Home স্বপ্নমুখর জীবন জীবন পথে সফল হতে (পার্ট-২) -আমিনুল ইসলাম ফারুক

জীবন পথে সফল হতে (পার্ট-২) -আমিনুল ইসলাম ফারুক

জীবনে আমরা সবাই সফল হতে চাই। অনেকেই সফলতার মূলমন্ত্র জানতে চাই। আসলে সফলতার মূলমন্ত্র জিনিসটা আপেক্ষিক। একেকজনের সফলতার কারণ একেক রকম। তারপরও কিছু মিনিমাম বিষয় এক্ষেত্রে আবশ্যিক নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। আবার সফলতার বিষয়টি একটা ধারাবাহিক ও পর্যায়ক্রমিক বিষয়ও হতে পারে।
যা হোক, আমার কাছে সফলতার মূলমন্ত্র বলতে একগুচ্ছ কাজের সমষ্টিকে বুঝায়, যেগুলো সফলতার পথকে প্রশস্ত করে।
এক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- ১. স্রষ্টার আশীর্বাদ, ২. পরিশ্রম, ৩. ধৈর্য ও ত্যাগ, ৪. আত্মপ্রত্যয় ও আত্মবিশ্বাস, ৫. একাগ্রতা ও আন্তরিকতা ৬. দৃঢ় মানসিকতা, ৭. সাহসিকতা ও ঝুঁকি গ্রহণ, ৮. জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা, ৯. কর্মনিষ্ঠা এবং ১০. যুগোপযোগী শূন্যতাপূরণ ও পারিপার্শ্বিকতা।

সফলতার কোনো শর্টকাট ফর্মুলা নেই। আকস্মিক বা বিলম্বিত সফলতার ক্ষেত্রেও উপর্যুক্ত বিষয়গুলো কোনো না কোনোভাবে প্রাসঙ্গিক। স্রষ্টার আশীর্বাদ ছাড়া কোনো কাজই সমাপন বা পূরণ সম্ভব নয়। সব কাজ গোছালো, তারপরও সামান্য ভুলের কারণে পুরো আয়োজন ভেস্তে যেতে পারে। এ যেন তীরে এসে তরী ডোবার মতো। তাই সবসময় স্রষ্টার কাছে মনে প্রাণে কাক্সিক্ষত স্বপ্নপূরণের জন্য চাইতে হবে। সাথে পরিশ্রম ও অব্যাহত প্রচেষ্টা এ কাজকে কিছুটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
শ্রম না দিয়ে ফল লাভের চেষ্টা করা বাতুলতা মাত্র। তাই পরিশ্রমীরাই দিন শেষে বিজয়ী হয়। একবার চেষ্টায় সফল হতে না পারলে হাল ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। এজন্য চরম ধৈর্যের দরকার হলেও তা করতে হবে। লেগে থাকতে হবে নাছোড়বান্দার মতো। প্রয়োজনে অনেক ত্যাগও স্বীকার করতে হবে। পরাজয় মানে সবসময় হেরে যাওয়া নয়। অনেক সময় তা আশীর্বাদস্বরূপ। শিক্ষা নেওয়ার মতো হলে অবশ্যই তা গ্রহণ করা উচিত। নিজের মধ্যে বিশ্বাস সৃষ্টি করতে ও করাতে হবে যে আমি সংশ্লিষ্ট কাজে সফলতা চাই।

যদি মনে করেন ‘আমাকে দিয়ে এ কাজ হবে না’ তাহলে তো আপনি নিজেই সার্টিফাই করলেন যে তা আপনাকে দিয়ে হবে না। সত্যিই তখন তা আপনাকে দিয়ে হবে না। কারণ আপনিই তখন নিজের শত্রু হিসেবে গণ্য হলেন। নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও মনোবল লালন ও পালন করতে হবে। যা করবেন পূর্ণ মনোযোগ দিয়েই করবেন। ফাঁকিবাজি করলেন তো নিজেই নিজেকে ধোঁকা দিলেন। তাই একাগ্রচিত্তে যে কোনো কাজকে সানন্দে গ্রহণ করা উচিত। মন ভাঙবে একবার, দুই বার কিংবা বহুবার। অনেক সময় কাছের মানুষও ভুল বুঝবে। তাতে কী হয়েছে। বিপদের সময় কেউ আপনার পাশে ছিল না, থাকবে না তা স্বাভাবিক।
যদি কেউ থাকে তো আপনি সৌভাগ্যবান। অন্যথায় কারো সমালোচনা গায়ে না মেখে স্বপদে দৃঢ়ভাবে বহাল থাকা উচিত। আপনি নিজেই নিজের ড্রাইভার হবেন তখন। অনেকটা ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চল রে’ এর মতো। হতাশ হওয়া যাবে না কোনো সময়। কিছু কাল (সময়) হয় সুকাল (ভালো সময়), আর কিছু কাল হয় আকাল (খারাপ সময়), উত্থান-পতন নিয়েই মানবজীবন। সফল মানুষদের জীবনে ব্যর্থতার পাল্লাই ভারী বেশি।
তাই চরম সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে নিজেকে। যতটা প্রয়োজন ততটা ঝুঁকি গ্রহণ করতে হবে প্রয়োজনে। প্রয়োজনীয় জ্ঞানটুকু অবশ্যই অর্জন করতে হবে। বুদ্ধিমানের কাজ হলো জ্ঞানার্জন করা। এজন্য শেখার জগৎকে বিস্তৃত করতে হবে। ছোটোবেলা থেকে এ পর্যন্ত যা শিখেছেন সবই প্রয়োজনীয়। তা ভালো হোক আর মন্দ হোক। কারণ তা আপনার অভিজ্ঞতাকে সঞ্চিত ও সমৃদ্ধ করেছে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আপনি তার যথাযথ ব্যবহার ও মূল্যায়ন করতে পারবেন।

