাকী মাহবুব

কবিতায় নদী বয়ে যায় -সাকী মাহবুব

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে জালের মতো এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে অসংখ্য নদ-নদী। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে হাজারও হাওড়, বাঁওড়, খাল বিল, জলাশয় ইত্যাদি। এগুলো বাংলাদেশের প্রকৃতিকে করেছে বৈচিত্র্যময়, আকর্ষণীয় ও মোহময়। প্রাচীনকালে রচিত সাহিত্য থেকে শুরু করে আধুনিক কালের সাহিত্যেও নদী অপরিহার্য এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গান, কবিতা, ছড়া, গল্প, উপন্যাস, নাটক, সিনেমা যেগুলো আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে করেছে অলংকৃত ও সমৃদ্ধময়। নদী, বাংলাদেশ, বাংলাদেশের জনজীবন ও কবিতা যেন একই সূত্রে গাঁথা’। এটি শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, বিশ্ব সাহিত্যেও নদী অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। মানুষের জীবনযাপন, সভ্যতার বিকাশ ও ঐশ্বর্যনির্মাণ, ইতিহাস, আন্দোলন, সংগ্রাম, আনন্দ বেদনায়, সুখে দুঃখে, হাসি কান্নায় নদী মিশে আছে একাকার হয়ে। মানুষের জীবনে নদী কখনো ভয়ঙ্কর পতিপক্ষ ও ধ্বংসকারী। এক কথায় বলা যায়, নদীকে এড়িয়ে মানুষের জীবন গড়া ও সভ্যতার ঐশ্বর্য নির্মাণ একেবারেই অসম্ভব। নদীবিহীন জীবন যেমন বাঙালির কাছে অকল্পনীয়, সাহিত্যেও নদীর ভূমিকা যেন একই সত্য ধারণ করে। তাই সঙ্গত কারণেই প্রত্যেক কবির কবিতায় নদী এসেছে নানাভাবে, নানা রঙ্গে, নানা রূপে। বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান কবিদের কবিতায় নদীর নান্দনিক উপস্থিতি বেশ চোখে পড়ে। বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে আমরা বাংলা কবিতায় নদী নিয়ে আলোচনা করার প্রয়াস পাবো।
বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহের বরপুত্র কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় নদীকে নানা ব্যঞ্জনায় ফুটিয়ে তুলতে দেখা যায়। নজরুলকে ভালোভাবে অধ্যয়ন করলে মনে হয় নজরুল প্রকৃত অর্থেই নদীর মতো। একজন সত্যিকারের কাজী নজরুল ইসলাম যেন এক সত্যিকারের নদী। নজরুলের জীবনে তাই বুঝি নদী মিশে আছে বিভিন্নভাবে বিভিন্নরূপে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলো তাঁকে আকর্ষণ করেছিল বেশ। পদ্মার বুকের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় স্রোতস্বিনী পদ্মা দাগ কেটে যায় তার বুকে। তাঁর গানে কবিতায় পদ্মা অমর হয়ে যায়। তিনি লেখেন-
‘পদ্মার ঢেউরে মোর শূন্য হৃদয় নিয়ে যা, যারে।’
কবি কাজী নজরুলের নদীপ্রীতি এখানেই শেষ নয়। ‘ওগো প্রিয় তব গান’ কবিতায় কবি নজরুল লিখেছেন-
‘ওরে ও সুরমা, পদ্মা, কর্ণফুলি তোদের ভাটির স্রোতে
নিয়ে যা আমার না বলা কথাগুলো ধুয়ে মোর বুক হতে।’
কর্ণফুলি নদীর কাছে কবি তাঁর হৃদয়ের ব্যথা প্রকাশ করেছেন এভাবে-
‘ওগো ও কর্ণফুলি,
উজাড় করিয়া দিনু তব জলে আমার অশ্রুগুলি।
যে লোনা জলের সিন্ধু সৈকতে নিত্য তব আনাগোনা,
আমার অশ্রু লাগিবে না সখা তার চেয়ে বেশি লোনা।’

কবি আহসান হাবীবের কবিতায়ও নদী প্রসঙ্গ এসেছে বারবার। তাঁর সাড়া জাগানো কবিতা ‘মেঘনা পাড়ের ছেলে’ আমাদের সবারই জানা। তাঁর ভাষা যেমন সরল, বর্ণনার ঢংও মুগ্ধকর। মেঘনার দুই তীরের মান্ষু এবং তাদের জীবনযাত্রার মান গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে যা এই কবিতার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। কবির ভাষায়-
‘আমি মেঘনা পাড়ের ছেলে
আমি মেঘনা নদীর নেয়ে।
মেঘনা নদীর ঢেউয়ের বুকে
তালের নৌকা বেয়ে
আমি বেড়াই হেসে খেলে
আমি মেঘনা পাড়ের ছেলে।
(মেঘনা পাড়ের ছেলে/আহসান হাবীব)

