Home দেশ-মহাদেশ রঙধনুর দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

রঙধনুর দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

দক্ষিণ আফ্রিকা আফ্রিকা মহাদেশের সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র। সরকারি নাম দক্ষিণ আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র। দেশটির দক্ষিণে ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগর অবস্থিত; দুই মহাসাগর মিলে দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলীয় তটরেখার দৈর্ঘ্য প্রায় ২৮০০ কিলোমি হাজার ৯৭৮ জন। জাতিগত গ্রুপের মধ্যে রয়েছে কৃষ্ণাঙ্গ ৮০.৭ শতাংশ, মিশ্রবর্ণ ৮.৮ শতাংশ, শ্বেতাঙ্গ ৭.৯ শতাংশ এবং এশীয় ২.৬ শতাংশ। প্রধান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রয়েছে খ্রিষ্টান ৭৮ শতাংশ, অধার্মিক ১০.৯ শতাংশ, ঐতিহ্যবাহী আফ্রিকান ধর্মাবলম্বী ৪.৪ শতাংশ, মুসলিম ১.৬ শতাংশ, হিন্দু ১ শতাংশ, অন্যান্য ২.৭ শতাংশ এবং অচিহ্নিত ১.৪ শতাংশ। এদেশের সরকারি ভাষা ১১টি : ইংরেজি, জুলু, সোয়াজি, আফ্রিকান্স, সেপেডি, সেসোথো, সেতসোয়ানা, জিতসোঙ্গা, জোসা, শিভেন্দা ও ইসিনডেবেলে। এছাড়া বিশেষ মর্যাদার ভাষা রয়েছে আরো ১৫টি।
রাষ্ট্রটির রাজধানী তিনটি : প্রিটোরিয়া নির্বাহী রাজধানী, কেপ টাউন আইন বিভাগীয় রাজধানী এবং ব্লোয়েমফন্টেইন বিচার বিভাগীয় রাজধানী। দেশটির বৃহত্তম নগরী জোহানেসবার্গ; এছাড়া ডারবান ও পোর্ট এলিজাবেথ হলো অন্যতম দুটি প্রধান নগরী। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট একাধারে রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান। বর্তমান প্রেসিডেন্ট সাইরিল রামাফোসা ও ডেপুটি প্রেসিডেন্ট ডেভিড মাবুজা। এদেশের আইনসভা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট : উচ্চকক্ষ ৯০ সদস্যের ন্যাশনাল কাউন্সিল এবং নিম্নকক্ষ ৪০০ সদস্যের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি। নিম্নকক্ষের সদস্যরা জনসংখ্যার ভিত্তিতে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। অর্ধেক সদস্য নির্বাচিত হন জাতীয় তালিকা থেকে, আর অর্ধেক প্রাদেশিক তালিকা থেকে। উচ্চকক্ষ গঠিত হয় প্রত্যেক প্রদেশ থেকে দশজন সদস্য নিয়ে। এ ক্ষেত্রে জনসংখ্যার তারতম্য বিবেচ্য নয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রশাসনিক এলাকা ৯টি প্রদেশে বিভক্ত। প্রদেশগুলো হলো ইস্টার্ন কেপ, ফ্রি স্টেট, গউটেং, কোয়াজুলুনাটাল, লিমপোপো, এমপুমালাঙ্গা, নর্থ ওয়েস্ট, নর্দার্ন কেপ ও ওয়েস্টার্ন কেপ। প্রদেশগুলো আবার ৫২টি জেলায় বিভক্ত : ৮টি মেট্রোপলিটান ও ৪৪টি জেলা পৌরসভা। জেলা পৌরসভাগুলো আবার ২০৫টি স্থানীয় পৌরসভায় বিভক্ত।
দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক বিষয়ে একটি উচ্চতর-মধ্যম ক্ষমতার দেশ। দেশটি উল্লেখযোগ্য আঞ্চলিক প্রভাব রাখে এবং কমনওয়েলথ দেশসমূহ ও জি২০ এর সদস্য। এটি একটি উন্নয়নশীল এবং নবীন শিল্পায়িত দেশ।
দক্ষিণ আফ্রিকার ভূখণ্ড তিনটি বৃহৎ অঞ্চলে ভাগ করা যায়। অভ্যন্তর ভাগে একটি প্রশস্ত মালভূমি দেশটির সিংহভাগ এলাকা গঠন করেছে। মধ্যভাগের এই মালভূমিটিকে এস্কার্পমেন্ট নামক একটি পার্বত্য অঞ্চল ঘিরে রেখেছে এবং একই সাথে উপকূলীয় নিম্ন সমভূমির একটি সরু বেষ্টনী থেকে মালভূমিটিকে পৃথক করেছে। পূর্বে ড্রাকেন্সবার্গ পর্বতশ্রেণীটি দেশের সর্বোচ্চ পর্বতাঞ্চল। দেশের পশ্চিমভাগে কালাহারি মরুভূমি ও নামিব মরুভূমির কিয়দংশ অবস্থিত। অরেঞ্জ নদী ও লিম্পোপো নদী দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান দুই নদী।
