Home বিজ্ঞান ও বিশ্ব বিস্ময়কর গুহা -মুশফিক নেওয়াজ

বিস্ময়কর গুহা -মুশফিক নেওয়াজ

চীনের বেইসুয়েন গ্রামের মাটির নিচে লুকিয়ে আছে প্রাচীন পৃথিবীর এক নিদর্শন। আজ থেকে ২৭ বছর আগেও এই স্থান সম্পর্কে কেউ জানতেন না। গ্রামটির পাশ দিয়ে বয়ে চলা কিউজিয়াং নদীর তীর ঘেঁষে ফিনিক্স হিল নামের এক পাহাড়ের কাছে আবিষ্কৃত হয় বেলে পাথরের তৈরি কিছু প্রাচীন গুহা। গুহাগুলো লঙ্গিউ গুহা নামে পরিচিত।
১৯৫০ সালে এই অঞ্চলে বড়ো ধরনের বন্যা হয়। কিউজিয়াং নদীর পানিতে তলিয়ে যায় আশপাশের অনেক গ্রাম। গ্রামবাসীরা ফিনিক্স হিল পাহাড়ে আশ্রয় খুঁজে নেয়। স্থানটি উঁচু এবং খাবার পানির অভাব না থাকার ফলে দ্রুত আশপাশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আরও লোক এসে ফিনিক্স হিলের পাদদেশে ‘সিয়ান্বি’ নামে এক নতুন গ্রাম গড়ে তোলে।
১৯৯২ সালের দিকে গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দারা হঠাৎ করেই ২০০০ বছরেরও পুরোনো এই কৃত্রিম গুহাগুলোর খোঁজ পান। যখন গুহাগুলো আবিষ্কৃত হয় তখন এগুলোর অধিকাংশই পানিতে নিমজ্জিত ছিল।
উ আনাই নামের এক গ্রামবাসী অন্যদের সহায়তায় এখানকার একটি গুহার পানি নিষ্কাশনের কাজ শুরু করেন। ১৭ দিন ধরে পানি নিষ্কাশনের পর পানি সরে গেলে তারা একটি গুহার সন্ধান পান।
উ আনাই ও তার সঙ্গীরা আরও উৎসাহিত হয়ে এভাবে আশপাশের আরও ছয়টি গুহার পানি নিষ্কাশন করেন। এই সাতটি গুহার মেঝে ৩০০-২,০০০ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
লঙ্গিউ গুহার মোট সংখ্যা ৩৬টি। এই গুহাগুলো ৩০,০০০ বর্গমিটারের বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। কঠিন সিল্ট পাথরের মাঝে খোদাই করে বানানো এই গুহাগুলো মাটির ৩০ মিটার নিচ পর্যন্ত বিস্তৃত।
এগুলোর প্রতিটিতে পাথরের তৈরি ঘর, সেতু, নালা, এমনকি পুলও আছে। সেই সাথে আছে ওপরের ছাদকে ভারসাম্য রাখার জন্য পাথরের থাম। এখান থেকে মাত্র একটি গুহাকে পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ববিদ, স্থাপত্যবিদ, প্রকৌশলী কিংবা ভূ-তত্ত্ববিদ এগুলো সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেননি। এমনকি এটাও অজানা যে এগুলো কীভাবে বা কেন তৈরি করা হয়েছিল!
লঙ্গিউ গুহাগুলো বানাতে যে পরিমাণ শ্রমের দরকার হয়েছে, তা সত্যিই অদ্ভুত। এই কৃত্রিম গুহাগুলো খোদাই করে তৈরি করার সময় প্রায় ১০ লক্ষ কিউবিক মিটার পাথর অপসারণ করা হয় বলে মনে করা হচ্ছে।
গুহা বানাবার জন্য যে ১০ লক্ষ কিউবিক মিটার পাথরের ভেতর খনন করা হলো, সেই পাথরগুলো কোথায় গেল! গুহাগুলো যে এলাকায় অবস্থিত, তার আশপাশে সেগুলোর কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি ।
বিজ্ঞানীরা ধারণা করেছেন যে, প্রতিদিনে একজন শ্রমিক কতটুকু পাথর খোদাই করতে পারে হিসাব করে যদি ১০০০ মানুষ দিন-রাত কাজ করে তাহলে এই গুহাগুলো বানাতে সময় লেগেছে প্রায় ৬ বছর বা তারও বেশি সময়।
একটি গুহার সাথে আরেকটি গুহার সামঞ্জস্যতা, সাদৃশ্যতা এতো নির্ভুলভাবে কীভাবে করা সম্ভব হলো তা সত্যিই বিস্ময়কর।
