Home প্রবন্ধ নজরুলের কিশোর কবিতার ভাব ও বৈশিষ্ট্য -ড. মোজাফফর হোসেন

নজরুলের কিশোর কবিতার ভাব ও বৈশিষ্ট্য -ড. মোজাফফর হোসেন

শিশু-কিশোরের নরম মনের ছোটো চেতনাগুলো নজরুলের কবিসত্তাকে আলোড়িত করেছিল। কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) ছিলেন জাতীয় কবি ও বিদ্রোহী কবি। পরিণত বয়সীদের কবি হিসাবে নজরুলের কবিসত্তার অন্যতম প্রকাশ ঘটেছে দ্রোহের ভেতর। তাঁর এক হাতে ছিল আনন্দবেদনার বাঁশী অন্য হাতে ছিল রণতূর্য। নজরুল কাব্যের উপজীব্যই ছিল শাসকদের শোষণ ও জুলুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারা। ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষেরবাঁশী’ কাব্যদ্বয় এ বিষয়ে অন্যতম। সমাজ, রাষ্ট্র, শাসক, রাজা-প্রজার বিষয়াদির সাথে কবি শিশু-কিশোর মনের আবেদন নিবেদনকে স্মরণ করেছেন দারুণভাবে। দ্রোহ, সামাজিক সাম্য, মানবিক মূল্যবোধ, মানুষে মানুষে আর্থিক ভারসাম্য তৈরি করতে নজরুল খেটেছেন, ভেবেছেন, লিখেছেন নিরবধি। এর ভেতরও তিনি শিশু-কিশোরদের আবেগ অনুভূতিকে উপেক্ষা করতে পারেননি; মনে রেখেছেন অনবরত। শিশু-কিশোরদের উপযোগী সহজ সরল ভাব-ভাষায় লিখেছেন কবিতা। এসব কবিতার কোনো কোনোটায় রয়েছে আদেশ উপদেশ; হিতাহিত জ্ঞান শেখানোর প্রবণতা। আর কোনো কোনোটা রচিত হয়েছে শুধু আনন্দ দানের উদ্দেশ্যে।
মানুষ কবিতা পড়া, কবিতা আবৃত্তি করা, গান শোনা, গান গাওয়া শুরু করে কিশোর বয়স থেকে। কিশোর বয়স শুরু হয় ৭ বছরে। শেষ হয় ১৮ বছরে। এই বয়সে আবেগ, চিন্তা-ভাবনা পছন্দ-অপছন্দ, ভালোলাগা, মন্দলাগা সবই এলোমেলো। কিশোর বয়সের ছেলেমেয়েদের নিছক ভাবনা যা ক্ষণে ক্ষণে বদলায়। অর্থবহ ভাবনা, অর্থপূর্ণ চিন্তাচেতনা, ব্যক্তিগত অভিপ্রায় অভিলাষ হয়ে ওঠে অপরিণত। নতুন নতুন অভিজ্ঞতায় অস্থির মন হুটহাট বদলে যায়; চঞ্চল হয়ে ওঠে। নিরর্থক কোনো কিছুকে ভালোলাগে আবার অযথায় কোনো কিছুর ব্যাপারে উদাসীন হয়ে ওঠে কিশোর বয়স। কাজী নজরুল ইসলাম কিশোর মনের সেই উত্থান-পতনকে অবহেলা করতে পারেনি। তিনি লিখলেন- ঝিঙেফুল, ঘুমজাগানো পাখি, পুতুলের বিয়ে, শেষ সওগাত, সঞ্চয়ন কাব্যগ্রন্থ। কিশোরদের নিয়ে লেখা কবিতার পরিমাণ কম হলেও উৎকর্ষের দিক দিয়ে বাংলা সাহিত্যের মূল্যবান সম্পদ নজরুলের এই সব কাব্যগ্রন্থ।
কাজী নজরুল ইসলামের কিশোর কাব্যগ্রন্থের মধ্যে অন্যতম ‘ঝিঙেফুল’। এই গ্রন্থে ১৩টির মতো কবিতা রয়েছে। ‘ঝিঙেফুল’ এ গ্রন্থের নাম কবিতা। তাছাড়া রয়েছে- খুকী ও কাঠবেড়ালি, খোকার খুশি, খাঁদু-দাদু, দিদির বে তে খোকা, মা, খোকার বুদ্ধি, খোকার গল্পবলা, চিঠি, প্রভাতী, লিচু-চোর, হোঁদল কুৎকুতের বিজ্ঞাপন, ঠ্যাং-ফুলী, পিলে-পটকা, প্রভৃতি। প্রভাতী কবিতায় কবি শিশু-কিশোরদের সকাল সকাল বিছানা ছাড়ার আহ্বান করলেন; অতি চমৎকারভাবে। ভোরের সকাল থাকে ¯িœগ্ধ। এই ¯িœগ্ধ প্রত্যুষে ঘুম থেকে ওঠা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। স্বাস্থ্য ভালো থাকলে মন ভালো থাকে। সেজন্য সূর্য ওঠার আগেই যেন বিছানা ছাড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে সে লক্ষ্যে কবি লিখলেন-
ভোর হলো
দোর খোলো
খুকুমণি ওঠরে!
ঐ ডাকে
জুঁই শাখে
ফুল খুকী ছোট রে!
রবি মামা
দেয় হামা
গায়ে রাঙা জামা ঐ
দারোয়ান
গায় গান
শোন ঐ রামা হৈ!