দক্ষিণ আফ্রিকার আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ উপক্রান্তীয় প্রকৃতির। শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে মাঝে মাঝে খরার সমস্যা দেখা দেয়। দেশটিতে স্বর্ণ, কয়লা, হীরা, প্লাটিনাম ও ভ্যানেডিয়ামের মজুদ আছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার সিংহভাগ বিক্ষিপ্ত বৃক্ষরাজি ও তৃণভূমি দিয়ে আচ্ছাদিত। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে প্রচুর ফুল-ফলের গাছ জন্মে। পশ্চিমের শুষ্ক অঞ্চলে ঝোপঝাড় ও গুল্ম জন্মে যেগুলো খুব কম বৃষ্টিপাতেও বেঁচে থাকতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকায় স্বল্পসংখ্যক অরণ্য আছে, সেগুলো মূলত উপকূল ঘেঁষে কিংবা পার্বত্য উপত্যকাগুলোতে অবস্থিত। দেশটিতে সীমিত সংখ্যায় সিংহ, হাতি, গণ্ডার, জলহস্তী ও অ্যান্টিলোপ হরিণের মতো বন্যপ্রাণী দেখা যায়। এগুলো মূলত বন্যপ্রাণী উদ্যানে সুরক্ষিত অবস্থায় বাস করে।
দক্ষিণ আফ্রিকা নৃতাত্ত্বিকভাবে একটি বহু-গোষ্ঠীয় রাষ্ট্র, যেখানে বহু বিচিত্র সংস্কৃতি, ভাষা ও ধর্মের মেলবন্ধন ঘটেছে। এ কারণে এটিকে ‘রংধনু জাতি’ হিসেবেও ডাকা হয়।
প্রস্তর যুগে অর্থাৎ এখন থেকে ১০ হাজার বছর আগে এখানে সান ও খোয়েখোয়ে (খোইসান ভাষাভাষী) জাতির লোকেরা বিচরণ করতো। খোয়েখোয়েরা পরবর্তীতে পশুচারণ সংস্কৃতি গড়ে তোলে। আজ থেকে দুই হাজার বছর আগে এখানে বান্টু ভাষাভাষী জাতির লোকেরা বসতি স্থাপন করে। তারা এখানে সোনা ও তামার খনি প্রতিষ্ঠা করে ও পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করে। বান্টুরাই বর্তমান দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের মূল পূর্বসূরি।
১৫শ শতকের শেষভাগে আফ্রিকার সর্বদক্ষিণ অংশে পর্তুগিজরা একটি বসতি স্থাপন করে, যা ছিল অঞ্চলটির ইউরোপীয় উপনিবেশিকীকরণের সূচনা। ১৬৫২ সালে ওলন্দাজরা দক্ষিণ-পশ্চিমের উত্তমাশা অন্তরীপে একটি উপনিবেশ স্থাপন করে। তারা ধীরে ধীরে তাদের বসতির কলেবর বৃদ্ধি করতে থাকে। এই ঔপনিবেশিক ওলন্দাজদেরকে ‘বুর’ (অর্থাৎ ‘কৃষক’) নামে ডাকা হতো। পরবর্তীতে তারা ওলন্দাজ ভাষা থেকে উদ্ভূত আফ্রিকান্স ভাষায় কথা বলার কারণে ‘আফ্রিকানার’ নামে পরিচিতি লাভ করে। বুররা পূর্বে বসতি স্থাপন করার চেষ্টা করার সময় স্থানীয় অনেক আফ্রিকান জাতিগোষ্ঠীর সাথে তাদের যুদ্ধ হয়, যাদের মধ্যে খোসা জাতি ছিল অন্যতম।
১৭৯৫ সালে ব্রিটিশ সেনারা উত্তমাশা অন্তরীপ নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং ১৮০৬ সাল নাগাদ সমগ্র ওলন্দাজ উপনিবেশই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হতে ১৮৩৬ সাল থেকে শুরু করে প্রায় দুই দশক ধরে ওলন্দাজ বংশোদ্ভূত আফ্রিকানার জাতির লোকেরা দেশের উত্তর দিকে এক মহাযাত্রা সম্পাদন করে এবং ১৮৫০-এর দশকে সেখানে অরেঞ্জ ফ্রি স্টেট ও দক্ষিণ আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র (বর্তমান ট্রান্সভাল অঞ্চল) নামের দুইটি স্বাধীন বুর প্রজাতন্ত্র স্থাপন করে।
অপর দিকে, ব্রিটিশরা উত্তমাশা অন্তরীপে তাদের প্রতিষ্ঠিত কেপ উপনিবেশ দক্ষিণ আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের সমগ্র অংশ জুড়ে প্রসারিত করে। এরপর ব্রিটিশরা ১৮৯৯ সাল থেকে ১৯০২ সাল পর্যন্ত যুদ্ধ করে বুরদের রাষ্ট্র দু’টি দখল করে নেয়। এই যুদ্ধ ইতিহাসে দক্ষিণ আফ্রিকান যুদ্ধ বা বুর যুদ্ধ নামে খ্যাত। ব্রিটিশরা এই দুইটি ওলন্দাজ প্রজাতন্ত্রকে উপনিবেশে পরিণত করে।