হুমায়ুন কবির বাংলাসাহিত্যের খ্যাতিমান কবি। তাঁর উপলব্ধি ছিল নির্মল ও গভীর। দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বিচিত্রমুখী। মেঘনা নদীকে নিয়ে তিনি যেভাবে অনুভব করেছেন তা সত্যিই মুগ্ধকর। মেঘনা নদীকে নিয়ে তাঁর হাতে সৃষ্টি হয়েছে একটি উৎকৃষ্ট কবিতা। নদীকেন্দ্রিক এমন জনপ্রিয় এবং শিল্পগুণসম্পন্ন কবিতা আধুনিক বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি নেই। কবির ভাষায়-
‘শোন মা আমিনা রেখে দে রে কাজ ত্বরা করি মাঠে চল,
এল মেঘনায় জোয়ারের বেলা এখনি নামিবে ঢল।
নদীর কিনার ঘনঘাসে ভরা
মাঠ থেকে গরু নিয়ে আয় ত্বরা
করিস না দেরি- আসিয়া পড়িবে সহসা অথই জল
মাঠ থেকে গরু নিয়ে আয় ত্বরা মেঘনায় নামে ঢল।’
(মেঘনার ঢল/হুমায়ুন কবির)

কবি গোলাম মোস্তফা বাংলা সাহিত্যের একজন খ্যাতিমান কবি। তিনি নদী নিয়ে খুব আশা জাগানিয়া একটি কিশোর কবিতা লিখেছেন। এটি বাংলা সাহিত্যে খুব জনপ্রিয় একটি কবিতা। তিনি লিখেছেন-
‘নদী যেমন দুই কূলে তার
বিলিয়ে চলে জল
ফুটিয়ে তোলে সবার তীরে
শস্য ফুল ও ফল॥
তেমনি করে মোরাও সবে
পরের ভাল করব ভবে
মোদের সেবায় উঠবে হেসে
এই ধরণী তল।’
(শিশুর পণ/গোলাম মোস্তফা)

কবি বন্দে আলী মিয়া যুগ সচেতন কবি। বিভিন্ন নদী নিয়ে তিনি বেশ কয়েকটি কবিতা রচনা করেছেন। পদ্মা নদীও তাঁর সূচিপত্র থেকে বাদ যায়নি। ‘ময়নামতির চর’ কবিতায় পদ্মা নদী উঠে এসেছে অতি চমৎকারভাবে। তিনি লিখেছেন-
‘ওপার হইতে পদ্মা সাঁতারি বন্য বরাহ পাল
এপারে আসিয়া আখ খায় রোজ ভেঙে করে পয়মাল।
তাই বেচারিরা দারুণ শীতেও এসেছে নতুন চরে
টোঙে বসি বসি জাগিতেছে রাত পাহারা দেবার তরে;
(ময়নামতির চর/বন্দে আলী মিয়া)

কবি ফররুখ আহমদও নদীকে এড়িয়ে যাননি। বরং বলা চলে তিনি একজন নদীপ্রেমিক কবি। তাঁর অসংখ্য কবিতায় নদী উঠে এসেছে বারবার। নদী নিয়ে তিনি বহু কবিতা লিখেছেন। তার মধ্যে হৃদয় কাড়া একটি কবিতা হলো-
‘আমার নদীর দেশে বাস
সব নদীতে নৌকা বেয়ে
বেড়াই বার মাস।
কর্ণফুলি, রজত রেখা
চিত্রা, হেরা দেয়রে দেখা,
মধুমতী হরিণঘাটায়
ফেলি আমি শ্বাস।’
(নদী/ফররুখ আহমদ)

কবি আল মাহমুদ। নদী নিয়ে তিনি অনেক কবিতা লিখেছেন। তাঁর কবিতায় আছে বৈচিত্র্যময় উপলব্ধি বিন্যাস। যে তিতাসের তীরে তিনি বেড়ে উঠেছেন সেই তিতাসের অপার সৌন্দর্যে আচ্ছন্ন হয়েই ‘ভরদুপুরে’ নামে কবিতা লিখেছেন-
‘মেঘনা নদীর শান্ত মেয়ে তিতাসে
মেঘের মতো পাল উড়িয়ে কী ভাসে!
মাছের মতো দেখতে এ কোন পাটুনী
ভরদুপুরে খাটছে শখের খাটুনি।’
(ভরদুপুরে/আল মাহমুদ)

তিনি অন্য একটি কবিতায় লিখেছেন-
‘আমার কেবল ইচ্ছে জাগে
নদীর কাছে থাকতে,
বকুল ডালে লুকিয়ে থেকে
পাখির মতো ডাকতে।
সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে
কর্ণফুলির কূলটায়
দুধভরা ঐ চাঁদের বাটি
ফেরেশ্তারা উল্টায়।”
(পাখির মতো/আল মাহমুদ)