শিশু-কিশোরদের মন বৈচিত্র্যে ভরা। পশুপাখি নিয়ে কিশোরদের কৌতূহলের শেষ নেই। পশু-পাখি দেখলেই কিশোর মন আনন্দে নেচে ওঠে। নজরুল কিশোর মনের এই অবস্থাকে ধারণ করলেন এবং শিশুসুলভ জিজ্ঞাসায় লিখলেন- খুকু ও কাঠবেড়ালি, শিরোনামে কবিতা। কিশোরের কৌতূহলী প্রশ্নে নজরুল কবিতাটি প্রকাশ করলেন এভাবে-
কাঠবেড়ালি! কাঠবেড়ালি! পেয়ারা তুমি খাও?
গুড়-মুড়ি খাও? দুধ-ভাত খাও? বাতাবিনেবু? লাউ?
বেরাল-বাচ্চা? কুকুর-ছানা? তাও?
কাঠবেড়ালি! তুমি আমার ছোড়দি হবে? বৌদি হবে? হুঁ
রাঙা দিদি? তবে একটা পেয়ারা দাও না! উ:

কী অপূর্ব ভঙ্গিমায় নজরুল ইসলাম ‘খুকু ও কাঠবেড়ালি’ কবিতাটি লিখলেন যেন কিশোর বয়সে তিনি সম্মুখ কথোপকথন করছেন। বর্ণনাভঙ্গি, ভাব ও বিষয়ে এ কবিতাটি নজরুলের কিশোরমূলক কাব্যপ্রতিভার অনন্য স্মারক। কিশোর বয়সে আবোল-তাবোল ভাবনার দৃষ্টান্ত দিলেন লিচুচোর কবিতায়। বয়সের দুরন্তপনায় এর ওর গাছের ফলমূল চুরি করে খাওয়ার মধ্যে মজা খুঁজে পায় কিশোররা। নজরুল কিশোরদের সেই বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরলেন লিচুচোর কবিতায়।
বাবুদের তাল পুকুরে
হাবুদের ডাল কুকুরে
সে কি বাস করলে তাড়া
বলি থাম একটু দাঁড়া
পুকুরের ঐ কাছে না
লিচুর এক গাছ আছে না
হোতা না আস্তে গিয়ে
য়্যাব্বড় কাস্তে নিয়ে
গাছে গ্যে যেই চড়েছি
ছোট্ট এক ডাল ধরেছি
ও বাবা মড়াৎ করে
পড়েছি সড়াৎ জোরে
পড়বি পড় মালীর ঘাড়েই
সে ছিল গাছের আড়েই।

চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়া। শাস্তি পেয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করা, সেই অভিজ্ঞতাকে কবিতায় প্রকাশ করা। লিচুচোর কবিতার শেষ প্রান্তে কাজী নজরুল ইসলাম লিখলেন চুরির শেষ পরিণতি। চুরি করা যে ভালো নয় তার শিক্ষা লিচুচোর কবিতার শেষে তুলে ধরলেন এভাবে-
যাব ফের? কানমলি ভাই
চুরিতে আর যদি যাই।
তবে মোর নামই মিছা
কুকুরে চামড়া খিঁচা
সে কি ভাই যায় রে ভুলা
মালীর ঐ পিটনিগুলা
কি বলিস? ফের হপ্তা?
তৌবা নাক খপতা।