জানা থাকলে ভুল কম হয়। আর অজানা থেকে ভয়ের উৎপত্তি। তাই পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকেও জ্ঞানলাভের চেষ্টা করুন। কর্মই এগিয়ে রাখে সবসসয়। কর্মই ধর্ম। আর কর্মনিষ্ঠ ব্যক্তি কখনো চূড়ান্তভাবে হারে না। হারলেও সহজে ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। তাই কর্মনিষ্ঠ হোন। অলসতা কখনো সফলতার পথে চালিত করে না। বরং সফলতার পথকে রুদ্ধ করে। আর সফলতা দৈবাৎ আসে না। একে আমন্ত্রণ জানাতে হয়।
আপনি না চাইলে তা আপনার দ্বারে আসবে না। আপনি যে বিষয়ে সফলতা চান তাতে যুগোপযোগী হোন। সনাতনী মন-মানসিকতা ঝেড়ে ফেলুন। এখন প্রতিযোগিতার যুগ। নিজেকে সেভাবে তৈরি করুন। নিজেকে নিজের সহযোগী করুন। নিজের জগৎকে কখনও অন্যের সাথে মিলাবেন না। আপনার উদাহরণ আপনিই।

দৃশ্যত আমরা শুধু সাফল্যই দেখি। অথচ কিছু কিছু সাফল্য বংশ পরম্পরায়ও প্রাপ্ত হয়। সত্যিকার সাফল্য হলো, ক্রমাগত ব্যর্থতায় দৃঢ় মনোবল ধরে রাখা। সফলতার পেছনের সেসব ব্যর্থতাগুলো আমরা দেখি না বা ইচ্ছা করেই না দেখার ভান করি। অথচ জীবনের শিক্ষা এখান থেকেই শুরু হয়। অনেক কষ্টে পাওয়া সফলতাগুলো সহজে পাওয়া সফলতার চেয়ে বেশি শিক্ষণীয়। কিন্তু এ ব্যর্থতার গল্পগুলো আমরা শুনতে চাই না। অথচ এগুলোই মূলত দৃঢ় অস্তিত্বের গল্প। এ গল্পগুলো আমাদের জানায়- কীভাবে একজন পিছলে পড়ে, একবার-দু’বার নয়; কয়েকবার পড়েও নিজেকে টেনে তোলে। মার্কিন বাস্কেটবল খেলোয়াড় মাইকেল জর্ডান একবার বলেছিলেন, ‘আমি আমার ক্যারিয়ারে ৯ হাজারেরও বেশি শট মিস করেছি। প্রায় ৩০০ খেলায় হেরেছি। ২৬টি ইভেন্টে জেতার ভার দেওয়া হয়েছিল আমাকে, মিস করেছি। জীবনে বারবার ব্যর্থ হয়েছি। আর এ কারণেই আমি আজ সফল।’
এখানে মূল কথাটা খুবই সহজ; তা হলো, তিনি ব্যর্থ হয়েছেন বারংবার। ২৬ বারের চেষ্টায়ও নিজের দলকে বিজয় এনে দিতে পারেননি; কিন্তু খেলা থামাননি। কিংবদন্তি হওয়ার আগে তাকে বারবার ব্যর্থ হতে হয়েছিল। তবে প্রতিবার নিজেকে টেনে তুলতে দ্বিধা করেননি। এ ধারাবাহিকতায় ‘পড়ার পর নিজেকে টেনে তোলা’র ব্যাপারটা তাকে কিংবদন্তির আসনে দীর্ঘসময় ধরে আসীন করে রেখেছে।
‘আরও একবার চেষ্টা করা’-এই মন্ত্রই ভিন্নতা তৈরি করে।

