Home নিয়মিত আমার কিশোর বেলার কথা -মাহবুবুল হক

আমার কিশোর বেলার কথা -মাহবুবুল হক

ছোটো কালের কত কিছু ভুলে গেছি। রংধনুর কথা, “রোদ উঠেছে বৃষ্টি হচ্ছে, খেঁকশিয়ালের বিয়ে হচ্ছে।” শীতকালের রাত্রিতে দূর থেকে বাঘ হুম হাম করছে। বেশ দূর থেকে আমাদের ডেকে ডেকে সজারু বলছে, এই যে, পড়শিরা বাঘ এসে গেছে সাবধান! সাবধান! তিস্তা নদীর একপ্রান্তে মকবুল চাচা পাথর বিছানো স্বচ্ছ পানিতে আমাদের গোছল করাতো। ঠিক অপর প্রান্তে বাঘ ছানাদের গোছল করাতো বাঘের মা।
হামিদ চাচা কখনও সাইকেলের পিছনের ক্যারিয়ারে কখনও বা ঠেলা গাড়িতে করে মরা বাঘ নিয়ে আসতো। কাঁধে থাকতো দোনলা বন্দুক!
গাছের গুড় মনে করে বিরাট অজগরের পিঠে বসে কলকি সাজাতে গিয়ে সাপ যখন নড়ে উঠেছে, তখনই সত্যেন বাবু দে দৌড়। মুরগির ডিম মনে করে সাপের ডিম নিয়ে সিদ্ধ করার কিচ্ছা বা দেবীগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলে টিনের ছাদে পাহাড় থেকে সাপসহ বরফখণ্ডের নিপতিত হওয়া এবং সাপ পরিবারের বিচ্ছুরিত হওয়া। আগ-পরে বলতে গেলে তো সব কিছুই ভুলে গেছি।
নদীর কাছে, বিলের কাছে, পাহাড়-পর্বত, বন-জঙ্গল, গাছপালার কাছে বেড়ে উঠেছে। সেসব কথা কি আর সবটুকু মনে আছে? ছোট্টকালের সাওতাল বন্ধুদের কথা, হিন্দু সমাজের বন্ধুদের কথা, কত জাতি-উপজাতি খেলার সাথীদের কথা সবার কথা বা সবটুকু কথা এখন আর মনে নেই।
বেশ মনে আছে গাধার পাল কাপড় নিয়ে নদীতে যেত, আবার ধোয়া কাপড় নিয়ে ধোপার আঙিনায় ফিরে আসতো।
বিশাল ঘোড়ার পিঠে চড়ে। পাগড়ি পরিহিত ফকির ভিক্ষুক মানুষের দ্বারে বিশাল নারিকেলের মালা নিয়ে দাঁড়াতো। লোকেরা মালার মধ্যে টাকা-পয়সা, চাল-মুড়ি-চিঁড়া যা পারতো দিতো। কিন্তু মজার ব্যাপার কি জানো, অনেক কিছু ভুলে গেলেও ঈদের কোনো কথা একেবারেই ভুলিনি।
আরবি মাস রমজান আমাদের ছোট্টকালে হঠাৎ করে আসতো না। এখনতো হঠাৎ করে আসে। কি শহর কি গ্রাম সবখানেই রমজান মাসের পূর্বেই অর্থাৎ দু’মাস পূর্বেই আসতো।
এখনতো তোমরা রজব-শাবান এসব মাস সম্পর্কে কিছুই জানো না। এটা তোমাদের দোষ নয়। দোষটা আমাদের। আমরা যারা তোমাদের মুরব্বি বা অভিভাবক, তাদের দোষ।
রমজানের পূর্বের মাসটির নাম শাবান মাস। শাবান মাসের পূর্বে হলো রজব মাস। তখন রজব মাস থেকেই রমজানের প্রস্তুতি চলতো।
আমার ছোটোকালটাতো কেটেছে এখনকার তিনটি জেলায়। দিনাজপুর থেকে পঞ্চগড়। পঞ্চগড় থেকে ঠাকুরগাঁও। আবার ঠাকুরগাঁও থেকে দিনাজপুর। মাঝে অবশ্য কিছুদিন ছিলাম এখনকার লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলায়। সে কারণে আমি যখনই শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করেছি তাতে উদ্ভাসিত হয়েছে উত্তরবঙ্গের যাপিত জীবন নিয়ে।