১৯১০ সালে কেপ কলোনি বা অন্তরীপ উপনিবেশ, ট্রান্সভাল, নাটাল ও অরেঞ্জ রিভার নামের ব্রিটিশ উপনিবেশগুলো একত্রিত হয়ে ইউনিয়ন অফ সাউথ আফ্রিকা নামের একটি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করে। নতুন এই রাষ্ট্রের দায়িত্বে ছিল শ্বেতাঙ্গ একটি সরকার। তারা ১৯৬১ সালে ব্রিটিশ কমনওয়েলথ পরিত্যাগ করে। ২০শ শতক জুড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনীতির মূল অমীমাংসিত প্রশ্নটি ছিল দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর ওপরে শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্য বজায় রাখার প্রশ্ন। ২০শ শতকের শুরু থেকেই শ্বেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গদের থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে পৃথক থাকলেও ১৯৪৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটিতে বর্ণবৈষম্য নীতির প্রবর্তন করা হয়। এই ব্যবস্থার সুবাদে শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর হাতে প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা, সিংহভাগ জমি ও সেরা চাকরিগুলো কুক্ষিগত হয়।
১৯১২ সালেই দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ ও মিশ্রবর্ণের অধিবাসীরা আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস নামের একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে। তারা শুরুতে শ্বেতাঙ্গ সরকারের বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলন করত। ১৯৬০-এর দশকে শার্পভিল নগরীতে শ্বেতাঙ্গ পুলিশেরা শত শত কৃষ্ণাঙ্গ মিছিলকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। এর প্রতিক্রিয়ায় আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস বোমা বিস্ফোরণসহ অন্যান্য সহিংস কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই অব্যাহত রাখে। তাদের অনেক নেতাকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়, যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ সরকারের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী নিন্দা ও ধিক্কারের ঝড় ওঠে।
১৯৯০ সালে এসে নতুন রাষ্ট্রপতি এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্কের নেতৃত্বে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ সরকার বর্ণবৈষম্য আইনগুলো একে একে রদ করে এবং নেলসন ম্যান্ডেলাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেয়। ১৯৯৪ সালে সমস্ত জাতি ও বর্ণের জন্য একটি উন্মুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যাতে নেলসন ম্যান্ডেলা দেশটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৯৭ সালে একটি স্থায়ী বর্ণবৈষম্যরোধী সংবিধান প্রণীত হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার রন্ধন প্রণালী অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। এদেশের বিভিন্ন সংস্কৃতি ও পটভূমির খাবারগুলো সব সম্প্রদায় উপভোগ করে থাকে এবং বিশেষ করে পর্যটকদের মধ্যে যারা বিশাল বৈচিত্র্যময় খাবারের স্বাদ নিতে চান তাদের কাছে এসব খাবার বাজারজাত করা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার রন্ধন প্রণালী প্রচুর পরিমাণে গোশত-ভিত্তিক এবং এটা ব্রাই নামে পরিচিত যা বারবিকিউয়ের একটি ভিন্নতা।
দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল, রাগবি ও ক্রিকেট। অন্যান্য তাৎপর্যপূর্ণ ক্রীড়ার মধ্যে রয়েছে সাঁতার, এথলেটিকস, গলফ, বক্সিং, টেনিস, রিংবল, হকি ও নেটবল। এছাড়াও বাস্কেটবল, জুডো, সারফিং ও স্কেটবোর্ডি ক্রমান্বয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০ সালের ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজন করে এবং তা খুবই সাফল্যের সাথে সম্পন্ন করে। দেশটি তিন বার রাগবি বিশ্বকাপ জয় করেছে। এদেশের ক্রিকেট টিম প্রোটিয়াস নামে পরিচিত এবং ক্রিকেট জগতে একটি শক্তিশালী দল।

SHARE

Leave a Reply