Home নিবন্ধ কিশোরদের সঠিক বিকাশে আমাদের কর্তব্য -ফকির আব্দুল্লাহ আল ইসলাম

কিশোরদের সঠিক বিকাশে আমাদের কর্তব্য -ফকির আব্দুল্লাহ আল ইসলাম

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভাষ্যমতে, মানব সন্তানের বয়স ১০ থেকে ১৯ বছরের মাঝামাঝি সময়টাকে কৈশোর বলে। ১০-১৪ বছর বয়সে প্রথম কৈশোর এবং ১৫-১৯ বছর বয়সে শেষ কৈশোর ধরা হয়। এই হিসাবে পঞ্চম শ্রেণি থেকে শুরু করে কলেজ জীবন পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষার দুয়ারে প্রবেশরত ছাত্র-ছাত্রীরা সাধারণত কিশোর-কিশোরী বলে গণ্য। জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের সর্বশেষ তথ্যানুসারে বাংলাদেশে বর্তমানে ৩ কোটি ৬০ লাখ কিশোর-কিশোরী রয়েছে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ।
হঠাৎ শৈশব পেছনে ফেলে এসে তারুণ্যে প্রবেশের প্রাক্কালে কৈশোর নামক অধ্যায়টা জীবনে বড্ড দুরন্ত দুঃসময়! তাইতো কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ‘আঠারো বছর বয়স’ কবিতায় লিখেছেন, আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ ¯পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি/ আঠারো বছর বয়সেই অহরহ বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি। কিশোর-কিশোরীরা এসময় না পারে শিশুদের সাথে তাল মেলাতে, আর না পারে বড়োদের সাথে মিলতে। তারা ছোটো না, আবার ঠিক বড়োও না, এমন একটা বিব্রতকর গোত্রের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়!
ইউনিসেফের তথ্যমতে, বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবার স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে সচেতন না হওয়ায় এ বয়সী বেশির ভাগ ছেলে-মেয়ে পুষ্টিহীনতায় ভোগে। তাই এদের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, আয়রন, আয়োডিন, কার্বোহাইড্রেট, জিংক সমৃদ্ধ খাবার দুধ, ডিম, মাছ, গোশত, ডাল, ফলমূল, শাকসবজি খেতে দিতে হবে।
বস্তুত আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য একেবারেই উপেক্ষিত। যার ফলে দিন-দিন বেড়েই চলেছে কিশোর অপরাধ। গণমাধ্যমে গরম খবরের কাতারে যেন স্থায়ীভাবে শিরোনাম করে নিয়েছে ‘কিশোর গ্যাং’ শব্দটি! অঙ্কুরেই বিনষ্ট হচ্ছে অজস্র সম্ভাবনাময় জীবনের হাতছানি! প্রাকৃতিক নিয়মে কৈশোরকালীন ছেলে-মেয়েরা কিছুটা রুক্ষ ও খামখেয়ালিপনা স্বভাবের হতে পারে। এক্ষেত্রে সুন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ছোটোদের স্নেহ করে না ও বড়োদের সম্মান করে না, সে আমার উম্মত না। তিনি আরো বলেছেন, শিশু-কিশোরদের জন্য তার পিতার পক্ষ হতে সবচেয়ে বড়ো উপহার এটাই যে তিনি তাদের যথাযথভাবে বড়ো করে গড়ে তুলবেন।
আমাদের কিশোরদের সঠিক বিকাশ ধারা সমুজ্জ্বল করতে পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের যথার্থ নৈতিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে চিরসবুজ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে আকাশ সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে থাকা আন-লিমিটেড অপসংস্কৃতিসহ সকল প্রকার সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রুখতে হবে। আর সেজন্য দরকার টেকসই পরিকল্পনা ও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন।
বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, এদেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠী ইসলামের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও চিত্ত-বিনোদনের অন্যতম বাহন চলচ্চিত্র, নাট্যাঙ্গানসহ মূলধারার কোথাও ইসলামী সংস্কৃতির ছোঁয়া নেই! সবখানে চরিত্রহীন অশ্লীল অপসংস্কৃতির ছড়াছড়ি। এর জন্য দায়ী কে?
দেশে উলামা-মাশায়েখ হিসেবে পরিচিত কিছু লোক বহু আগেই ফতোয়া দিয়ে বসে আছেন, ইসলামে সিনেমা-গান প্রভৃতি হারাম-হারাম এবং হারাম! অথচ কোনটা হারাম আর কোনটা হালাল, মন্দের বিপরীতে ভালোর জেহাদ; সেসব বিষয়ে তারা পুরোপুরি নীরব! এ অবস্থা তো একদিনে তৈরি হয়নি।
উপমহাদেশে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের দীর্ঘ দুঃশাসনের যাঁতাকলে মুসলিম সভ্যতার মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এবং এমন বহু আবোল-তাবোল গোত্র সৃষ্টি করা হয়েছে, যা আজো রয়েই গেছে। সৃষ্টিজগতের চির সুমহান স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালা আমাদের দুনিয়া ও আখেরাতের অন্তহীন জীবনের পরম শান্তি, কল্যাণের জন্য একমাত্র ইসলামকেই পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে মনোনীত করেছেন। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল কুরআনের নির্দেশনা ও রাসূল (সা.) -এর বাস্তব জীবনের মধ্যেই সঠিক সমাধান বিদ্যমান রয়েছে। সেই নমুনায় ইসলামী চেতনায় বর্তমান ইরান আমাদের সামনে এক অনন্য মডেল। সেখানে গড়ে উঠেছে এক সুবিশাল ইসলামী সভ্যতা। তাদের তৈরি চলচ্চিত্র অস্কার জয় করে। শুধু তাই নয়, ইরানি চলচ্চিত্রকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শৈল্পিক সিনেমা হিসেবে বিবেচনা করেন জগদ্বিখ্যাত চলচ্চিত্রকারেরা।
তাই আসুন আমরাও জেগে উঠি ইসলামী জাগরণের শপথে।
আমাদের তৈরি সুস্থধারার শিশু-কিশোর চলচ্চিত্র ‘দূরবীন’-এর মতো বহু চলচ্চিত্র, নাটক, জীবনমুখী গান-কবিতা সৃষ্টি করি। বাতিল অপসংস্কৃতির স্রোতের বিপরীতে সুন্দর ও শুদ্ধতার সুস্থ সংস্কৃতির মাধ্যমে পাকাপোক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলি।
শিশু-কিশোরদের শতভাগ মাদকমুক্ত করার চেষ্টা করি। প্রতিটি ঘরে-ঘরে পৌঁছে দিন নতুন কিশোরকণ্ঠ! শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দিন। বিশ্বাস করুন অধিকাংশ শিশু-কিশোরই তাহলে সঠিকভাবে বেড়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ।

SHARE

Leave a Reply