কবি গোলাম মোহাম্মদের ‘উদার নদীর কূল’ কবিতা থেকে উদ্বৃতি দেওয়া হলো-
‘পদ্মা মেঘনা পলি প্লাবনের দেশ
সুনীল আকাশ মাঠ বন অনিশেষ
মিনারে মোহন আজান মধুর ধ্বনি
সম্প্রীতি প্রেম প্রাণময় প্রতিবেশ।
(উদার নদীর কূল/গোলাম মোহাম্মদ)

মানুষের সাথে নদী ও প্রকৃতির অবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক। মানুষের জীবন ধারণের জন্য প্রকৃতি ও নদীর অপরিহার্যতা সর্বজনীন স্বীকৃত। আমরা প্রতি মুহূর্তে প্রকৃতির দান গ্রহণ করছি। নদীও প্রকৃতির মতোই অবারিতভাবে মানুষকে প্রতি মুহূর্তে তার প্রয়োজন মেটাচ্ছে। নদীর পানি দিয়ে আমরা তৃষ্ণা মিটাই, নদী পলিমাটি বহন করে আমাদের মাঠকে উর্বর করে তোলে, নদীর পানিতে আমাদের ফসলের মাঠ পূর্ণ ও শস্য শ্যামল হয়ে ওঠে, নদীতে সাঁতার কেটে শিশুরা আনন্দ কোলাহলে মত্ত হয়, নদীতে নৌকা ভাসিয়ে আমরা এখান থেকে সেখানে চলাচল-পারাপার করি। পণ্য আনা নেওয়া করি। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা প্রয়োজনে নদী আমাদের জীবনের সাথে অন্তরঙ্গভাবে সম্পর্কিত। কবি মতিউর রহমান মল্লিক তাই লেখেন-
‘নদী তো অববাহিত করে পলি,
আলুলায়িত গৃহিণী এক,
পৃথিবীর চাষ-বাস-সংসার, ঝাড়া-পোছা,
টুকিটাকি ঠিক রাখে তালিকা,
ঠিক রাখে সূর্যের মাখামাখি, চন্দ্রের স্নেহ।
(নদী এক নদী/মতিউর রহমান মল্লিক)

কবি আবদুল হাই শিকদার। ভারতের ফারাক্কা বাঁধের করাল গ্রাসে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি আজ হুমকির মুখোমুখি। ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে কলম চালিয়ে একজন আদর্শ দেশপ্রেমিক কবির পরিচয় দিয়েছেন এভাবে-
‘দানব আমার সবুজ পোড়ায়
পোড়ায় সংস্কৃতি,
হিংস্রতম ফারাক্কা বাঁধ
বিষাক্ত উদ্বৃতি।
সেই বিষে আজ নীল হয়েছে
পদ্মা নদীর প্রাণ
বাংলাদেশের সকল স্বপ্ন
হতেছে খানখান।
(ডাক/আবদুল হাই শিকদার)

কবি হাসান আলীম লিখেছেন-
‘ইচ্ছে করে ছোট্ট বেলার
বকুল তলা যেয়ে,
নদীর ঘাটে দেই কাটিয়ে
ডিঙি নৌকা বেয়ে।
বিল বাঁওড়ে নদী নালায়
স্বপ্নগুলো ভাসে,
বন্ধুরা ভাই থেকো সবাই
সর্বদা মোর পাশে।
(বিল বাঁওড়/হাসান আলীম)

কবি মোশাররফ হোসেন খানের নদী বিষয়ক কবিতার সামান্য উদ্ধৃতি-
‘‘কপোতাক্ষ কপোতাক্ষ কী যে মধুর ডাক!
মায়ের কেশের মতই সে যে নিচ্ছে শত বাঁক।
… … …
ওই যে নদী আমার নদী কোথায় বা তার ঘর?
সে যে আমার বুকের ভেতর নিত্য সহচর।’’
(কপোতাক্ষ/মোশাররফ হোসেন খান)

এভাবে বাংলা কবিতার বিশাল ভুবনে বাংলাদেশের ছোটো বড়ো সব নদী নালা অত্যন্ত মর্যাদার সাথে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। বাংলা ভাষায় যারা কবিতা চর্চা করেছেন নদীনালা নিয়ে দু’ লাইন কবিতা বা ছড়া রচনা করেননি এমন কবি বা ছড়াকার খুঁজে পাওয়া যাবে না। নদীর বৈচিত্র্যময় প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের কবিদের ওপর। ফলে যুগে যুগে নদী নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে অনবদ্য অমর কবিতা। যতদিন নদীনালার আঁকাবাঁকা পথচলা অব্যাহত থাকবে ততদিন নদীর প্রভাব প্রতিফলিত হবে বাংলাদেশের কবিতায়। এভাবেই নদী কবি সাহিত্যিকদের সৃষ্টিকর্মের উপকরণ জোগাবে, অনুপ্রেরণা দেবে অনাদিকাল ধরে। সৃষ্টি হবে অমর কবিতা। সমৃদ্ধ হবে আমাদের বাংলা সাহিত্যের গতিধারা।

SHARE

Leave a Reply