প্রতিটি গুহার মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত খাঁজ কাটা। এরকম একই প্যাটার্নে খাঁজ কাটতে প্রয়োজন বিপুল জনশক্তি আর অফুরন্ত সময়। ধারণা করা হচ্ছে এই খাঁজ কাটা লাইনগুলোর সাথে স্থানীয় একটি মিউজিয়ামে থাকা খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ থেকে ৮০০ বছরের পুরোনো কিছু মৃতশিল্পের ওপরের দাগের মিল রয়েছে।
গুহার নির্মাণশিল্প দেখলে বোঝা যায় এখানে স্থাপত্যবিদ্যার উচ্চতর কারিগররা কাজ করেছেন। প্রতিটি গুহার বৈশিষ্ট্য, প্যাটার্ন এবং স্থাপত্যশৈলী প্রায়ই একই।
চারদিকের দেয়াল খাড়া এবং সোজা। নির্মাণ কাজের আগে একটি সুষ্ঠু এবং নিখুঁত নকশা ছাড়া এ ধরনের কাজ সম্পন্ন করা খুবই দুরূহ ব্যাপার। এমন নির্মাণকাজের সাথে তখনকার দিনের দক্ষ ব্যক্তিরা জড়িত ছিলেন বলে প্রমাণিত হয়। কিন্তু সেসব তুখোড় স্থাপত্যশিল্পী সম্পর্কে ইতিহাসে কিছুই জানা যায় না।
এত পুরোনো গুহা পানির নিচে ছিল অনেক দিন। অথচ পিলারগুলো এখনো অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। গুহাগুলোর কোনো কোনো দেয়াল মাত্র ৫০ সেন্টিমিটার পুরু। তারপরও, সেগুলোর কিছু হয়নি এতো বছর পরেও।
গত দুই হাজার বছরে, চীনের ঐ এলাকায় অনেকে গিয়েছে, যুদ্ধ হয়েছে, বন্যায় প্লাবিত হয়ে অনেক পর্বতের আকৃতি পরিবর্তিত হয়েছে। অথচ, লঙ্গিউ গুহা এর ব্যতিক্রম।
গুহাগুলো এতটাই গভীর যে ওপর থেকে সেগুলোর নিচে মেঝের দিকে তাকালে কালো অন্ধকার চোখে পড়ে। এটা সত্যিই খুবই অবাক করা বিষয় যে, এত গভীরেও গুহাগুলোর মেঝে, কলাম আর সিলিংয়ে খাঁজ কাটা সমান্তরাল লাইনগুলো খোদাই করা হয়েছে।
জানা যায় দিনের একটা বিশেষ সময়ে, তির্যকভাবে যখন সূর্যের আলো গুহাগুলোতে পড়ে, শুধু তখনই গুহাগুলো আলোকিত হয়। গুহাগুলোর যত নিচের দিকে যাওয়া যায়, সূর্যের আলো তত কমতে থাকে। একদম নিচে পৌঁছানোর পর প্রায় আর কিছুই দেখা যায় না। তাহলে, দুই সহস্র বছর পূর্বে চীনে যখন আলোকিত করার কোনো যন্ত্র ছিল না, তখন কীভাবে অন্ধকারে ঐ গুহা আর ‘নকশা’-গুলো বানানো সম্ভব হলো!
প্রতিটা গুহাই মাত্র এক বর্গ কিলোমিটার জায়গার মধ্যে বিস্তৃত। এত ঘন করে থাকা এই গুহাগুলোর একটার সাথে আরেকটির সংযোগ থাকার কথা। অথচ প্রতিটি গুহাই আলাদা আলাদা। অনেক গুহার দেয়ালই মাত্র ৫০ সেন্টিমিটার পুরু।
অনেকে অনুমান করেন যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য মাটির নিচে এমন গুহা তৈরি করা হয়েছে। মাটির নিচে রণকৌশল সাজানো এবং নানা নতুন যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারের কৌশল রপ্ত করার জন্য এ স্থানকে তারা ব্যবহার করতেন। ফলে বাইরের কারও পক্ষে তা জানা সম্ভব হতো না।
এমন গুহা সাধারণ মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়। কোনো রাজাই এমন বড়ো মাপের কাজ করার নির্দেশ দিতে পারেন। তবে এই বিষয়েও কোথাও প্রমাণযোগ্য তথ্য নেই। তাই এই গুহাটি আজও রহস্যের আড়ালে রয়ে গেছে।

SHARE

Leave a Reply