Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস কিশোর উপন্যাস

কিশোর উপন্যাস

১০ মে ২০২১। সোমবার।
অন্যান্য দিনের মতোই আলোকোজ্জ্বল একটি দিন। গাজা রামাল্লাহসহ ফিলিস্তিনের শহরগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই দিনটি শুরু হয়েছিল। কিন্তু সে দিনটিতে কেয়ামত নেমে আসবে, আকাশ কালো হয়ে উঠবে তেমনটা কেউ ভাবেনি। পূর্ব জেরুসালেমের শেখ জারাহ উপকণ্ঠে মোনাও অন্যান্য দিনের মতোই দিনটি শুরু করেছিল। কিন্তু দখলদার ইহুদি সেনারা দিনটিকে কেয়ামত বানিয়ে ছাড়বে তা তারও জানা ছিল না। অতর্কিত যুদ্ধ শুরু করে দিল ইসরাইলি সেনারা। মুহুর্মুহু কামানের গোলা আর জঙ্গিবিমান থেকে বোমা ফেলা শুরু হয়ে গেল। শেখ জারাহর আকাশ কালো হয়ে উঠলো স্টান গ্রেনেডের ধোঁয়ায়। আবার গাজার আকাশ লাল হয়ে হয়ে উঠলো বোমার লাল আগুনে। যে যে দিক পারে নিরাপদ স্থানে দৌড়াতে শুরু করলো কোন কিছু বোঝার আগেই। ফিলিস্তিন নামে মাত্র একটি কর্তৃপক্ষ, পূর্ণাঙ্গ দেশ হয়ে উঠতে পারেনি। একজন প্রেসিডেন্ট আছেন, জাতিসংঘের একটি পর্যবেক্ষক সদস্য দেশ মাত্র। কিন্তু তা হওয়ার কথা ছিল। হয়নি। ইসরাইল হতে দেয়নি। ১৯৯৩ সালে ফিলিস্তিনের মহান নেতা ইয়াসির আরাফাত এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিনের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির মধ্যে দু’রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা ছিল। সে চুক্তির আলোকেই গঠিত হয় ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ (পিএ) যা স্বশাসিত এবং স্বাধীন সরকারের মতো কাজ করার অধিকার লাভ করে। চুক্তিতে বলা হয়, এক সময়ে ফিলিস্তিন একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করবে। কিন্তু উগ্র ইহুদিরা সে শান্তিচুক্তি মেনে নেয়নি। মায়ের কাছ থেকে মোনা এসব শুনেছে। সে আরো শুনেছে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ইতিহাসের বাস্তবতা। ৪৫০ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছিল। এমনকি দেশটির রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল অতীত। ১৯৪৮ সালে কোথা থেকে কী যেন হয়ে গেল! জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে ষড়যন্ত্রকারীরা দেশটির অস্তিত্ব বিপন্ন করেছে। শুনে ভারি মন খারাপ মোনার।
: কেন আম্মি এমনটা হলো? জানতে চেয়েছিল সে। মা বলেছেন-
: সেটা আমাদের দুর্ভাগ্য আর ষড়যন্ত্রকারীদের বিজয়।
: এখন কী হবে? আমরা কবে স্বাধীন দেশ পাব?
: সেই আশায়ই তো বুক বেঁধে আছি মা। আর সংগ্রাম করছি।
মায়ের কাছ থেকে সেই সংগ্রামের কথাও জেনেছে মোনা। সেই সংগ্রাম করেছে পিএলও-ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থা। সেই সংগ্রামের সাথে যুক্ত হয়েছে ইন্তিফাদা। গণ অভ্যুত্থান। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত প্রথম ইন্তিফাদা চলেছিল। দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শুরু হয় ২০০০ সালে এবং ২০০৫ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এ সময়ে অন্তত ৩২০০ ফিলিস্তিনি শহীদ হন এবং ইসরাইলের এক হাজার মানুষ মারা যায়। ২০০০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ইসরাইলের তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা এরিয়েল শ্যারন আল-আকসা চত্বর পরিদর্শনের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেন। ফিলিস্তিনিরা এর প্রতিবাদ করে। শ্যারন স্থানত্যাগ করার পর হারাম আল শরিফের প্রাঙ্গণে ইসরাইলি দাঙ্গা পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপের মাধ্যমে বিক্ষোভ শুরু হয়। সেটাই দ্বিতীয় ইন্তিফাদা। পরে এই সংগ্রামের সাথে যুক্ত হয়েছে ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন-হামাস আর ইসলামী জিহাদ।

দুই.