দিনাজপুর, পঞ্চগড় বা ঠাকুরগাঁর অধিকাংশ ঘর ছিল মাটির। এসব বাড়ি বা ঘরগুলো আমার কাছে অসম্ভব সুন্দর লাগতো। বাড়ি-ঘর এবং দেয়ালগুলো ছিল মাটির রঙে ভরপুর। জমিনের রঙ আর বাড়ির রঙ ছিল এক।
জোতদার ও তালুকদারদের বাড়িতে কিছু কিছু অংশ সাদা রঙের চুনকাম করা হতো। বৌদ্ধ ও হিন্দুরা কেউ কেউ নানারঙের আলপনা আঁকতো। বিশেষ করে দরজা এবং কপাটে। তো এই ঘর বাড়িগুলো পরিষ্কার করে মাটি দিয়ে লেপা বা চুনকাম করা শুরু হতো রজব মাসের প্রথম থেকে। রজব মাসের মধ্যেই বাড়ি-ঘর দুয়ার ঝকঝকে তকতকে হয়ে যেত। এ কাজে পুরুষদের চেয়ে মহিলাদের অংশগ্রহণই ছিল বেশি। এজন্য আলাদা করে কোনো খরচ করা হতো না। নিজেদের ঘর-বাড়ি-দুয়ার নিজেরাই লেপা-মুছা করতো। বাড়ির সবাই আনন্দ চিত্তে এসব কাজে অংশগ্রহণ করতো।
জাতি গোষ্ঠীর সাহায্য প্রয়োজন হলে সবাই মিলে আনন্দের সাথে তা করে দিতো। বিনিময়ে সবাইকে নিয়ে উঠানভোজ হতো। সেসবও ছিল অনেক মজার। সবাই মিলে নানা রকম পাটি, বাঁশের ধারা ইত্যাদিতে বসে যেত। বাঁশের ডালি বা টুকরিতে ভাপ উঠা অর্গানিক চালের ভাত কলাপাতায় মুঠ মুঠ করে সবাইকে দিয়ে যেত। টিনের বালতিতে থাকতো গরুর গোশত বা খাসির গোশত। তাও দেওয়া হতো হাত দিয়ে মুঠি মুঠি করে। ডাল বিতরণের বেলায় হাতের সাথে সাথে ছোটো বাটির ব্যবহারও ছিল।
অবস্থাপন্ন চাষির ঘরে মাটির থালা বাসন ব্যবহার করা হতো। ধনাঢ্য পরিবারে অবশ্য মেহমানদের জন্য তামা কাঁসার বাসন ব্যবহার হতো। বাড়ির আশপাশ পরিচ্ছন্ন করা হতো। আবর্জনাগুলো জমা করে আগুন জ্বালানো হতো। মোট কথা একটা পরিচ্ছন্নতার অভিযান চলতো দুই মাস ধরে।
সিন্দুক থেকে লেপ-তোশক, কাঁথা-বালিশ এবং উঠিয়ে রাখা জামা-কাপড়, শাড়ি, বিছানা-চাদর, দস্তরখান রোদে মেলে দেওয়া হতো। এমনকি নিত্য ব্যবহৃত কাপড়-চোপড়, লেপ-তোশক বালিশ রৌদ্রে মেলে দিয়ে পরিচ্ছন্নতার সূচনা করা হতো।
এর মধ্যে শবে মেরাজ আসত, আসতো শবে বরাত এই উৎসবগুলোও পারস্পরিক শুভেচ্ছা আন্তরিকতা ও দেওয়া নেওয়ার মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক ও আত্মীয়তার বন্ধন রি-নিউ হয়ে যেত।