খুব কম মানুষই আছে-মার্কিন লেখক স্টিফেন কিংয়ের কথা শোনেননি। তিনি এখন খ্যাতিমানদের একজন। কিং ৩০ বার তার বিখ্যাত বই ‘ক্যারি’র (ঈধৎৎরব) পাণ্ডুলিপি জমা দিয়েছিলেন; ৩০ বারই প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। ৩১তম চেষ্টা না করে তিনি পাণ্ডুলিপিটা ছুড়ে ফেলে দেন। তার স্ত্রী সেটা কুড়িয়ে নিয়ে তাকে আরও একবার চেষ্টা করতে বলেন। বাকিটা ইতিহাস। এটাই সেই ‘আরও একবার’; যা বিপ্লব ঘটিয়েছে।

অ্যানিমেশন প্রোগ্রামার ওয়াল্ট ডিজনির বয়স যখন ২২, তিনি মিসৌরির একটি সংবাদপত্রে কাজ করতেন। সেই পত্রিকার সম্পাদক তাকে বরখাস্ত করেন। কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন ডিজনির সৃজনশীলতার অভাবের কথা। ডিজনি যখন হাল ছেড়ে দেওয়ার পথে, সে সময় তার এক বন্ধু কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়। এভাবেই তার ওয়াল্ট ডিজনি হয়ে ওঠা।
মোজার্ট, এই বিস্ময়কর ব্যক্তির জীবনেও কম ব্যর্থতা নেই। তিনি পাঁচ বছর বয়স থেকে মিউজিক কম্পোজিশন শুরু করেন। জীবদ্দশায় ৫০০টিরও বেশি মিউজিক্যাল মাস্টারপিস রয়েছে। তার কম্পোজিশনের সহজাত দক্ষতা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। তার জীবনেও পতন ছিল। তিনি রাজদরবারের সঙ্গীতজ্ঞের পদ থেকে বিতাড়িত হয়েছেন, আর্চডিউক তার ‘দ্য ম্যারেজ অব ফিগারো’কে ‘গোলমেলে’ আখ্যায়িত করেন। তার শেষ তিনটি কম্পোজিশন ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়। এত কিছুর পরও তিনি হাল ছাড়েননি, হতাশ হননি। তিনি তার কাজ চালিয়ে যান পূর্ণোদ্যমে, আবেগ ও সাহস নিয়ে। আর এ দৃঢ়তাই তাকে ‘মোজার্ট’ বানায়।
নিউটন বলেছিলেন, ‘আমার ক্ষমতাগুলো সাধারণ; শুধু প্রয়োগের ভিন্নতা আমাকে সাফল্য এনে দিয়েছে।’ আইডিয়াটা কিন্তু সহজ। যে কাজের ওপর আপনার আবেগ আর ভালোবাসা জড়িত, সে কাজের ব্যর্থতায় কিছুতেই নিরাশ হবেন না। আপনি জানতেও পারবেন না যে, আর একটিবার চেষ্টা করলেই হয়তো আপনি সফল হয়ে যেতেন। ১০ হাজার বার ব্যর্থতার পর এডিসন যদি হাল ছেড়ে দিতেন, আমরা হয়তো অন্ধকারেই থেকে যেতাম। ওই ‘আর একবারের’ চেষ্টাই তাকে সাফল্য এনে দিয়েছিল। ‘জীবনে বেশির ভাগ ব্যর্থতায় হাল ছেড়ে দেওয়া মানুষ বুঝতেই পারে না, তারা সাফল্যের কত কাছাকাছি ছিল’-এ কথা যিনি বলেছেন, তার নাম এডিসন।
কৃষ্ণাঙ্গ হয়েও ওবামা সফলতার সঙ্গে ‘হোয়াইট হাউজে’ ৮ বছর কাটিয়েছেন। তিনি কখনও হাল ছাড়েননি। তিনি সবসময় মনে করতেন, ‘হ্যাঁ, আমরা পারব।’ এটাই জীবনে টিকে থাকার মনোবল। তিনি যদি পারেন, আমিও পারব। প্রয়োজন শুধু আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রম, কর্মস্পৃহা আর দৃঢ় মনোভাব। ব্যর্থতা কখনও দুর্বলতা নয়; বরং জয় করার বিষয়। আজ এ পর্যন্তই। সবাই ভালো থাকবে, সুস্থ থাকবে। আল্লাহ হাফিজ।

SHARE

Leave a Reply