ছি ছি! এভাবে মানুষ মারতে শয়তানগুলোর হাত কাঁপে না। এটা কি যুদ্ধের ধর্ম? প্রশ্ন জাগে শেখ জারাহবাসীর মনে। একটি শেল্টারে আশ্রয় নেওয়া মোনাও ভাবছিল সেটা, আর হাঁপাচ্ছিল। কারণ দৌড়াতে দৌড়াতে তাকে এতটা পথ আসতে হয়েছে। আব্বা আম্মা কোথায়, প্রাণের ভাইটা কোথায় সে ভাবনায় অস্থির হয়ে উঠতে শুরু করলো সে। সত্তুর বছরের বেশি সময় ধরে যুদ্ধ করে চলেছে ফিলিস্তিনিরা। কত নারী পুরুষ শিশু-কিশোর শহীদ হয়েছে তার কি কোনো শেষ আছে? যুদ্ধ তো তাদের জন্য নতুন কিছু নয়। নিজেদের বাড়ি ঘরে আজ তারা নেই, সেটা দখল জবর দখল করে নিয়ে বসবাস করছে ইসরাইলিরা। পৃথিবীর বুকে এমন অপয়া বর্বর জাতি আর হয় না, ভাবে মোনা। এক ফিলিস্তনি প্রতিবাদী তরুণী।
কোনো কিছুকে তোয়াক্কা করে না ইসরাইলিরা। কথা বলে অস্ত্রের ভাষায়। বুলেট বোমা কামানের গোলার আঘাত নিত্যকার সঙ্গী ফিলিস্তিনিদের। শরণার্থী হয়ে পড়াদের কষ্ট তো আরো বেশি। কিন্তু ১০ মের এই জঘন্য হামলার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছে না ফিলিস্তনিরা। মোনা তো কিছু বুঝতেই পারছে না। পরে আরো শুনেছে সে গাজা ভূখণ্ডে ইসরাইলিরা বিমান হামলা চালিয়ে বৃষ্টির মতো বোমা নিক্ষেপ করেছে।
৬ মে শেখ জারাহতে ছয়টি ফিলিস্তিনি পরিবারকে উচ্ছেদের বিষয়ে ইসরাইলের সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের কারণে ফিলিস্তিনিরা বিক্ষোভ শুরু করে। আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে, ইসরাইলের সাথে সংযুক্ত এই এলাকাটি ফিলিস্তিনি অঞ্চলগুলোর একটি অংশ যা বর্তমানে ইসরাইলের দখলে রয়েছে। বিক্ষোভ দ্রুত ইহুদি ও ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সহিংস সংঘাতে পরিণত হয়। ৭ মে ইসরাইলি পুলিশ ইসলামের পবিত্র স্থান আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে হামলা চালায়। পুলিশ ইট পাটকেল নিক্ষেপকারী ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট এবং স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করে। ফিলিস্তিনিদের কাছে আধুনিক অস্ত্র নেই। তারা ইটপাটকেল মেরেই তাদের প্রতিবাদ করে। সেই আদিকালের সামান্য ইটপাটকেল মারাও বরদাস্ত করতে রাজি নয় ইসরাইলি হার্মাদগুলো।
: মোনা, মোনা, তোর কী হয়েছে? বেশি লাগেনি তো? আহা বেচারি। বলেন পাশের বাড়ির এক চাচী রাহিলা।
: আমি ঠিক আছি, আমার ভাইকে দেখ। ও তো একটু জেদি।
: দেখি, দেখি। কতখানি ছড়ে গেছে, রক্ত ঝরছে। বললেন রাহিলা।