মসজিদ, মাদরাসা, ইয়াতিমখানা, কবরস্থান, নামাজের ঘর বা স্থান পটাপট সব পরিচ্ছন্ন হয়ে যেত। এখনকার মতো কোনো কিছুতেই সমস্যা হতো না। সবাই একে অপরকে সাহায্য করতো। একে অন্যকে সহযোগিতা করতো। যাদের স্থায়ী অসুখ থাকতো তারা কবিরাজ-হেকিম-আয়ুর্বেদ ও তাবিজ-তুমার, ঝড় ফুঁক করে শরীরটাকে সুস্থ করার প্রাণান্ত প্রয়াসে উদ্বেলিত হতো। তারাবির নামাজ পড়ানোর জন্য মাদরাসার শিক্ষক-ছাত্রের কাছে ধরনা দেওয়া শুরু হতো।
তখনকার দিনে এখনকার মতো এতো কুরআনে হাফেজ খুঁজে পাওয়া যেত না। বিশেষ করে গ্রামে-গঞ্জে সূরা তারাবিহ হতো ২০ রাকাতে। নানা রকম নামাজ ছিল না। ধর্মের বিষয়টা ছিল এক সুরে গাঁথা। এক সুরের হারমনি, অনেক সুরের হারানো নিয়ম নয়।
শবে বরাতের পর বাড়িতে বাড়িতে হাতের সেমাই তৈরি হতো। মেশিনে সেমাই বানানোর চল এলো ৫০ দশকের শেষ দিকে। কী দারুণ উত্তেজনা। ময়দা বা চালের গুঁড়ার দলা সেমাই মেশিনে দিয়ে হাতের প্যাডেল ঘুরিয়ে সরু সরু সেমাই বের হয়ে আসতো। এটা দেখার জন্য পাড়ার ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েরা হুমড়ি খেয়ে পড়তো। খুদে দর্শকরা হাতল চালানোর জন্য অনুরোধ আবদার করতো। এ নিয়ে মজার মজার চিত্রপট তৈরি হতো। দেখা দেখি এসব নিয়ে ছোটোখাটো ব্যবসাও শুরু হতো।
ঈদের মেহমানদারির জন্য নানা-রকম পিঠাও তৈরি হতো। পিঠা তৈরিতে উত্তরবঙ্গ সবসময় হেরে যেত দক্ষিণবঙ্গের সাথে। নানা রকম সেমাই বানানো ও পিঠা তৈরির এপিসডটি দারুণ মজাদার ছিল। অনেকে ফেরি করে এসব বিক্রিও করতো। বাজারে বাজারে কাপড় চোপড় কেনার ধুম ছিল না। ঈদে নতুন কাপড় পরতেই হবে এমন কোনো ঐতিহ্য বাঙালি সমাজে বিদ্যমান ছিল না। যা ছিল তা হলো ঈদের জন্য জামা-কাপড় পরিচ্ছন্ন করে রাখা। কেউ কেউ ছেঁড়া-কাপড় পরতেন। তাও ছিল পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন।
ঈদের নতুন কাপড়ের চল এলো ৬০ দশকের মাঝামাঝি থেকে। শুরুটা হয়েছিল শুধু ছেলে-মেয়েদের জন্য। পরবর্তীতে তা সবার জন্য নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়। ঈদ মানেই নতুন কাপড়-চোপড় এ যেন এখন এক ধর্মীয় বিধান।
এখনতো অনেক শ্রেণির মানুষ। তখন তো ছিল মাত্র তিন শ্রেণির মানুষ। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত। উচ্চবিত্তের দায় ভার ছিল অন্য সবার জন্য। জাকাতের টাকা দিয়ে তারা নিম্নমানের শাড়ি লুঙ্গি কিনে দিত। দরিদ্র ছেলে-মেয়েদের জন্য দু’টুকরো রঙিন থান কাপড় বিলি করতো। গ্রামে-গঞ্জে ডজন-ডজন দর্জি বা খলিফা ছিল না। মা-চাচী, খালা-ফুফু-বোনেরাই বাচ্চাদের এসব জামা-কাপড় তৈরি করতো। কী কষ্ট করতো একটু অনুধাবন কর। এবং দয়া করে সেসব মা-চাচীদের জন্য আলাদা করে দোয়া করতো। শুধু কি তাই। মা-চাচী-বোনেরা রাত ২টায় ঘুম