Home চিত্র-বিচিত্র লড়াকু পাখি বুলবুলি -রিফাত মাহমুদ

লড়াকু পাখি বুলবুলি -রিফাত মাহমুদ

বন্ধুরা,
তোমরা জানই তো বুলবুলি আমাদের অতি পরিচিত বৃক্ষচারী পাখি। এদের বসবাস আমাদের আশপাশেই। গ্রামগঞ্জের ঝোপ-ঝাড়ে এদের সহজেই দেখা যায়। লড়াকু পাখি হিসেবে বেশ পরিচিত এই পাখিটি। ঢাকা শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামে সর্বত্রই এই পাখির দেখা মেলে।
বুলবুলি দুঃসাহসী এক পাখি। বুলবুলি পাখি পূর্ব-দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থানীয় পাখি। আফ্রিকার অধিকাংশ অঞ্চল, মধ্যপ্রাচ্য, ক্রান্তীয় এশিয়া হতে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত এবং উত্তরে জাপান পর্যন্ত এদের বিচরণ লক্ষ করা যায়। এছাড়া চীনেও এদের দেখতে পাওয়া যায়।
আরো বিভিন্ন দেশে পাখিটি দেখা যায় বলে জানা গেছে। পৃথিবীতে এদের মোট সংখ্যা কত তা এখনো অজানা। বিগত কয়েক দশক ধরে এদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সে কারণে আইইউসিএন এই প্রজাতিটিকে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত বলে ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতির পাখিটি সংরক্ষিত আছে লড়াকু পাখি হিসেবে।
বাংলাদেশে ১১ প্রজাতির বুলবুলি দেখা যায়। বুলবুলি, ছাইরঙা বুলবুলি, কালো বুলবুলি, সবুজ বুলবুলি, হলদে বুলবুলি, কালোমাথা বুলবুলি, পাহাড়ি বুলবুলি ইত্যাদি।
বুলবুলির দৈর্ঘ্য প্রায় ২০ সেন্টিমিটার। ডানা ১০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। ঠোঁট দুই সেন্টিমিটার। লেজের পরিমাপ ৯ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার। পা ২ দশমিক ২ সেন্টিমিটার। একেকটি বুলবুলি পাখির ওজন প্রায় ৪২ গ্রাম।
বুলবুলি পাখি সাধারণত বাদামি রঙের হয়ে থাকে। স্ত্রী-পুরুষ পাখি দেখতে একই রকম। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথা কালো বা কালচে-বাদামি। মাথা ও গলা চকচকে কালো। এদের মাথার ওপর ছোট্ট কালো ঝুঁটি আছে। কারো কারো আবার ঝুঁটি দেখা যায় না।
এদের পালক আঁশের মতো। লেজ বাদামি হলেও লেজের আগা কিছু অংশ গাঢ় বাদামি হয়ে প্রান্ত একদম সাদা। পেট অপেক্ষাকৃত ফিকে বাদামি।
ডানা, পিঠের ওপরের অংশ ও বুকের প্রতিটি পালকের আগায় খুব সরু সাদা পট্টি নজর কেড়ে নেয়। পাখিটির পালক লম্বা, কোমল এবং ফোলানো। এদের ঠোঁট সামান্য বাঁকা। বুলবুলি পাখির পা খাটো এবং দুর্বল। দেহের তুলনায় লেজ অপেক্ষাকৃত লম্বাকৃতির। পাখির ঘাড়ে লোমসদৃশ পালক রয়েছে। এদের ডানা খর্বকায় এবং গোলাকার। চোখের ভেতরের অংশ গাঢ়। চঞ্চু ও পায়ের রঙ কুচকুচে কালো। চঞ্চু ছোটো ও শক্ত। এর দেহের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা টকটকে লাল অবসারণী-ঢাকনি।
বুলবুলি একটি লড়াকু পাখি। লড়াইবাজ পাখি হিসেবে দুনিয়াজোড়া এর খ্যাতি রয়েছে। এ কারণে এক সময় সারা ভারতবর্ষে বুলবুলি পোষার রেওয়াজ ছিল। বাংলাদেশেও এক সময় কক ফাইটের মতো বুলবুলিরও লড়াই দেখা যেতো।
বুলবুলি খুবই চঞ্চল স্বভাবের পাখি। বুলবুলিরা বিভিন্ন রকম ছোটো ছোটো ফল, কিট-পতঙ্গ এবং ফুলের মধু খায়। পুঁইশাকের পাকা দানা ও মটরশুঁটি ওদের খুব প্রিয় খাবার। তাই কৃষকের ভরা জমিতে সবজি খেতে ওদের দলে দলে হামলা করতে দেখা যায়। ঝোপঝাড় ও গাছের পাতায় এরা খাবার খুঁজে বেড়ায়।
বুলবুলি সামাজিক পাখি। তাই এরা জোড়ায় জোড়ায় বা দল বেঁধে চলতে পছন্দ করে। জোড়া ছাড়া এদের দেখা যায় না বললেই চলে।
বুলবুলি বেশ সাহসী পাখি। শক্ত নখর নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে শত্রুর ওপর। এই পাখি বেশ ভালো পোষ মানে।
বুলবুলি বেশি উড়তে পারে না বলে একটানা বেশি দূর উড়ে যায় না। তবে ওদের ওড়াটা বেশ দ্রুত। ওড়ার সময় ডানার ঝাপটার শব্দ স্পষ্ট শোনা যায়। এরা সারাক্ষণ গাছের ডালে ডালে ঘুরে বেড়াতেই অভ্যস্ত। মাটিতে ভালো করে হাঁটতে পারে না বলে মাটিতে নামে না বললেই চললে। কোনো খাবার মাটি থেকে তুলে নেওয়ার প্রয়োজন হলেই কেবল মাটিতে নেমে আসে।
বুলবুলি পাখি গাছের ডাল, পাতার ঝোপ বা নিচু গাছে মাটির কাছে বাসা বানায়। বাসা বানাতে এদের সময় লাগে ২-৫ দিন। সাধারণত এরা ছোটো ঝোপঝাড়ে বাসা বানায়। এ ছাড়া গাছের গর্ত, ঝোপালো গাছ, নদী তীরের গর্ত, ভাসমান কচুরিপানা, বাসা-বাড়ির কার্নিশ এমনকি বাসের মধ্যেও বাসা বানায়। বাসার উচ্চতা ভূমি থেকে ৭-১০ ফুট ওপরে হয়। ডাল, ধাতব তার, পাতা, কঞ্চি, ঘাস, চুল ইত্যাদি মাকড়সার জালে জড়িয়ে পরিপাটি করে বাটির মতো বাসা বানায় এরা।
ডিম পাড়ার মাধ্যমে এই পাখি বংশবিস্তার করে। এদের ডিমের রঙ গোলাপি সাদা হয়। তার ওপর বাদামির ছোপ থাকে। একটি স্ত্রী বুলবুলি পাখি একবারে দুই থেকে পাঁচটি ডিম দেয়। ১০-১৫ দিন ডিমে তা দেওয়ার পর বাচ্চা ফোটে।

পাখিটির গলার স্বর খুবই মধুর। এরা গান গায় না। তবে সারাদিনই বিরামহীনভাবে মিষ্টি এবং সুরেলা কণ্ঠে ডাকাডাকি করে ঘুরে বেড়ায় গাছের ডালে ডালে। এরা এক সঙ্গে কিচিরমিচির আওয়াজে সবাইকে মাতিয়ে তোলে।
এই পাখিটির দিকে যতই তাকানো হয়, ততই চোখ শীতল হয়ে যায়!

SHARE

Leave a Reply