: আমার কিছু হয়নি। ভাইটাকে দেখ। ওকে সৈন্যরা মেরেছে খুব। মোনা তার ভাইয়ের কথা বলেই যাচ্ছিল নিজের কথা না ভেবে। ফিলিস্তিনি অ্যাম্বুলেন্সও আসতে দিচ্ছিল না সেনারা। অনেক ঘুর পথ বেয়ে শেষে হাজির হলো। দু’জন নার্স আর একজন ডাক্তার বের হয়ে এলেন অ্যাম্বুলেন্স থেকে। কয়েকজন গুলি আর রাবার বুলেট খেয়ে কাতরাচ্ছিল। তাদের তুলে নিলো তারা ঝটপট অ্যাম্বুলেন্সে। একজন স্বাস্থ্যকর্মী রক্তে ছেয়ে যাওয়া মোনাকে কোলে তুলে নিয়ে গাড়িতে তুলে নিয়ে মুহূর্তেই যে পথে এসেছিল সে পথে চলে গেল। দূরে অস্ত্র তাক করা ইসরাইলি বাহিনী দেখছিল সব। তবে আর গুলি করেনি।
শেখ জারাহ ফিলিস্তিনিদের শত শত বছরের আবাসভূমি। এর দখল নিতে চায় ইসরাইলি আর সেটলাররা। তাতে বাধা দিচ্ছে এসব বাড়ির মালিকেরা। এ নিয়েই শেখ জারাহর লড়াই। শেখ জারাহ পূর্ব জেরুসালেমের একটি উপকণ্ঠ। পুরনো ফিলিস্তিনি জনপদ। মাউন্ট স্কোপাসের রোডে ওল্ড সিটি থেকে দুই কিলোমিটার উত্তরে। এখানে অবস্থিত মুসলিম বীর সালাউদ্দিনের চিকিৎসক শেখ জারাহর সমাধি। ১৩ শতকে তাকে সেখানে সমাহিত করা হয়। সে থেকে এলাকাটির নামকরণ করা হয়েছে শেখ জারাহ। মহল্লাটি ১৮৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ধীরে ধীরে জেরুসালেমের মুসলিমদের আবাসিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পর এটি জর্ডান-অধিকৃত পূর্ব জেরুসালেম এবং ইসরাইল-অধিকৃত পশ্চিম জেরুসালেমের মধ্যে নো-ম্যানস ল্যান্ড সীমানা ছিল। বর্তমান ফিলিস্তিনি জনসংখ্যার অধিকাংশই ১৯৪৮ সালে জেরুজালেমের তালবিয়া এলাকা থেকে বহিষ্কৃত উদ্বাস্তুদের থেকে এসেছে বলে বলা হয়। আসলে তা নয়। তারা এখানকারই অধিবাসী। কট্টর ইসরাইলিরা ১৯৬৭ সাল থেকে এই অঞ্চলে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে সেটলারদের প্রতিস্থাপন করে চলেছে। পাঁচ দশক ধরে শেখ জারাহের পাশে বেশ কয়েকটি ইসরাইলি বসতি তৈরি করা হয়েছে, ফিলিস্তিনিরা যা মেনে নিতে পারছে না। পবিত্র রাত লাইলাতুল কদরের দিনে কট্টর ইহুদিরা একটি মিছিলের পরিকল্পনা করে। তাদের মিছিল মানেই রক্তপাত। তাদের সাথে থাকে অস্ত্র তাক করা সেনা। এই মিছিলের অর্থ কি বোঝে না শেখ জারাহর আরেক তরুণ আল বশির। যদিও পরে এই মিছিল বাতিল করা হয়। তবে সেই মিছিলের সূত্র ধরে প্রতিবাদ করতে গিয়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় আহত হয় ৩০০ জনেরও বেশি মুসলিম। ফলে ইসরাইলের অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাভিচাই উত্তেজনা কমাতে সুপ্রিম কোর্টের রায় ৩০ দিন পিছিয়ে দেন।
: না আমরা বাপ দাদার বাড়ি ছেড়ে যাব না যতই অবৈধ রায় দেওয়া হোক। বলেন এক ফিলিস্তিনি যুবক।
: কেন যাবো। এসব বাড়ি আমাদের। কেন তার দখল নেবে বাইরে থেকে আসা সেটলাররা। কোন অধিকারে? বললেন আরেক জন।
: আল্লাহু আকবার। আল্লাহু আকবার। শ্লোগান তোলেন অপর জন।

তিন.