থেকে উঠে সাহরির খাবার তৈরি করতো। খাবার তৈরি হওয়ার পর বাড়ির সবাইকে ঘুম থেকে জাগাতো। ফজর নামাজের পর সবাই যখন ঘুমোতে যেত আমাদের মা-চাচী-বোনেরা তখন বাড়ির গরু-ছাগল-হাঁস মুরগি যত্ন নেওয়ার জন্য অন্তত ১-২ ঘণ্টা সময় ব্যয় করতো। তারপর রোগী ও শিশুদের মধ্যে যারা রোজা রাখতো না তাদের জন্য আবার নাস্তা বা খাবার তৈরি করতে হতো। এরপর বাসন-কোসন পরিষ্কার করা, কাপড়-চোপড় ধোয়া, নামাজ কুরআন শরীফ পড়া এবং জোহরের নামাজের পর থেকে ঘরের মানুষ ও মসজিদের জন্য ইফতার তৈরি করা। শুধু কি তাই? বাড়ির চারপাশের পাড়া-পড়শির জন্য ইফতার পাঠাতো। এসবই করতো আমাদের মা-চাচী-বোনেরা। তখনতো ঘরে ঘরে গৃহকর্মী ছিল না।
গৃহকর্মী রাখার রেওয়াজ ছিল চাষবাসের জন্য। পালা-পার্বণের জন্য গৃহকর্মী ছিল না। তাহলে একটু চিন্তা কর সেকালেও রাত ১০টার আগে মা-চাচী-বোনেরা বিছানায় যেতে পারতেন না।
এসব আলাপচারিতায় প্রমাণিত হচ্ছে রোজার দিনে মা-চাচী-বোনেরা মাত্র চার ঘণ্টা বিছানায় থাকতে পারতেন। বলো, জাজাকাল্লাহু খাইরান।
রাত ২টায় ঘুম থেকে উঠে আমাদের মা-চাচী-বোনেরা কিশোর ছেলেদের জাগিয়ে দিতো। যা, যা কাফেলায় যা-ওরাতো অনেকক্ষণ ধরে গান গাইছে। কাফেলা, তোমরা বুঝেছ কি না জানি না। এখনও পুরনো ঢাকার অধিকাংশ অংশে এবং গ্রাম-বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে কিছু কিছু জায়গায় সাহরির সময় দল বেঁধে কিশোররা রোজাদারদের জন্য সমবেত কণ্ঠে নানা রকম ইসলামী-সঙ্গীত গেয়ে থাকে। আসলে রোজাদারদের এভাবে জাগানোর খুব প্রয়োজন হয় না। কিন্তু এটা বহুকাল ধরে এভাবেই চলে আসছে। তখন ঘরে ঘরে ঘড়ি ছিল না, মোবাইল ছিল না। এটা রমজানকে উৎসব হিসাবে পালন করার জন্য একটা দারুণ ইভেন্ট। সবার মনে একটা আনন্দের আবহ সৃষ্টি হয়। মানুষের মনে উৎসাহ, উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে অনেক পজিটিভ বিষয় আছে।
তুমি আমি যদি নীরবে সাহরি খেয়ে, নামাজ পড়ে চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ি তাহলেতো আর উৎসব হলো না। আনন্দ হলো না। রমজানের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য বুঝা গেল না।
রমজান ইবাদতের মাস হলেও এর মধ্যে আনন্দ আছে, উদ্দীপনা আছে। আছে ইহ-পরকালের নানা কিসিমের জয়গান। ইসলামের ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্য কালে কালে যুগে যুগে এভাবেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আমাদের কৈশোর জীবন চিত্রটা এমনি ছিল।

SHARE

Leave a Reply