নজরুল রচিত ‘পুতুলের বিয়ে’ গ্রন্থে বেশ কটি কবিতা কিশোরদের জন্য লেখা। এ গ্রন্থে ‘পুতুলের বিয়ে’ শুধু নাটিকা। অবশিষ্ট যা আছে সব কবিতা। যেমন- কালো জাম রে ভাই; কে কি হবি বল; কানামাছি; জুজু বুড়ীর ভয়; ছিনিমিনি খেলা; সাত ভাই চম্পা; নবার নামতা পাঠ; শিশু যাদুকর। কবিতাগুলো রসদীপ্ত কাব্যালাপ। ‘নবার নামতা পাঠ’ কবিতাটি অত্যন্ত সুখকর। বাবা আশপাশে না থাকলেই মজা বেশি। অন্যঘর থেকে আচার চুরি করা; কুলের গাছ থেকে কুল পাড়া। বাবার ভয়ে এসব করা যায় না। কিশোরদের যেন তটস্থ থাকতে হয়। এই ভাবটি নিয়ে কবি লিখলেন-
একেককে এক-
বাবা কোথায় দেখ।
দুয়েককে দুই-
নেইকো? একটু শুই।
তিনেককে তিন-
উহু-হু গেছি! আলপিন।
চারেককে চার-
ঐ ঘরে আচার।
পাঁচেককে পাঁচ-
হুই দেখ কুলগাছ।

‘কে কি হবি বল’ কবিতায় কিশোর মনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ধরা পড়েছে। এই কবিতায় বোন যখন তার সাত ভাইকে জিজ্ঞেস করেছে তারা কে কি হবে। তখন তারা এক এক করে জবাব দিয়েছে কেউ হবে ফেরিওয়ালা, কেউ হবে কাবলিওয়ালা, কেউ হতে চেয়েছে জজসাহেব, কেউবা পণ্ডিতমশাই, কেউ কনস্টেবল, কেউ দারোগা হতে চেয়েছে। আর সপ্তম ভাই হতে চেয়েছে বাবা। এই পরিকল্পনা নজরুলের কবিতায় ধরা পড়েছে এভাবে-
আমি হব বাবার বাবা
মা সে আমার ভয়ে
ঘোমটা দিয়ে লুকোবে কোণে
চুণি-বিল্লী হয়ে!
বলব বাবায়, ওরে খোকা
শিগগির পাঠশাল চল।

‘হোঁদল কুতকুতের বিজ্ঞাপন’ কবিতায় কবি অসাধারণভাবে মিনমিনে স্বভাবের বালকদের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন-
মিচকে মারা কয় না কথা মনটি বড় খুঁতখুঁতে
ছিচ কাঁদুনে ভ্যাবিয়ে ওঠেন একটু ছুতেই না ছুতে।

‘সাত ভাই চম্পা’ কবিতায় নজরুল ইসলাম কিশোর মনের অভিলাষকে বাণিবদ্ধ করেছেন অনিন্দসুন্দর করে। কিশোরের মন অবাধ সুদূরপ্রসারী কল্পনাকে ভাসিয়ে নিতে চায়। সাত ভাইয়ের প্রথম ভাই সকাল বেলার ঘুমজাগানো পাখি হতে চায়। তার বিচিত্র ইচ্ছার মধ্যে রয়েছে-
‘ফুলের বনে ফুল ফোটাব, অন্ধকারে আলো
সূয্যি মামা বলবে উঠে, খোকন ছিলে ভালো?
বলব, মামা কথা কওয়ার নাইক সময় আর
তোমার আলোর পথ চালিয়ে ভাঙ ঘুমের দ্বার।
রবির আগে চলব আমি ঘুম ভাঙা গান গেয়ে
জাগবে সাগর, পাহাড় নদী ঘুমের ছেলেমেয়ে।

কাজী নজরুল ইসলামের এই সব অনবদ্য কবিতা কিশোরদের মন কাড়া কবিতা। নজরুল শুধু বড়োদের কবি নন তিনি কিশোরদেরও কবি। অত্যন্ত সাদামাটা কিশোর কবিতাগুলোও নজরুল কাব্যের অলঙ্কার এবং বাংলা সাহিত্যের গৌরব।

SHARE

Leave a Reply