১০ মে হামাস ইসরাইলকে টেম্পল মাউন্ট কমপ্লেক্স ও শেখ জারাহ থেকে নিরাপত্তা বাহিনী প্রত্যাহারের আল্টিমেটাম দেয়। একই দিনে হামাস ও ফিলিস্তিনি ইসলামি জিহাদ গাজা ভূখণ্ড থেকে ইসরাইলে রকেট নিক্ষেপ শুরু করে। এটা তাদের প্রতিবাদের ভাষা। যেগুলো ইসরাইলের একাধিক বাসভবন ও একটি স্কুলে আঘাত হানে। এর ফলে ভয়ে কেঁপে ওঠে দখলদারদের বুক। এ প্রতিবাদ তো হামাসের নিয়মিত প্রতিবাদের অংশ। কিন্তু তার জবাব দিতে হবে এভাবে নির্বিচারে বোমা বর্ষণ করে? এটা কি যুদ্ধের ধর্ম? এ প্রশ্নের কোনো জবাব পায় না ফিলিস্তিনিরা।
এরপরই ইসরাইল গাজার অভ্যন্তরে বিমান হামলা চালায়। সেখানেও হঠাৎ করে যেন কেয়ামত নেমে আসে। গাজা সিটির মান্নার মহল্লার মাহদি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিল। কড়াৎ কড়াৎ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে সে হকচকিয়ে যায়। গিয়ে দেখে তাদের ঘরবাড়ি ততক্ষণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তার মা নুসাইবাকে অ্যাস্বুলেন্স সার্ভিস হাসপাতালে নিয়ে গেছে। সঙ্গে গেছে কিছুটা কম আহত তার ছোটো বোন নুজহাত। বাবা মুহম্মদ হিকমাহর লাশ পড়ে আছে সাদা কাপড়ে ঢাকা অবস্থায়। তার ভাই শুহাদার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানাল পাশের বাড়ির মাকাসিদ আল মানসুরি।
: এটা কী করে হলো? বলে মানসুরির বুকে আছড়ে পড়ে মাহদি। মানসুরির মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হয় না। কী বলবে সে প্রিয় বন্ধু মাহদিকে? তবু বলে-
: কাঁদিসনে ভাই আমার। আমরা দুর্ভাগ্য মাথায় করে পৃথিবীতে এসেছি, আমাদের তো এসব মেনে নিতেই হবে। এর পর কান্নায় ভেঙে পড়ে সেও। দু’জন অনেকক্ষণ ধরে বুকে জড়াজড়ি করে কাঁদে। তখনও মাথার ওপর উড়ছে ইসরাইলি জেট ফাইটার। সন্ধ্যার পর মাহদির বোন নুজহাত খবর নিয়ে আসে মা নুসাইবা আর নেই। আশ্চর্য ওর চোখে কোনো পানি নেই। অধিক শোকে সে কি পাথর হয়ে গেছে? আবার কড়াৎ কড়াৎ শব্দ। আবার বম্বিং। আবার দৌড়াদৌড়ি শুরু গাজার বাসিন্দাদের।
গাজা ভূখণ্ড ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত একটি স্বশাসিত ফিলিস্তিনি অঞ্চল ও গাজা সিটি ফিলিস্তিনের সবচেয়ে বড়ো শহর। পুরো গাজার ৩২০ কিলোমিটার এলাকায় রয়েছে চারটি শহর, আটটি ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবির আর এগারোটি গ্রাম। প্রায় ১২ লক্ষ ফিলিস্তিনির বসতি। ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তি অনুসারে ইসরাইল ফিলিস্তিনি জাতীয় কর্তৃপক্ষকে স্বীকৃতি দিলে গাজায় স্ব-শাসন চালু হয়। ২০০৭ সাল থেকে অঞ্চলটি হামাস কর্তৃক পরিচালিত হচ্ছে। তবে ইসরাইল দ্বারা অবরুদ্ধ। ফলে গাজার বাসিন্দাদের দুঃখের সীমা নেই। আর ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের রাজধানী জেরুসালেম ঘোষিত হলেও সেখানকার শাসনকাজ রামাল্লাহ শহর থেকে পরিচালনা করছে পিএলওর প্রধান দল ইয়াসির আরাফাতের ফাতাহ মুভমেন্ট। বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। সেটা আলাদা ভূখণ্ড। ফিলিস্তিনের মোট জনসংখ্যা চার কোটি আশি লাখ। ১৬ মে নাগাদ গাজা সিটিতে প্রায় ৯৫০টি হামলায় চারটি উঁচু টাওয়ারসহ ১৮টি ভবন, ৪০টি বিদ্যালয় ও চারটি হাসপাতাল সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়ে যায়।‌ ফিলিস্তিনি রকেট হামলায় ইসরাইলে একজন শিশুসহ মোট ১২ জন নিহত হন।
আল আকসা এলাকায় ভয়ঙ্কর হামলার সূত্রপাত ১৩ এপ্রিল ২০২১। প্রতিদিনই তো তারা গুলি করে, হত্যা করে। এ আর নতুন কী? সে রাতে ইসরাইলি পুলিশ আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে আযান দেওয়ার লাউডস্পিকারের তার কেটে দেয়, যাতে পশ্চিমপ্রাচীরে ইসরাইলের স্মরণীয় দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি রুভেন রিভলিনের দেওয়া ভাষণ বিঘিœত না হয়। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এই ঘটনাকে ‘বর্ণবাদী ঘৃণামূলক অপরাধ’ বলে অভিহিত করেন। কিন্তু এটি কোনো আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করলো না। ইসরাইলি পুলিশ পুরনো শহরের দামেস্ক গেটের বাইরের প্লাজাটি বন্ধ করে দেয়, যা ফিলিস্তিনিদের একটি ঐতিহ্যবাহী ছুটির দিনের সমাবেশস্থল। ফলে রাতে সংঘর্ষ শুরু হয়।
১৫ এপ্রিল। এক ফিলিস্তিনি কিশোর একজন ইহুদি ব্যক্তিকে চড় মারার একটি টিকটক ভিডিও প্রকাশিত হয়। পরদিন রমজানের প্রথম শুক্রবার ইসরাইল সরকার মসজিদে নামাজের স্থানে ১০,০০০ ব্যক্তির সীমাবেঁধে দেওয়ায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি মুসল্লিকে আল-আকসা থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। একই দিনে জাফায় একজন ইহুদি ধর্মীয় শিক্ষককে মারধর করা হয়, যার ফলে দুই দিন ধরে বিক্ষোভ হয়। মোনার মনে এসব কষ্ট জমা হতে থাকে।

চার.
৬ মে। শেখ জারাহতে ইসরাইলি সেনা আর পুলিশের আনাগোনা বেড়ে যেতে থাকে।
: কী হতে চলেছে। ওরা এখানে কেন?
: কেন আবার, আমাদের তাড়িয়ে সেটলারদের বসাবে নাকি?
: কেন? কেন? এসব ঘর বাড়ি আমাদের। ওরা কারা দখল করার। আমরা ছেড়ে কথা বলবো নাকি? এ রকম ফিসফিসানি শোনা যায় ফিলিস্তিনিদের মুখ থেকে। এসব কথা বলছিল শেখ জারাহর বাসিন্দা আল ওয়াসিফ ও মানাফ ফালুতি। মোনাদের বাড়ির দু’টি বাড়ির পরেই তাদের বাড়ি। মোনাদের পুরনো বাড়ির গেটে লাগানো বোগেনভেলিয়ার লতা লাল ফুল নিয়ে দোল খাচ্ছিল। তার পাশেই উঁচু খেজুর গাছের পাতাও হাওয়ায় নড়ে চড়ে উঠছিল।
দেখতে দেখতে বহু ফিলিস্তিনি সেখানে জড়ো হয়। ফিলিস্তিনি বিক্ষোভ শুরু হয়ে যেতে দেরি হয় না। ইসরাইলের অন্যান্য আরব এলাকা এবং পশ্চিমতীরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এর পরই আসে ১০ মের ভয়ঙ্কর হামলার দিনটি। ভাবনায় পড়ে মোনা ও তার বন্ধু সারাহ, জুলফা, নাশিদ ও শাফিয়া। ক্রোধে ফুঁসে ওঠে মোনার ভাই আল কুর্দ ও তার বন্ধু সালাহ, জুবাইর, শিহামরা।
শেখ জারাহতে ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলিদের মধ্যে ৬ মে প্রথম সংঘর্ষ হয়, যেখানে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো উচ্ছেদ হওয়ার ঝুঁকিতে ছিল। বিক্ষোভকারীরা সন্ধ্যায় ঘরের বাইরে ইফতার করছিল। সে দিন ইহুদি সেটলার ও ইসরাইলিরা ফিলিস্তিনিদের রাস্তাজুড়ে একটি টেবিল স্থাপন করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিওগুলোতে দেখা যায় উভয় পক্ষই একে অপরের দিকে ইটপাটকেল ও চেয়ার ছুড়ে মারছে। বিষয়টি নাড়া দেয় ফিলিস্তিনিদের। মোনার কানেও এ খবর পৌঁছে যায়। এক দিকে সে ঘৃণা নিক্ষেপ করে ইসরাইলিদের প্রতি। এবার আর বসে থাকার সময় নেই। শেখ জারাহর সব ফিলিস্তিনি বাসিন্দা ক্ষোভে ফুঁসতে থাকে।
: হায় আল্লাহ। এই ইহুদি হার্মাদগুলোর হাত থেকে আমাদের বাঁচার কি কোন রাস্তা নেই? সত্তুর বছর ধরে লাখ লাখ ফিলিস্তনি ঘরবাড়ি হারা। অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল স্থাপন করতে গিয়ে ব্রিটিশ আর পশ্চিমা শক্তি আমাদের ভাইদের উচ্ছেদ করেছে। শেখ জারাহতে গুটি কয় পরিবার আছে এবার তাদের উচ্ছেদ করবে? তুমি এর বিচার কর আল্লাহ।
মোনার মায়ের এই দোয়া মেয়েকেও আপ্লুত করে। নামাজ পড়ে এই দোয়া তিনি করছিলেন। মোনা ঘরে ঢুকে তা শুনতে পায়।
নামাজ শেষে মেয়েকে দেখতে পেয়ে বলেন তিনি-
: কোথায় ছিলি এতক্ষণ? পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে, একটু সাবধানে থাকিস মা।
: ও নিয়ে তুমি চিন্তা করো না আম্মি। আমরা সবাই এক জোট হয়ে চলি। সে তার বন্ধুদের কথা বললো।
: তোদের চলা তো ইহুদি সেনা আর সেটলারগুলোর বিরুদ্ধে মিছিল। ভয়ে আমার বুক দুরু দুরু করে। তোর ভাইটা কোথায় গেল? মোনার যমজ ভাই মোহাম্মদ আল কুর্দ এর কথা জানতে চান আম্মি জাহরা বিন্ত খাইর।
: সে আছে আম্মি ছেলেদের আরেকটা গ্রুপ নিয়ে। তবে ভেবো না, এখন পর্যন্ত নিরাপদেই আছে।
: নারে আম্মি। ইহুদি সেনাদের কোনো বিশ^াস নেই। যখন তখন গুলি করে বসে হায়েনার দল। সেটাই তো ভাবনার।
কিছুক্ষণ পর তিনি আবার বলেন-
: তোরা কী করতে চাস বলতো? তোদের প্রতিবাদে কী হবে? প্রতিবাদ করতে করতেই এ পর্যন্ত এলাম। মোনার আম্মি জাহরার মুখে হতাশার সুর। আর হতাশ কেন হবেন না তিনি। তিনি তার দু’ছেলেকে হারিয়েছেন। প্রতিবাদ বিক্ষোভ করতে গিয়ে তারা গুলিতে শহীদ হয়েছে।
না এ নিয়ে কোন দুঃখ নেই জাহরার। ফিলিস্তিনি কোন মা-ই ইসরাইলিদের সাথে সংঘর্ষে সন্তান হারানোতে কোনো ব্যথা অনুভব করে না, গৌরব বোধ করে। তার ছেলে শহীদ হয়েছে বলে। জন্মভূমির জন্য আত্মোৎসর্গকে কোন মুখে তারা খারাপ বলবে? এর চেয়ে ভালো কি আর হতে পারে? কিশোর ছেলেগুলো জীবন বাজি রেখে লড়াই করে, মাতৃভূমির জন্য জীবন দেয়, এর চেয়ে গৌরবের কী আছে? তারা জানে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ধর্মের জন্য যারা শহীদ হয় তাদেরকে মৃত বলো না, বরং তারা জীবিত, তোমরা বুঝতে পারো না। সুতরাং শহীদ যারা তাদের জন্য গৌরব বোধ করেন সকল ফিলিস্তিনি মা। মোনা কোনো কথা বলে না। কী বলবে আম্মিকে? তাদের নিত্যকার সংগ্রামের কথা তো তার জানাই আছে।[চলবে]

SHARE

Leave a Reply